রাণুর ভানু

মহুয়া ভট্টাচার্য

মঙ্গলবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:২২ পূর্বাহ্ণ
43

(পর্ব-১)
কৈশোর থেকে তারুণ্যে পদার্পণের সময়টুকুতে সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা একটি উপন্যাস আমার মনে দারুণ দাগ কেটে গিয়েছিল। উপন্যাসটির নাম ‘রাণু ও ভানু’। রাণু অধিকারী, যিনি বিয়ের পর রাণু মুখার্জী নামে পরিচিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের সাথে তার গভীর সখ্যতা ও নিবিড় অথচ অসমবয়সী প্রেম উপন্যাসটিকে কালোত্তীর্ণ সৃষ্টির মাত্রা প্রদান করেছে। দশ বছর বয়েসী রাণুর সাথে আটান্ন বছরের প্রৌঢ় রবীন্দ্রনাথের প্রেম, নির্ভরতা সর্বোপরি সম্পর্কের অনন্য সাধারণ রসায়ন এই কাহিনীর মূল উপজীব্য। রাণু ও ভানুর এই প্রেম স্থায়ী হয় ছয় বছরকাল। এই ছয় বছরে রানু ও রবীন্দ্রনাথের মধ্যে বহু চিঠির আদানপ্রদান হয়। সেই সমস্ত চিঠিগুলোই তাঁদের নিখাঁদ প্রেমের ইঙ্গিত বহন করে। অথচ প্রায় ৫০ টিরও বেশি চিঠির মধ্যে আট দশটি চিঠি ছাড়া বাকী চিঠিগুলোর কোন হদিসই পাওয়া যায়নি।
রাণু অধিকারীর জন্ম অভিজাত সাংস্কৃতিক পরিমন্ডলে। তাঁর বাবা ছিলেন কাশীতে একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দর্শন বিভাগের অধ্যাপক। বয়সে বড় সহোদর, সহোদরাদের সংস্কৃতিচর্চার সুফল হিসেবে রাণুর সাথে আটান্ন বছর বয়েসী নোবেলজয়ী কবি রবীন্দ্রনাথের পরিচয়সূত্র স্থাপিত হয়। সে তাঁর সমস্ত লেখা পড়তে শুরু করল, এবং নিয়মিত রবীন্দ্রনাথের কাছে তার শিশুমনের সমস্ত অপরিপক্কতা নিয়ে রবীন্দ্রনাথের প্রতি গভীর ভালোবাসা আর অধিকারবোধের ডালি সাজিয়ে এক একটি চিঠি লিখে পাঠাতো। রবীন্দ্রনাথ সেইসময় অকল্পনীয় ব্যস্ত একজন ব্যক্তি, যাঁকে হরহামেশা তাড়িত করছে নিজের সৃষ্টির তাড়না, পাশাপাশি বয়ে চলতে হচ্ছে বোলপুর শান্তিনিকেতনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবেও দায়িত্বের ভার। এছাড়া তখন রবীন্দ্রনাথকে একে একে বিধ্বস্ত করছে স্বজন হারানোর শোক, যে-শোকের ডালি প্রথম নিয়ে এসেছিলেন তার নতুন বৌঠান। অল্প বয়সেই এক একটি সন্তানের মৃত্যুর মিছিল তাঁর জীবনকে ক্ষত-বিক্ষত করে দিচ্ছিল, ঠিক এই সময়ই অশোক পলাশের রাঙ্গা হাসিমাখা বসন্তের প্রলেপ বুলিয়ে গেল রাণুর আগমন।এতকিছু ঝক্কি ঝামেলা সামলেও রবীন্দ্রনাথ তাঁর অনুরাগীদের চিঠির উত্তর দিতেন নিয়ম মাফিক। তেমনি কিছু চিঠির ভীড়ে একদিন রাণুর চিঠিটিও ভানুর পরশ পেলো। রাণুর লেখা প্রথম চিঠিটি:

‘প্রিয় রবিবাবু ,
আমি আপনার গল্পগুচ্ছের সব গল্পগুলি পড়েছি, আর বুঝতে পেরেছি কেবল ক্ষুধিত পাষাণটা বুঝতে পারিনি। আচ্ছা , সেই বুড়োটা যে ইরানী বাঁদির কথা বলছিল , সেই বাঁদির গল্পটা বলল না কেন ? শুনতে ভারি ইচ্ছা করে । আপনি লিখে দেবেন। হ্যাঁ ?
আচ্ছা জয়-পরাজয় গল্পের শেষে রাজকন্যার বিয়ে হল। না ? কিন্তু আমার দিদিরা বলে শেখর মরে গেল। আপনি লিখে দেবেন যে, শেখর বেঁচে গেল আর রাজকন্যার সঙ্গে তার বিয়ে হল । কেমন? সত্যিই যদি শেখর মরে গিয়ে থাকে, তবে আমার বড়ো দুঃখ হবে। আমার সব গল্পগুলোর মধ্যে মাষ্টারমশাই গল্পটা ভালো লাগে। আমি আপনার গোরা , নৌকাডুবি , জীবনস্মৃতি, ছিন্নপত্র, রাজর্ষি, বউ-ঠাকুরানীর হাট, গল্প সপ্তক পড়েছি । কোন কোন জায়গা বুঝতে পারিনি কিন্তু খুব ভালো লাগে। আপনার কথা ও ছুটির পড়া থেকে আমি আর আমার ছোট বোন কবিতা মুখস্ত করি। চতুরঙ্গ, ফাল্‌গুনী ও শান্তিনিকেতন শুরু করেছিলাম কিন্তু বুঝতে পারলাম না। ডাকঘর , অচলায়তন, রাজা , শারদোৎসব এসবো পড়েছি। আমার আপনাকে দেখতে খু- উ -উ ু উ ু উ ু উব ইচ্ছে করে। একবার নিশ্চয় আমাদের বাড়িতে আসবেন কিন্তু। না এলে আড়ি। আপনি যদি আসেন তবে আপনাকে আমাদের শোবার ঘরে শুতে দেব। আমাদের পুতুল দেখাব। ও পিঠএ আমাদের ঠিকানা লিখে দিয়েচি।
রাণু
আমার চিঠির উত্তর শিগগির দেবেন নিশ্চয় । ’
সাতান্ন আটান্ন বছরের একজন লেখক, কেবল লেখক বললে ভুল হবে, রবীন্দ্রনাথের খ্যাতি তখন জগতজুড়ে। সারা পৃথিবীতে বিস্তৃত হয়েছে তখন তাঁর কর্মপরিধি। অথচ বক্ষ জুড়ে হাহাকার। কিছুদিন আগেই অকালমৃত্যু হয়েছে কবি কন্যাসন্তান- তারও নাম রাণু। হৃদয় খুঁড়ে খুঁড়ে সেই বেদনার তপ্ত লাভা কবির মনকে বিদীর্ণ করছে অনুক্ষণ। তবুও বাইরে তিনি স্থির। হাজার দায়িত্বের ফাঁকেও তিনি তাঁর ভক্ত, অনুরাগীদের পাঠানো চিঠি পড়েন, উত্তর দেন। কিন্তু রাণু নামের দশ বছর বয়েসী এই অধ্যাপক-কন্যার চিঠি কবির মনে যে কৌতূহলের জন্ম দিল, সেই টানেই তিনি রাণুর পাঠানো চিঠিটি বার দুয়েক পড়লেন। চিঠি প্রেরকের অপরিপক্কতা আর বয়স নিয়ে কবি মনে আর কোন সন্দেহ রইল না। প্রথমত, নিজের নামের পাশে নেই কোন পদবী, চিঠির শুরুতে নেই শ্রদ্ধা সম্বোধনের বালাই! বরং বেশ প্রাপ্তবয়স্কের মতোই গম্ভীর সম্বোধন। ‘প্রিয় রবিবাবু!’ কাঙালেরও অধিক কাঙাল যে মন তাঁর, চিরকালই খুঁজে বেরিয়েছেন ভালোবাসার ঠাঁই, নিরাপদ আশ্রয়। অথচ যাকেই আঁকড়ে ধরেছেন নিবিড় করে, সেই তাঁকে ছেড়ে গেছেন। তবুও সেই খোঁজ থামেনি কবির। চিঠির এক জায়গায় বালিকাটি লিখছে, ‘আপনাকে খু উ উ উ ব দেখতে ইচ্ছে করছে।’ কবি মনে মনে ভেবে রাখলেন, সময় করে এই চিঠির উত্তর দেবেন। অবশেষে দেরীতে হলেও তিনি চিঠির উত্তর দিতে সমর্থ হলেন। কবি রানুকে লিখলেন তাঁর প্রথম চিঠি:
১৯ অগাস্ট ১৯১৭
শান্তিনিকেতন
বোলপুর

কল্যাণীয়াসু ,
তোমার চিঠির জবাব দেব বলে চিঠিখানি যত্ন করে রেখেছিলুম কিন্তু কোথায় রেখেছিলুম সেকথা ভুলে যাওয়াতে এতদিন দেরি হয়ে গেল। আজ হঠাৎ না খুঁজতেই ডেস্কের ভিতর হতে আপনিই বেরিয়ে পড়ল ।
তোমার রাণু নামটি খুব মিষ্টি। আমার একটি মেয়ে ছিল, তাকে রাণু বলে ডাকতুম, কিন্তু সে এখন নেই। যাই হোক ওটুকু নাম নিয়ে তোমার ঘরের লোকের বেশ কাজ চলে যায় কিন্তু বাইরের লোকের পক্ষে চিঠিপত্রের ঠিকানা লিখতে মুস্কিল ঘটে। অতএব লেফাফার উপরে তোমাকে কেবলমাত্র রাণু বলে অভিহিত করাতে যদি অসম্মান ঘটে থাকে তবে আমাকে দোষ দিতে পারবে না। বাড়ীর ডাক নামে এবং ডাকঘরের ডাক নামে তফাৎ আছে যদি ভবিষ্যতে চিঠি লেখো তবে সেকথাটা মনে রেখো ।
শেখরের কথা আমাকে জিজ্ঞাসা করে। রাজকন্যার সঙ্গে নিশ্চয়ই তার বিয়ে হত কিন্তু তার পূর্বেই সে মরে গিয়েছিল। মরাটা তার ভুল হয়েছিল কিন্তু সে আর তার শোধরাবার উপায় নেই। যে খরচে রাজা তার বিয়ে দিত সেই খরচে খুব ধুম করে তার অন্ত্যেষ্টি সৎকার হয়েছিল।
ক্ষুধিত পাষাণে ইরাণী বাদির কথা জানবার জন্যে আমারও খুব ইচ্ছে আছে কিন্তু যে লোকটা বলতে পারত আজ পর্যন্ত তার ঠিকানা পাওয়া গেল না ।
তোমার নিমন্ত্রণ আমি ভুলবনা হয়ত তোমাদের বাড়িতে একদিন যাব কিন্তু তার আগে তুমি যদি আর-কোনো বাড়িতে চলে যাও? সংসারে এই রকম করেই গল্প ঠিক জায়গায় সম্পূর্ণ হয় না।
এই দেখ না কেন, খুব শীঘ্রই তোমার চিঠির জবাব দেব বলে ইচ্ছা করেছিলুম কিন্তু এমন হতে পারত তোমার চিঠি আমার ডেস্কের কোণেই লুকিয়ে থাকত এবং কোনোদিনই তোমার ঠিকানা খুঁজে পেতুম না।
যেদিন বড় হয়ে তুমি আমার সব বই পড়ে বুঝতে পারবে তার আগেই তোমার নিমন্ত্রণ সেরে আসতে চাই। কেননা যখন সব বুঝবে তখন হয় তো সব ভাল লাগবে না। তখন যে-ঘরে তোমার ভাঙা পুতুল থাকে সেই ঘরে রবিবাবুকে শুতে দেবে।
ঈশ্বর তোমার কল্যাণ করুন।

ইতি
৩রা ভাদ্র ১৩২৪
শুভাকাঙ্ক্ষী
শ্রীরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
কবি তাঁর এই সাতান্ন বছরের জীবনে কম চিঠি পাননি। তাঁর অনুরাগী, সমালোচক প্রত্যেকের চিঠির জবাব তিনি যত্ন সহকারেই দিতেন। কিন্তু রাণুর চিঠির মত এত নির্মলরসের চিঠি কবি আর পাননি। রাণু তার পরের চিঠিতে লিখেছে-
প্রিয় রবিবাবু,
আপনি এতদিন আমাকে চিঠি দেননি বলে খুব রাগ হয়েছিল, কিন্তু আপনার চিঠি পেয়ে খুব খুশি হয়েছি। আমার ভালো নাম কি জানেন? প্রীতি। বেশ সুন্দর নাম- না? ইস্কুলে সবাই আমাকে প্রীতি বলে ডাকে। কিন্তু আপনি আমাকে রাণু বলেই ডাকবেন। আপনারও নামটা সুন্দর লাগে কিনা,তাই বলচি। আমার আরো নাম আছে- শুনবেন? রাণী,রাজা,বাবা। সব নামগুলোই বেশ না? আপনি যে কর্তার ইচ্ছায় কর্ম বলে একটা সুন্দর লেকচার দিয়েছিলেন না, সেটা ভারতী আর প্রবাসীতে বেরিয়েছিল। মা,বাবজা,বাবু,আশারা সেটা পড়ে বলেন যে, খুব সুন্দর হয়েছে। আমিও তাই পড়তে গেলাম, কিন্তু কিছুই বুঝতে পারলাম না। বোধহয় সেটা খুব শক্ত। কিছুদিন আগে আমার খুব অসুখ করেছিলো। এখন ভালো আছি। আপনি নিশ্চয় একদিন আমাদের বাড়ি আসবেন। আমরা এ বাড়ি ছেড়ে যাবনা। এ বাড়ি আমাদের নিজের বাড়ি। ভাড়ার বাড়ি নয়। আপনি আসবার সময় আমাদের জানাবেন। আমি স্কুল ছুটি নিয়ে আপনাকে ইস্টিশানে আনতে যাবো। এ চিঠির উত্তর শিগগির দেবেন যেন। হারিয়ে ফেলবেন না যেন। আমি কেমন সুন্দর ফুল আঁকা কাগজে চিঠি লিখচি( ভাদ্র ১৩২৪)।
রাণু।
আমাদের বাড়ির ঠিকানা আবার লিখে দিচ্ছি।
235 Agast Kundoc
Benaras city
আপনি আর কবিতা লেখেন না কেন।
একদিকে সমাজ,সংসারের দায়ভার চাপা কাঁধ, পাঁচজনের ভালোমন্দ, সামাজিকতা অন্যদিকে অন্তরের গভীরে ঝড়ের রাতের মহাসমুদ্র, যন্ত্রণার প্রলয় তিলে তিলে জীর্ন করে দিচ্ছিলো কবি মনকে। এমনই এক শীর্ণ হৃদয়ে পূণ্যময় উত্তাপ ছড়াতে ছড়াতে রাণুর এক একটি চিঠি আসতে লাগলো কবির কাছে। রাণুর চিঠি পেয়ে কবি মনে মনে হাসেন। যেন কতদিনের চেনা সে তাঁর। যেন কতখানি আবদার তার কবির প্রতি! রাণু কি আস্থার সাথে লিখছে তার পরের চিঠিতে-
‘আমি এদ্দিন চিঠি দিইনি বলে রাগ করবেন না যেনো। আমার খুব অসুখ হয়েছিল। কিন্তু এখন ভালো আছি। লক্ষ্মীটি রাগ করবেন না। আজকে থেকে আমাদের পূজোর ছুটি শুরু হয়েছে। 31st October -এ খুলবে।আচ্ছা, আপনার চিঠি লেখা ছাড়া আর কি কাজ!? আর কোই গল্পও লেখেন না। ইস্কুলেও যান না। আমার আপনার চাইতে ঢের বেশি কাজ। সকালে ন’টা পর্যন্ত মাস্টার মশাইয়ের কাছে পড়ি। বিকেলে চারটা পর্যন্ত ইস্কুলে থাকি। ইস্কুল থেকে এসে এক পন্ডিতজীর কাছে হিন্দী পড়ি। আর রাত্রে লেখা, টাস্ক করি। আপনাকে এসে কিন্তু আমাদের বাড়িতেই থাকতে হবে।আর কোথাও থাকতে পারবেন না।’
চিঠি পড়তে পড়তে কবির কাশীর ‘অগস্ত্য কুন্ড’ জায়গাটার নাম ভীষণ চেনা চেনা মনে হল। আগেও একবার গিয়েছিলেন কি!? কাশীর এক অধ্যাপকের বাড়িতে একবার তিনি গিয়েছিলেন, তা বেশকিছুদিন আগে। অধ্যাপকের কয়েকটি কন্যা সন্তানকে তিনি দেখেছিলেন। মনে মনে ভাবতে লাগলেন, তাঁরই কোন কন্যা হবে হয়তো রাণু। শিক্ষানুরাগী এই অধ্যাপককে কবির বেশ পছন্দ হয়েছিল। তিনি ঠিক করলেন আর একবার তিনি কাশি যাবেন। তবে এবার যাবেন রাণুর সাথে দেখা করতে।
রবীন্দ্রনাথের সারাজীবনের চিঠির সম্ভার খুঁজতে গেলে তা পাঁচ হাজার ছাড়িয়ে যাবে। রবীন্দ্রনাথ চিঠি লিখতে যেমন ভালোবাসতেন, তেমনি চিঠি পেতেও ভালোবাসতেন। রবীন্দ্রনাথের সেসব চিঠির অন্যতম উপজীব্য ছিল নারী। যারা রবীন্দ্রনাথকে বিশ্লেষণ করেছেন আজীবন ঘরে-বাইরে কখনো বৌঠান, কখনো ভাতুষ্পুত্রি কিংবা তাঁর অনুরাগী নারীদের নিয়েই প্রেমে মেতেছেন, তাঁদেরও সেই চিন্তার ছেদ পরে যখন দেখা যায়,কবি তাঁর চিঠিতে তাঁর স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে পরম স্নেহে সম্বোধন করছেন ‘ভাই ছুটি’ বলে। হয়তো সেখানে দুজনের অশ্রুবদনার মিলনকাব্য একই মোহনায় এসে মিশতে পারেনি ঠিক, কিন্তু কবির ভালোবাসায় ফাঁকি ছিল না। তবে রাণুর সাথে চূড়ান্ত বয়সের তারতম্য স্বত্ত্বেও সে হয়ে উঠেছিল কবির মনের একচ্ছত্র রাণী। রাণুর বয়স কম হওয়াতে চিঠির সংখ্যা এবং কবির প্রতি তার আবেগ ছিল বেশি। সে একের পর চিঠি লিখে যেতো কবির কাছে। কিন্তু কবির নানারকম ব্যস্ততা হয়তো কিছুটা দূরত্ব তৈরি করতো চিঠির আদানপ্রদানে। এতে রানুর অভিমান,আর সেই অভিমান ভাঙ্গাতেও কবি কসুর করতেন না। তিনি রাণুর কম বয়সের জন্য তাকেই দায়ী করে চিঠি লিখতেন।একবার কবি লিখলেন-
কল্যানীয়েষু রাণু,
‘…কিন্তু আমার দুর্ভাগ্যের কথা একবার শোন, তুমি জন্মাবার কয়েক বছর পরেই আমি পঞ্চাশ বছর পার হলুম। তাতেও একরকম চলে যাচ্ছিলো, তারপর তুমি আমাকে চিঠি লেখা আরম্ভ করার কয়েক মাস পরই আমার শরীর গেল বিগড়ে। দোষ আসলে তোমার, তুমি সেই পৃথিবীতে জন্মগ্রহণ যখন করেছোই, তখন আরো ত্রিশ চল্লিশ বছর আগেই জন্মাতে! ঢিলেমি করে তুমিই দেরীটা করলে, অথচ আড়ি করবার বেলায় তোমারই উৎসাহ বেশি। যাই হোক, তোমার সাথে ঝগড়া করবো না। তোমার আড়ি বাঁচিয়ে চলার চেষ্টা করবো।আড়িকে বড় ভয় করি।
বয়সের এতখানি পার্থক্য, পরস্পরের কাছে আসার এত সকল বাধা স্বত্ত্বেও দুজনের ভালোবাসার দৈন্যতা যেন কিছুই ছিলো না। বালিকা রাণু- কবির অভিমানী প্রেয়সীর ভূমিকা খুব সহজেই নিয়ে নিলো, আর কবিও সহসা মান ভাঙ্গানো প্রেমীরূপে অবতীর্ণ হতে লাগলেন এক একটি চিঠিতে। রাণু শুরু থেকেই কবিকে ‘প্রিয় রবিবাবু’ বলে সম্বোধন করত। হঠাৎই কোন এক মান-অভিমানের জেরে রাণু রবীন্দ্রনাথকে ‘শ্রী রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর’ বলে সম্বোধন করে চিঠি লিখলো। এতে কবির রাণুর অভিমানের সুর বুঝতে মোটেই অসুবিধা হল না। কিন্তু তিনিও কম যান না! সাতান্ন বছরের কবি সাতাশ বছরের যুবক হয়ে ঝগড়ার তোড়জোড় শুরু করলেন! তিনি রাণুর চিঠির জবাব দিলেন –
‘পরশু তোমাকে ঝগড়াটে বলে নিন্দে করে চিঠি লিখেছি, আর তুমি আজকের চিঠিতেই তার প্রমাণ দিয়েছো। আমি যদি তোমার মত হতুম, তাহলে শ্রীমতী রাণু সুন্দরী দেবী বলে তোমাকে আজ সম্বোধন করতে পারতুম, তবেই তুমি জব্দ হতে। কিন্তু নিতান্ত ভালো মানুষ বলে আমি তোমার পাল্টা জবাব দেবার চেষ্টা করিনি। একে তো সময় খুবই কম, তার উপর আবার বয়স হয়ে গেল, কিছু না হোক সাতাশের (!!!সাতাশ???) কম তো হবে না। আমার কি ঝগড়া করে সময় খরচ করার মত অবকাশ আছে? তোমার মত বয়স হলে কি জানি কি করতুম, হয়তো বা ভীষণ ভীষণ রাগের মাথায় শ্রী শ্রী শ্রী শ্রী শ্রীমতী বলে তোমার নামের গোড়ায় একেবারে পাঁচটা শ্রী বসিয়ে দিতুম। রাণুর বদলে মহারাণী ভিক্টোরিয়া নাম বানিয়ে দিতুম। কিন্তু যতই রাগ করি না কেন, কখনোই তোমার নামে ভুলেও চারটা শ্রী বসাতুম না।’
এমনই রসবোধ সম্পন্ন আর প্রেমময় কবির চিঠি পড়ে রাণুর ঠোঁটে হাসির ঝিলিক দেখা না দিয়ে কি পারত! রাণুর বয়েসী হয়ে রাণুরই মত ঝগড়া, মান-অভিমান, প্রেমে মাতিয়ে রাখা কবির মানসপটের অধিকারিণী হতে রাণুর খুব বেশি সময় লাগলো না। কত অজুহাত, কত আর্তি, কত নিবেদন ছিল কবির এই বালিকার প্রতি! রাণুকে লেখা এক চিঠিতে নিজের দোষ ঢাকতে, কি বালকসুলভ খোঁড়াযুক্তি অথচ কি প্রাঞ্জলভাবে বলছেন-
‘মনে করেছিলুম কাল তোমার চিঠি পাবো, কালই পাওয়া উচিৎ ছিলো, পোস্ট অফিসে কালই এসেছিলো নিশ্চয়, কিন্তু পোস্ট মাস্টারের অসুখ করেছে বলে, পশ্চিমের ডাক কেবল আমাদের দেয়নি। আজ সকালে দিয়ে গেছে।’
শান্তি নিকেতনে কবির একটি নিজস্ব ঘর ছিল, আর সবাই জানত, গুরুদেব যখন লিখতে বসবেন তাঁর ঘরে কারো প্রবেশ নিষেধ। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই একটি চপলা হরিণী শকুন্তলা বেশে গোটা আশ্রমময় দাপিয়ে বেড়াতে শুরু করল, এখানে তার অবাধ বিচরণ, তার কোন বিধিনিষেধ মানার বালাই নেই। এই স্নেহ প্রশ্রয় মূলত কবির-ই দেওয়া। তিনি কাশীতে রাণুর সাথে দেখা করার পর রাণুর পরিবারকে আমন্ত্রণ জানালেন শান্তিনিকেতনে এসে কিছুকাল থেকে যেতে। তখন রাণুর বাবা অধ্যাপক ফণিভূষণ অধিকারীও তখন অসুস্থ সুতরাং এই যাত্রায় তাঁরও হাওয়া বদল করা হয়ে যাবে, এই চিন্তা করে রাণু আর তার পরিবার কবির আমন্ত্রণে চলে এল শান্তিনিকেতনে। এখানে এসেই রাণু দূরের মানুষ, চিঠির মানুষটিকে খুব কাছ থেকে চিনতে আরম্ভ করল। সে কখনো কিছু বুনো ফুল কোচড়ে করে নিয়ে বৃষ্টি ভেজা মাথা নিয়ে ঝড়ের মত ঢুকে পড়ে কবির লেখার ঘরে। ঢুকেই রাজ্যের বকবকানি আর অন্যদিকে কবি লেখার ঘোরে হাঁ,হুঁ করেই ক্ষান্ত দিতেন। কিন্তু রাণুর তাতে চলবে কেন!? সে কবিকে জোর করে তার দিকে ফিরিয়ে এনে দেরাজ থেকে চিরুনিটি বের করে, ঠিক একটি শিশুর মত কবির চিবুকখানা ধরে কবির চুল আঁচড়ে দিচ্ছে, দাড়ি ঠিক করে দিচ্ছে! কবির হঠাৎ হঠাৎই মনে হয়, এ যেন আরেক মাধুরীলতা! কবির ছোট মেয়েটিও কবির এমনই করেই গা-ঘেঁষে থাকতো। রাণুর শাসন,আবদার,আহ্লাদের এক ফাঁকে কবি রাণুকে বলেন, ‘আশ্রমের সকলে আমায় গুরুদেব বলে ডাকে, পা ছুঁয়ে প্রণাম করে, কোই তোমায় তো দেখি না আমাকে প্রণাম করতে!?’ রানু তেমনি কবিকে নিবিষ্ট হয়ে সাজাতে সাজাতে উত্তর দেয় ‘আমি তা বলি না,এতে দূর দূর মনে হয়!’ তখন কবিও খানিকটা দুষ্টুমির ছলে বলেন, ‘আমি ভেবেছিলুম আমরা তো পিরিলির বামুন,আর তোমরা উঁচু জাত! তাই বুঝি আমার পা ছুঁতে তোমার আপত্তি!’ বালিকার মনের কোণে এই পুরুষোত্তোমের জন্য যে প্রণয়ের ধারা বয়ে চলা শুরু হয়েছে সবেমাত্র, তার খানিকটা কুলকুল ধ্বনি কি একেবারেই কর্ণগোচর হওয়া অসম্ভব!? সেই মানুষটি যে হৃদয়রাজা! রাণু চট করে বলে, ‘আমার অত ভক্তি শ্রদ্ধা আসেনা। আপনাকে যে আমি ভালোবাসি!’ মুহূর্তেই কবি হৃদয়ের সমস্ত তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বেদনার সুর বেজে ওঠে যেন! তিনি রাণুর কোমল দুটি হাত নিজের করতলে নিয়ে বলেন, ‘এত স্পষ্টাস্পষ্টি ভালোবাসার কথা কতকাল কেউ বলেনি!’
সেবার রাণুকে শান্তিনিকেতন থেকে নিয়ে যেতে বেশ বেগ পেতে হলো সকলকে।রাণু যাবেনা কিছুতেই। সে চাইছে কবির সাথে থাকতে অথচ তা অসম্ভব। এদিকে রাণুর কান্না কবির মনকেও বিদীর্ণ করে দিচ্ছে, কিন্তু কিছু বলারও নেই। রাণু চলে গেল। ট্রেন চলতে শুরু করতেই রাণু কান্না থামিয়ে চিঠি লিখতে শুরু করল তার প্রিয় ভানুদাদার কাছে।
‘… এখন গাড়ি চলছে। আমি খুব কাঁদছি। আপনার জন্য মন কেমন করছে। আপনার কাছে বড্ড যেতে ইচ্ছে করছে। আপনার নাওয়া হয়ে গেছে, কে চুল আঁচড়ে দেবে আপনাকে!?… রোজ বিশ্রাম করবেন। আমার সন্ধ্যেবেলা ভালো লাগবে না। আপনারও বোধহয় লাগবেনা।….যদি কিছু সভা হয় তো বেশি জোরে লেকচার দেবেন না।…সন্ধ্যে হয়ে এসেছে, এখন শান্তিনিকেতনের কথা মনে আসছে। …আমার গাড়িতে একটুও ভালো লাগছে না। আপনার কাছে যেতে ইচ্ছে করছে।’
রাণুর চিঠি পেয়ে কবির মনে একটু শান্তির প্রলেপ পড়ল। চিঠি পাওয়ামাত্র কবি উত্তর লিখলেন।
‘রেলের পথে তোমার যে মন খারাপ হয়েছিল, সেই পড়ে বড় আমার বড় কষ্ট হল। তুমি মনে করো না আমি বুঝতে পারিনি। সেই বুধবারের দিন যখন তোমার গাড়ি চলছিলো, আর আমি যখন চুপটি করে ছাদে বসেছিলুম, তখন তোমার কষ্ট আমার বাজছিল। আমি মনে মনে কেবল এই কামনা করছিলুম যে, বাদলের ওপর যেমন ইন্দ্রধনু তৈরি হয়, তেমনি করে তোমার অশ্রুভরা কোমল হৃদয়ের উপরে স্বর্গেও পবিত্র আলো পড়ুক, সৌন্দর্যেও ছটায় তোমার জীবনের এক দিগন্ত থেকে অন্য দিগন্ত পূর্ণ হয়ে উঠুক। আমি আমার জীবনকে তাঁরই কাছে উৎসর্গ করেছি। সেই উৎসর্গকে যে তিনি গ্রহণ করেছেন তাই মাঝে মাঝে তিনি আমাকে নানা ইশারায় জানিয়ে দেন। হঠাৎ তুমি তাঁরই দূত হয়ে আমার কাছে এসেছ। তোমার উপর আমার গভীর স্নেহ তাঁর সেই ইশারা। এই আমার পুরস্কার, এতে আমার কাজের দ্বিগুণ উৎসাহ হয়। আমার ক্লান্তি দূর হয়ে যায়, আমার মনের আকাশ উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।’
রাণু জানত, সামনের পূজোর ছুটির আগ পর্যন্ত সে আর তার ভানুদাদার কাছে যেতে পারবে না। তার চিঠির ছত্রে-ছত্রে সেই বেদনা বারবার জানান দিচ্ছিলো কবিকে।
ততদিনে রাণুর মন অধিকার করে নিয়েছেন অপরূপ সুন্দর মানুষটি। দীর্ঘকায়,শক্তিমান, দুটি কোমল চোখ, সুরেলা কন্ঠস্বর – সবসময় রাণুর সাথে কি অপরিসীম ধৌর্যের সাথে কথা বলে চলেছেন। যেন রাণুর একার মানুষ তিনি! শান্তিনিকেতন আর প্রিয় ভানুদাদার কথা মনে পড়লেই রাণুর ছুটে যেতে ইচ্ছে করে বারবার। রাণু পরের চিঠিতে লিখল-
‘… কি সুন্দর চুল তোমার ভানুদাদা! তুমি চুল কাটলে আমার মন খারাপ হয়ে যেতো। তুমি পূজো পর্যন্ত চুল কাটবে না। তাহলে পূজোর সময় বেশ বড় চুল, সুন্দর হবে। আমি পূজোয় তোমার কাছে যাবোই ঠিক। লক্ষ্মীছেলে হয়ে থাকবে, যাতে সুন্দর দেখায়।’
সাতান্ন বছর বয়সে কবি যখন রাণুর সাথে কথা বলতেন, চিঠি লিখতেন তিনি নিজেও যেন তারই সমবয়সী হয়ে যেতেন। একটি দশ বছরের বালিকার মন তিনি পড়তে পেরেছিলেন এতখানি বয়সেও। এ বুঝি কেবল রবীন্দ্রনাথের পক্ষেই সম্ভব! আবার নিজের উদাসীন মনের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়ে বালিকাটিকে তার মনের কাছাকাছি নিয়ে রাখতেন। তেমনি একটি সারল্যেভরা চিঠিতে কবি রানুর কাছে আত্মসমর্পণ করে লিখেছেন-
কল্যাণীয়েষু,
কলিকাতা
তোমার সঙ্গে চিঠি লিখে জিততে পারব না, এ আমি আগে থাকতে বলে রাখছি। তোমার মতো বাসন্তী রংয়ের কাগজ খুঁজে পেলুম না। সামান্য সাদা কাগজই সবসময় খুঁজে পাইনে। তোমাকে তো আগেই বলেছি আমি কুঁড়ে। তারপরে,আমি ভারি এলোমেলো- কোথায় কি রাখি তার কোন ঠিকানা পাইনে। …আমি জানি তুমি লক্ষ্মী মেয়ে, তুমি অনেক সহ্য করতে পার, আমার কুঁড়েমি, আমার ভোলা স্বভাব, আমার এই সাতান্ন বছর বয়সের যত রকম শৈথিল্য সব তোমাকে সহ্য করতে হবে। আমার মত অন্যমনস্ক, অকেজো মানুষের সাথে ভাব রাখতে হলে খুব সহিষ্ণুতা থাকা চাই। চিঠির উত্তর যত পাবে তার চেয়ে বেশি চিঠি লেখবার শক্তি যদি তোমার না থাকে, দেনাপাওনা সম্বন্ধে তোমার হিসেব যদি খুব বেশি কড়াক্কড় হয় তা হলে একদিন আমার সঙ্গে হয়তো ঝগড়া হতেও পারে, এই কথা মনে করে ভয়ে ভয়ে আছি। …কর্তব্য করতে ভুলি, ভুল সংশোধন করতে ভুলি, সংশোধন করতে ভুলেছি তাও ভুলি। এমন মানুষের সাথে যদি স্থায়ী বন্ধুত্ব রাখতে চাও তাহলে তোমাকেও অনেক ভুলতে হবে।’
ইতি, কার্তিক ১৩২৪।
সে বছর রানুর শান্তিনিকেতনে যাওয়া হল না। গরমের ছুটিতেও নয়, পূজোর ছুটিতেও নয়। কিন্তু চিঠির আদান-প্রদান চলতে লাগল যথানিয়মে। রানুর ভানুদাদা রাণুকে লিখলো- ‘.. .বিধাতা আমাকে অনেকটা পরিমাণে একলা করে দিয়েছেন। কিন্তু তুমি হঠাৎ এসে আমার জীবনের জটিলতার একান্তে যে বাসাটি বেঁধেছ, তা আমাকে আনন্দ দিয়েছে, হয়তো আমার কর্মে, আমার সাধনায় এই জিনিসটির বিশেষ প্রয়োজন ছিল। তাই আমার বিধাতা এই রসটুকু আমাকে জুটিয়ে দিয়েছেন।’
কবি তাঁর প্রতিটি চিঠিতে রাণুর সাথে খুব হালকা হাস্যরসের বাক্যালাপ, যেমন করতেন, তেমনি তিনি হয়ে উঠলেন রাণুর পথ প্রদর্শক, বন্ধু, আলোর দিশারী। তিনি রানুর জীবনে যেন একটি শুকতারা। রাণুর ছবি আঁকার প্রতিভাকে উৎসাহিত করতেন। তেমনি রাণুর সঙ্গীতচর্চার জন্য রাণুকে নিজ হাতে উপহার দিয়েছিলেন এস্রাজ।

x