রাজীব মীর: মানুষটা কেমন ছিল?

জয়দীপ দে শাপলু

মঙ্গলবার , ২৪ জুলাই, ২০১৮ at ৫:৩৯ পূর্বাহ্ণ
49

সে এখন নিঃসঙ্গ। এরপর শোনা যায় তার লিভার সিরোসিস। কাল রাতের খাবার খেতে খেতে এসব গল্পই করছিলাম মিতুর সাথে। সকালেই শুনি রাজীব স্যার নেই।

রাজীব মীরের সাথে আমার পরিচয়টা কীভাবে হলো? সত্যি বলছি আমার মনে নেই। তবে সম্ভাব্য কিছু ঘটনা আমি বলতে পারি। তার কোন একটা ক্লিক করে যেতে পারে।

বিশ্ববিদ্যালয়ে জনপ্রিয় ও তরুণ শিক্ষকরা লাঞ্চের পর আর্টস ফ্যাকাল্টির ঝুপড়িতে আড্ডা পিটাতেন। বড় বড় তত্ত্ব কপচে, কখনো বা গান বাজনা করে ছাত্রপ্রিয় হওয়ার চেষ্টা করতেন। এখানে জার্নালিজমের শিক্ষকদের ছিল আধিপত্য। কারণ নতুন বিভাগ। তরুণ শিক্ষকদের আধিক্য। সেখানে শুনতাম এক জুনিয়র শিক্ষক এসেছেন কোনো এক ভবনের কৃপায়, তিনি খুব চেষ্টা করছেন প্রগতিশীল সাজার, তার থেকে সাবধান। কিছুদিন পর তাকে খুঁজে পেলাম একদল তরুণের কাফেলার পুরোভাগে। মনে মনে ঘৃণাই হলো।

আমরা চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সবচেয়ে অন্ধকার সময়ের শিক্ষার্থী। আমি যে বছর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হই, সেবার ৮ টা খুন হয়। এদল যদি বিদলের কাউকে মারে, বিদল মারে এদলকে। পাল্টাপাল্টি খুন চলছিল একের পর এক। এসব কারণে একবার মধ্যে সামান্য বিরতি দিয়ে ১৪ মাস বন্ধ ছিল ভার্সিটি। তার উপর সে বছরই চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় (সারা দেশে সর্বপ্রথম) ৪ বছরের অনার্স চালু করে। এদিকে আমাদের ডিপার্টমেন্টে ছিল চরম শিক্ষক দ্বন্দ্ব। শিক্ষকদের ত্রিমুখী সংঘর্ষে কেউ মাস খানেকের বেশি চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করতে পারছিলেন না। শেষমেশ সবচেয়ে নিরীহ ও নির্বিষ ব্যক্তিকে চেয়ারম্যান করা হলো। এ সুযোগে শিক্ষকরা উঠলেন মাথায়। আমার সেশনে মোট শিক্ষার্থী ছিল ২২ জন। এই ২২ জনের ২২ টি শিল্পকর্ম দেখে নাম্বারিং করা একজন শিক্ষকের ২২ মিনিটের কাজ। কিন্তু সেটা করলেন একেকজন ২০ মাসে। ফলে আমাদের ছাত্রজীবন হয়ে যায় ছত্রখান। অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাস করে আমাদের ব্যাচমেট বা সমসাময়িকরা হয়ে যেত লাগল আমাদের শিক্ষক। এরকম একঝাঁক তরুণ শিক্ষকের ভিড়ে খুঁজে পাই রাজীব মীর নামে এক তরুণকে। রাজীব মীর বয়সে আমার বছর তিনেকের বড়।

আমরা তখন ধুমায়ে খ্যাপ মেরে বেড়াতাম চট্টগ্রাম শহরে। আমার ডান আর বাম হাত ছিল রাফি আর বেলো। তারা থাকত ঝর্নার পার এলাকায়। সেখানে মাঝেমাঝে শলাপরামর্শের জন্য যেতাম। সেখানে শুনলাম সেই নবাগত শিক্ষক থাকেন। বিষয়টা আমার ভালো লাগে নি। সেখানে তার সাথে কি আমার পরিচয় হয়েছিল? ঠিক করে মনে পড়ছে না।

তারপর রাফি বেলোরা চলে এলো আমার পাড়ায়। তাদের বন্ধু ছিল রুবেল। রুবেলের মারফতে আগামীর সাথে সম্পৃক্ত হওয়া। যেআগামীর বর্ষবরণ আয়োজন ছিল চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় রক্তপাতবিহীন সাংস্কৃতিক উত্থান। সেই অনুষ্ঠানের সময় আবিষ্কার করলাম আমার সাথে রাজীব মীরের ঘনিষ্টতা একটা পর্যায় পেয়েছে। লোকটাকে আমার খারাপ লাগছে না। তার সাথে আড্ডা পিটাতে ভালোই লাগে। তিনি নির্দ্বিধায় আমার বাসায় চলে আসেন। রাতের খাবার খেয়ে চলে যান।

তবে রাজীব মীরের প্রতি আমার পারসেপশন ভাঙার একটা ছোট্ট ঘটনা আছে, সেটা বলি। তখনও তার সাথে আমার পরিচয় হয়ে উঠেনি। সেবার নবীনবরণের দায়িত্ব ছিল আমাদের ইয়ারের। রেওয়াজটা ছিল এমন, অনার্স ফাইনাল ইয়ারই আয়োজন করবে নবীন বরণ আর বিদায় অনুষ্ঠান। মাস খানেক ধরে খেটেখুটে আমরা মঞ্চ বানালাম। র‌্যালির জন্য মুখোশ পুতুল। সেসময় সংস্কৃতিচর্চাবর্জিত ক্যাম্পাসে চারুকলার নবীনবরণ ছিল এক উৎসব। অন্য বিভাগের শিক্ষার্থীরা উন্মুখ হয়ে থাকত। আমরা আপ্রাণ চেষ্টা করছিলাম সেউৎসবে যাতে কোনো কমতি না হয়। অনুষ্ঠানের দিন সকালে এসে আমাদের মাথায় হাত। দেখি আমাদের সব পুতুল আর মুখোশ পুড়িয়ে দেয়া হয়েছে। মঞ্চ ভেঙে তছনছ। আমরা হন্তদন্ত হয়ে আমাদের বিভাগের এক সিনিয়র ভাইয়ের শরণাপন্ন হই। সে বলল, ‘তোমরা বিশাল ভুল করেছো। ছাত্র সংগঠনের অনুমতি না নিয়ে এসব করা ঠিক হয়নি।’ আমরা অবাক হই। এর আগে তো কোনোদিন তাদের অনুমতি লাগেনি। একটা বিভাগের অনুষ্ঠানে কেন ছাত্র সংগঠনের অনুমতি লাগবে। সে ভাই কিছু শর্ত দিলেন। তা মানলেই কেবল অনুষ্ঠান হতে পারবে। কি শর্ত? শর্ত একঅনুষ্ঠান শুরুতে কোরআন তেলোয়াত করতে হবে। আমরা বললাম, ঠিক আছে। তাহলে গীতা ও ত্রিপিটক পাঠও হোক। তিনি তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন। যেমঞ্চে কোরআনের পবিত্র ধ্বনি শোনানো হবে সে মঞ্চে মূর্তিপুজারিদের অসভ্য শব্দ শোনানো যাবে না। তার পর একের পর এক শর্ত। তার শর্ত মেনেই অনুষ্ঠান শুরু হলো।

সেই গুমোটকালো অনুষ্ঠানের মাঝে হঠাৎ এক তরুণ শিক্ষক কিছু শিক্ষার্থীকে নিয়ে হৈ হৈ করে এসে ঢুকে পড়লেন। সব ধরনের ফর্মালিটিসকে ইগনোর করে সোজা উঠে গেলেন মঞ্চে। খাঁচায় আনা দুটো মুনিয়া পাখি ছেড়ে দিলেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের মেঘেঢাকা আকাশে। মনে হলো আমাদের মনের ভেতরে আটকে থাকা উদ্বেগের দীর্ঘশ্বাস যেন পাখি হয়ে উড়ে গেলো। মুহূর্তে অনুষ্ঠান হালকা হয়ে এলো। খাটো কৃষ্ণকায় সেই শিক্ষকটির নাম পরে জেনেছি রাজীব মীর। জার্নালিজমের টিচার।

রাজীব মীরকে পড়াশোনাঅলা টিচাররা পছন্দ করতেন না। বাম ঘরনার ছাত্ররা দেখত সন্দেহের চোখে। আর শিবির থাকত তক্কেতক্কে তাকে বিপদে ফেলবার জন্য। ছাত্রলীগ ভাবত ছাত্রদলের লোক। মানে কোনো সংগঠন বা প্রতিষ্ঠান তাকে পছন্দ করত না। কিন্তু প্রতিটি বিভাগে ছিল তার শত শত ভক্ত অনুরাগী। কীভাবে মন খুলে শিক্ষার্থীদের সাথে মিশতে হয় তিনি জানতেন। তিনি যেটা জানতেন না তা অকপটে স্বীকার করতেন। খুব সাধারণ বিষয়ে তিনি প্রশ্ন করতেন। হয়ত কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক তা করবেন না। তার মধ্যে কোনো অভিনয় ছিল না। প্রচুর বই কিনতেন এবং পড়তেন। আর পছন্দ করতেন দলেবলে ঘুরে বেড়াতে।

বিশ্ববিদ্যালয়ের কেউ বিপদে পড়লে যেমানুষটা সবার আগে এগিয়ে যেতেন তিনি রাজীব মীর। রাজীব মীরের সাথে কতবার চট্টগ্রাম মেডিকেলে গেছি তার কোনো হিসাব নেই। যে বাম ছাত্র সংগঠনের নেতারা তাকে সহ্য করতে পারত না, তারা তুলোধুনো হওয়ার পর মেডিকেলে গিয়ে দেখত রাজীব মীর হাজির। যে শিক্ষকরা ছুটির পর আটর্স ফ্যাকাল্টির ঝুপড়িতে তুবড়ি ছোটাতেন, প্রগতিশীলতার বুলি কপচাতেন, ছাত্রছাত্রীরা ন্যায্য আন্দোলনে গেলে তারা চলে যেতেন সিএল ছুটিতে। রাজীব কিছু আলাভোলো ছেলে নিয়ে ঠিকই ঝাঁপিয়ে পড়তেন হাসিমুখে। অনেকে আড়ালে বলত, সস্তা জনপ্রিয়তার চেষ্টা। আমি মনে মনে ভাবতাম, এরকম চেষ্টা থেকে যদি ভালো কিছু হয় খারাপ কি?

একবার আমি জার্নালিজমের করিডোর দিয়ে আমি যাচ্ছিলাম। তিনি কি কারণে যেন ক্লাস থেকে বের হয়েছিলেন। আমাকে দেখে জাপটে ধরলেন। তারপর ক্লাসে নিয়ে সবাইকে চমকে দিয়ে বললেন, আজ ও তোমাদের ক্লাস নিবে। তার পড়ানোর বিষয় মূর্তিতত্ত্ব।

রাজীব মীরের জীবনযাত্রায় এমন কিছু অনুষঙ্গ ছিল যা আমার মতো বোকাবোকা আদর্শবাদীরা সহজভাবে নিতে পারতাম না। বিশেষ করে তার নারীসঙ্গপ্রিয়তা। বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আমি যেমন শীর্ণকায় ছিলাম, তেমনি অনাকর্ষণীয় ব্যক্তিত্বের। তাই কোনো নারীরই মনোযোগ পেতাম না। তাই নারীসঙ্গপ্রিয় কিংবা রমনীমোহন টাইপের কাউকে দেখলে সহ্য হতো না। মনে হতো গোল্লায় গেছে ছেলেটা। এ পয়েন্টে এসে আমি আর প্রতিক্রিয়াশীলরা অজান্তে এক হয়ে গেলাম। এনিয়ে প্রায় আর্টস ফ্যাকাল্টিতে লিফলেট বিলি হতো। রাজীব মীর হাসিমুখে তা এড়িয়ে যেতেন। পাত্তা দিতেন না। প্রায় স্যারের কাছে উষ্মা প্রকাশ করতেন। স্যার হাসতেন। তখন স্যারের ঘনিষ্ঠ সহচর ছিল সোহাগ। সোহাগকে একদিন স্যার নাকি আফসোস করে বলেছিলেন, ‘জয়দীপ ছেলে হিসেবে অসাধারণ, কিন্তু ১৫ দিনের বেশি তাকে সহ্য করা যায় না।’ মজার ব্যাপার কি এরপর অনেক জায়গায় দেখেছি স্যারের অবজার্ভেশন হার্ন্ডেড পার্সেন্ট কারেক্ট।

এসব কারণে আমার আর স্যারের দূরত্ব তৈরি হতে থাকে। আমরা দু’জনই বিষয়টা ধরা দিতাম না। দেখা হলো স্যার কত গল্প করতেন। আমি আর সোহাগ ঢাকায় এসে একটা বাসায় সাবলেট উঠি। স্যার প্রায় চট্টগ্রাম থেকে এসে সেখানে উঠতেন। আড্ডা হতো রাতের পর রাত। তিনি নাকি একদিন শবেবরাতের সন্ধ্যায় গরীবুল্লাহ শাহর মাজারে ভিক্ষুক সেজে বসেছিলেন। ১ ঘন্টায় ৩০০ টাকা ভিক্ষা পেয়েছিলেন। আমার ছিল ভোরেই চাকরি। বিরক্ত হতাম। স্যার বোধহয় টের পেতেন।

তারপর আমি আর সোহাগ বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। স্যারের সাথে বইমেলা ছাড়া আর তেমন দেখা হতো না। বইমেলায় দেখা হলে পরমাত্মীয়ের মতো তিনি কাছে টেনে নিতেন। সবাইকে বলতেন, ও খুব বড় লেখক। কাউকে দিয়ে ছবি তোলাতেন।

ফেসবুকের কল্যাণে স্যারের সব খবর পেতাম। চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জার্নালিজম ডিপার্টমেন্ট একটা অভিশপ্ত বিভাগ। এর জন্ম থেকেই কোন্দল। এই কোন্দলে একজন শিক্ষককে প্রাণও দিতে হয়েছিল। সেই বিভাগ ছেড়ে তিনি জগন্নাথে জয়েন করেন। ততদিনে তিনি বিখ্যাত লেখক। টিভি ব্যক্তিত্ব। রাতবিরাতে তাকে টিভিতে দেখা যায়। পত্রিকায় আর্টিকেল লেখেন। দেখা হলে প্রায় বলতেন, তিনি ভোলা থেকে এমপি ইলেকশন করবেন কোনো একসময়।

তারারা নাকি বেশি আলো ছড়ানোর দিনেই খসে পড়ে। হঠাৎ শোনা গেল যৌন কেলেংকারির অভিযোগে তার চাকরি চলে গেছে। এর কিছু আগে তিনি বিয়ে করেন। চাকরি হারানো অবস্থায় তার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখে। বিধাতা কেমন নিষ্ঠুর! এতদিন যাকে হাসিঠাট্টায় মজিয়ে রাখলেন, সত্যিকারের আনন্দের সময় তার চারপাশ অন্ধকার। প্রায় লোকাল বাস বা উবারে বসে দেখতাম হলুদ বা সাদা পাঞ্জাবী পরে রাজীব মীর হাঁটছেন শাহবাগ কিংবা বেইলি রোড। যে রাজীবকে ঘিরে রাখত ঝাঁক ঝাঁক তরুণ, সে এখন নিঃসঙ্গ। এরপর শোনা যায় তার লিভার সিরোসিস। কাল রাতের খাবার খেতে খেতে এসব গল্পই করছিলাম মিতুর সাথে। সকালেই শুনি রাজীব স্যার নেই। এখন বুঝি আদর্শবাদিতার নামে আমিই একটা বৃত্তবদ্ধ মানুষ। বৃত্তের বাইরে হাঁটা মানুষকে মেনে নেয়ার শক্তি আমার ছিল না। এখন আমি শিক্ষকতা করি। পেশাগত বিরূপতা এখানেও আছে। নিজেকে রাজীবের সাথে তুলনা করলে কেমন একটা ভীরু ও আত্মকেন্দ্রিক মানুষ মনে হয়। যত সরলভাবে একযুগ আগে রাজীবকে জাজ করেছিলাম, আজ বুঝতে পারছি হিসাবটা এত সরল নয়। তাই রাজীব ছিল আমার জীবনের এক অপঠিত অধ্যায়। রাজীব মীর মানুষটা কেমন ছিল আমি বলতে পারব না। স্যরি।

x