রাজার ছড়া

জসীম ওমর

বুধবার , ২৮ আগস্ট, ২০১৯ at ১১:২৩ পূর্বাহ্ণ
15

আমার বোন শার্র্লি বছর খানেক আগে লন্ডন থেকে ফিরেছে। ফিরেই ওর মাথায় ভূত চেপে বসল টেকনাফে মোটেল দেবে। জায়গাও আগে কিনে রেখেছিল। তাই লন্ডন থেকে ফিরে এসে বিলম্ব না করে মোটেল দিয়ে দিল টেকনাফ থেকে চার পাঁচ মাইল অদূরে রাজারছড়া নামক এক চমৎকার জায়গায়। শার্র্লি টেকনাফে মোটেল দেয়ার কারণ হল আমার এক ফুফাতো ভাই মেজর আনোয়ার টেকনাফে বদলি হয়ে এসেছে। শার্র্লির সাথে মেজর আনোয়ারের বিয়ের কথাবার্তা অনেক আগে থেকেই ঠিক হয়ে আছে। লন্ডন থেকে ফেরার পর আনোয়ারের কথায় শার্র্লি রাজার ছড়ায় মোটেল দিতে রাজি হন। গেস্টরাও আসতে শুরু করেছিলো। কিন্তু মাস দু’এক যেতে না যেতেই শার্র্লির নামে একের পর এক উড়ো চিঠি আসতে লাগল। শার্র্লি ব্যাপারটি মেজর আনোয়ারকে বলেছিল। নিকুঞ্জ বিকাশ দে নামে এক স্মাগলার নাকি শার্লির মোটেলটা কিনতে চেয়েছিল। শার্র্লি যখন রাজি হল না তখন ওর পেছনে লোক লাগিয়ে দেয়া হল। শার্র্লি নিজেই গাড়ি ড্রাইভ করে টেকনাফ শহরে আসা যাওয়া করত। নিকুঞ্জ বিকাশের লোকেরা কয়েকবার নাকি শার্লির গাড়িটা খারাপ করে দিয়েছিল। একবার নাকি টেকনাফ থেকে মোটেলে ফেরার পথে জীপের ব্রেক ফেল হয়ে গিয়েছিল। সেদিন শার্র্লি অল্পের জন্য নাকি প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল। নইলে সেদিনই তাকে এ পৃথিবীর মায়া ছেড়ে পরপারে চলে যেতে হত। দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পাওয়ার পর পরই শার্র্লি আমাকে রাজারছড়া যাওয়ার জন্য এক দীর্ঘ চিঠি লিখল। তাতে ওর বিপদের কথাই লেখা ছিল বেশি। আমি শার্লির কথা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারলাম না। ভাবলাম বেশ কিছুদিন ওকে দেখতে যাইনি বলে কি শার্র্লি এরকম লিখেছে। পরক্ষণে ভাবলাম শার্লিরতো আমি ছাড়া কেউ নেই। সত্যি ওকে দেখতে যাওয়া দরকার। শার্র্লিকে আমি অনেক বারণ করেছিলাম। এতদূরে মোটেল দেওয়ার দরকারটা কি এখানে দিলেই বা ক্ষতি কি ছিল কিন্তু শার্র্লি আমার কোন কথাই শুনল না। আমাকে দেখে শার্র্লি দৌড়ে এল। এরপর জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল সত্যি এসেছ। জামী ভাই আমিতো ভাবলাম তুমি আমাকে ভুলেই গেছ। তারপর আঁচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল নিকুঞ্জ বিকাশের জ্বালায় অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছি। তুমি এসেছ ভালই হয়েছে। ব্যাটাকে একবার একটা উচিৎ শিক্ষা দেয়া যাবে। শার্র্লি আমার হাত থেকে ব্যাগটা নিয়ে বলল, তুমি উপরে গিয়ে ফ্রেস হয়ে এস আমি মরিয়ম বিবিকে টেবিলে খাবার দিতে বলি।
খেয়ে দেয়ে নিজের ঘরে যখন বিশ্রাম করতে এলাম দক্ষিণের জানালাটা খুলে দিলাম। সঙ্গে সঙ্গে সমুদ্রের এক ঝলক ঠান্ডা বাতাস এসে প্রাণটা জুড়িয়ে দিল। মনে মনে বললাম সমুদ্রের কোল ঘেঁষে শার্র্লির মোটেলটা গড়ে উঠেছে। সত্যিই ওর প্রশংসা করতে হয়। এমন সময় শার্র্লি এসে ঘরে ঢুকল। শার্র্লিকে বললাম দেখি এবার তোর বিপদের কথা বল। তারপর ও একের পর এক বিস্তারিতভাবে তার বিপদের কথা খুলে বলল। শার্র্লিকে লেখা নিকুঞ্জ বিকাশের শেষ চিঠিটাও আমার দিকে বাড়িয়ে দিল। তাতে নিকুঞ্জ বিকাশ লিখেছে শার্র্লি ম্যাডাম, নমস্কার। আপনার জন্য আমার খুব মায়া হচ্ছে। আমি বুঝতে পারছি না কেন আপনি নিজের পায়ে নিজে কুড়াল মারতে চাইছেন। আবারো বলছি মোটেলটা আমার বিশেষ প্রয়োজন। আমার কাছে বিক্রি করে এখান থেকে কেটে পড়েন। নতুবা পরিণতি ভালো হবে না। ইতিএন.বি দে।
চিঠি পড়ে শার্র্লিকে বললাম এটাতো রীতিমত থ্রেড। নিকুঞ্জ মশাই যে তৎপরতা শুরু করেছে তাতে মনে হয় না তুই বেশিদিন এখানে টিকতে পারবি। তুই থানায় একটা ডায়রী কর । শার্লি ভ্রু কুঁচকে বলল টিকব না মানে? আমাকে টিকতেই হবে। দেখি কত ধানে কত চাল।
শার্লির সঙ্গে গল্প করতে করতে অনেক রাত হয়ে গিয়েছিল। ঘুমও এসেছিল দু’চোখ ভরে। রাত তখন দু’টো কি তিনটে আমার ঘরে টোকা পড়ল। ভাবলাম এত রাতে আবার কে আসবে। নিশ্চয় শার্র্লি হবে। দরজা খুলতেই মুখোশধারী কয়েকজন যুবক হুড়মুড় করে ভিতরে ঢুকে পড়ল। একজন আমাকে দেশে তৈরি রিভলবার উঁচিয়ে ধরল। কিছুক্ষণ পর ওরা শার্র্লিকেও নিয়ে এল আমার ঘরে। আমি চিৎকার করে ওদের উদ্দেশ্যে বললাম শুয়োর কি আওলাদ শার্র্লিকে ছেড়ে দে। ওদের একজন খিলখিল করে হেসে উঠল আর বলল এই দেখ দেখ শালা গালি দেতাহে। বেশ মোটাসোটাএকজন আমার দিকে এগিয়ে এলো আমার চিবুক ধরে চোখ বড় বড় করে বল্ল, বেশি বাড়াবাড়ি করলে চোখের সামনেই অঘটন ঘটাইয়া দিমু। আরেকজন এগিয়ে এসে বলল, ঘটনা ঘটাইনা ঘইটা যায়। আমি কৌশলে আমাকে উঁচিয়ে ধরা রিভলবারটা এক ঘুষিতে ফেলে দিলাম। তারপর নিজেই রিভলবারটা তুলে নিয়ে ওদের দিকে তাক করে বললাম খবরদার এক পা এগুলে গুলি করব। ওদের হাত থেকে একে একে সব অস্ত্র খসে পড়ল। শার্র্লি মেজর আনোয়ারকে ফোন করে ঘটনাটা জানিয়ে দিল। সঙ্গে সঙ্গে মেজর আনোয়ার এসে গেল। তারপর সবটাকে বেঁধে মেজর আনোয়ার জীপে করে তুলে নিয়ে গেল। ভোর হওয়ার সাথে সাথে নিকুঞ্জ বিকাশও ধরা পড়ল। বিকেলে মেজর আনোয়ার এসে উপস্থিত হল। সঙ্গে এল ওর বন্ধু আসিফ ইকবাল। মেজর আনোয়ারের সাথে শার্লির বিয়ের দিন তারিখ সেদিনই চূড়ান্ত হল। দু’দিন পরই বিয়ে। বিয়েতে তেমন কাউকে নিমন্ত্রণ করা হয়নি। মেজর আনোয়ারের কয়েকজন সহকর্মী এসেছিল মাত্র। মেজর আনোয়ার আর শার্র্লিকে এক সাথে দেখে কাজী সাহেবের সাথে সবাই এক বাক্যে স্বীকার করতে বাধ্য হন যে শার্র্লি আর মেজর আনোয়ারকে চমৎকার মানিয়েছে।

x