রাজনীতি ও ভিআইপি সংস্কৃতি

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০১৮ at ৬:০৬ পূর্বাহ্ণ
80

জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজার রায়ের পর দেশের রাজনীতিতে বড় ধরনের বাঁক বদলের ইঙ্গিত মিলেছে। বাঁক বদলের এই রাজনীতি ইতিবাচক এবং নেতিবাচক দু’তরফেই হতে পারে। নির্ভর করছে, জাতীয় নীতিনির্ধারক শক্তিগুলোর দৃষ্টিভঙ্গির উপর। বিএনপি নেতা এবং এই ঘরানার বুদ্ধিজীবীদের অভিযোগ, খালেদা জিয়া তার পরিবার এবং বিএনপি ঘনিষ্ঠ নেতাআমলাদের বিরুদ্ধে মামলাটি সাজানো। কিন্তু আদালতে দীর্ঘ শুনানী, সাক্ষীদের জেরা, সাওয়ালজবাবের পরে প্রায় ৬৩২ পৃষ্ঠার দীর্ঘ রায়ের সার সংক্ষেপে সংশ্লিষ্ট বিচারক খালেদা জিয়া, তারেক রহমানসহ ৬ অভিযুক্তকে অপরাধী বলে রায় দেন। ইতোমধ্যে রায়ের বিষয়টি দেশবাসী জেনে গেছেন। তাই এ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা অবান্তর। এক এগারোর তত্ত্বাবধায়ক সরকার আমলের এই মামলার দীর্ঘ দশ বছর ধরে বিচারিক কার্যক্রম চলেছে। রায় হলো ৮ ফেব্রুয়ারি। রায়কে ঘিরে দেশব্যাপী টান টান উত্তেজনা বিরাজ করে রাজনৈতিক অঙ্গনে। জনজীবনে আতঙ্কের কালো মেঘ জমে। বেগম জিয়া রাজধানীর বিশেষ আদালতে আসার পথে কাকরাইল ও চানখার পুলে বিএনপি নেতাকর্মীদের সাথে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সংক্ষিপ্ত সংঘর্ষ ছাড়া এ’দিন বড় কোন দুর্ঘটনা ঘটেনি। দেশের অন্যান্য অঞ্চলে বিচ্ছিন্ন কিছু সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরিশালের জনসভায় এ’দিন তার পূর্বসূরি সম্পর্কে যে বক্তব্য দিয়েছেন, এটা রাজনৈতিক বক্তব্য হিসাবে ধরে নেয়াই সঙ্গত।

সবচে’ বড় কথা হলো এই ঐতিহাসিক রায়ের মাধ্যমে আবার প্রমাণ হলো, এদেশে সর্বোচ্চ ক্ষমতাধর প্রভাবশালীদেরও বিচার হয়। অবশ্য এই প্রক্রিয়া প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকার কুখ্যাত যুদ্ধপরাধীদের তামাদি মামলাগুলো পুনরুজ্জীবিত করে তার সরকারের দ্বিতীয় মেয়াদেই শুরু করেন। প্রচণ্ড ক্ষমতাধর এবং দাম্ভিক কুখ্যাত যুদ্ধাপরাধীদের ফাঁসিতে ঝুলানো হয় তার মেয়াদে। এদের কেউ কেউ এত বেশি ক্ষমতাধর এবং দাম্ভিক আচরণ করেছেন যে, জনমনে ধারণা জন্মে এদেশে এদের ধরা এবং বিচার অসম্ভব। অসম্ভবকে সম্ভব করেছেন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনা। নিম্ন আদালতের রায়ে বেগম জিয়া, তার পুত্র এবং সংশ্লিষ্টদের সাজা হলেও উচ্চতর আদালতে আপিলের সুযোগ রয়েছে। দেশের বিচার ব্যবস্থার উপর রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ নতুন নয়। যখন যে দল ক্ষমতায় থাকে, তাদের বিরুদ্ধে অভিযোগের আঙুল তোলে বিরোধী দল। আবার ক্ষমতাসীন দলটি ক্ষমতা হারালে একই অভিযোগ তোলে শাসক দলের বিরুদ্ধে। আদালত নিয়ে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এই ‘চাপানউতোরের’ খেলা চলছেচলবে। কিন্তু যতই অভিযোগের আঙুল উঠুক, দেশের জনগণের ন্যায় বিচার প্রাপ্তির শেষ আশ্রয়স্থল এখনো আদালত। কাজেই আদালতের এই সাহসী রায়কে খাটো করে দেখার সুযোগ নেই। বেগম জিয়া ন্যায় বিচার না পেলে তার জন্য হাইকোর্ট এবং আপিল বিভাগের দরজা খোলা রয়েছে। ইতোমধ্যে বিএনপি নেত্রী ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী মামলার রায়ের আগে নেতাকর্মীদের সহিংসতা এবং নৈরাজ্যকর রাজনীতি থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দিয়েছেন। তাঁর এই নির্দেশনা অবশ্যই রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পরিচায়ক।

রায়ের ইতিবাচক দিক হচ্ছে, দেশে যে যত প্রভাবশালী বা ক্ষমতাধর হোক না কেন, কেউ বিচারের ঊর্ধ্বে নন। বিচারের এই ধারা সমুন্নত থাকলে সুস্থ ও গতিশীল রাজনীতির পুনরুজ্জীবন ঘটবে। তৃণমূল থেকে শীর্ষস্তর পর্যন্ত ন্যায় বিচারের হাত সম্প্রসারিত হলে বিচারহীনতার সংস্কৃতি থেকে জাতি মুক্তি পাবে। পাশাপাশি দেশ শাসনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালীরা দুর্নীতি অনিয়ম, লুঠপাটে জড়িত হলে তাদেরও একদিন বিচারের কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হবে এই সতর্ক সংকেত পৌঁছে যাবে। রাষ্ট্রীয় ক্ষমতার অপব্যবহার এবং দুর্নীতিঅনিয়মের শেষ অঙ্ক যে করুণ, তা আশা করি দুর্নীতির পক্ষে ডুবে থাকা ক্ষমতাবানেরা বুঝতে পারবেন। পাশাপাশি বিপুল কর্মীসমর্থক থাকলে আদালতের রায় নিজের পক্ষে না গেলে দেশব্যাপী নৈরাজ্য, সহিংসতার আগুন জ্বালিয়ে দেয়া সম্ভব এই অশুদ্ধ ধারণা থেকেও ক্ষমতাধর শক্তি বা দল মুক্ত হতে পারবে। রাজনীতিতে এই কয়েকটি ইতিবাচক ঘটনা ঘটলে বিচার বিভাগ ও নির্বাহী বিভাগের উপর মানুষের চিড় খাওয়া আস্থা জোড়া লাগবে। একইভাবে রাজনীতি হিংসা ও জীঘাংসার অন্ধকার খোড়ল থেকে মুক্ত হয়ে শুদ্ধ ধারায় ফিরে আসবে। রাজনীতির ইতিবাচক মোড় পরিবর্তনের দায়টা নিতে হবে সরকার ও সরকারি দলকে। কিন্তু চলমান বাস্তবতা তা বলেনা। সরকারি দলে আগাছার এত বেশি চাষ হচ্ছে, যা রাজনীতি নিয়ে মানুষের মনে স্থায়ী নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিচ্ছে। এমন কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা অঞ্চল নেই, যেখানে সরকারি দল ও ছাত্র সংগঠনের নামে সংঘর্ষ, হামলা পাল্টা হামলা, চাঁদাবাজি রক্তপাতের ঘটনা ঘটছেনা। পাশাপাশি অনিয়ম, দুর্নীতি, নিয়োগ ও কমিশন বাণিজ্যের বিরুদ্ধে নিজেদের পাল্টাপাল্টি দোষারোপের ঘটনাও নিত্য ঘটছে। স্বাভাবিক কারণে জনগনের কাছে নেতিবাচক বার্তা পৌঁছাচ্ছে। ইতোমধ্যে বেগম জিয়ার সাজার রায়ের পর গুঞ্জন উঠেছে, বেগম জিয়া যদি দুর্নীতির জন্য শাস্তি পায়, তাহলে সরকারি দলের দুর্নীতিবাজরা কেন নয়! গুঞ্জনের ছোট ছোট স্ফূলিঙ্গ থেকে বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়। স্বাভাবিক কারণে জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলার রায় থেকে সরকার ও সরকারি দলকে নতুন করে শিক্ষা নিতে হবে। সরকারি দলের যে সব নেতা দল বা সরকারি পদ পদবীর সুযোগ ব্যবহার করে রাতারাতি বাসযাত্রী থেকে মার্সিডিজ, ভলভো যাত্রী হয়েছেন। বিত্ত ও প্রভাবের ছড়ি ঘোরাচ্ছেন, দুদককে তাদের সম্পদের উৎস খুঁজে বের করতে হবে। দুর্নীতিবাজ ও ক্ষমতা অপব্যবহারকারীরা সরকারি দলের ছাউনিতে থেকে যদি শাস্তি না পান, তাহলে খালেদা জিয়া তার দোসরদের রায় জনগনকে ভুল বার্তা পৌঁছে দেবে। যে কোন মূল্যে আইনকে তার নিজস্ব পথে চলতে দেয়া এখন সরকারের নৈতিক দায়িত্ব এবং কঠোর এজেন্ডা হওয়া উচিত। প্রধানমন্ত্রী এবং বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনাকে যে কোন মূল্যেই নিজ দল এবং সরকারের আবর্জনা সাফ করতেই হবে। যদি তিনি ঘরের শত্রু বিভীষনদের শাস্তির আওতায় আনতে পারেন, তাহলে বাংলাদেশের আগামী দিনের রাজনীতি বিশ্ব দরবারে স্বচ্ছতা ও নীতি নৈতিকতার আদর্শিক রোল মডেলের সম্মান পাবে। আমাদের বিশ্বাস, বঙ্গবন্ধু কন্যা এবং সাহসী প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা ইচ্ছা করলেই তা পারবেন। যদিও সরকার ও দলের অভ্যন্তরে প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের জাল তাকে থামিয়ে দিতে চাইবে। কিন্তু ষড়যন্ত্রের এই জাল তাঁকে ছিন্ন করে দেশ ও জাতিকে সমৃদ্ধি ও আলোর দিগন্তে তুলে আনতে হবেই। কারণ বাংলাদেশে শেখ হাসিনার বিকল্প কোন রাষ্ট্রনায়ক আপাতত নেই। তিনি ব্যর্থ হলে দেশ ও জাতিকে অন্ধকারের অতলে ঠেলে দেয়ার জন্য নিজের দলের সর্বভূক রাক্ষসখোক্ষসেরাই যথেষ্ট। বিরোধী দল বা অন্য কোন প্রতিপক্ষের দরকার নেই। দেশ যাতে কোনভাবেই নেতিবাচক পথে মোড় না বদলায় এ’ব্যাপারে বঙ্গবন্ধু কন্যাকে কঠোর এবং সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে।

এদিকে মন্ত্রী পরিষদে রাস্তার যানজট এবং ভুল পথে ভিআইপিদের যান চলাচল বন্ধে রাজধানীর রাজপথে ভিআইপি লেইন চালুর প্রস্তাব উঠেছে। যারা এই প্রস্তাব এনেছেন, তারা কখনো সরকার, দেশ এবং জাতির বন্ধু হতে পারেন না। কারণ আমাদের সংবিধানে ভিআইপি নামে কোন শ্রেণি নেই। প্রজাতন্ত্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতার মালিক দেশের ষোল কোটি নাগরিক, কোন ভিআইপি নন। তাহলে কেন ভিভিআইপি নামের কিছু পরজীবী বাড়তি সুবিধা নেবেন। সড়ক পথের আকালের দেশে তাদের জন্য আলাদা ভিআইপি লেইন করতে হবে কেন? এ’ধরনের সুবিধা পৃথিবীর কোন দেশে নেই। নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশের মন্ত্রীরা অফিস শেষে নিজস্ব বাহনে বাসায় ফিরেন। নিজেরা হাটবাজার করেন কোন সরকারি প্রটোকল ছাড়া। আমাদের দেশে কেন ভিআইপি সংস্কৃতি থাকবে। ভিআইপি সেবায় রাষ্ট্রীয় কোষাগারের বিপুল অর্থ অপব্যয় হবে? যদি এমন হয় এদেশে তো সবাই ভিআইপি হতে চাইবে। খেটে খাওয়া মানুষ, রেমিট্যান্স যোগানদাতা প্রবাসী ছাড়া যারা কোন উৎপাদনের সাথে সংশ্লিষ্ট নন, তারা সবাই ভিআইপি হওয়ার দৌড়ে থাকবে। যা সরাসরি সংবিধানের বরখেলাপ। ভিআইপি সংস্কৃতি পুরোপুরি ছাটাই করে দিতে কঠোর সিদ্ধান্ত যত দ্রুত নেয়া যায়, ততবেশি জাতির মঙ্গল। উন্নয়ন অভিযাত্রায় ভিআইপি সংস্কৃতি বড় ধরনের ব্যারিকেড তৈরি করে রেখেছে।

x