রাজনীতির হিরন্ময় চাষি

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৫ সেপ্টেম্বর, ২০১৮ at ১০:২২ পূর্বাহ্ণ
10

তাঁর মৃত্যুটা কারো ভুলার মতো না। পবিত্র ঈদুল ফিতরের জামায়েতে হঠাৎ করে অসুস্থ হয়ে চলে গেছেন সবাইকে ছেড়ে অন্য ভুবনে। কী বলবো এই মহাযাত্রাকে? মুসলিম উম্মাহর সবচেয়ে বড় আনন্দ উৎসবের আবহে বেদনার নীল ঢেলে পুরো আয়োজনকে নয়া মাত্রা যোগ করেছেন তিনি। রাজসিক বিদায়, ২০০৯ সালের ২১ সেপ্টেম্বরে! তিনি এম এ মান্নান। চট্টগ্রাম আওয়ামী পরিবারের অবিসংবাদিত অভিভাবক। শুদ্ধ রাজনীতি চর্চার হিরণ্মময় পুরুষ। রাজনীতিতে ত্যাগ, শিক্ষা, আদর্শ, জ্ঞান, মেধা, শুদ্ধতা যে প্রধান শর্ত, এম এ মান্নান নিজের কর্ম ও চর্চা দিয়ে এই সত্য তুলে ধরেছেন আজীবন। তাইতো পবিত্র ঈদের দিন চট্টগ্রামের দলমত নির্বিশেষে সব মানুষকে কাঁদিয়ে চলে গেছেন, ব্যাতিক্রমী ধারার এই মানুষটি। না, মোটামুটি পরিণত বয়সেই তিনি পরপারের যাত্রী হয়েছেন। তবুও চট্টগ্রামের রাজনীতি বিশেষ করে আওয়ামী লীগ রাজনীতিতে আদর্শিক যে শূন্যতা তিনি তৈরি করে গেছেন, তা কখনো পূরণ হয়নিহবেও না। দিব্যি দিয়ে এই সত্য উচ্চারণ করা খুবই সহজ। কারণ, কর্পোরেট ঘরানার মাফিয়ার সংক্রমণ রাজনীতি বিশেষ করে ক্ষমতাসীন রাজনীতিতে যে দুষণ ছড়াচ্ছে, তাতে বাঁধ দেয়ার মতো আর কেউ রইল না! আগামীতে আসবেন এই সম্ভাবনা একেবারেই ক্ষীণ। রাজনীতিতে এখন দাপিয়ে বেড়াচ্ছে কর্পোরেট চক্র। সরকারি দলের রাজনীতিও বঙ্গবন্ধুর নীতিআদর্শিক অবস্থান থেকে মোড় বদল করে কর্পোরেট ঘরানায় ঢুকে গেছে। দিনে দিনে এই দুষণ আরো কঠিন আংটায় আটকে ফেলছে, রাজনীতিকে। অথচ গণ মানুষের কল্যাণের সবচেয়ে বড় প্লাটফরম হিসাবে একসময় মানব দরদী ও শিক্ষিত জনগোষ্ঠী রাজনীতিতে বিচরণ করতেন। বৃহত্তর পরিসরে দেশ ও মানুষের সেবাই ছিল তাঁদের একমাত্র লক্ষ্য। এই লক্ষ্য অর্জনে তারা অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়েছেন। বৈরি শক্তির রোষানলে পড়ে জেলজুলুম, নির্যাতন সহ্য করেছেন হাসিমুখে। হাতের কাছে উদাহরণ, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। এখন কর্পোরেট স্বার্থের আকর্ষণ ও নিজ স্বার্থ সুরক্ষার বর্ম হিসাবে ব্যাবহৃত হচ্ছে রাজনীতি।

স্বাভাবিক কারণে সাধারণ মানুষ রাজনীতি ও রাজনীতিকদের প্রতি মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। বিপরীতে ঘোলা স্রোতের তোড়ে নব্য কর্পোরেট গোষ্ঠী ও নব্য ধনবান ও ঋণখেলাপিরা রাজনীতি বিশেষ করে সরকারি দলে আশ্রয় নিচ্ছেন। এই প্রবণতা দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত ভয়ঙ্কর। রাজনীতি তার আদর্শিক গতিপথ থেকে সরে গেলে তা গণ মানুষের চেয়ে গোষ্ঠীস্বার্থের রক্ষাকবজের ভূমিকা পালনে বাধ্য। দুঃখজনক হলেও সত্য খান্দানী বা ছাত্রজীবন থেকে যারা বঙ্গবন্ধুর রাজনীতির সাথে নানাভাবে জড়িয়ে আছেন, তারাও দল, দেশ, কর্মী বা গণ মানুষের কল্যাণ নয়, আত্মকল্যাণে অতিমাত্রায় মনোযোগী হয়ে পড়েছেন। নীতিআদর্শ, মেধা, মনন, জ্ঞান ও বুদ্ধিবৃত্তিক অবক্ষয় রাজনীতিকে নষ্ট বাণিজ্যিক ঘরানায় অবনমন ঘটাচ্ছে দ্রুত।

বঙ্গবন্ধুর অসাধারণ দুটো রাজনৈতিক গ্রন্থ ‘অসমাপ্ত আত্মজীবনী’ এবং ‘কারাগারের রোজনামচা’ বেস্টসেলার নিঃসন্দেহে, কিন্তু বহুল পঠিত নয়! বিস্ময়কর হলেও সত্য, আওয়ামী লীগের অন্তত ৮০% নেতা কর্মী বইগুলো পড়ার বদলে ড্রয়িং রুমের শোপিস হিসাবে ব্যবহার করছেন। এটা নিষ্ঠুর কিন্তু পরীক্ষিত সত্য। প্রয়োজনে আওয়ামী লীগ দলীয়ভাবে এর সত্যতা যাচাইয়ে জরিপ চালাতে পারে। বঙ্গবন্ধুর কর্ম ও জীবনকে যারা ধারণ করে না, তারা কোনোভাবেই আওয়ামী লীগ বা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ধারণ করতে পারে না। নবাগতদের হাইব্রিড বা অনুপ্রবেশকারী বলে কটাক্ষ করার নৈতিক অধিকারও তাদের নেই।

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন দোরগোড়ায়। নতুন নতুন আরো আগন্তক সরকারি দলের খান্দানীদের কাঁধে চড়ে সরকারি তাঁবুেেত ভীড় করছেন! লক্ষ্য পরিস্কার, এমপি পদে মনোনয়ন টিকিট কেনার পাশাপাশি সরকারি দলের নিরাপদ ছাতার নিচে বিত্ত প্রভাবের আয়েশি ভবিষ্যত নির্মাণ। রাজনীতির এই অবক্ষয়ের চিকিৎসা দেয়ার মতো নিবেদিত নেতা এখন বিরলপ্রজ। মান্নান ভাই বেঁচে থাকলে অন্তত ঘোলাস্রোতে বাঁধ দেয়ার সর্বোচ্চ চেষ্টা করতেন। কারণ, তিনি রাজনীতিতে নিজস্ব শুদ্ধ ও আদর্শিক একটা মডেল উপহার দিয়েছেন। বঙ্গবন্ধুর একান্ত স্নেহভাজন ও কাছের মানুষটি বঙ্গবন্ধুর মতোই রাজনীতিতে নিবেদিত ছিলেন আমৃত্যু। তিনি সম্পদ, প্রচার, প্রভাব কিছুরই ধার ধারতেন না। বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের শোষণ ও বষ্ণনামুক্ত দুখী মানুষের সোনার বাংলা নির্মাণই ছিল তাঁর ব্রত। এই ব্রত থেকে কখনো পিছু হঠেন নি। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের দৃঢ় ভিত্তি নির্মাণে তিনি এম এ আজিজ, জহুর আহমেদ চৌধুরী, এম এ হান্নানদের সাথে একযোগে কাজ করেছেন। বিনয়ী, মৃদুবাক, জ্ঞান, মনীষায় ঋদ্ধ এম এ মান্নান শুরুতে জেলা আওয়ামী লীগ পরে সাংগঠনিক জেলা ভাগ হওয়ার পর নগর শাখার আহবায়ক, সাধারন সম্পাদক, সভাপতিসহ কেন্দ্রীয় সদস্য ও উপদেষ্টার দায়িত্ব পালন করেছেন বিভিন্ন সময়ে। মুক্তিযুদ্ধে নেতৃত্ব দান, পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড প্রধানের ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্বও সফলতার সাথে পালন করেন। অসাধারণ সাংগঠনিক দক্ষতার গুণে তিনি প্রচন্ড বিপদে আপদে দলকে আগলে রেখেছিলেন, মানবিকতা ও দলীয় শৃংখলার অপূর্ব মিশেলে। আবার সুদিনে এমপি, মন্ত্রীসহ সরকারের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করেন তিনি। বর্ণাঢ্য রাজনৈতিক জীবনে তিনি ছিলেন,কর্মী অন্তপ্রাণ ও সততার মূর্ত প্রতিক। মন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালীন তাঁকে ঘিরে থাকা কিছু সুবিধা শিকারী নেতা ও নিকট আত্মীয়ের কারণে তিনি কিছুটা বিতর্কের মুখে পড়েন। অথচ, নিম্নবিত্তের সাধারণ জীবনে অভ্যস্থ মান্নান ভাই, প্রচুর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও দল ও আদর্শের জন্য বিপুল ত্যাগ ছাড়া ন্যূনতম বিত্ত অর্জনে মনোযোগ দেননি। উল্টো নগরীর অত্যন্ত লোভনীয় অংশে নিজের পারিবারিক সম্পত্তি পানির দামে বিক্রি করে সংসার ও বিপদেআপদে রাজনীতির দায় মিটিয়েছেন। সম্পদ ও ক্ষমতালোভী হলে তিনি অনেক আগেই শতশত কোটি টাকার মালিক হতেন, বিনা আয়াসে। আর এমনটি হলে তিনি কখনো সমালোচনার তিরে বিদ্ধ হতেন না। কারণ সম্পদশালী ক্ষমতাধরদের সমালোচনার তির ছুঁতেও পারে না! নিবেদিত ত্যাগী রাজনীতিক ও অন্য সেবাধর্মী নিবেদিত পেশাজীবিদের জন্য এদেশে এটা এক চরম ট্রাজেডিও বটে! সার্বিক বিবেচনায় চলমান রাজনীতির প্রেক্ষাপটে মান্নান ভাই শতভাগ খাঁটি হিরে। তাই রাজনীতির পরীক্ষিত হিরকখন্ডকে রঙিন কাঁচের সমালোচনার আঁচড় আরো পরিশুদ্ধ করেছে বলে ব্যাক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি। আফসোস, বড় দুঃসময়ে মান্নান ভাইদের মতো ব্যাতিক্রমী, শুদ্ধ ধারার রাজনীতিকরা আওয়ামী লীগের আকাশ থেকে ঝড়ে গেছেন! মান্নান ভাই, মহিউদ্দিন ভাইদের অভাব, চট্টগ্রাম আওয়ামী লীগ নেতাকর্মী ও অনুরাগীরা এখন তীব্রভাবে অনুভব করছেন। এদের দু’জনের রাজনৈতিক সমঝোতাও ছিল একদম বিপরীত ধারার। একজন অগ্নিগিরির জলন্ত লাভা অন্যজন সৌম্য ও ঠান্ডা। কিন্তু সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঠিকই একই সমান্তরালে! মান্নান ভাইয়ের রাজনৈতিক দর্শন অনেকটা বুদ্ধিবৃত্তিক ও ধীরস্থির। আর মহিউদ্দিন ভাইয়ের তাৎক্ষণিকঅবস্থা বুঝে দ্রুত ব্যবস্থা গ্রহণ! এই মডেলের যুগল নেতৃত্ব আওয়ামী ঘরানায় আর কখনো ফিরে আসে কিনা, জবাব ভবিষ্যতের গর্ভে। কিন্তু না ফেরার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি।

x