রাজনীতির বিরল ‘টাচস্টোন’

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৫ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৬:১৯ পূর্বাহ্ণ
561

ব্যক্তিস্বার্থের ভয়ঙ্কর সংক্রমণ, মেধা-মননের খরা ও কথামালাসর্বস্ব রাজনীতিতেও মাঝে মাঝে কিছু বিরলপপ্রজ ছায়াবৃক্ষের আগমন ঘটে। তারা ব্যক্তিস্বার্থ আদায়ের বদলে দলীয় নীতি-আদর্শ ও মানবিক কল্যাণকে জীবনের ব্রত হিসাবে বরণ করে নেন। নিজেরা ঠকেন, ঠকেও তাঁরা হাসিমুখে নিজের স্বেচ্ছা দায়কে মিশন বা ব্রত হিসাবে গ্রহণ করে মানবিকতার ছায়া বিলিয়ে যান অকাতরে। কষ্টসাধ্য আদর্শিক মিশনে রাজনীতিকে নিজের প্রভাব বা প্রতিষ্ঠা অর্জনের সিঁড়ি হিসাবে ব্যবহারের বদলে নিজের কষ্টার্জিত সম্পদ উল্টো বেহিসেবে বিলিয়ে দেন দেশ ও গণ মানুষের কল্যাণে। চালাকচতুর বিষয়ীজনেরা তাঁদের নামের সাথে বেকুব এবং বোকা লেজুড় জুড়ে দিলেও তাঁরা মানবিকতার কক্ষপথ থেকে কখনো বিচ্যুত হন না। চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগ রাজনীতির কঠিন সময়ে এরকম একজন বড় মাপের মানুষের আবির্ভাব ঘটে! এরশাদ স্বৈরাচার কবলিত গত শতকের আশি দশকে রাজনীতিতে আসেন তিনি। আবার দ্রুততম সময়ে দল ও মানুষের জন্য সর্বস্ব বিলিয়ে দিয়ে পরপারে চলে যান ! তিনি আলহাজ্জ্ব মোহাম্মদ নাজিম উদ্দীন! আওয়ামী লীগের কঠিনতম দুর্দিনের এক মৃত্যুঞ্জয়ী মহানায়ক!
হ্যাঁ, তাঁকে মহানায়ক বলার মত সৎসাহস আর কারো না থাক, আমার আছে। কারণ, আমার নিজের রাজনৈতিক জীবনের বড় অংশ জুড়েই তিনি ছিলেন- আছেন-থাকবেন। ইচ্ছে করে, নিজের গায়ে থুতু ছিটাই! রাজনীতি থেকে দূরে সরে যাওয়ার পর নানা বৈষয়িক টানাপোড়েনের চাপে তাঁকে মনে রাখা সম্ভব হয়না, বলে। এমনকী তাঁর প্রয়াণ দিবসটিও বারবার ভুলে যাই! এর থেকে চরম অকৃতজ্ঞতা আর কী হতে পারে!
আসলে অকৃতজ্ঞতা না শুধু, কৃতঘ্নও আমি! জানি, এই পাপের কোন প্রায়শ্চিত্ত নেই।
গত শতকের আশি দশকের মাঝামাঝিতে তিনি উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের ভয়ঙ্কর দুর্দিনে মরহুম ম, ইদরিস ভাইয়ের হাত ধরে আওয়ামী লীগের সক্রিয় রাজনীতিতে যুক্ত হন। তখন ইদরিস ভাই, হাটহাজারী থানা আ’লীগের সভাপতি ও উত্তর জেলার সম্পাদক মন্ডলীর প্রভাবশালী সদস্য। আমি উত্তর জেলার সদস্য ও থানার সম্পাদক মন্ডলীর সদস্য। নাজিম ভাই ও ইদরিস ভাই দু’জনের বাড়িই হাটহাজারীর মাদার্শা গ্রামে। নাজিম ভাই লব্ধ প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী। খাতুনগঞ্জের স্বনামধন্য ইন্ডেন্টিং ব্যবসায়ী। মঈনুদ্দিন কর্পোরেশন তাঁর ব্যবসায়িক অফিস। রাজনীতির আগেও একজন অসাধারণ নীরব দানবীর হিসাবে পুরো চট্টগ্রাম জুড়েই তাঁর নাম সুবাস ছড়াচ্ছিল। ইদরিস ভাই, ৮৪ সালের কোন এক রোদ্দুরধোয়া দিনে নাজিম ভাইয়ের অফিসে নিয়ে যান। প্রথম পরিচয়েই তাঁর মোহন ব্যাক্তিত্বে বিমুগ্ধ! সৌম্য, স্নিগ্ধ আন্তরিক হাসি ছিল তাঁর ব্রান্ড। পরিচয়ের পর মোহাবিষ্ট ছিলাম অনেকক্ষণ! এ যুগের একজন ধনাঢ্য ব্যবসায়ী এতো বিনম্র আর অতিথি বৎসল হতে পারে ধারণায়ও ছিল না!
এরপরের ইতিহাস অনেক লম্বা! পুরো হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজান তখন এরশাদশাহীর সহযোগিতাধন্য শিবির, এনডিপি (সাকার ক্যাডার) জাসদ ও আব্দু বাহিনী উপদ্রুত বিভীষিকার জনপদ। দক্ষিণ হাটহাজারী জাতীয় পার্টির কুখ্যাত পোষা মাস্তান আব্দু বাহিনীর একচেটিয়া দখলে। বাকি অংশসহ পুরো তিন থানা শিবির নাসির, এনডিপি, বিএনপি ও এরশাদশাহীর লেজুড় জাসদ ক্যাডারদের অবাধ অস্ত্র মহড়ার নিরাপদ আস্তানা। এ সময়ে পুরো অঞ্চলটি ছাত্রলীগ, যুবলীগ, আ’লীগ খুনের বিশাল কসাইখানা হিসাবে দেশব্যাপী কুখ্যাতি পেয়ে গেছে। হত্যা,গুম, লুঠ, গুপ্তহত্যা, হামলা, পুলিশী নিরাপত্তায় বন্দুকবাজীর ভয়াল দুঃসময়ে নাজিম ভাইয়ের রাজনীতিতে অভিষেক। এরপর মৃত্যু উপত্যকায় নাজিম ভাইয়ের সর্বাত্মক সহযোগিতায় গড়ে উঠে প্রতিরোধের দুর্ভেদ্য প্রাচির। ইদরিস ভাই, ফটিকছড়ির মরহুম বাদশাহ আলম ভাই থানা সভাপতি হিসাবে সমন্বয় করতেন প্রতিরোধ কার্যক্রম। আ’লীগ প্রেসিডিয়াম সদস্য প্রয়াত অধ্যাপক পুলিন দে, চবি’র সাবেক ভি সি মরহুম ড. আবু ইউসুফ আলম ও জেলা আ’লীগ সভাপতি মরহুম এম এ ওহাব ভাই অভিভাবক। সবকিছু দেখভাল করেছেন প্রিয় নেতা ও গণ মানুষের রাজনীতির বাতিঘর, সাবেক সফল সিটি মেয়র মরহুম এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরী। রাউজানের ছাত্রলীগ নেতাদের দেখভালও নাজিম ভাই করতেন। সাথে পুরো জেলায় দলের সব দাতব্য সেবাতো ছিলই। এমনকী জননেত্রী শেখ হাসিনা ও কেন্দ্রীয় নেতাদের চট্টগ্রাম সফরসূচি, জনসভাসহ আনুষ্ঠানিক খরচের বড় অংশ তিনি নিজেই টানতেন।
‘৮০ ও ‘৯০ দশকের শুরুতে তিন থানায় কত ছাত্রলীগ, যুবলীগ নেতার রক্ত ঝরেছে, এই বর্ণনা দেয়া অসম্ভব। দল ও কর্মীদের ঘোরতর দুর্দিনে নাজিম ভাই ছিলেন বিশাল এক ছায়াবৃক্ষ, বরাভয়! নিজের সর্বস্ব হাসিমুখে দল, কর্মী ও গণ মানুষের জন্য বিলিয়ে দিয়েছেন। নিজের চেনাজানা নেতাদের মাঝে নাজিম ভাই ছিলেন উজ্জ্বল এক ব্যাতিক্রম। অনেক শহীদ ও আহত নেতাকর্মীর পরিবার ও চিকিৎসার সব দায় নিজে বহন করেছেন। নিজের কষ্ট, সীমাবদ্ধতা স্মিত হাসির আড়ালে লুকিয়ে গেছেন আজীবন। আজকের প্রতিষ্ঠিত অনেক নেতা-কর্মীর বিয়ে-শাদীর দায়ও তিনি টেনে গেছেন। নিজেও নানাভাবে তাঁর উপকারভোগীর একজন। সাংবাদিকতা পেশার সূত্রে পরিচিত পেশাগত বন্ধুরাও তাঁর অবিশ্বাস্য সেবা নিয়ে ধন্য হয়েছেন। ৮৬’র নির্বাচনে তিনি দল মনোনীত প্রার্থী হিসাবে অনেক বৈরি পরিস্থিতি মোকাবেলা করেছেন। আব্দু, শিবির বাহিনীর সহযোগিতাপুষ্ট সদ্য সাবেক মহাজোট মন্ত্রী এবং তদানিন্তন জাতীয় পার্টি নেতা ও এরশাদশাহীর প্রভাবশালী মন্ত্রী ব্যারিষ্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদের বিরুদ্ধে সংসদ নির্বাচনে লড়েছিলেন তিনি। নাজিম ভাই তখন হাটহাজারী থানা আওয়ামী লীগ সভাপতির দায়িত্বে। ইদরিস ভাই, জেলা কমিটির সম্পাদকীয় পদে।
নাজিম ভাই হাটহাজারীসহ পার্শ্ববর্তী তিন উপজেলার সশস্ত্র জামাত-শিবির মুক্তি লড়াইয়ের অজেয় এক সিপাহসালার! অথচ তাঁর ‘৯১র নির্বাচনী লড়াইয়ে আমরা অনেকে বিশ্বাসভঙ্গ করেছি! বর্তমান প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ হাসিনার মনোনীত প্রার্থী হিসাবে তিনি হাটহাজারী সংসদীয় আসনে নির্বাচন করেন। এ সময়ে জামাত-শিবির সশস্ত্র ক্যাডারদের সহযোগিতা নেয় বিএনপি প্রার্থী। আমরাও কেউ কেউ তাঁর জন্য আন্তরিকভাবে কাজ করিনি। নিজের বুকের জমাট ব্যথার কিছুটা তিনি আভাস দিয়েছেন-আমাকে। পরিচয়ের পর থেকে ছোট ভাইয়ের মত স্নেহের বাঁধনে আটকে রাখেন, জীবনের শেষদিন পর্যন্ত! ‘৯২র ৩ জানুয়ারিতে আকস্মিকভাবে তিনি মহাপ্রয়ানের যাত্রী হয়ে যান বড় অসময়ে। মৃত্যুকালে তাঁর বয়স ছিল মাত্র চল্লিশের কোঠায়। উল্লেখ্য, চট্টগ্রামে এরশাদবিরোধী গণ অভ্যুত্থানের মাঠ তৈরিতেও নাজিম ভাই সামনের সারিতে নেতৃত্ব দিয়েছেন। দুর্ভাগ্য, দুর্দিনে দলের সামনের সারির অগ্রনায়ককে সুদিনে আওয়ামী লীগ নেতারা মনে রাখেননি!
তাঁর তৈরি ভিতের উপর হাটহাজারী, ফটিকছড়ি, রাউজানের দুর্ভেদ্য শিবির, এনডিপি, আব্দু ঘাঁটি মুক্ত হয়। নাজিম ভাই কত বড় মহাপ্রাণ, পরোপকারি এবং সর্বংসহা গণ মানুষের মহানায়ক ছিলেন, জীবনকালে তা কাউকে বুঝতে দেননি। মৃত্যুর পর পরিষ্কার হয়ে যায়, তিনি পরিবার বা নিজের জন্য নয়, অর্জিত সব সম্পদ অকাতরে দল ও মানুষের জন্য বিলিয়ে গেছেন। হাটহাজারী থানা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসপ্তক মৃত্যুঞ্জয়ী মহানায়ক নাজিম ভাইয়ের প্রয়াণ দিবস চলে গেছে ক’দিন আগে। বিলম্বে হলেও তাঁর পুণ্য স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা অবিরল। তাঁর যোগ্য পুত্র স্নেহভাজন মনির, আনিসের প্রতি অশেষ শুভাশীষ। পাশাপাশি অসম্ভব সহিষ্ণু ভাবীসহ পরিবারের সবার কাছে ক্ষমা চেয়ে নিচ্ছি- বিস্মৃতির চাদরে নাজিম ভাইকে মুড়ে রাখার জঘন্য অপরাধের!

Advertisement