রাজনীতির ড্রামা ও ফণী

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৭ মে, ২০১৯ at ৬:০৫ পূর্বাহ্ণ
34

বিএনপি ও ঐক্যজোট রাজনীতি নিয়ে দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে যখন ধোঁয়াশা আর রহস্য জমাট হচ্ছিল, ঠিক তখনি ঘূর্ণিঝড় ফণীর আবির্ভাব! ফণী বঙ্গোপসাগরের অদূরে ভারত মহাসাগরে ঘনীভূত হয় সপ্তাহ দেড়েক আগে। ফণীর প্রভাবে শুরুতে তাপমাত্রা বাড়তে থাকে দ্রুত। এমনিতেই বৈশাখের খরতাপে জনজীবন বিশেষ করে শ্রমজীবী মানুষের দুর্ভোগ চরমে। এর উপর ফণীর প্রভাবে বৈশাখের সূর্য সকাল দশটা থেকে অগ্নিলাভা ঢালতে থাকে বেশ ক’দিন। দেশের কোথাও কোথাও তাপমাত্রা রেকর্ড ৪০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে যায়। টিভিসহ প্রায় সবগুলো গণমাধ্যমের শীর্ষে উঠে আসে, ফণী ও ঘূর্ণিঝড় সংক্রান্ত নানা খবরাখবর। দীর্ঘ পথ পরিক্রমার পর ফণী শুক্রবার সকালে ভারতের উড়িষ্যার পুরি উপকূলের বিস্তীর্ণ এলাকায় প্রথম ছোবল হানে। প্রায় ২০০ কিলোমিটার গতির ঘূর্ণিঝড়টি এরপর দূর্বল হয়ে পশ্চিম বঙ্গ হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণ পূর্বাঞ্চলেও লেজঝাপ্টা দেয়। এর প্রভাবে রাজধানী ঢাকাসহ পুরোদেশে ঝড়ো হাওয়াসহ বিচ্ছিন্ন বৃষ্টিপাত হয়। বজ্রপাত, জলোচ্ছ্বাস ও গাছের ডাল ভেঙে বেসরকারি হিসাবে প্রাণহানির সংখ্যা ৯ জন। দক্ষিণের উপকূলীয় জেলাগুলোতে ৫/৬ ফুট উচ্চতার সামুদ্রিক ঢেউ ও প্রবল বর্ষণে জনজীবন বিপর্যস্তসহ সম্পদ ও শস্যের ক্ষয়ক্ষতি হয়। চট্টগ্রামে ফণীর প্রভাব থেকে যায় শনি, রোববার পর্যন্ত। ফণী শক্তি হারিয়ে গভীর নিন্মচাপে পরিণত হওয়ায় দেশব্যাপী বৃষ্টিপাত হয়েছে।
ফণীর উৎপত্তি ও তার ছোবল নিয়ে ক’দিন ধরে মিডিয়াগুলো বেশুমার শব্দ খরচ করেছে। রাজনীতিসহ অন্যান্য জাতীয় গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো স্বাভাবিক কারণে পর্দার আড়ালে চলে যায়। ফণীর ছোবল থেকে গণমানুষ ও সম্পদ সুরক্ষায় চট্টগ্রাম, কঙবাজার ও উপকূলীয় এলাকাগুলোতে সরকারি-বেসরকারি সংস্থাগুলোর প্রস্তুতিও ছিল ব্যাপক। শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি যত ভয়াবহ ভাবা হয়েছিল, তেমনটি ঘটেনি। যদিও ফণীর আক্রমণ ও গতি ভয়াবহ হতে পারে বলে আবহাওয়া দফতর টানা পূর্বাভাস দিয়ে যায়। যা’হোক বলা যায়, আপাতত অল্পতেই রক্ষা পেয়েছে বাংলাদেশ।
ফেরা যাক, রাজনীতিতে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন ঐক্যজোটের মূল শরিক বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোট। ৩০ ডিসেম্বেেরর নির্বাচনে তারা জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয়। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আগের রাতে ক্ষমতাসীন দলের ভোট ডাকাতির অভিযোগ তুলে ঐক্যজোট নির্বাচন বর্জন করে। নির্বাচনে জয়ী জোটের ৮ এমপি শপথ নেবেনা বলেও ঘোষণা দেয়। নির্বাচনে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুলসহ ৬ জন এবং গণফোরামের ২ জন বিজয়ী হন। এর ফাঁকে ৩০ জানুয়ারি ২০১৯ সংসদ অধিবেশন শুরু হয়। অধিবেশন শুরুর ৯০ দিনের মধ্যে নির্বাচিতদের শপথ নেয়ার সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ড. কামালের গণফোরাম থেকে বিএনপির প্রতীক ধানের শীষ নিয়ে জয়ী সুলতান মোহাম্মদ মনসুর ৭ মার্চ শপথ নেন। তাঁর দাবি,তিনি গণফোরামের কেউনা, তাঁর দল আওয়ামী লীগ! গণফোরাম তাঁকে বহিষ্কার করে। কিন্তু নিজে পদত্যাগ না করায় তাঁর এমপি পদ বহাল থাকে। এরপর গণফোরামের মোকাব্বের এবং শেষ মুহূর্তে মির্জা ফখরুল ছাড়া বিএনপির ৫ এমপিও শপথ নেন। এতে এক অদ্ভুত ক্যূ ঘটে যায় বিএনপি ও ঐক্যজোটে! বলা হয়, লন্ডন হাই কমান্ডের নির্দেশে বিএনপি এমপিরা শপথ নিয়েছেন। সত্যতা নিশ্চিত করেন, খোদ মির্জা ফখরুল। তাহলে তিনি বাদ কেন, সাংবাদিকদের প্রশ্নের পর মির্জা সাহেবের জবরদস্তি হাস্যোজ্জ্বল জবাব, কৌশলগত কারণে তিনি শপথ নেননি! তাও লন্ডন কমান্ডের নির্দেশনায়! ঠিক একই সময়ে (২৯ এপ্রিল) দলের পল্টন অফিসের আবাসিক সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভি প্রেস ব্রিফিংএ তীব্র ক্ষোভের সাথে দাবি করেন, সরকারি লোকজন জবরদস্তি তুলে এনে বিএনপি এমপিদের শপথ করিয়েছে! দু’ নেতার বক্তব্য থেকে স্পষ্ট, বিএনপি এখন একেবারেই অগোছালো, দলের কোন চেইন অব কমান্ড নেই। অন্য সিনিয়র নেতারাও শপথ গ্রহন ড্রামার পর এখন পর্দার আড়ালে। আপাত দৃষ্টিতে এটা সরকারি দলের জন্য সুখবর হলেও এর সুদূরপ্রসারি ফলাফল কিন্তু তেতো হতে বাধ্য। শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে গণতন্ত্রের গাড়ি সচল থাকেনা। যতটুকু গণতন্ত্র আছে তাও সরকারি দলের সর্বভুক চাটুকার, চামচারাই শক্তিশালী বিরোধী দলের অভাবে বিনা বাধায় চেটেপুটে খেয়ে ফেলতে পারে। উন্নয়ন অভিযাত্রায় দ্রুত ধাবমান প্রিয় দেশের জন্য এটা বড় বিপদ সংকেতও বটে। আশা করি, সর্বোচ্চ নেত্রী সতর্ক থাকবেন।
= শহীদ জননী চলে গেলেন =
চট্টগ্রামের নিভৃতচারী শহীদ জননী জাহানারা বেগম আর নেই। ৩০ মে মঙ্গলবার ভোর রাতে নগরীর একটি বেসরকারি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় নশ্বর পৃথিবীর সব ক্লান্তি পেছনে রেখে চলে যান অসামান্যা এই শহীদ জননী। যাবার সময় তাঁর বয়স হয়েছিল ৯৫ বছর। একইদিন বাদ আসর নগরীর জাতীয় মসজিদ দামপাড়া জমিয়তুল ফালাহ ময়দানে মরহুমার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। প্রাসঙ্গিকভাবে বলতে হয়, জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর খুব কাছের মানুষ আওয়ামী লীগের প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে স্বাধীনতা ছিনিয়ে আনার দুঃসাহসী অভিযাত্রী সাবেক মন্ত্রী ও চট্টল অহঙ্কার জহুর আহমেদ চৌধুরীর জীবন সঙ্গিনী জাহানারা বেগম। মরহুম চৌধুরী জাহানারা বেগমের মত সর্বংসহা অসাধারণ একজন জীবনসঙ্গিনী পাশে থাকায় চট্টগ্রাম তথা দেশের মুক্তি ও গণ মানুষের জন্য অকাতরে সবকিছু বিলিয়ে দিতে পেরেছেন। জাহানারা বেগমের তিন পুত্রের প্রথম হচ্ছেন, চট্টগ্রামের কিংবদন্তীতুল্য অসম সাহসী শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সাইফুদ্দিন খালেদ চৌধুরী। সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের এজিএস সাইফুদ্দিন ছিলেন মুক্তিযুদ্ধের সূচনায় ছুটন্ত উল্কাপিন্ড! পুরো চট্টগ্রমজুড়ে হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে চোরাগোপ্তা ঝটিকা হামলায় নেতৃত্ব দেন তিনি। ছিপছিপে খাপখোলা খন্‌জরতুল্য মাত্র ২২ বছরের এই তরুণের দুর্দান্ত সাহস ও বীরত্ব আজকের তারুণ্যের কাছে দেশপ্রেম ও বীরত্বের অজেয় উৎস হিসাবে দৃষ্টান্ত থাকবে হাজার বছর! তাঁর দ্বিতীয় পুত্র মাহতাবউদ্দিন চৌধুরীও একজন দুঃসাহসী মুক্তিযোদ্ধা এবং জনকের ছায়ায় বেড়ে ওঠা নিবেদিত রাজনীতিক। চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতির বিশাল দায়িত্ব সামলাচ্ছেন তিনি। শহীদ সাইফুদ্দিন চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সবচে’ ভয়াল সূচনা পর্বেই ৭১ সালের ১৩ এপ্রিল রাউজানের সাবেক ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজের সামনের সড়কে সর্বাধুনিক অস্ত্রসজ্জিত পাকি বাহিনীর সাথে মুখোমুখি যুদ্ধে ৫ সহযোদ্ধাসহ শহীদ হন।
দীর্ঘদিন প্রথম সন্তানের শাহাদাতের খবর মা জাহানারা বেগমকে জানতে দেয়া হয়নি। এনিয়ে আগে লিখেছি। প্রথম সন্তানের পর স্বামী মন্ত্রী জহুর আহমেদ চৌধুরীকে স্বাধীনতার মাত্র তিন বছরের মাথায় হারান তিনি। মূলত জহুর আহমেদ চৌধুরীর মত একজন সার্বক্ষণিক রাজনীতি পাগল সংসারবিমুখ মানুষের প্রায় ডুবে যাওয়া বিশাল সংসারকে বুকের সব মমতা দিয়ে আগলে রাখেন তিনি। তরুণ শহীদ পুত্র ও স্বামী শোকের পর তিনি প্রিয় পুত্রবধুকেও (মাহতাব ভাইয়ের সুনিপুণা স্ত্রী) হারান। সব শোক বুকের গহীনে লুকিয়ে রেখে পরিবারের দায় একা সামলে নিয়েছেন। তাঁর তৃতীয় পুত্র মঈনুদ্দিন চৌধুরীও অসুস্থ।
ক্ষণজন্মা মহিয়সী শহীদ জননী দীর্ঘদিন ধরে বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসাধীন ছিলেন দীর্ঘদিন। মৃত্যুর সময় তিনি নিজ গর্ভজাত দু’পুত্রসহ ৯ পুত্র, ৯ কন্যা, নাতি, নাতনীসহ অসংখ্য আত্মীয় শুভাকাঙ্ক্ষী রেখে যান। মহান সৃষ্টিকর্তা নিভৃতচারী, প্রিয় মা মহিয়সী শহীদ জননীকে জান্নাত নসিব করবেন বলে বিশ্বাস করি ।
[[দুর্ভাগ্য আমার! মাত্র ক’দিন আগে শহীদ সাইফুদ্দিন ভাইয়ের উপর লেখা তৈরি করতে গিয়ে হঠাৎ নিভৃতচারী মহিয়সী শহীদ জননীর খোঁজ পাই। পরপরই আজাদী ও পূর্বকোণে তাঁকে নিয়ে আমার লেখা ছাপা হয়। কিন্তু সপ্তাহের মাঝেই তিনি চলে গেলেন চিরতরে!]]

x