রাজনীতিতে ঝাঁকি এবং…

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৯ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ
23

চট্টগ্রামের রাজনীতিতে হঠাৎ করে বড় একটা ঝাঁকুনি দিলেন নগর মহিলা দল সভানেত্রী মনোয়ারা বেগম মনি। জামাল খান ওয়ার্ডের সংরক্ষিত কাউন্সিলর মনি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনকে প্রশংসায় ভাসিয়ে দিয়ে ঘোষণা দেন, সামনের নির্বাচনে মেয়র নাছির মনোনয়ন না পেলে তিনিও কাউন্সিলর পদে আর নির্বাচন করবেন না! তিনি আরও প্রচুর প্রশংসার শব্দ পাপড়ি উপহার দিয়ে বর্তমান মেয়রকে প্রায় নাইয়ে দিয়েছেন। আজাদীসহ স্থানীয় কিছু মিডিয়ায় বেশ গুরুত্ব দিয়ে কাউন্সিলর ও মহিলা দল সভানেত্রীর বক্তব্য প্রকাশিত হয়েছে শনিবার, ৫ অক্টোবর। তাই, বাড়তি শব্দক্ষয় অপ্রয়োজনীয়। মনোয়ারা বেগম মনি বিএনপির সাহসী ও পরীক্ষিত নেত্রী। যতটুকু জানা যায়, দলের জন্য তাঁর ত্যাগ প্রচুর। মেয়র নাছিরের উপস্থিতিতে দুর্গা পুজা উপলক্ষে মহিলাদের বস্ত্রদান অনুষ্ঠানে দেয়া বক্তব্য নিয়ে ওদিনই নগর বিএনপিতে তোলপাড় ওঠে। নগর বিএনপির শীর্ষ নেতৃত্ব, মহিলা দলসহ প্রায় সব নেতা দলে এই নেত্রীর আনুগত্য ও নিবেদন নিয়ে কড়া প্রশ্ন তোলেন। দলীয় ফোরামে ব্যবস্থা নেয়ারও ঘোষণা আসে। কিন্তু মনি বলেছেন, এটা তাঁর কৌশলগত অবস্থান। অবস্থানগত কারণে জনপ্রতিনিধি হিসাবে তিনি এসব বলেছেন! তো, বিএনপি তাঁর ব্যাপারে কী সিদ্ধান্ত নেয় বা আওয়ামী লীগ সিটি মেয়র এবং নগর আওয়ামী লীগ সাধারণ সম্পাদক আ জ ম নাছিরের প্রতি বিএনপি নেত্রীর প্রশংসার ঝর্ণাধারায় কী প্রতিক্রিয়া দেখায়, তা একান্তই দলীয় বিষয়। কিন্তু অবস্থানগত কারণে কোন কোন রাজনীতিক যে সুর বদলান, তা স্পষ্ট করে দিলেন মনি। এজন্য তিনি ধন্যবাদ পেতেই পারেন।
এমনিতেই জাতীয় রাজনীতির সাথে চট্টগ্রামের রাজনীতিও দোলাচালে। বইছে ঝাঁকির ঢেউ! নতুন ইস্যু ভেসে উঠে পুরানোগুলো ডুবিয়ে দিচ্ছে! জাতীয় পর্যায়ের দুর্নীতির অবিশ্বাস্য কিছু ঘটনা ভেসে উঠেছে ক’দিন পর পর। ঢেউ আছড়ে পড়ে বন্দরেও! শুরু রূপপুরের বালিশ, তোষক খাট কান্ড নিয়ে। সর্বশেষটা, চট্টগ্রাম মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের বালিশ, বালিশ কভার এবং যন্ত্রপাতি কেনাকাটার অবিশ্বাস্য মূল্য তালিকার প্রস্তাব। মিডিয়ায় ঢেউ উঠায় অস্বাভাবিক দামের প্রস্তাবটি অবশ্য আটকে গেছে। আবার সুখবরও আছে। চট্টগ্রামের মানুষ শিগগিরই ৫০০ বেডের আরেকটা হাসপাতাল পাচ্ছে। চ মে ক হাসপাতালের একাডেমিক ভবনের পেছনের প্রায় শত বছরের পুরানো হাসপাতাল ভবন ভেঙে এটা নির্মিত হবে বলে খবর প্রকাশ করেছে আজাদী। কিন্তু ট্রিলিয়ন শব্দের সুখবর বছরের পর বছর গেলানো হলেও চট্টগ্রামের ভয়াবহ সমস্যা জলাবদ্ধতা এবং যানজট পরিস্থিতির কোন উন্নতি হয়নি। বরং কিছু কিছু সড়কের দুরারোগ্য অসুখ বছরের পর বছরেও সুস্থ হচ্ছে না। অতি গুরুত্বপূর্ণ পোর্ট কানেকটিং সড়ক, আগ্রাবাদ এক্সেস সড়ক, বহদ্দারহাট হাট থেকে কালুরঘাট পর্যন্ত সড়ক কটি এর উপস্থিত উদাহরণ। এদিকে সিডিএ নগরীর জলাবদ্ধতা দূর ও দখলকৃত নদী, খাল, নালা পুনরুদ্ধার করে জলযটমুক্ত নগর উপহার দিতে পৌনে ৬ হাজার কোটি টাকার বিশাল প্রকল্প বাস্তবায়নের কাজ শুরু করলেও অগ্রগতির খবর ক্ষীণ। নগরীর গুরুত্বপূর্ণ প্রবর্তক মোড়সহ অনেক এলাকা হাল্কা বৃষ্টি বা জোয়ারের পানিতে গলা জলে ডুবে যায়। প্রবর্তক মোড়ের নালার উপর নির্মিত প্রিমিয়ার বিশ্ববিদ্যালয় ভবন এবং বেআইনি সব ভবন ও কাঠামো ভেঙে পানি নিষ্কাশন প্রতিবন্ধকতা দূরের চূড়ান্ত সিদ্ধান্তও দৃশ্যমান নয়। ফলে ভয়াল জলযট ও যানজট ফাঁদে দেশের রাজস্ব আয়ের সবচেয়ে বড় উৎস বন্দর নগরী চট্টগ্রামের ৭০ লাখ মানুষের জীবন স্থবির হয়ে পড়ছে। কয়েকটি উড়ালসড়ক তৈরি হলেও নগরীর সামগ্রিক সড়ক ব্যবস্থাপনায় ওগুলো সফল প্রমাণিত হয়নি। যেকোন মূল্যে এবং সর্বোচ্চ মান বজায় রেখে নগরীর উন্নয়ন প্রকল্পগুলো নির্ধারিত সময়ে বাস্তবায়নে সমন্বিত উদ্যোগ নিতেই হবে। দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো পরস্পরের উপর দায় চাপিয়ে সরকারের রাজনৈতিক অঙ্গীকারগুলো ভন্ডুল করে দেয়ার কোন সুযোগ নেই।
এরমাঝে দেশে ক্যাসিনোকান্ডের পর দুর্নীতি বিরোধী অভিযান জোরদার হয়েছে। সরকারি দলের অনেক কেউকেটা জালে আটকাচ্ছে। আরো বহু আটকের অপেক্ষমান তালিকায়। প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজেই অভিযান তদারকি করছেন। তিনি নিজ পরিবারের ৭ সদস্যদের তালিকাও পুনঃস্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, উন্নয়নের সুফল উইপোকা খেয়ে ফেলছে। উইপোকা বিনাশ করে উন্নয়নের সুফল বৈষম্যহীনভাবে সবার দরজায় পৌঁছে দিতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ তিনি। বঙ্গবন্ধু আক্ষেপ করে বলেছিলেন, চাটার দল সব খেযে ফেলছে! আর নেত্রী বলছেন, উইপোকা সব লুটে খাচ্ছে! আমরা বারবার বলেছি, দেশ ও দলের নিরাপদ ঢাল ব্যবহার করে পরজীবি রাক্ষস-খোক্কস সব অর্জন শেষ করে দিচ্ছে। এদের লোভের আগুনে পানি না ঢাললে সবকিছু শেষ হতে দেরি নেই। যাহোক, বিলম্বে হলেও প্রধানমন্ত্রী দুর্নীতির আগাছা নির্মৃলে হাত দিয়েছেন। কাজটা খুবই ভয়ঙ্কর ও কঠিন। কারণ, সব সেক্টরে আগাছা ঝাড় বিস্তৃতি ঘটিয়ে নিশ্চিদ্র অন্ধকার জঙ্গলে পরিনত হয়েছে। স্বাভাবিক নিয়মেই শ্বাপদ ও বিষধরের বংশ বিস্তার ঘটেছে সেখানে। এরা কায়েমী স্বার্থে থাবা পড়লে মরণ ছোবল দিতে একটুও দেরি করেনা। আশা করি, নির্মম অতীত থেকে শিক্ষা নিয়ে নেত্রী সর্বোচ্চ সতর্ক ও বিচক্ষণতার সাথে এগুবেন। বিশ্বাস এবার তিনি দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত দেশ উপহার না দিয়ে থামবেন না।

x