রাঙিয়ে দিই তাদের আকাশ

রেজাউল করিম

বুধবার , ১ মে, ২০১৯ at ৬:০৯ পূর্বাহ্ণ
37

অমিয় সম্ভাবনা একমাত্র শিশুদের মাঝে লুক্কায়িত। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, শিশুর জন্ম কোন আকস্মিক ব্যাপার নয়। বিশ্বের সমস্ত রহস্যের মধ্যখান থেকে শিশুর আবির্ভাব হয়। শিশুদের মুখে তিনি দেখেছেন স্বর্গের ছবি। সুকান্ত ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় বলেছেন, ‘এসেছে নতুন শিশু, তাকে ছেড়ে দিতে হবে স্থান/ জীর্ণ পৃথিবীতে ব্যর্থ, মৃত আর ধ্বংসস্তূপপিঠে/ চলে যেতে হবে আমাদের।’ আজকের শিশু পৃথিবীর আলোয় এসেছে আমরা তার বেড়ে ওঠার জন্য সাজানো বাগান চাই। চাইলে তো আর হয় না। যে বয়সে বইখাতা নিয়ে স্কুলে যাওয়ার কথা, হেসে- খেলে বেড়ে ওঠার সময়ে তাকে শ্রম দিতে হচ্ছে। পৃথিবীতে আজ শিশুরা নিষ্পেষিত, নির্যাতিত। জাহাজ ভাঙা, ব্যাটারি ভাঙা, অ্যালুমিনিয়াম, গার্হস্থ্য, চাসহ প্রায় শিল্পে শিশুরা শ্রমিক হিসেবে কাজ করছে। এমনকি শিশুরা হোটেলের গ্লাসবয়, ইট ভাঙা, বাজারের বিভিন্ন মালপত্র আনা নেয়া, ওয়ার্কশপ ওয়েল্ডিং, টেম্পোবাসে হেলপার, কলকারখানাসহ বিভিন্নস্থানে প্রতিনিয়ত শ্রম দিয়ে যাচ্ছে। মাদক কারবারসহ নানা অপকর্মে শিশুদের ব্যবহার করা হচ্ছে। দারিদ্র্য শিশুদের ঝুঁকিপূর্ণ শ্রমে নিয়োজিত হতে বাধ্য করছে।
শিশুদের দুঃখকষ্টের কথা ভেবে সুকান্তকে বলতে হয়েছিল, ‘সবচেয়ে খেতে ভালো লাগে মানুষের রক্ত।’ মানুষ আজ লোভী। মানুষের অর্থ-লালসার রাজ্যে ফুলের মতো পবিত্র শিশুদেরও মুক্তি নেই যেন। শিশুরা পবিত্র, নিষ্পাপ। শিশুদের মন স্বর্গীয় ফুলের মতোই সুন্দর। উচ্চবিত্ত, মধ্যবিত্ত শ্রেণির পরিবারগুলো তাদের সাধ্যমতো চেষ্টা করে সন্তানদের আগলে রাখতে বা অধিকারগুলো নিশ্চিত করতে। এদিকে দরিদ্র ও অসচ্ছল পরিবারের চিত্র উল্টো। আবার যাদের পিতা-মাতা এই পৃথিবীতে নেই, তাদের জন্ম যেন আজন্ম পাপ। সুবিধাবঞ্চিত প্রায় শিশুরাই নিতান্ত পেটের দায়ে ঝুঁকিপূর্ণ কাজগুলোকে তাদের নিত্যদিনের পেশা হিসেবে বেছে নিতে বাধ্য হচ্ছে। নিয়তির নিষ্ঠুর পরিহাসের শিকার সবচেয়ে বেশি এক শ্রেণির শিশু।
শিশুদের কলকারখানায় নিয়োগ করে এক শ্রেণির স্বার্থান্ধ মানুষ প্রচুর মুনাফা অর্জন করে চলছে। আইন ও জরিমানাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তারা কাজ হাসিল করে চলছে। দারিদ্র্যের কারণে শিশুরা নিজের শ্রম বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছে। দেশ ও জাতিকে তারা অভিশাপ দিয়ে অনিশ্চিত ভবিষ্যতের দিকে এগিয়ে চলছে তীব্রগতিতে, যা আমাদের জন্য লজ্জাজনক। আজ তারা তাদের প্রাপ্য অধিকারটুকু পাচ্ছে না। আমরা যদি মৌলিক অধিকার অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা নিশ্চিত করতে পারি, তাহলে যা চাই, তা পাওয়াটা বোধ করি খুব কঠিন হবে না।
মে দিবস এলে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে কথা বলি। এমনকি অনেকে ঘরে শিশুশ্রমিক রেখে শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে রাজপথে সোচ্চার থাকে। এসব লোকদের দ্বারা শিশুরা হয় নির্যাতিত, নিগৃহীত। বাংলাদেশের শহরাঞ্চলে বিত্তবানদের ঘরে শিশু নির্যাতন হচ্ছে প্রতিনিয়ত। এসব ঘরে কাজের ছেলে বা মেয়ে হিসেবে যারা কাজ করে, তারা সামান্য ভুল কিংবা অসাবধানতার জন্য গৃহকর্ত্রী বা মালিক অমানবিক শাস্তি দিয়ে থাকে। এরা সহায়-সম্বলহীন কাজের ছেলেমেয়েদের মানুষের সন্তান বলে মনে করে না। এসব মানুষরূপী পশুদের কাছ থেকে শিশুদের রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। শিশুশ্রম কারোর কাম্য নয়। সামাজিক ন্যায়বিচারহীনতা এবং বিভিন্ন স্তরের শক্তি ও ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে দুর্বৃত্তপরায়ণ, দেশপ্রেমহীন, নৈতিক শিক্ষা, মূল্যবোধ, মায়া-মমতাহীন প্রবৃত্তির লোকের প্রাধান্য থাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। শিশুশ্রম আছে বলেই শিশু নির্যাতন ঘটছে অহরহ। শিশুশ্রম রোধে সরকার আন্তরিক। কিন্তু এরপরেও শিশুশ্রম থেমে নেই। সব কাজ সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়। একটু সচেতন হলে, সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের প্রতি হাত বাড়ালে তাদের শ্রম দেওয়া লাগে না। সরকারের দিকে শুধু তাকিয়ে থাকলে চলবে না।
মহান মে দিবস বিশ্বব্যাপী শ্রমজীবী মানুষের আন্দোলন, সংগ্রামের অনুপ্রেরণা ও শ্রমের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার মূল চেতনা। ১৮৮৬ সালে আমোরিকার শিকাগো শহরের হে মার্কেটের ম্যাসাকার শহীদদের আত্মত্যাগকে স্মরণ করে পালিত হয়। সেদিন দৈনিক আটঘন্টার কাজের দাবিতে শ্রমিকরা হে মার্কেটে জমায়েত হয়েছিল। তাদেরকে ঘিরে থাকা পুলিশের প্রতি এক অজ্ঞাতনামার বোমা নিক্ষেপের পর পুলিশ শ্রমিকদের ওপর গুলিবর্ষণ শুরু করে। ফলে প্রায় ১০-১২জন শ্রমিক ও পুলিশ নিহত হয়। সে ঘটনা স্মরণে দিবসটি বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে। বিশ্বব্যাপী শিশুশ্রম সস্তায় মেলে বিধায় এর কমতি নেই।
তৃতীয় বিশ্বের উন্নয়নশীল দেশসমূহে শিশুশ্রম বেড়ে চলছে প্রতিনিয়ত। বাংলাদেশে মোট শিশুশ্রমিকের মধ্যে ১৩ লাখ অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ কাজে নিয়োজিত। বয়স্কদের তুলনায় শিশুশ্রমিকের মৃত্যুহার বেশি। বর্তমানে শতকরা ৯৪ ভাগ শিশুশ্রমিক কৃষি এবং অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে কাজ করে চলেছে।
শিশুশ্রম প্রতিরোধে সবার দায়িত্ব রয়েছে। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত কক্ষে এই শ্রম প্রতিরোধের কথা বললেই দায়িত্ব শেষ নয়। ঘরে থাকা শিশুশ্রমিককে নিজের শিশুর মতো ভাবলে অনেকটা দূর হয়ে যাবে শিশুশ্রম। আমাদের হাসি বরাদ্দ থাক গরিব, এতিম শিশুর জন্য। তবে সমাজে সুবিধাবঞ্চিত বলে আর কেউ অবশিষ্ট থাকবে না।

x