রাউজান আওয়ামী রাজনীতির পথ পরিক্রমা

সাইফুল ইসলাম চৌধুরী রানা

শুক্রবার , ২০ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৪:৪৭ পূর্বাহ্ণ
1886

সৌভাগ্যবশত আওয়ামী পরিবারে আমার জন্ম। দলের জন্য বাবার ত্যাগ-ভালোবাসা দেখতে দেখতে বেড়ে উঠা। তাই নিজের মধ্যে সযত্নে জন্ম নিয়েছে একটি ‘অনুভূতি’। সেই অনুভূতির নাম ‘বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ’। যেমনি বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের জাতীয় সম্মেলনে সৈয়দ আশরাফুল ইসলাম বলেছিলেন, ‘আওয়ামী লীগ শুধু একটি দল নয়, এটি একটি অনুভূতি’ ।
রাউজান উপজেলায় আওয়ামী লীগের ইতিহাস-ত্যাগ, সংগ্রামে যতুটুক সমৃদ্ধ হয়েছে ততটা সমৃদ্ধ আদর্শের চর্চায়। যেখানে বহু নেতা-কর্মী আদর্শের প্রশ্নে আপস না করায় জীবন দিয়েছেন, সহায়-সম্পত্তি হারিয়েছেন। আওয়ামী লীগে শিক্ষিত মানুষের সংখ্যাও ছিল বেশি। তাই রাজনীতিতে আদর্শ চর্চাও হতো বেশি। সে আদর্শ বুকে ধারণ-লালন করে অনেকেই নিজের জীবন বিসর্জন দিয়েছেন, অনেকে ঠাঁই করে নিয়েছেন নেতা-কর্মীদের অন্তরে। তাদেরই একজন আমার বাবা মরহুম আলহাজ্ব শফিকুল ইসলাম চৌধুরী বেবী। মহান মুক্তিযুদ্ধের পর বঙ্গবন্ধুর আহবানে দেশ গড়ার কাজে আত্মনিয়োগ করেন তিনি। মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ এর হাত ধরে আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে আসেন তিনি। পরবর্তীতে রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ এর হাল ধরেছেন, সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছেন দীর্ঘ দুই যুগের বেশি সময়। ১৯৯১-২০১৭ সাল, পর পর ০৩ টি সম্মেলন। অথচ রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ এর পথচলা ছিল কণ্টকময়। স্বাধীনতা বিরোধী শক্তিশালী চিহ্নিত পরিবারটির বিষদাঁতের বিষাক্ত ছোবল কেড়ে নিয়েছে অসংখ্য আওয়ামী লীগ,যুবলীগ ও ছাত্রলীগ নেতাকর্মীর প্রাণ। যেখানে বঙ্গবন্ধুর কথা বলা, প্রগতির কথা বলা ছিল একজন কর্মীর জন্য দুঃসাহসের ব্যাপার!
১৯৯৬ সালে জননেত্রী শেখ হাসিনা যখন যুগান্তকারী, বিচক্ষণ এবং দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে জননেতা এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরীকে রাউজান আসনে মনোনয়ন দেন, তখন স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতাদের একটি অংশ তাঁকে মেনে নেয়নি। চট্টগ্রাম রাজনীতির দুই অভিভাবক ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন ও এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী এর পরামর্শে আমার বাবা নেত্রীর মনোনীত প্রার্থীকে সাদরে গ্রহণ করে নেন এবং নির্বাচনে বিজয় অর্জনে প্রাণপণ প্রচেষ্টা চালান। কিন্তু স্থানীয় আওয়ামী-লীগের বিদ্রোহী অংশটি ভেতরে ভেতরে জাতীয় পার্টির প্রার্থী জিয়া উদ্দিন বাবলুর পক্ষ নেওয়ায় সামান্য ব্যবধানে হেরে যান জননেত্রীর প্রার্থী এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী। তবে তিনি থেমে থাকেননি, শুরু করেন তার উন্নয়নমুখী রাজনীতি। রাউজানের প্রতিটি রাস্তা-ঘাট নির্মাণসহ বাস্ত-বায়ন করেন শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মযজ্ঞ।
ফলশ্রুতিতে ২০০১ সালের জাতীয় নির্বাচনে জননেত্রী শেখ হাসিনাকে রাউজানের আসনটি উপহার দেন এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি। সৃজনশীলতা, কর্মস্পৃহা, সাংগঠনিক দক্ষতা ও উন্নয়নমুখী রাজনীতির মূল্যায়ন স্বরূপ জননেত্রী শেখ হাসিনা নিজ হাতেই ৬ বার মনোনয়ন দিয়েছেন তাঁকে। ১৯৯৬, ২০০১, ২০০৬ (স্থগিত), ২০০৯, ২০১৪ এবং ২০১৮ সাল মোট ৬ বার প্রাপ্ত মনোনয়নে টানা ০৪ বার জয়লাভের মধ্য দিয়ে নেত্রীর মূল্যায়নকে সঠিক প্রমাণিত করেছেন তিনি। একবার নির্বাচন স্থগিত হয়েছিল। একবার ষড়যন্ত্র করে নির্বাচনে হারানো হয়েছিল। আমি দৃঢ়তার সাথে বলছি, ১৯৯৬ সনে ষড়যন্ত্রকারীরা যদি এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরীর বিরোধিতা না করত কখনোই এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরীর রাজনৈতিক জীবনে পরাজয়ের আঁচড় লাগত না।
প্রসঙ্গক্রমে বলতে হয়, অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ শয্যাশায়ী থাকা অবস্থায় তখন আমার বাবা উনাকে দেখতে গেলে আবেগাল্পুত হয়ে নেতাকে বলেন, আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিবেন আমরা আপনার কাছে ঋণী কারণ আপনি রাউজানের সংসদীয় আসনটি একবার উপহার দিয়ে আমাদেরকে আজীবনের জন্য ঋণী করে রেখেছেন। স্বাধীনতা পরবর্তী দীর্ঘ ২৭ বছরে আমরা আর রাউজানের আসনে জয়লাভ করতে পারিনি। প্রতি উত্তরে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ বলেন, না! বরং আমিই তোমাদের প্রতি ঋণী; কারণ তোমরা নিজের পকেটের টাকা খরচ করে আমাকে নির্বাচনে জয়ী করেছ। বাবার নেতৃত্বে দীর্ঘ ২৭ বছর পর ২০০১ সালে যখন রাউজান সংসদীয় আসনে জনাব এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী প্রথমবার নির্বাচনে জয়লাভ করেন তখন উপজেলা আওয়ামী লীগের পার্টি অফিস হিসেবে পরিচিত সুবর্ণা প্রিন্টার্সের সামনে নির্বাচনী বিজয় মিছিল পরবর্তী হাজারো জনতার সমাবেশে বক্তব্য রাখার সময় আবেগাপ্লুত হয়ে বাবা বলেন, আজ আমার দীর্ঘদিনের স্বাদ পূর্ণ হয়েছে। দীর্ঘ ৩০ বছর পর পূর্বে অধ্যাপক মোহাম্মদ খালেদ নৌকাকে বিজয়ী করে গিয়েছেন। আজ ৩০ বছর পর আবার এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী নৌকার বিজয় উপহার দিয়ে রাউজান আওয়ামী পরিবারকে পুনরায় ঋণী করলেন।
রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী এমপি’র নেতৃত্বে এখন সুসংগঠিত। তার ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় সদর এলাকায় উপজেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয়, ১৪ টি ইউনিয়ন ও পৌরসভা মিলে মোট ১৬ টি দলীয় কার্যালয় নির্মাণ করা হয়। যা সারাদেশে নজির স্থাপন করে। এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী’র প্রত্যক্ষ তত্ত্বাবধানে রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ এর উদ্যোগে ১৫ আগস্ট জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রায় ১১শ ব্যাগ রক্তদান, প্রায় লক্ষ মানুষের জন্য মেজবান আয়োজন, রাউজানের ৭০০ মসজিদে খতমে কুরআন মাহফিল উদযাপন ও অসংখ্য মন্দিরে শোক প্রার্থনা সহ নানা কর্মসূচি পালন করা হয়।
বিভিন্ন সময় নেতৃত্ব দিয়ে আসা রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ এর প্রয়াত নেতৃবৃন্দের ছবি দলীয় কার্যালয়ে প্রদর্শনের মাধ্যমে ত্যাগী নেতাদের স্মরণ করা হয়। প্রতি বছর রমজান মাসে মরহুম নেতৃবৃন্দের স্মরণে মরহুমের নিজ নিজ এলাকায় খতমে কোরআন ও দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়। রাউজানে স্কুল ফিডিং প্রকল্পের মাধ্যমে দৈনিক ৩৩ হাজার প্রাথমিক শিক্ষার্থীর মাঝে খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে।
একদিনে সাড়ে চার লক্ষ ফলদ বৃক্ষের চারা রোপণ করে নজির স্থাপন করেন। ২৬ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপন করেন, রাউজানের সকল শিক্ষা ও প্রশাসনিক প্রতিষ্ঠানে নতুন নতুন ভবন নির্মাণ এবং ফুল বাগান সৃজন করে দৃষ্টিনন্দন করে তোলেন প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে, প্রতিটি বিদ্যালয়ে গ্যালারীসহ খেলার মাঠ নির্মাণ করেন, রাউজানের উত্তরে ও দক্ষিণে পিংক সিটি নামক দুটি আবাসন প্রকল্প স্থাপন করেন।
রাউজানের পরীক্ষিত নেতা এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী : কর্মীকে তার রাজনৈতিক জীবনে নেতার কাছে প্রতিনিয়ত পরীক্ষা দিতে হয়। কিন্তু নেতার পরীক্ষা নেওয়ার সুযোগ খুব কমই পায় একজন কর্মী। ২০০৪ সালে ২১ আগস্ট বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার উপর যখন গ্রেনেড হামলা হয়, তখন আমরা হাতেগোনা ১৫/২০ জন কর্মী পাথরঘাটার বাসায় এবিএম ফজলে করিম চৌধুরীর সাথে কথা বলছিলাম। সারাদেশে খবরে ছড়িয়ে পড়ে- গ্রেনেড হামলায় শেখ হাসিনাসহ আওয়ামী লীগ এর শীর্ষ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ কেউ বেঁচে নেই। খবর পেয়ে আমাদের নেতা ফজলে করিম চৌধুরী, সাথে থাকা মাত্র ১৫/২০ জন কর্মীকে নিয়ে কোতোয়ালী থেকে শুরু করে নিউমার্কেট-তিনপোলের মাথা-এনায়েতবাজার এলাকায় বিক্ষোভে ফেটে পড়েন। নেত্রীর প্রতি নেতার এ ভালোবাসা ও আবেগ দেখে আমরা সেদিন আবেগ আপ্লুত হয়েছিলাম। আমরা যারা আওয়ামী লীগকে ভালোবাসি, বঙ্গবন্ধুকে ও শেখ হাসিনাকে ভালোবাসি। সেই আওয়ামী লীগ ও বঙ্গবন্ধু পরিবারের উপর হামলায় যে নেতা ঘরে বসে না থেকে রাস্তায় ঝাঁপিয়ে পড়েন। সে নেতা আমাদের জন্য পরীক্ষিত নেতা।
উল্লেখ্য, বাবার নেতৃত্ব দেওয়া সংগঠন রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগে ২০১২ সাল থেকে এই পর্যন্ত কর্মী হিসেবে কাজ করা আমার জন্য অনেক গর্বের ও পরম সৌভাগ্যের। বাবার মত নীতি আদর্শের উপর অবিচল থেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শ, দেশরত্ন জননেত্রী শেখ হাসিনা’র নেতৃত্ব ও জননেতা এ.বি.এম ফজলে করিম চৌধুরী’র দিক নির্দেশনায় সংগঠনের কর্মী হয়ে আজীবন কাজ করে যাওয়া আমার দৃঢ় প্রত্যয়।
লেখক : কার্যনির্বাহী সদস্য রাউজান উপজেলা আওয়ামী লীগ।

x