রাউজানে গড়ে উঠেছে অনেক ফুলের বাগান

মীর আসলাম : রাউজান

সোমবার , ৮ অক্টোবর, ২০১৮ at ১০:৫২ পূর্বাহ্ণ
120

ফুল নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক ভালবাসার পবিত্র প্রতীক। ফুল ব্যবহার হয় জন্ম-মৃত্যুতে, শ্রদ্ধা নিবেদনে। ফুল দেয়া হয় প্রিয়জনদের উপহার হিসাবে। প্রিয়তমার জন্য ও প্রথম প্রেম নিবেদন করতে যে জিনিষটি উপহার দেয়া হয় সেটিও ফুল। ন্যায়নিষ্ঠতার প্রতীক হিসাবে বিবেচনায় নিয়ে ব্যক্তি চরিত্রকে তুলনা করা হয় ফুলের সাথে। ধর্মীয় আচার পালনে ব্যবহার করা হয় ফুল। পৃথিবীতে ফুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ নতুন নয়। ওই আকর্ষণ আদিকাল থেকে। ১৮৪০ সালে ইংল্যান্ডের রানী ভিক্টোরিয়ার বিয়ের সময় আমন্ত্রিত অতিথিদের বরণ করা হয়েছিল ফুল দিয়ে। সেই থেকে আভিজাত্যের প্রতীক হিসাবে ফুলের ব্যবহার বেড়ে যায়। এই সংস্কৃতি ছড়িয়ে পড়ে সাড়া দুনিয়ায়। মানব সমাজে বেড়ে যায় ফুলের প্রতি ভালবাসা ও আকর্ষণ। ফুল প্রেমিকরা চেষ্টা করেন ফুলের সৌরভে সারাক্ষণ নিজকে ডুবিয়ে রাখতে। পৃথিবীর দেশে দেশে কবি সাহিত্যিকরা এই ফুল নিয়ে লিখে গেছেন রোমাঞ্চিত অনেক গল্প, কবিতা,গান। তারা ফুলকে উপমা করে গান কবিতায় প্রকাশ করেছেন মনের আবেগ, অনুভূতি,বিরহ বেদনার কথা। এসব গান কবিতা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লেখা হয়েছিল প্রিয়জনদের উদ্দেশ্যে। বাংলা সাহিত্যের প্রাণ পুরুষ কবিগুরু রবিন্দ্র নাথ ঠাকুর, বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ অনেকেই তাদের গান, কবিতায় ফুলকে উপমা করেছেন প্রিয়জনদের সাথে। বিরহের অনলে দগ্ধ মনে কবি সাহিত্যিকরা প্রিয়তমাদের কাছে ডেকেছেন ফুলের সৌররে মাঝে নিজের সবটুকু উজার করে দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে। ফুলকে তুলনা করে নিজেদের বুকের ভিতর লালিত স্বপ্ন, বিরহ বেদনা আর আবেগ অনুভূতির কথা প্রকাশ করেছেন।
প্রেমের কবি কাজী নজরুল ইসলাম- তার মনের মাঝে স্থান দেয়া কোনো এক প্রেমিকার শিহরণ জাগাতে একটি গানে ফুলের রূপের বর্ণণায় এনেছেন আকাশের তারা, চৈত্রের চাঁদকে দিয়ে। প্রেমিকার মন জয়ে তার সেই জনপ্রিয় গানটি শুরু করেছিলেন এভাবে- “মোর প্রিয়া হবে এসো রাণী- দেব খোঁপায় তারার ফুল, কর্ণে দোলাব তৃতীয়া তিথির চৈতী চাঁদের দুল”—–।
ভালবাসা ও পবিত্রতার প্রতিক এই ফুলের প্রতি এযুগেও মানুষের আকর্ষণ কোনো ভাবেই কমেনি। বরং বেড়েছে। তবে ফুলের প্রতি মানুষের আকর্ষণ বাড়লেও বেশির ভাগ মানুষ ফুল বাগান সৃষ্টিতে তেমন মনোযোগি হয়ে উঠে না। বেশির ভাগ মানুষ হাতের কাছে পাওয়া ফুলটির প্রতি ক্ষণিকের ভালবাসাটুকু দিয়ে সন্তুুষ্ট থাকে।
তবে কিছু কিছু ফুল প্রেমিক ব্যতিক্রমী মানুষ রয়েছে যারা সেখানেই, যেই পরিবেশে থাকুক না কেন সেখানেই ফুলের সন্ধিগ্ধ পেতে মরিয়া হয়ে উঠে। নিজের চৌহদ্দির মধ্যে সৃষ্টি করতে চান ফুলের বাগান। এসব ফুল প্রিয় মানুষ নিজের পারিপার্শ্বিক পরিবেশকে ফুলের সৌরভের ডেকে রেখে কাজ করতে সাচ্ছন্দ বোধ করেন। আমাদের সমাজে শহরের অভিজাত এলাকার বাইরে ফুলের দৃষ্টিনন্দন সৌরভ দেখা যায় কমই। তবে এক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী একটি এলাকা রয়েছে, সেটি হচ্ছে রাউজান উপজেলা। ফুলে ফুলে ঢাকা, এই উপজেলা এখন রাউজানের মানুষের জন্য অন্য রকম গৌরব। রাউজান উপজেলা কমপ্লেক্স, সকল শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিদ্যুৎসহ প্রশাসনিক ও সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানের চৌহদ্দি এখন ফুলে ফুলে সজ্জিত। উপজেলার প্রতিটি প্রতিষ্ঠান পরিণত হয়ে আছে একেকটি ফুলের বাগান। প্রতিটি ঋতুতে বাহারী রঙের মোহনীয় ফুল সুবাস ছড়াচ্ছে গোটা রাউজানে। এই উপজেলার সর্বত্র ফুল বাগান সৃষ্টির প্রেরণায় রয়েছেন রাউজানের সাংসদ এবিএম ফজলে করিম চৌধুরী। তিনি এই উপজেলায় পেয়েছেন ফুল প্রেমিক ইউএনও শামীম হোসেন রেজাকে। যিনি নিজের সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি সার্বক্ষণিক ফুলের মধ্যে ডুবে থাকতে ভালবাসেন। ফুলের মধ্যে ডুবে স্বপ্নের জাল বুনেন। উপজেলা কম্পাউন্ডে ফুলের সৌরভের মধ্যে বসে সরকারি দায়িত্ব পালন করছেন এসি ল্যাণ্ড জোনায়েদ কবির সোহাগসহ কয়েকজন সরকারি কর্মকর্তাগণ। ।
এলাকার প্রবীণদের মতে গত দুই দশক আগে এই রাউজানের মাটি রাজনৈতিক কারণে রক্তের রঙে ছিল রঞ্জিত। ৯৬ সালের পর পরিবর্তিত রাজনীতির ধারায় এই রাউজানে ফিরে আসে শান্তির সুবাতাস। প্রতিষ্ঠা পায় সামপ্রদায়িক সমপ্রীতি। স্বস্তি ফিরে পায় রাউজানের মানুষ। গত দুই দশক থেকে রাউজানে খুন সন্ত্রাস অরাজক পরিস্থিতি নেই। জীর্ণশীর্ণ অবকাঠামো নেই, ভাঙাচোরা রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট নেই। সবকিছুতে এসেছে নতুনত্ব। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের চৌহদ্দিতে করা আছে ফুলের বাগান। ছোট বড় রাস্তাঘাট, হাট বাজার, উপজেলা কমপ্লেক্স, ইউনিয়ন পরিষদ কমপ্লেক্স, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স, কমিউনিটি ক্লিনিক, স্কুল কলেজ, মাদ্রাসার চারিদিকে আলোজ্বলমলে পরিবেশ, সবখানে গড়ে উঠেছে ফুলের বাগান। সড়ক-মহাসড়ক পথে যাত্রকালে দেশ বিদেশি অনেক পর্যটক এখন থমকে দাঁড়ায় রাউজানের সৌন্দর্য্যে বিমুগ্ধ হয়ে। রাউজান ঘুরে দেখা হলে মনে হবে গোটা রাউজানই এখন ফুলের বাগান। সাংসদের অনুপ্রেরণা ও উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তা শামীম হোসেন রেজার ফুলের প্রতি আসক্তিতে ফুল প্রেমিক অন্যরাও স্ব স্ব প্রতিষ্ঠানে ফুল বাগান করেছে। এভাবে গোটা রাউজানে বাগান সৃষ্টিতে সহায়ক হয়েছে। ইউএনও নিজের প্রশাসনিক কাজে ফাঁকে পরিচর্যা করেন তার হাতে সৃষ্টি করা বাগানের। অবসর সময়ে ডুবে থাকেন ফুলের সৌরভে। তিনি বাহারী স্বাদ ও রঙের ফল ফুলের বাগান করেছেন নিজের সরকারি বাসভবনের চারিপাশে ও রাউজান শিল্পকলা একাডেমির আঙ্গিনায়। ফুল প্রিয় এই কর্মকর্তা সকলকে পরামর্শ দেন বাড়ীর আঙ্গিনায় ফুলের বাগান সৃষ্টি করতে। ফুলের সুবাসে শিল্পকলায় বিকালের দিকে কোলাহল থাকে শিল্পি সাহিত্যিক, ছোট ছোট খোকা খুকিদের। যারা এখানের আবৃতি, গান ও নাচের চর্চা করেন।

x