রহস্যের পর্দা খোলা হোক

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৩৩ পূর্বাহ্ণ
56

চট্টগ্রামের সিটি মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন। ব্যক্তিগতভাবে খুউব কাছের। আসলে অনেক অনেক দূরের! অদ্ভুত শোনালেও এটাই অপ্রিয় সত্য।
কাছের কীভাবে এটা বলি আগে। চট্টগ্রাম নগর ছাত্রলীগের সভাপতি বা সাধারণ সম্পাদক ছিলেন তিনি। পরে ছাত্রলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সিনিয়র সহ সভাপতি। সম্ভবত ‘৭০ দশকের শেষ বা ‘৮০’ র শুরুতে। রাজনীতির সূত্রে তখন পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা।
আমি উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের হার্ডকোর কর্মী। সপরিবারে বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের প্রতিশোধের আগুন প্রতি ফোঁটা হিমোগ্লোবিনে টগবগ করে ফুটছে। কষ্টের টিউমার হৃদপিন্ডজুড়ে! ‘৭৫ এর ১৫ আগস্ট জনক হত্যাকান্ডের পর টিউমারটির জন্ম। ধীরে ধীরে টিউমারেরে কোষ শরীরজুড়ে সংক্রমিত হয়। প্রচন্ড কষ্ট, ক্রোধ, ক্ষোভ মিলেমিশে অসহনীয় দহন! গ্রহণকালের জাতক আ জ ম নাছিরও! বিনয়ী মৃদুভাষী, আকর্ষণীয় ব্যাক্তিত্ব! দলের প্রয়োজনে যে-কোন ঝুঁকি
গ্রহণের দুর্জয় সাহস তার প্রতি অন্যরকম আকর্ষণ তৈরি হয় বুকের গহীনে। দলের দুঃসময়ে তাঁর আত্মত্যাগ নিয়ে লিখতে গেলে সেটা হরর সিরিয়ালকেও টেক্কা দেবে! তাই প্রসঙ্গটা বাদ। ওনার সাথে ব্যক্তিগত ও রাজনৈতিক সম্পর্ক শিকড়-বাকড়, ডাল-পালা মেলে পরবর্তীতে বিশাল মহীরূহ! আসলে রাজনীতি তখন রামকৃষ্ণ মিশন ছিল না। দরকার ছিল, বিষাক্ত ছোবলের বদলে ঈগলের মত তীব্র পাল্টা ছোবল হানার দুর্জয় সাহসের। যার কমতি ছিলনা আ জ ম নাছিরের। আমরাও রাজনৈতিক জীবনে তৃণভোজী ছিলাম না!
‘৯২ সাল থেকে সরাসরি রাজনীতি থেকে সরে আসি। ফটিকছড়ির আওয়ামী লীগ নেতা হারুন বশরকে উত্তর চট্টগ্রামের ত্রাস শিবিরের নাসির গ্রুপ ঘর থেকে তুলে নিয়ে রাইফেলের বুলেটে দু’হাঁটু গুড়িয়ে দেয়ার পর। তখন উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বেশ প্রভাবশালী সদস্য ছিলাম। পাশাপাশি সাংবাদিকতা পেশাও। আমার তৈরি একটি মানবিক রিপোর্ট পড়ে প্রিয় নেত্রী শেখ হাসিনা চট্টগ্রাম বিমান বন্দর থেকে চমেক হাসপাতালে হারুন বশরকে দেখতে ছুটে যান। ঘটনাটি ‘৯১ এর উপকূলীয় ভয়াল ঘূর্ণিঝড় পরবর্তী। সম্ভবত মে মাসের প্রথম সপ্তাহে। এ নিয়ে প্রভাবশালী এক নেতার কোপানলে পড়ি। ফলাফল, স্বেচ্ছা ছুটি নিই রাজনীতি থেকে। তো, রাজনীতি থেকে ছুটি নিলেও আদর্শিক টান ঢিলা হয়নি- উল্টো আরো জোরালো হয়। শব্দ হয়ে উঠে লক্ষ্যভেদী মিশাইল। যা এখনো সমানে লক্ষ্যবস্তু ভেদ করে চলেছে। ‘৭৫ পরবর্তী গ্রহণকালে সক্রিয় রাজনীতিতে অবদান কী, স্বাক্ষী পুরো উত্তর চট্টগ্রাম। বাহুল্য কথন অনাবশ্যক। আ জ ম নাছিরের সাথে সম্পর্ক কখনো ঢিলে হয়নি, ঢিলে হয়নি মহিউদ্দিন ভাইয়ের সাথেও। বরং দিনে দিনে বেশি বেশি মজবুত হয়েছে। প্রাপ্তি বলতে একটাই, জননেত্রী শেখ হাসিনা তথা আওয়ামী লীগের ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন। মহিউদ্দিন ভাই আর আ জ ম নাছিরের রাজনীতির ধরণ পুরোপুরি আলাদা। একজন আগুন অন্যজন পানি!
দু’জন বিপরীত ধারার নেতার সাথেই মানিয়ে চলতে সমস্যা হয়নি। কারণ দল ও দেশের জন্য উনাদের নিবেদন ও অসামান্য আত্মত্যাগ। নিজের আদর্শিক অবস্থান বা দেশপ্রেম নিয়ে বলা মানে আত্মপ্রচার! তাই বাদ। দু’জনই মৃত্যুর সাথে বার বার জানবাজি রেখে রাজনীতিতে স্ব স্ব অবস্থানে উঠে এসেছেন। কারো করুণা বা দয়ায় নয়। নিজে তো দিয়েই যাচ্ছি, প্রাপ্তিযোগের পোকাকে পিষে মেরে! উনাদের একজন জনতা-নির্ভর অন্যজন কর্মী-নির্ভর। মহিউদ্দিন ভাই ভালো বক্তা নন, কিন্তু মানুষের মন জয় করতে পারতেন অতি দ্রুত। তাঁর চাটগাঁইয়া হিউমার, আন্তরিকতা, বেহেসাবি চাটগাঁইয়া গালাগাল দারুণ উপভোগ্য! যারা শুনছেন তারা যেমন, তেমনি যার উদ্দেশ্য গালাগাল তিনিও! শুনতে আজব লাগলেও এটাই বাস্তবতা। চট্টগ্রামবাসীর জনপ্রিয় দাবি নিয়ে তৎক্ষণিক জোরদার আন্দোলন গড়তে তাঁর প্রতিভা, দূরদর্শিতার কোন তুলনা হয়না।
বিপরীতে আ জ ম নাছির ঠান্ডা মাথার রাজনীতিক। মেধা, সাহস, দক্ষতার যোগফলে তিনি চট্টগ্রামে নিজের আলাদা বলয় গড়ে নেন। ফলে মহিউদ্দিন ভাইসহ কনভেনশনাল ধারার রাজনীতিকদের সাথে তাঁর দুরত্ব তৈরি হয়। আ জ ম নাছিরকে নিয়ে রাজনীতিতে অনেক মিথ,হরর, ফিকশন-ও তৈরি হয়। বাস্তবতা হচ্ছে, কোন কারণে মিথ, ফিকশনের জনকেরা তাঁর সামনা-সামনি হলে অবিশ্বাস্য ধাক্কা খান। যা হাজার ভোল্টের বৈদ্যুতিক শককেও হার মানায়। এটা অগ্নিঝলক নয়, কোমল ও ঠান্ডা ঝলক! এটা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ব্রেনে বিস্ময়ের পোকা ছেড়ে দেয়, তারা কামড় বসায়, ‘অন্য মুখের ঝোল টেনে কত দুর্নামের ভাইরাস ছড়িয়েছি আর দেখছিটা কী! এতো বিনয়ী, এতো প্রিয়ভাষী মানুষ কীভাবে হয়!’
পরবর্তীতে লোকটা নিজেকেই ধিক্কার দেন, ‘কেন কানকথায় ভর করে আ জ ম নাছির উদ্দীনের মতো বিনয়ী নেতাকে নিয়ে রূপকথার রাক্ষস-খোক্কসের গল্প ফেঁদেছিলেন!’ সমপ্রতি সিটি কর্পোরেশনে গণপূর্ত বিভাগের একজন সহকারি প্রকৌশলীকে মেয়র চড়থাপ্পড় মেরেছেন বলে ভাইরাল হওয়া ঘটনাটিও মিথ, ফিকশন বলেই ব্যাক্তিগত ধারণা। কারণ মেয়র আ জ ম নাছির কারো গায়ে হাত চালাতে পারেন, এটা একেবারেই অবিশ্বাস্য! তাও একজন সহকারী প্রকৌশলীর মতো ছোট কর্মকর্তার গায়ে! গণপূর্তের উর্ধ্বতন কর্মকর্তার সামনে এই প্রকৌশলী সিটি মেয়রের মতো প্রতিষ্ঠানের সাথে অশোভন আচরণের সাহসইবা পেলেন কোত্থেকে! মেয়রের বিরুদ্ধে নয়া মিথ, ফিকশন, হরর মার্কেটিং করতে তাঁকে টোপ হিসাবে ব্যবহার করাও হতে পারে। তাই রহস্যের জট খুলতে বিষয়টা নিয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। আপাতত ঘটনা চাপা পড়লেও, স্থানীয় সরকার ও গণপূর্ত বিভাগ দু’তরফই তৎপর হবে আশা করি। তাছাড়া চট্টগ্রামের মতো দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ নগরীর মেয়রের প্রাপ্য কিছু রাষ্ট্রীয় মর্যাদা এখনো ঝুলে আছে! এটা প্রতিষ্ঠান হিসাবে মেয়রের নয়, ৬০ লাখ নগরবাসীকে অবমূল্যায়ন! সবকিছু তাই খতিয়ে দেখা উচিত।
মেজাজ ধরে রাখার সমস্যা ছিল মহিউদ্দিন ভাইয়ের। তার কিছু নমুনা নিজের অভিজ্ঞতার ভান্ডারে মজুদও আছে। এগুলো মুচমুচে খবর হওয়ার মতোই আইটেম। তবুও ভুক্তভোগী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ ছিল, খবর হয়নি। আর মেয়র আ জ ম নাছিরের ঘটনা বা মিথ এত দ্রুত ছড়ালো কেন? কোন না কোন স্বার্থান্বেষী চক্র তো নেপথ্যে থাকতেই পারে। কথা হচ্ছে, কিছু নামধারী সাংবাদিক সর্বক্ষণ তাঁকে ঘিরে বলয় তৈরি করে রাখে বলে অভিযোগ আছে। আরো আছে অপ্রয়োজনীয় প্রচুর অকাজের চরিত্রও। তোষামোদ-খোসামোদ ছাড়া এদের কোনো সৃজনী জ্ঞান আছে বলে জানা নেই। নেই প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতার কথা থাউকগা! কৌশলে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থের সেবা নেয়াই এদের একমাত্র কাজ। না হলে অহেতুক বাজে ঘটনা কেমন করে এত দ্রুত এত বেশি প্রচার পেয়ে গেল! পক্ষে বিপক্ষে রাস্তা গরম করেইবা কী লাভ হয়েছে ? নেপথ্য কুশীলবদের গর্ত থেকে টেনে বের করাই এখন খাস কাজ। যদি চরিত্র হননের জন্য করা হয়, তাহলে তো সবে শুরু! দুর্ভাগ্য, মেয়র মহোদয় আপন-পর চিনতে বড্ডো ভুল করেন। সময় ব্যবস্থাপনায়ও তাঁর কিছু সমস্যা আছে। অনেকগুলো বিরল মানবিক গুণ থাকলেও তোষামোদের সুগারকোটেও বিভ্রান্ত হন, এটা নিজের অভিজ্ঞতা। আনুষ্ঠানিক কর্মসূচি ছাড়া দেখাই হয় না। বিরূপ অভিজ্ঞতার কারণেই নিরাপদ দূরত্বে থাকি। মাত্র এক কী দু’বার তাঁর অফিসে গিয়েছি গত চার বছরে! তাও কথা বলার সুযোগ হয়নি। সময় দিয়েও তিনি দু’মিনিট আলাদা কথা বলার সময়ই পাননি!
চট্টগ্রামের স্বার্থে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের দরকার আছে। গভীর ষড়যন্ত্র আর তোষামোদের থিকথিকে কাদা ভেঙে তাঁকে মেধা, প্রজ্ঞা, জ্ঞানের সেবা নিতে হবে। বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর নাড়ির স্পন্দন পড়তে হবে। কীভাবে করবেন এবং গণমানুষের কাছে পৌঁছাবেন, সিদ্ধান্ত কিন্তু তাঁর একার!

x