রহস্যেঘেরা ডেভিলস সী

আরিফ রায়হান

বুধবার , ১৭ জুলাই, ২০১৯ at ১০:৩০ পূর্বাহ্ণ
139

প্রশান্ত মহাসাগরের বুকে রয়েছে এক খণ্ড রহস্যময় জায়গা। যাকে অশুভ স্থান বলে মনে করা হয়। এটি ডেভিলস সী বা শয়তানের সাগর নামে পরিচিত। এটির মতো পৃথিবীতে আরো বারোটি স্থান রয়েছে যেখানে এর চৌম্বকীয় আকর্ষণ খুব বেশি। ঠিক এমনই এক ভয়ানক স্থান হচ্ছে ডেভিলস সী বা শয়তানের সাগরের ভেতরে অবস্থিত ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেল। জাপান আর বোনিন দ্বীপের মাঝখানে সাগরের মধ্যে অবস্থিত এই স্থানটিকে জাপানীরা সবসময়ই ড্রাগনের আস্তানা বলে মনে করে থাকে। জাপানিজ পৌরাণিক কাহিনী অনুসারে, এখানে এক ভয়ঙ্কর ড্রাগন বাস করে যার ক্ষুধা দূর করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। আর তাই এর কাছে আসা জাহাজ আর মানুষকে অনায়াসে গিলে ক্ষুধা মেটায়। সেই থেকে এর নাম হয়ে যায় ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেল।
১২০০ শতাব্দীর দিকে কুবলাই খান বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেছেন জাপানকে দখলে নিতে। এজন্য অতিক্রম করার চেষ্টা করেছেন শয়তানের সাগরের মাঝ দিয়ে। যতবারই চেষ্টা করা হয়েছে ততবারই বহু মানুষ আর জাহাজ হারাতে হয়েছে তাকে। শুধু তিনিই নন, অগণিত জাহাজ আর উড়োজাহাজ হাওয়ায় মিলে গেছে ঠিক এই জায়গায় এসে। বারমুডা ট্রায়াঙ্গেলের বিপরীতে অবস্থিত হলেও ঠিক ওটার মতই রহস্য জমা হয়ে আছে ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেলকে ঘিরে। কারো কারো মতে কোন কোন সময় এক রহস্যময় নারীকে দেখতে পাওয়া যায় সাগরের ওই জায়গাটিতে। ১৯৫০ সালে ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেলকে অনিরাপদ বলে ঘোষণা দিলেও এরপর অনেকেই চেষ্টা করেছেন এখানকার রহস্য উদঘটনে। আর তাদের ভেতরে একজন ‘ল্যারি কুছে’ নিজের বইয়ে জানান, ওখানে আর কিছুই না, রয়েছে এক বিশাল আগ্নেয়গিরি। আর যতসব রহস্যময় উধাও হওয়ার ঘটনা ঘটেছে এখনো পর্যন্ত সবগুলোর পেছনে হাত রয়েছে একমাত্র ঐ সমুদ্র আগ্নেয়গিরিরই।
ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেল নামকরণের ইতিহাস থেকে জানা যায়, চীনে প্রায় ১০০০ খ্রিস্টপূর্ব থেকে একটি পৌরাণিক মতবাদ রয়েছে, এই শয়তানের সাগরের পানির গভীরে লুকিয়ে রয়েছে এক বিশাল ড্রাগন। যখন এটি পানির নিচে চলাফেরা করে তখন সাগরের বুকে বড় বড় ঢেউ, ঘূর্ণিপাক, সামুদ্রিক ঝড়সহ চারিদিকে ঘন কুয়াশায় ঢেকে যায়। বিশাল ড্রাগন তার অসম্ভব ক্ষুধা নিবারণের জন্য বিভিন্ন জাহাজ বা বিমান গিলে ফেলে। ১৯৫২-৫৪ সালে মোট পাঁচটি সামরিক জাহাজ এ জায়গা অতিক্রম করার সময় প্রায় ৭০০ লোকসহ নিখোঁজ হয়। আবহাওয়াবিদরা জানান, ঐ মুহূর্তের আবহাওয়া পুরোপুরি স্বাভাবিক ছিল এবং জাহাজগুলো থেকে কোন প্রকার সংকেত বা সাহায্যও চাওয়া হয়নি। তবে কেন জাহাজগুলো নিখোঁজ হলো? ১২০০ শতাব্দীর দিকে কুবলাই খান অনেকবার জাপানকে দখলে নিতে গিয়েছিলেন শয়তানের সাগরের মাঝ দিয়ে। কিন্তু প্রতিবারই সেখানে এসে জাহাজ নিখোঁজ হয়। শেষবার প্রেরিত যুদ্ধ জাহাজে প্রায় ৪০ হাজার সৈন্য ছিল যা ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেল পার হওয়ার সময় নিখোঁজ হয়ে যায়। নিখোঁজ হওয়া সৈন্য ও জাহাজের সন্ধান আজও মেলেনি। এসব অদ্ভূতুড়ে ঘটনার অনুসন্ধানের জন্য ১৯৫০ সালে জাপান সরকার ৩১ জন ক্রু-বিশিষ্ট কাইও মারু নং ৫ নামক একটি বিশেষ জাহাজ পাঠায়। আশ্চর্যের বিষয় এই অনুসন্ধানকারী জাহাজটিও উধাও হয়ে যায়। ফলে জাপান সরকার এই জায়গাটিকে সমুদ্রযাত্রার জন্য বিপদসংকুল হিসেবে ঘোষণা করে।
অনেক গবেষক বলে থাকেন, অগ্ন্যুৎপাত এবং ভূমিকম্পের কবলে পড়ে এ জায়গা থেকে অতিক্রমকারী জাহাজগুলো সমুদ্রের অতল গহ্বরে হারিয়ে যায়। ফলে পরবর্তীকালে তাদের আর কোন সন্ধান পাওয়া যায় নি। পরিবেশবিদদের মতে, এমন অগ্ন্যুৎপাত বা ভূমিকম্পের কারণে সেখানকার প্রাকৃতিক পরিবেশ প্রতিনিয়ত বদলাতে থাকে। আরো আশ্চর্যের বিষয় হল, বিশ্বের কোন মানচিত্রেই ডেভিলস সী’র অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এ কারণে এই স্থানটির আয়তন বা অবস্থান সম্পর্কেও কোন সুস্পষ্ট ধারণা করা সম্ভব হয়নি। ১৯৭২ সালে লন্ডনের সাগা ম্যাগাজিনে প্রকাশিত ‘দ্য টুয়েলভ ডেভিল’স গ্রেভ ইয়ার্ডস এরাউন্ড দ্য ওয়ার্ল্ড’ অনুচ্ছেদ থেকে জানা যায়, পৃথিবীতে সর্বমোট ১২টি স্থান রয়েছে যেখানে তীব্র চৌম্বকীয় আকর্ষণ অনুভূত হয়। আর ডেভিলস সী বা শয়তানের সাগরে অবস্থিত ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেল ঠিক এমনই এক জায়গা। সায়েন্টিফিক আমেরিকানে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেলের এই স্থানটিতে প্রায় ৩৭ হাজার মাইল এলাকা জুড়ে গভীর সামুদ্রিক খাদ এবং প্রচুর পরিমাণে উদগিরিত লাভা ও কার্বন-ডাইঅক্সাইড রয়েছে।
শিগেরু কিমুরার যৌথ প্রয়াসে লেখা একটি বই থেকে মায়োজিনশো নামক সক্রিয় আগ্নেয়গিরি সম্পর্কে জানা যায়, মারু নামক জাহাজটি যেখানে নিখোঁজ হয়েছিল এই আগ্নেয়গিরিটির অবস্থান ঠিক সেখানেই ছিল। এই আগ্নেয়গিরি থেকে থেমে থেমে অগ্ন্যুৎপাত হয় যা প্রচন্ড আলোড়নের সৃষ্টি করে এবং শান্তসমুদ্রকে মুহূর্তেই উত্তাল করে তোলে, যার ফলে যানগুলোকে প্রবল আকর্ষণে পানির অভ্যন্তরে টেনে নিয়ে যায়। এখানে আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাতকে প্রাধান্য দেয়া হলেও এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি এর আসল কারণ। বিজ্ঞানের যুগে প্রযুক্তি উৎকর্ষে নানা রহস্য উদঘাটন হলেও ড্রাগন ট্রায়াঙ্গেল এর রহস্য উন্মোচন চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায় বিজ্ঞানের জন্য।

x