রহস্যময় ভুতুড়ে দ্বীপ

আরিফ রায়হান

বুধবার , ১৫ মে, ২০১৯ at ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ
84

ভুতের কথা বললে আমরা অনেকেই ভয় পাই। কেউ কম আবার কেউ বেশি। তবে ভয় পেয়ে থাকি মোটামুটি। আবার অনেকেই নিজেকে সাহসী হিসেবে জাহির করার জন্য বলে থাকেন আরে না ভূত-টুত বলে কিছুই নেই। এসব মনের ভয়। কিন্তু এই লোকও কখনো কখনো ভয়ে জড়োসরো হয়ে যান ভুতের ভয়ে। আমি বলছি একটি ভুতুড়ে দ্বীপের কথা। সেটির অবস্থান মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক সিটিরই একেবারে প্রাণ কেন্দ্রে। এই দ্বীপটি ব্রাদার আইল্যান্ড নামে পরিচিত। দ্বীপটির আরেক নাম অ্যাবানডন্ড আইল্যান্ড। আধুনিক নিউইয়র্ক শহর থেকে এটি বিচ্ছিন্ন একটি দ্বীপ। সেখানে নেই কোনও মানব বসতি। এই দ্বীপের সুনসান নীরবতা অবাক হওয়ার মতো একটি ব্যাপার।
ব্রাদার আইল্যান্ড দ্বীপকে ঘিরে আছে নানা ধরনের গল্প রূপকথা। আসলে কী হয়েছিল এ দ্বীপে। যে কারণে মানুষ চলে গেল এই দ্বীপটি ছেড়ে? কারো কারো মতে, মহামারির আক্রমণে মানবশূন্য হয়েছে দ্বীপটি। আবার কেউ অন্যভাবে বলেন, অদৃশ্য আত্মার উৎপাতে মানুষ ছেড়েছে এই দ্বীপ। ব্রাদার আইল্যান্ডের বয়স খুব বেশি নয়। ১৮৮৫ সালের দিকেও দ্বীপটিতে মানুষের যাতায়াত ছিল। তখন সংক্রামক রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলে আক্রান্ত রোগীকে সরিয়ে আনা হতো এই দ্বীপে। নির্জন এই দ্বীপে গড়ে তোলা হয় একটি হাসপাতাল। টাইফয়েডের চিকিৎসা দেওয়া হতো এখানে। চিকিৎসা চলাকালীন অনেক রোগীই এখানে মারা গেছে। তাদের মৃত্যুই এই দ্বীপকে অভিশপ্ত করে তুলেছে বলে মনে করেন অনেকে। সেই থেকে এ দ্বীপের প্রতি মানুষের কৌতূহল ও ভীতি দুটোই বেড়ে যায়। আবার অনেকে এই দ্বীপকে মৃত্যুপুরী বলে মনে করেন। তারা বলতেন, মৃতের আত্মারা এ নির্জন দ্বীপে লুকিয়ে রয়েছে। রাতের আঁধারে এরা জেগে ওঠেন, মানুষের প্রাণ প্রাণ নিতে। এই খবর ছড়িয়ে গেলে মানুষের আনাগোনা কমতে শুরু করে। এক সময় দ্বীপটি ছেড়ে চলে যেতে শুরু করে মানুষ। হাসপাতালটিও পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে থাকে। ১৯৫০ সালের দিকে এই দ্বীপে একটি মাদক নিরাময় কেন্দ্র বসানো হয়। তখন মাদকাসক্ত মানুষের চিকিৎসা চলত এখানে। তাদের পাগলামি দেখে অনেক চিকিৎসকই পালিয়ে গেছেন এই দ্বীপ ছেড়ে। এরপর থেকেই এই দ্বীপকে নিয়ে নানা ভয়ানক গল্প বেরিয়ে আসতে থাকে। যারা এই দ্বীপে ছিলেন তাদের বর্ণনায় বেরিয়ে আসে লোমহর্ষক একেক ঘটনা। প্রেতের সাক্ষাৎ পাওয়ার দাবিও করেছেন অনেকে। অশুভ আত্মদার ভয়ানক সব কর্মকাণ্ডের কথা শুনে মানুষের মনে ভয় আরও বাড়তে থাকে। এটিকে প্রেতের দ্বীপও বলতো লোকজন। রাতে মৃত মানুষের চলাফেরা তো ছিলই সেই সঙ্গে ছিল তাদের রাতভর কান্না। দ্বীপের আনাচে-কানাচে জ্বলত আগুন। দ্বীপটিকে দূর থেকে দেখলে মনে হতো এই বুঝি স্বপ্নপুরী কিন্তু এর ভেতরে ঢুকলে সবুুজ গাছের নিচে অন্ধকারে ডুবে যেতে হতো। এই অন্ধকার পেরিয়ে দ্বীপে চলাচলের রাস্ত খুঁজে পাওয়া ছিল কঠিন। অনেকেই ভুল রাস্তায় হেঁটে ক্লান্ত হয়ে ঢুকে পড়তেন পাথুরে গুহায়। অবাক শোনালেও কথিত আছে এ দ্বীপের পাথুরে গুহাগুলো কেবল অন্ধকারেই মুখ খুলে বসে থাকত। যখন কেউ এ গুহায় ঢুকত অমনি বন্ধ হয়ে যেত গুহার মুখ। এদের পরিণতি কী হতো তা সবার জানা। এমনিভাবে অনেক মানুষ হারিয়ে গেছে এই দ্বীপে।
এদিকে ১৯৬৩ সালের দিকে মানুষ একেবারেই ব্রাদার আইল্যান্ড ছেড়ে চলে যায়। মানবশূন্য হাসপাতালটিও পড়ে থাকে অযত্ন অবহেলায়। আসবাব যা ছিল সব পড়ে আছে ঠিক আগের মত। ১৯৭০ সালের দিকে দ্বীপটি বিক্রি করার দেয়ার চেষ্টা চলে। কিন্তু কেউ কিনতে আগ্রহ দেখায়নি। তারপর থেকে কয়েক দশক ধরে দ্বীপটি পরিত্যক্ত অবস্থাতেই ছিল। অবশেষে ২০১০ সালের দিকে ব্রাদার আইল্যান্ড হঠাৎ করেই আলোচনার চলে আসে। ঘোরা ফেরার মধ্যে দিয়ে এক পর্যটক পথ ভুলে ঢুকে যান দ্বীপের ভেতর। সেখান থেকে তিনি তুলে আনেন পরিত্যক্ত দ্বীপের নানা লোমহর্ষক ছবি। ছবিগুলো দেখে অনেকেই আগ্রহী হন নতুন করে এই দ্বীপ সম্পর্কে জানার।
অবশ্য অনেকেই তাদের এই আগ্রহকে বাড়াবাড়ি বলে অভিযোগ করছেন। তাদের মতে ব্রাদার আইল্যান্ড দ্বীপের ক্ষুধা আবারও জেগে উঠেছে। সে ছলে-কৌশলে লোকজনদের আবারও তার কাছে টেনে নেয়ার চেষ্টা করছে। হয়তো কোন একসময় মানুষের রক্ত মাংশ দিয়ে আবারও করবে ভুরিভোজ।

x