রহস্যময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল

আরিফ রায়হান

বুধবার , ১৪ নভেম্বর, ২০১৮ at ৫:৩১ পূর্বাহ্ণ
161

বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। এটিকে বলা হয় বিশ্বের সবচেয়ে রহস্যময় স্থান। যেখানে লুকিয়ে রয়েছে ভয়ঙ্কর নানা রহস্য। আবার এটি ‘রহস্যময় ত্রিভুজ’ বা ‘শয়তানের ত্রিভুজ’ বলেও পরিচিত। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের রহস্য উদঘাটনে যুগে যুগে নানা চেষ্টা হয়েছে। কিন্তু কাজের কাজ কিছুই হয়নি। তদুপরি সৃষ্টি হয়েছে আরো নতুন নতুন রহস্যের।
উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরের একটি অঞ্চলের নাম বারমুডা ট্রায়াঙ্গল। এটি জাহাজ এবং বিমান চলাচলের একটি রুট। কিন্তু রহস্য কিংবা ভয়ানক ব্যাপার হলো এ অঞ্চল দিয়ে বিমান কিংবা নৌযানগুলো চলাচলের সময় রহস্যজনকভাবে নিখোঁজ হয়। অনেকে মনে করেন এসব অন্তর্ধানের মূলে রয়েছে নিছক দুর্ঘটনা। মনে করা হয়, প্রাকৃতিক দুর্যোগ বা চালকের অসাবধানতায় এসব দুর্ঘটনা ঘটেছে। তবে প্রচলিত রয়েছে ভিন্ন কথা। অনেক বিশেষজ্ঞও বলেন, এসব আসলে দুর্ঘটনা নয়। এর পেছনে রয়েছে অতিপ্রাকৃতিক কিছু, যা দৃষ্টিগোচর হয়নি। কেউ কেউ মত দেন ভিনগ্রহের কোনো প্রাণীর উপস্থিতিতে এসব ঘটেছে।
জানা গেছে, ১৯২১ সালে ‘ক্যারল এ ডিয়ারিং’ নামের এক জাহাজ ওই অঞ্চল থেকে হঠাৎ নিখোঁজ হয়। জাহাজটির খোঁজে পাঠানো হয় একটি অনুসন্ধান দল। পরে দলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে জাহাজটিকে। ক্যাপ্টেন আর ক্রুসহ জাহাজের সব মানুষ নিখোঁজ। তবে তারা কীভাবে কোথায় হারিয়ে গেলো আজো জানা যায়নি। আলোড়ন সৃষ্টিকার একটি ঘটনা হচ্ছে, ‘ইউএসএস সাইক্লোপস’-এর আকস্মিক হারিয়ে যাওয়া। জাহাজটি ১৯১৮ সালের ৪ মার্চ বারবাডোস দ্বীপ থেকে রওনা হয়। বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে যাওয়ার পর জাহাজটির ইঞ্জিন বিকল হয়ে যায়। এরপর ৩০৯ জন যাত্রীসহ নিখোঁজ হয়ে যায় জাহাজটি। নিখোঁজ হওয়ার আগে ইঞ্জিন বিকল হওয়ার ব্যাপারে ক্যাপ্টেন সংকেত পাঠান। পরে উদ্ধারকারীরা গিয়ে আর কোনো খোঁজ পায়নি জাহাজটির। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় উত্তর আটলান্টিক মহাসাগরে নিখোঁজ হয় ‘প্রটিয়াস’ ও ‘নেরেয়াস’ নামের দুটি জাহাজ। ‘বারমুডা ট্রায়াঙ্গল’-এ নিখোঁজ হওয়া আরেকটি জাহাজ হলো ‘মেরি কেলেস্তে’। ১৮৭২ সালের ৫ ডিসেম্বর আটলান্টিক মহাসাগরে ‘দেই স্রাতিয়া’ নামের কানাডীয় একটি জাহাজ পরিত্যক্ত অবস্থায় ওই জাহাজটিকে আবিষ্কার করে। নিখোঁজ হওয়ার আগে ওই জাহাজে স্ত্রী-কন্যাসহ অবস্থান করছিলেন ক্যাপ্টেন। ছিলেন বেশ কিছু নাবিক। জাহাজটি একটি দ্বীপে ভিড়িয়ে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন তাঁরা। কিন্তু তাঁরা আর ফিরে আসেননি। তাঁদের খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয় উদ্ধারকারী দল। পরে তাদের সেই জাহাজটিও আর পাওয়া যায়নি। সেই ক্যাপ্টেন, নাবিক ও জাহাজের ভাগ্যে কী ঘটেছিল তা জানা যায়নি আজও।
এই অন্তর্ধানের বেশ কয়েক বছর পর কিছু জেলে আর নাবিক ও রকম একটি জাহাজের দেখা পাওয়ার তথ্য দেন। কিন্তু উদ্ধারকারী দল ঘটনাস্থলে গিয়ে কোনো জাহাজের সন্ধান পায়নি। এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে। পরে এই ঘটনার প্রেক্ষাপটে ‘গোস্ট শিপ’ নামের একটি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গলের ভেতর দিয়ে যাওয়ার সময় একবার এক ক্যাপ্টেন ফোনে কোস্টগার্ডকে জানান যে তাঁর জাহাজের সঙ্গে কিছু একটা ধাক্কা খেয়েছে। মনে হচ্ছে কোনো বিপদ। জাহাজটি বারবাডোজ থেকে রওনা হয়েছিল। কোস্টগার্ড সদস্যরা দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখে কিছুই নেই। এত দ্রুত গোটা জাহাজ উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনা বেশ আলোড়ন সৃষ্টি করে।
রহস্যজনকভাবে কিছু উড়োজাহাজও নিখোঁজ হয় এই বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে। এরমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের ফ্লাইট-১৯-এর কাহিনি অন্যতম। এটি ছিল পাঁচটি গ্রুম্যান টিবিএম অ্যাভেঞ্জার টর্পেডো বম্বার বিমানের নিখোঁজ হয়ে যাওয়া। ১৯৪৫ সালের ৫ ডিসেম্বর আটলান্টিকে একটি প্রশিক্ষণে এই যুদ্ধবিমান পাঁচটি অংশ নেওয়ার সময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গল থেকে নিখোঁজ হয়ে যায়। একই সঙ্গে নিখোঁজ হয় ১৪ জন ক্রু। লক্ষণীয় যে ওই সময় কোনো প্রাকৃতিক দুর্যোগ ছিল না। এসব বিমানে কোনো যান্ত্রিক বা কারিগরি ত্রুটি দেখা দেওয়ারও সংকেত পাওয়া যায়নি। কোনো অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে বিমানগুলো পড়েছিল, তাও নয়।
একবার তিনটি যুদ্ধবিমান প্রশিক্ষণে অংশ নেওয়ার সময় বারমুডা ট্রায়াঙ্গলে গিয়ে পথ হারিয়ে ফেলে। এমন সময় অচেনা একটি যুদ্ধবিমানের আগমন ঘটে। ওই বিমানের পাইলট তাদের পথ দেখিয়ে বিপদ থেকে উদ্ধার করে। হারানো আকাশপথ ফিরে পেয়ে বিমান তিনটি নিরাপদে ফিরে আসে। কিন্তু পরে পথ দেখানো ওই্‌ বিমানটিকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি। বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে অনেক বিখ্যাত ব্যক্তি নিজ নিজ অভিজ্ঞতার কথা বলে গেছেন। আমেরিকার আবিষ্কারক ক্রিস্টোফার কলম্বাস বলে গেছেন, তাঁর নাবিকেরা বারমুডায় রহস্যময় ত্রিভুজে আলোর নাচন দেখেছে । এমন ঘটনার কথা অবশ্য আরও শোনা গেছে।
একবার একটি জাহাজ রাতের বেলা বারমুডা ট্রায়াঙ্গল দিয়ে যাচ্ছিল। ওই জাহাজে ক্যাপ্টেন এ সময় আরেকটি জাহাজ দেখতে পান। লোকজনে সরগরম সেই জাহাজ। ক্যাপ্টেন হঠাৎ লক্ষ্য করলেন, একটি ছোট লাল আলো পানির ওপর দিয়ে নাচতে নাচতে ওই জাহাজে গিয়ে শেষ হলো। ক্যাপ্টেনের কৌতূহল হলেও এ নিয়ে আর মাথা ঘামাননি। পরদিন দেখেন, ওই জাহাজে কারও কোনো সাড়াশব্দ নেই। ক্যাপ্টেন তাঁর কয়েকজন ক্রু নিয়ে ওই জাহাজে গেলেন। আশ্চর্য, একজন মানুষও নেই! একসঙ্গে এত মানুষ কী করে উধাও হলো, এ রহস্যের কিনারা আজও হয়নি।
বারমুডা ট্রায়াঙ্গল নিয়ে কথিত আছে, এ মহাসাগরের তলদেশে ডুবে আছে আরেকটি মহাদেশ। আর সে মহাদেশেরই কোনো বিশেষ শক্তি গ্রাস করছে এ জাহাজ ও বিমানগুলোকে। অন্য একটি মতে, এ অঞ্চলে একটি বিশেষ চৌম্বকীয় শক্তির প্রভাব রয়েছে, যা দিক নির্ণায়ক যন্ত্রে ত্রুটির সৃষ্টি করে নাবিককে বিভ্রান্ত করতে পারে। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কোনো অলৌকিক শক্তির প্রভাবে নয়, বেশ কিছু কারণেই এ সব দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। এর কারণ হিসেবে বলেছেন, উত্তর আটলান্টিকের একটি প্রচণ্ড শক্তিশালী স্রোতের নাম গল্ফ স্রোত। এর গতি প্রতি সেকেন্ডে ২.৫ মিটার। যান্ত্রিক ত্রুটি বা অন্য কোনো প্রয়োজনে বিমানকে ওয়াটার ল্যান্ডিং করালে এ তীব্র স্রোতের আঘাতে বিমানটি প্রচণ্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একইভাবে স্রোতের সঙ্গে থাকা ভাসমান বস্তুর আঘাতেও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বিমানটি। তবে এসব কারণ দেখানো হলেও শেষ পর্যন্ত বৈজ্ঞানিক বা কাল্পনিক কোন কিছুই পৌঁছাতে পারেনি এই রহস্যের শেষ সীমান্তে।

x