রশীদ হায়দারের গল্পে মুক্তিযুদ্ধ

চৌধুরী শাহজাহান

শুক্রবার , ৩ আগস্ট, ২০১৮ at ৩:৩০ পূর্বাহ্ণ
42

রশীদ হায়দারের গল্পের বিষয়বস্তু বহু বিচিত্র। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনসংগ্রাম, ভাষাআন্দোলন, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাউত্তর মানবজীবনের নানা সংকট, সামরিক শাসন, সাধারণ মানুষের হাসিকান্না প্রভৃতি অনুসঙ্গ তাঁর গল্পের প্রধান উপাদান। তাঁর জীবনাদর্শ হচ্ছে চারটি ‘ব’। ‘ব’ চারটি হচ্ছে বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। জীবনবাস্তবতার বিচিত্র অনুভূতি শিল্পসম্মতভাবে রূপায়ণ করেন তিনি তাঁর গল্পউপন্যাসে। রশীদ হায়দারের ছোটগল্পের রূপায়ণ সম্পর্কে বলা যায়, সমাজ জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত মানুষের জীবনকে তিনি তাঁর গল্পে কখনো গুরুগম্ভীরভাবে দেখেছেন আবার কখনো দেখেছেন চটুল রসিকতার বিষয়রূপে। তাই কখনো কখনো তাঁর সাহিত্যে শিল্পজ্ঞানের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তবে গল্পের স্বাভাবিকতা তাতে ব্যত্যয় ঘটে না। এখানেই তাঁর সার্থকতা।

রশীদ হায়দার লেখালেখি শুরু করেন ষাটের দশকে। কথাশিল্পীসম্পাদক হিসেবে তিনি সমধিক পরিচিত। বাংলাবাঙালি, ইতিহাসঐতিহ্য, মুক্তিযুদ্ধস্বাধীনতা, স্বাধীনতাউত্তর সময়ে রাজাকারদের প্রতিষ্ঠা, সামরিক শাসন এবং সমকালের নানা প্রসঙ্গঅনুসঙ্গ তাঁর সাহিত্যে বাণীরুপ লাভ করে। কথাসাহিত্য তাঁর পছন্দের এলাকা। কথাসাহিত্যের মাধ্যম যেহেতু গদ্য, তাই গদ্য নিয়ে রয়েছে তাঁর নিজস্বএকান্ত ভাবনা। তিনি বলেন-‘গদ্য লেখা হচ্ছে পাথরে শাবল চালানোর মতো কাজ। এটা ছেলেখেলা নয়। লেখককে পড়তে হবে, লেখককে দেশের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে জানতে হবে। মুক্তিযুদ্ধকে উপলব্ধি করতে হবে। লেখকের অনেক শ্রম দিতে হয়। লেখকদের নিয়মিত লেখার অভ্যাস থাকা প্রয়োজন। নিয়মিত লেখার চর্চা না থাকলে সম্ভাবনাময় লেখকও হারিয়ে যায়।’ দেশভাগের পর থেকে বাঙালির রয়েছে আন্দোলনের সুদীর্ঘ ইতিহাস। বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন থেকে শুরু করে ১৯৭১ সালের স্বাধিকার আন্দোলন পর্যন্ত প্রতিটি প্রতিবাদসংগ্রামে বাঙালি তার অধিকার আদায়ে ছিল সোচ্চার। দেশ স্বাধীনের পর বাঙালির ইতিহাস ও ঐতিহ্য নিয়ে আমাদের দেশের সাহিত্যিকরা সাহিত্য রচনা শুরু করেন। সূচিত হয় নব ধারার সাহিত্যমুক্তিযুদ্ধের সাহিত্য। রশীদ হায়দারের কথাসাহিত্যে বিশেষ করে তাঁর গল্পে আমরা মুক্তিযুদ্ধের ঘটনাবলী বিস্মিত হতে দেখি সফলভাবে।

রশীদ হায়দার ১৫ জুলাই, ১৯৪১ সালে দোহারপাড়া গ্রাম, পাবনায় জন্মগ্রহণ করেন। প্রকৃত নাম শেখ ফয়সাল আবদুর রশীদ মোহাম্মদ জিয়াউদ্দীন হায়দার। ডাক নাম দুলাল। পিতার নাম মোহাম্মদ হাকিমউদ্দিন শেখ এবং মাতার নাম রহিমা খাতুন। ১৯৫৯ সালে গোপালগঞ্জ ইন্সটিটিউশন থেকে মাধ্যমিক পাস করেন। ১৯৬১ সালে পাবনা এডওয়ার্ড কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং ১৯৬৫ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলা সাহিত্যে স্নাতকোত্তর পাস করেন এই গুণী লেখক। ১৯৬১ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রাবস্থায় রশীদ হায়দার তখনকার জনপ্রিয় পত্রিকা চিত্রালীতে কাজ শুরু করেন। সেসময় তার বড় ভাই জিয়া হায়দার ঔ পত্রিকায় কাজ করতেন। জিয়া হায়দার নারায়ণগঞ্জের তোলারাম কলেজে চাকরি নিয়ে চলে যাওয়ার আগে তাঁর অনুরোধে কর্তৃপক্ষ ছোট ভাইকে তাঁর জায়গায় চাকরিতে নিয়োগ দেন।

১৯৬৪ সালে চিত্রালীর পাশাপাশি পাকিস্তান রাইটার্স গিল্ড এর মুখপত্র পরিক্রম পত্রিকার সহকারী সম্পাদক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান। তারপর তিনি চিত্রালীর কাজ ছেড়ে দিয়ে রিসার্চ সহকারী হিসেবে যোগ দেন ন্যাশনাল বুক সেন্টার অব পাকিস্তানে। ১৯৭০ সালে বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন ব্যাংকের ত্রৈমাসিক পত্রিকা কৃষি ঋণপত্রিকার সম্পাদক হিসেবে যোগদান করেন। কর্মস্থল ছিল করাচি। একই বছরের নভেম্বর মাসে তিনি বদলি হয়ে ঢাকা চলে আসেন। দেশ স্বাধীনের পর ১৯৭২ সালে তিনি বাংলা একাডেমিতে চাকরি পান। দীর্ঘদিন চাকরির পর ১৯৯৯ সালে বাংলা একাডেমির পরিচালকের পদ থেকে অবসর নেন। পরে নজরুল ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ছিলেন।

রশীদ হায়দার বাংলা একাডেমিতে কর্মরত থাকাকালীন অবস্থায় তাঁর শ্রেষ্ঠ কীর্তি স্মৃতি:১৯৭১ । মুক্তিযুদ্ধে স্বজন হারানো মানুষের স্মৃতিচারণা নিয়ে তাঁর সম্পাদিত স্মৃতি:১৯৭১। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দালিলিক গ্রন্থ। ১৩ খন্ডে সমাপ্ত এই গ্রন্থে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধে আত্মদানকারী বুুদ্ধিজীবীদের স্বজনদের স্মৃতিচারণে সার্থকভাবে উঠে এসেছে মুক্তিযুদ্ধের গৌরবগাঁথার পাশাপাশি তাদের স্বজন হারানোর ব্যথা আর স্বাধীন দেশে বেঁচে থাকার তীব্র সংগ্রামের জীবনকথা। বাংলাদেশের আনাচেকানাচে থাকা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বুদ্ধিজীবী পরিবার খুঁজে খুঁজে বের করা এবং তাঁদের পরিবারের কোন সদস্য বা কোন ঘনিষ্ঠজনদের দিয়ে স্মৃতিকথা লিখিয়ে নেবার কাজটি ছিল অত্যন্ত কঠিন। স্মৃতি:১৯৭১ গ্রন্থের সম্পাদক হিসেবে এখানেই লেখকের কৃতিত্ব।

১৯৬৭ সালে ১লা জানুয়ারি প্রকাশিত হয় রশীদ হায়দারের প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘নানকুর বোধি’। বইটির একটি কপি তিনি প্যারিসে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহর কাছে পাঠিয়ে দিয়েছিলেন। উত্তরে সৈয়দ ওয়ালিউল্লাহ জানিয়েছিলেন, ‘থামবেন না, লিখে যান।’ ১৯৭২ সালে দৈনিক সংবাদ পত্রিকায় ধারাবাহিকভাবে লেখা শুরু করেন জীবনের প্রথম উপন্যাস ‘গন্তব্যে’। অর্ধেক মুদ্রিত হওয়ার পর কোন এক অজানা কারণে লেখাটি তিনি আর লিখে শেষ করতে পারেন নি। ১৯৮৬ সালে একটি পূর্ণাঙ্গ উপন্যাস আকারে ‘অসম বৃক্ষ’ নামে প্রকাশিত হয়।

কথাশিল্পী হিসেবে রশীদ হায়দার পাঠকমহলে সুপরিচিত হলেও তিনি কিন্তু একজন অভিনেতাও ছিলেন। ১৯৭৪ সালে দিল্লীতে ন্যাশনাল স্কুল অব ড্রামায় তিন বছরের জন্য লেখাপড়ার সুযোগ পান। তিন মাস ক্লাস করার পর বাংলা একাডেমির চাকরি হারানোর ভয়ে তাঁকে ফিরে আসতে হয়। কারণ নাটক করে সংসার চালানো সম্ভব কখনো ছিল না। তবে নাটকের প্রতি তাঁর টান রয়ে যায়। ১৯৬৪ সালে মুনীর চৌধুরীর পরিচালনায় তিনি অভিনয় করেন ভ্রান্তিবিলাস নামে একটি নাটকে কিংকর চরিত্রে। ছাত্রজীবনের শেষেও প্রায় দশবারো বছর তিনি নাট্যজগতের সাথে জড়িত ছিলেন। এই সময় অগ্রজ জিয়া হায়দার আমেরিকা থেকে ‘মাস্টার অব ফাইন আর্টস’ ডিগ্রি নিয়ে দেশে ফিরে এসে নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় নামে একটি নাট্যদল গঠন করেন। রশীদ হায়দারও অগ্রজের সাথে এই দলে যুক্ত হন। দৈনিক বাংলায় কেরোসিন তেল সংকট নিয়ে তাঁর লেখা ‘তেল’ নাটকটি পড়ে নাট্যকার আলী যাকেরের ভালো লেগেছিল। তিনি রশীদ হায়দারকে ‘তেল’ নাটকটির নাট্যরুপ দেয়ার জন্য অনুরোধ করেন। পরবর্তীকালে ‘তৈল সংকট’ নামে এটির নাট্যরূুপ দেন। নাটকটি নাট্যবোদ্ধামহলে যথেষ্ট সমাদৃত হয়েছিল। কিন্তু তিনি অনুভব করেন মঞ্চের সাথে যুক্ত থাকলে তাঁর স্বাভাবিক লেখালেখির কাজে সমস্যা হবে। তাই নাটক ছেড়ে কলমকেই তিনি শক্তভাবে আঁকড়ে ধরেন। সুদীর্ঘ লেখালেখির জীবনে বহুমাত্রিক অভিজ্ঞতা ও ঘটনার ঘনঘটায় তাঁর জীবন পরিপূর্ণ। তিনি গল্প, উপন্যাসের উপাদান খুঁজে পান নিজের জীবন ও স্বদেশে ঘটে যাওয়া নানান বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে।

রশীদ হায়দারের গল্পউপন্যাসনাটকঅনুবাদনিবন্ধস্মৃতিকথা ও সম্পাদনা মিলিয়ে প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ৭০এর অধিক।। তাঁর উল্লেখযোগ্য সাহিত্যকর্মগুলো হলোউপন্যাস: খাঁচায় (১৯৭৫), অন্ধ কথামালা (১৯৮২), নষ্ট জোছনায় এ কোন অরণ্য (১৯৮২), অসম বৃক্ষ (১৯৮২), নদী ও বাতাসের খেলা, তিনটি প্রায়োপন্যাস; গল্পগ্রন্থ: নানকুর বোধি (১৯৬৭), অন্তরে ভিন্ন পুরুষ (১৯৭৩), তখন (১৯৮৭), উত্তরকাল (১৯৮৭), পূর্বাপর (১৯৯৩), মেঘেদের ঘরবাড়ি (১৯৮২), বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প (২০১৩), মুক্তিযুদ্ধের নির্বাচিত গল্প (২০০৫), আমার প্রেমের গল্প (১৯৮৮), খুঁজে ফিরি, সীমা পরিসীমা, বাবার গল্প, গন্তব্যে; কলাম: আত্মকথন, তিনি একজনই, ছবি অপরুপ, চিম্বুকের নিচে আলোর প্রভা, বাঙালির তীর্থভূমি; নাটক: সেক্সপীয়র দি সেকেন্ড (১৯৮৫), তৈল সংকট (১৯৭৪), গোলাপ গোলাপ; অনুবাদ নাটক: কাফকার দ্য ট্রায়ালের নাট্যরূপকাঠগড়া; বিবিধ: বঙ্গমাতা শেখ ফজিলাতুন নেছা (জীবনী), অসহযোগ আন্দোলন: একাত্তর (১৯৮৫) (গবেষণা), রবীন্দ্রনাথ ও নজরুল (প্রবন্ধ), একুশের গল্প (সম্পাদনা), ও বেলা এ বেলা (স্মৃতিকথা), অদ্বিতীয়া ডলি (স্মারকগ্রন্থ), শহীদ বুদ্ধিজীবী কোষগ্রন্থ, স্মৃতি:৭১ (১৩ খন্ড), ১৯৭১: ভয়াবহ অভিজ্ঞতা; কিশোর উপন্যাস: শোভনের স্বাধীনতা (২০০০), যুদ্ধ ও জীবন, আমার স্কুল, পুনর্জন্ম , যদি দেখা পাও , জসীমের নকশি কাঁথা, গোলাপের জন্ম ইত্যাদি।

রশীদ হায়দারের উত্তরকাল, তখন, পূর্বাপর প্রভৃতি গ্রন্থের গল্পসমূহে কাহিনীর উপকরণ হিসেবে একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ এবং যুদ্ধকেন্দ্রিক বিচিত্র ঘটনা ব্যাপকভাবে অঙ্কিত হয়েছে। পাকিস্তান শাসিত পূর্ব বাংলার রাজনৈতিক মুক্তি অর্জনের জন্য দীর্ঘ নয় মাসব্যাপী বাঙালির যৌথ প্রতিরোধ সংগ্রাম, হানাদার বাহিনীর নির্মম অত্যাচারহত্যানির্যাতন এবং স্বাধীনতাবিরোধী রাজাকারআলবদরদের অমানবিক নৃশংসতা এবং যুদ্ধরত মুক্তিযোদ্ধাদের ভয়ঙ্কর মৃত্যু প্রভৃতি অভিজ্ঞতা এই গ্রন্থগুলিতে বর্ণিত হয়েছে। পূর্বাপর গ্রন্থে যুদ্ধকালীন অভিজ্ঞতার স্মৃতিময় বর্ণনা এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পরিবর্তিত সময়ে সামাজিক বিন্যাস, সাম্প্রদায়িক শক্তির উথ্‌থানসহ নানাবিধ অসঙ্গতি স্থান পেয়েছে। একাত্তরে স্বধীনতাবিরোধীরাই উত্তরকালে দেশের নব্য মুক্তিযোদ্ধা সেজে সমাজের হর্তাকর্তা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছে। অন্তরে ভিন্ন পুরুষ গ্রন্থে গল্পের প্লট ও চরিত্রায়ণে লেখক আবেগময় বর্ণনার আশ্রয় নিয়েছেন। এ গ্রন্থের প্রতিটি গল্পে কাহিনী বর্ণনার পাশাপাশি সংলাপরীতির ব্যবহার করেছেন। অচেনা, পলাতক, নিষিদ্ধ এলাকা, জয়, স্বাদ প্রভৃতি গল্পে নাটকীয় ঘটনাবিন্যাসের ফলে চমক সৃষ্টি হয়েছে। অচেনা গল্পে ইউসুফ সাহেবের গভীর রাতে পুত্রের ঘরের দরজায় এসে দাঁড়ানো এবং পুত্র ও পুত্রবধূর অন্তরঙ্গ দৃশ্যে লুকিয়ে অবলোকনের ঘটনাটি একেবারেই বেমানান। পুত্রবৎসল এবং পুত্রের কল্যাণ কামনায় ইউসুফ সাহেব দ্বিতীয় বিবাহ থেকে বিরত থাকলেও কোন উদ্দেশ্যে তিনি একা থাকার সিদ্ধান্ত নিলেন, তা গল্পে শিল্পসম্মতভাবে বর্ণিত হয় নি। নিষিদ্ধ এলাকা গল্পের ঘটনাবিন্যাস ও চরিত্র চিত্রণে লেখককে শিল্পসফল বলে মনে হয়নি। অন্তরে ভিন্ন পুরুষ গ্রন্থে আঙ্গিককল্পনায় আবেগময় ঘটনার প্রাবল্য থাকলেও উত্তরকাল, তখন, পূর্বাপর গ্রন্থে রশীদ হায়দার প্রকরণবিন্যাসে নিজস্বতা অর্জন করেছেন। উপরে উল্লেখিত তিনটি গ্রন্থের গল্পসমূহের প্রধান বিষয়বস্তু মুক্তিযুদ্ধ। এ কোণ ঠিকানা, সেই পাখির গান, এ কোণ গৃহকোণ, এ কোন সঙ্গীত, আজ অনামিকা প্রভৃতি নামকরণের মধ্যেই রয়েছে স্মৃতি অনুসঙ্গ। এ কোন ঠিকানা, সাঁকো, দ্বিতীয়বার, বাবার দ্বিতীয় গল্প, মর্ত্যলোক, আজ অনামিকা প্রভৃতি গল্পের কাহিনী উত্তম পুরুষে বর্ণিত হয়েছে। এ কোন ঠিকানা গল্পে বাসেত, সাঁকো গল্পে রাজাকার আব্বাস আলি, বাবার দ্বিতীয় গল্পের কাহিনী বর্ণনাকারী চরিত্রগুলি কথক চরিত্র হিসেবে বর্ণিত হয়েছে।

মুক্তিযুদ্ধকেন্দ্রিক গল্পগুলোতে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই চরিত্রের স্মৃতিময় উচ্চারণে ও সংলাপে যুদ্ধের ঘটনা চিত্রিত হওয়ায় লেখক কাব্যময় বিশ্লেষণান্তক পরিচর্যারীতির আশ্রয় নিয়েছেন। তখন গ্রন্থের নিয়মের নিয়ামত বুড়ো গল্পের আয়তন ছোটগল্পের প্রথাগত ফর্মকে অতিক্রম করে গেছে। উপন্যাস হিসেবে প্রথমে একটি পত্রিকায় প্রকাশিত হলেও লেখক বড় গল্প হিসেবে এটিকে গ্রন্থভুক্ত করেছেন। বস্তুত নিয়ামত আলীর ব্যক্তি চৈতন্যের ক্রমবিকাশ, তার বিশ্বাসের ক্রমররূপান্তরই গল্পটির প্রধান বিষয়। প্রথাগত ধর্মচর্চা থেকে বিরত নিয়ামত আলী এক সময় ধর্মে গভীরভাবে মনোসংযোগ করেন। নিয়মিত মসজিদে গিয়ে নামাজ পড়া, খোদাভীতি, সৎ চিন্তাভাবনা প্রভৃতি নিয়ামতকে ব্যাপক পরিবর্তন করে দেয়। মুক্তিযোদ্ধাদের প্রতি নিয়ামত আলীর আগ্রহ প্রবল। ‘আমাগো যারা কাফের কয় তাগরে মারণের জন্যে যারা আমার বাড়ির ওপর দিয়াই যায়, তাগরেই আমি দেখবার পালাম না।দেখতে পাইলে দোয়া পইড়া বুকে ফুঁ দিয়া কইতাম, কাফের মাইরা দেখাইয়া দাও এখনো আল্লাহ আছে, রসুল আছে (পৃ.৮২)।’ যে মুক্তিযোদ্ধারা দেশের ইজ্জত বাঁচাবে তাদেরকে এক নজর দেখতে না পাওয়ার জন্য নিয়ামত আলী ভীষণ কষ্ট পায়। সত্যিকার অর্থে মুক্তিযুদ্ধ সারা দেশবাসীর মধ্যে যে প্রাণের জোয়ার বয়ে এনে দিয়েছিলো, বৃদ্ধ নিয়ামতের মাধ্যমে লেখক এই গল্পে অত্যন্ত পরিশীলিতভাবে চিত্রিত করেছেন।

২৫ মার্চ রাতে পাক হানাদার বাহিনীর আকস্মিক হামলা ঢাকা শহরে ঘুমন্ত নিরস্ত্র মানুষ প্রথমে কিছু বুঝে উঠতে পারেনি। প্রথম দিনে গল্পে ভয়ে আতঙ্কগ্রস্ত শহরের দিশেহারা মানুষের অসহায়ত্ব ও অনিশ্চিতের কথা বর্ণিত হয়েছে। রাজারবাগ পুলিশ লাইনে প্রথম গুলি বর্ষণের মাধ্যমে হানাদার বাহিনীর আক্রমণ শুরু হয়। বাদশার মা রাজারবাগের পাশে গুলবাগ এলাকায় থাকে এবং তার মেয়ে রাবেয়ার জন্য অস্থির হয়ে ওঠে। বাইরে বের হওয়া জীবনের ঝুঁকি জেনেও বাদশা রাবেয়াকে খুঁজতে বের হয়। পথে প্রতিবেশী আকমল সাহেবের সাথে দেখা। তিনি সাবধান করে দিয়ে বলেন, রাস্তায় মানুষ দেখলেই গুলি করে মারা হচ্ছে। বাদশা ভয়ে ফিরে আসে। তিনি আরো বলেন, তাদের পাড়ার কমান্ডার আলতাফকে পাকবাহিনী গুলি করে হত্যা করে জীপের সঙ্গে বেঁধে টানতে টানতে নিয়ে গেছে, যিনি পাকিস্তান নেভীতে কাজ করতো এবং আগরতলা ষড়যন্ত্র মামলার আসামী ছিল। বিকেলে মা নিজেই রাবেয়াকে খুঁজতে বের হতে চাইলে বাদশা নিজেও যাওয়ার জন্য তৈরী হয়। কিন্তু বাদশার স্ত্রী ফিরোজা তাতে বাধা দেয়। এমন সময় হঠাৎ রাবেয়া তার পরিবারসহ হাজির হয়। ২৫ মার্চ রাতে পাকবাহিনীর অতর্কিতে হামলার ফলে ভীতসন্ত্রস্ত সাধারণ মানুষের একটি ভয়াল চিত্র এই গল্পে বর্ণিত হয়েছে। যেমন-‘সহসা বাদশার সব চেতনা একসঙ্গে ফিরে আসার পর প্রথমেই মনে হয় গুলাগুলি চলছে সামনের রাস্তায়, সে লাফ দিয়ে বিছানা থেকে নেমে মেঝেয় উপুড় হয়ে শুয়ে চেঁচিয়ে বলে, ‘ফিরোজা, নেমে এসো।’ অন্ধকারে নামতে গিয়ে খাটের কোণায় গুতো খেয়ে চাপা গলায় আর্তনাদ করে ওঠে ফিরোজা আর তক্ষুণি মা দরজা ধাক্কা দিচ্ছে শুনতে পায়, ‘বাদশা ও বাদশা, ওঠ, ও কিসের শব্দ?’ অন্ধকারে হাতড়ে হাতড়ে দরজা খুলে মাকে হাত ধরে মেঝেতেই বসাতে বসাতে টের পায়, মা থরথর করে কাঁপছে।’ (পৃ. ১১)

রশীদ হায়দারের হাওয়ার মানুষ ও দ্বিতীয় বার গল্পেও অসহায় মানুষের উদ্বেগউৎকন্ঠা ফুটে উঠেছে। হাওয়ার মানুষ গল্পে ঢাকা শহরে কর্মরত আলম মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে শত অনিশ্চয়তার মাঝেও লোক মারফত গ্রাম থেকে স্ত্রী আয়েশার দুইটি চিঠি পায়। চিঠিতে সে জানতে পারে যে, আয়েশার সব গহনা চুরি হয়ে গেছে, মিলিটারি বাড়িতে আগুন দিয়েছে ইত্যাদি। প্রবল উৎকণ্ঠায় কয়েকদিন কাটিয়ে এক সময় আলম বাড়ি যায়। খাওয়ার সময় মা উদ্বেগের কথা বলে। ঘরে এসে স্ত্রীর কাছে বিস্তারিত জেনে আলম রেগে যায়। কারণ, মিলিটারিরা যখন বাড়িতে আসে তখন আয়েশা ওসমান পাগলাকে পালাতে বলতে গিয়ে মিলিটারির সামনে গিয়ে প্রায় ধরা পড়ে গিয়েছিল। কন্যা বুলুকে নিয়ে কিভাবে যে পালিয়েছে তা সেই জানে। সেদিন ওসমানকে হত্যা করা হয়েছে। চিঠিতে বাড়ির সব সংবাদ জানানো হলেও ওসমান আপনজন নয় বলে কেউ তার মৃত্যুর সংবাদটা জানানোর প্রয়োজন বোধ করে নি।

দ্বিতীয় বার গল্পে পাকিস্তানি সৈন্যদের আক্রমণ থেকে বাঁচার জন্য পলায়নপর স্বামী, স্ত্রী ও শিশু কন্যার করুণ পরিণতির কথা বর্ণিত হয়েছে। যুদ্ধবিধস্ত বাংলাদেশে পাক হানাদার বাহিনীর ধ্বংসযজ্ঞ ও হত্যাকান্ড চিত্রিত হয়েছে এ কোন সঙ্গীত গল্পের ক্যানভাসে। এই গল্পে নিজামের জবানিতে যুদ্ধ বিধ্বস্ত বাংলাদেশ চিত্রিত হয়েছে এভাবে-‘ছোটবেলায় আমরা যেমন একটার পর একটা দেশলাইয়ের কাঠি জ্বালিয়ে আনন্দ পেতাম, তেমনি ওরা খেয়ালখুশি মতো বাড়িঘর জ্বালাচ্ছে।। ঢাকা শহরের যেখানেসেখানে পোড়া বাড়িঘর দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল মানুষের ওপর ওদের যতোটা রাগ তার চেয়ে বেশী ঘরবাড়ির ওপর। এটাই কি আল্লাহর বিচার, সাধারণ মানুষ যারা রাজনীতির রও বোঝে না তারাই আজ সব কিছু হারিয়ে পথের ফকির হয়ে গেছে।’

রশীদ হায়দারের বিপদের ঘ্রাণ গল্পে এক অসমসাহসী মুক্তিযোদ্ধার আত্মগোপন করে সস্ত্রীক পলায়নের চিত্র অঙ্কিত হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের এস.ডি.ও আফজাল মুক্তিযুদ্ধে যোগদান করেন এবং তার কর্মকান্ডের সুবাদে চারদিকে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়লে তিনি পাকসেনাদের টার্গেটে পরিণত হন। এক সময় তিনি আত্মপরিচয় গোপন করে পালিয়ে আসেন। পলায়নের সময় ফেরিঘাটে আফজালের স্ত্রী দোলনসহ দোলনের প্রাক্তন প্রেমিক বোরহানের সঙ্গে আতঙ্কশিহরিত সময় নির্বাহ এই গল্পের মূল বিষয়। মিলিটারির নাকের ওপর দিয়ে পলায়নের ক্ষেত্রেও মুক্তিযোদ্ধা আফজালের সাহসিকতা দৃষ্টি আকর্ষণ করার মতো। চেহারা গল্পে আশাহত এক মুক্তিযোদ্ধা ও তার পরিবারের দুঃস্বপ্নের বয়ান রুপায়িত হয়েছে সেই পরিবারের এক নারীর বিবাহ না হওয়ার করুন কাহিনীকে কেন্দ্র করে। স্বাধীনতার পর নির্লজ্জ সুযোগ গ্রহণ মনঃপুত হয় নি বলে মুক্তিযোদ্ধা মজনু বাড়িতে নিশ্চুপ বসে থাকে এবং অলস জীবনযাপন করে। কিন্তু তার ছোট ভাই রানু দলবদল করে সরকারি দলের ছাত্র সংগঠনের নেতা হয়ে ছাত্রাবস্থায়ই বেশ টাকাপয়সা রোজগার করে। বোনের বিয়ের সময় সে বেশ দামী জিনিসপত্র কিনে নিয়ে বাড়ি আসে। মজনুর তাকে অচেনা মনে হয়। ওদিকে বরপক্ষ বাড়িতে এসে মজনুর মুক্তিযুদ্ধে যোগদান, তাদের বাড়ি আর্মি কর্তৃক পুড়িয়ে দেয়া এবং সর্বোপরি আর্মির লালসার হাত থেকে বাঁচানোর জন্য পিতা কর্তৃক মেয়ের মুখ আগুনে ঝলসে দেয়া ইত্যাদি বিষয় জানার পর এই মেয়ের সাথে বিয়েতে অস্বীকৃতি জানিয়ে চলে যায়।

এ গল্পে মুক্তিযোদ্ধার আশাভঙ্গের চিত্র ফুটে উঠেছে মজনুকে উদ্দেশ্য করে বলা ছোট ভাই রানুর উক্তিতে। ‘আপনি মাঝে মাঝে এমনভাবে তাকান যেন আমাকে চেনেন না। বুঝি, অনেক আশা নিয়ে যুদ্ধে গিয়েছিলেন। যুদ্ধে জিতলেন ঠিকই কিন্তু আশা পূরণ হল না।’

রশীদ হায়দারের পূর্বাপর গল্পগ্রন্থের আপনজন গল্পে ওসমানের কষ্ট হয় নিয়তির নির্মম খেলা দেখে। ভাগ্য বঞ্চিত মাভাইবোনদের কথা ভেবে বড়লোকি জীবনের প্রতি তার ঘৃণা আর আক্রোশ জন্মে। অথচ কুলখানির সংবাদ পেলেই ক্ষিদের জ্বালায় বড়লোকদের বাড়িতে উপস্থিত হয়। কিন্তু ওসমানের নজর থাকে বড়লোক মানুষের বাড়ির খাবার ও মেয়েমানুষের দিকে। গল্পকার এ গল্পে তীব্র ব্যঙ্গের মাধ্যমে জীবনের নানা অসাম্যঅসংগতির চিত্র অঙ্কন করেছেন। দারিদ্র্যের শিকার ওসমানের মনের বিকৃতিকে প্রকাশ করেছেন খোলামেলাভাবে।

অগ্নিস্পর্শে গল্পে কুখ্যাত রাজাকারদের মুখোশ খুলে দিতে একটি তথ্যভিত্তিক লেখা লিখেছিলেন লেখক। ব্যঞ্জনাধর্মী এই গল্পটিতে বাংলাদেশের লড়াই ও ক্রোধের চিত্রই ফুটে ওঠেছে।

রশীদ হায়দারের আরেকটি মুক্তিযুদ্ধের গল্প জানালায়। এই গল্পে পাক সেনাবাহিনীর হাতে অত্যাচারিত রমণীর করুণ কাহিনী বর্ণিত হয়েছে। স্বাধীনতা যুদ্ধ থেকে ফিরে নির্যাতিত স্ত্রীর মুখোমুখি হবার চেষ্টা করেও স্বামী ব্যর্থ হচ্ছে। সংসারের এই শ্মশানভূমিতে দাঁড়িয়ে তাদের উভয়ের প্রেম ও যন্ত্রণার কথা তুলে ধরেছেন লেখক এই গল্পে। এ কোন গৃহকোণ গল্পটিতে মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী সময়ের বাংলাদেশের সংকটের কথা ফুটে উঠেছে। মৃত আহম্মদ আলির স্ত্রী আফিয়া তার ভাই বাসেতকে জানায় স্বামীর মৃত্যুর পিছনের কাহিনী। মৃত আহম্মদ তার ভাইকে বাঁচাতে একদিন রাজাকারদের রাইফেলের বাঁটের আঘাত বুকে পেতে নিয়েছিল। কিন্তু যে মানুষটি বুক দিয়ে রক্ষা করল, সেই হয়ে উঠল ভাইয়ের চোখের শূল। দেবর সম্পর্কে আফিয়া বলে, ‘লোকে তো জানে তোরা মুক্তি বাহিনীতে আছিস, কিন্তু আমি তো জানি, কোনে তুরা কি করিস, দ্যাশ স্বাধীন হওয়ার পর তুরা কি মানুষ ছিলিরে।’

মধ্যরাতে টোকা গল্পটিতে আফজালরেহেনার কাহিনীর পাশাপাশি পাকিস্তানের রাষ্ট্রপ্রধান আইয়ুব খানের সময়ের পূর্ব পাকিস্তানের রাজনৈতিক পরিস্থিতির কথাও বর্ণিত হয়েছে। গল্পের নায়ক কলেজের পুরানো বন্ধুদের পাল্লায় পড়ে মদের আড্ডায় গিয়ে বুঝতে পারে এরা আসলে আইয়ুব খাঁন সাহেবের যুব সংগঠনের হোমড়াচোমরা। এদের লাগামহীন বিলাসী জীবনের খরচপাতিও আসে পশ্চিম পাকিস্তান থেকে। ফলতঃ পূর্ব পাকিস্তানের স্বাধীনতা আন্দোলনের এই শত্রুদের সঙ্গে বসে আর আড্ডা দেওয়া যায় না। প্রতিবাদ করে আফজাল। তারপরেই রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে মধ্যরাতে তার দরজায় সাদা পোশাকধারী আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হামলা। এই ধরনের আরেকটি গল্প হচ্ছে চোরচাট্টা। এখানে জনৈক কবির প্রতি রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগ নিয়ে শেষ রাতে টোকা মারে সাদা পোশাকের লোকজন।

রশীদ হায়দার মানবতাবাদী শিল্পী। মানব মনের নানা অজানা রহস্য তিনি ফুটিয়ে তুলেন তাঁর গল্পে। অমানুষ গল্পের নায়ক মনোয়ার। এই নায়কের একটি বিশেষ লক্ষণ হচ্ছে যে কোনো মুহূর্তে সে মানুষ খুন করতে পারে। তার কোনো ডরভয় নেই। অথচ নিজের শিশুপুত্রের সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হয়ে বিলাপ করে বেড়ায়। পলাতক জীবনসঙ্গীকে খুন করার ইচ্ছা বুকের ভিতর লালন করে সব সময়। অন্যদিকে উৎসব গল্পের নজরুল সরমার প্রেমে পাগল হয়ে জোর করে ধরে নিয়ে যায় কাজীর কাছে বিয়ে করার জন্যে। ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে বোনকে বাঁচাতে সরোজকে প্রাণ দিতে হয় নজরুলের হাতে। যাবজ্জীবন কারাদন্ডের সাজাপ্রাপ্ত আসামী নজরুল জেল থেকে পালায়। শেষ পর্যন্ত পাপের অনুতাপে দগ্ধ হয়ে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে মৃত্যু কামনায়। কিন্তু যুদ্ধে তার মৃত্যু হয়নি। তাই বহু বছর পরেও সেই মেয়েটিকে নজরুলের চোখে দেখার আকাঙ্খা জাগে।

রশীদ হায়দারের গল্পের বিষয়বস্তু বহু বিচিত্র। দেশভাগ, সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, বিভিন্ন রাজনৈতিক আন্দোলনসংগ্রাম, ভাষাআন্দোলন, গণআন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, স্বাধীনতাউত্তর মানবজীবনের নানা সংকট, সামরিক শাসন, সাধারণ মানুষের হাসিকান্না প্রভৃতি অনুসঙ্গ তাঁর গল্পের প্রধান উপাদান। তাঁর জীবনাদর্শ হচ্ছে চারটি ‘ব’। ‘ব’ চারটি হচ্ছে বাংলা, বাঙালি, বাংলাদেশ ও বঙ্গবন্ধু। জীবনবাস্তবতার বিচিত্র অনুভূতি শিল্পসম্মতভাবে রূপায়ণ করেন তিনি তাঁর গল্পউপন্যাসে। রশীদ হায়দারের ছোটগল্পের রূপায়ণ সম্পর্কে বলা যায়, সমাজ জীবনের সঙ্গে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত মানুষের জীবনকে তিনি তাঁর গল্পে কখনো গুরুগম্ভীরভাবে দেখেছেন আবার কখনো দেখেছেন চটুল রসিকতার বিষয়রূপে। তাই কখনো কখনো তাঁর সাহিত্যে শিল্পজ্ঞানের ভারসাম্য নষ্ট হয়েছে। তবে গল্পের স্বাভাবিকতা তাতে ব্যত্যয় ঘটে না। এখানেই তাঁর সার্থকতা।

ঋণ স্বীকার:

বাংলাদেশের ছোটগল্পে মধ্যবিত্ত জীবনের রূপায়ণ, মো: মুস্তাফিজুর রহমান, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৯।

বাংলাদেশের ছোটগল্পের শিল্পরূপ, চঞ্চল কুমার বোস, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ২০০৯।

বাংলাদেশের উপন্যাসে জীবন চেতনা, ফরিদা সুলতানা, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৯।

বাংলাদেশের ছোটগল্প : বিষয়ভাবনা স্বরূপ ও শিল্পমূল্য, আজহার ইসলাম, বাংলা একাডেমি, ঢাকা, ১৯৯৬।

বৃহন্নলা ও অন্যান্য গল্প, সংকলন ও সম্পাদনাঅঞ্জন সাহা, ন্যাশনাল বুক ট্রাস্ট, ইন্ডিয়া, নয়াদিল্লী, ২০১৩।

x