রমজান আলী মামুন (মা ডাকে বাড়ি ডাকে)

শুক্রবার , ১০ মে, ২০১৯ at ৬:২৮ পূর্বাহ্ণ
36

সপ্তাহের প্রতিটি দিন রাত বারোটার আগে আমার বাড়ি ফেরা হয় না। ক্লান্ত শরীরে যখন সিঁড়ি ভেঙে চতুর্থ তলায় বাসার চৌকাঠে পা রাখি, তখন দেখি মৃদু আলো আঁধারে লিকলিকে শরীরে উদ্বিগ্ন হয়ে একাকী দাঁড়িয়ে আছেন মা। আমি বরাবরের মতো অপরাধীর ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে দরোজা পেরিয়ে ঘরে ঢুকে শার্ট-প্যান্ট ছেড়ে লুঙ্গি পরে দ্রুত ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ি। হাত মুখ ধুয়ে এসে দেখি টেবিলে ভাত তরকারি সাজানো সাথে দুটি প্লেট। গৃহিণী এসে ক্ষুব্ধস্বরে রোজকার মতো একটু ঝাড়ি মারলো। বলে- মা যে তোমাকে ছাড়া খায় না এটা বুঝি তোমার কানে ঢোকে না ? তখনই মা বলেন, থাক বৌমা ওকে কিছু বলো না। এবার আমি সুবোধ ছেলের মতো মায়ের পাশে এসে চুপচাপ খেতে বসে পড়ি। কখনো সময় পেলে দুপুরে লাঞ্চ সেরে মায়ের পাশে গিয়ে একটু ভাত ঘুম দেই। মা খুব খুশী হন। পারলে আমাকে বুকে আগলে রাখেন। একটু পর হঠাৎ আমার ঘুম ভেঙে গেলে আমি ধুপধাপ ওঠে পড়ে রেডি হতে থাকি। মা আকুতি করে বলেন – এক্ষুণি চলে যাবি! আরেকটু থাক না। আমি বলি- না, মা আমার কাজ আছে। আমাকে এক্ষুণি বেরোতে হবে। আমার কথার সাথে সাথে দেখি, মায়ের চোখে-মুখে একরাশ অন্ধকার এসে ভর করে। আজ মা নেই। আমার মাথার ওপর ছায়া নেই। বন্ধুদের সাথে আড্ডায় খোশ-গল্পে সময় দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হলেও বাড়ি ফেরার কোন তাড়া অনুভব করিনা। তবে মাঝে মধ্যে কখনো সখনো সিঁড়ি ভেঙ্গে যখন উপরে উঠি তখন মায়ের কথা খুব করে মনে পড়ে। বুকটা খ্যাঁৎ করে ওঠে। বুকের ভেতরে তীব্র কষ্ট অনুভব করি। হায়রে! আমার দরদী মা যতোদিন বেঁচে ছিলেন একটিবারও আমাকে দরোজা টোকা দিয়ে খুলতে হয়নি। কেমন করে জানি তিনি আমার উপস্থিতি টের পেয়ে দরোজা খুলে রাখতেন। এখন বন্ধ দরোজায় ধুমধাম টোকা দিলেও সহজে সাড়া মেলে না। হায়রে আমার জনমদুঃখিনী মা, আমার ঘরের দরোজা- আমার জন্য আগে ভাগে খুলে রাখবে কে?

x