রবীন্দ্র-ভাবনায় বর্ষা

তপন বাগচী

শুক্রবার , ১০ আগস্ট, ২০১৮ at ৯:০৪ পূর্বাহ্ণ
32

রবীন্দ্রনাথের জন্ম বৈশাখে আর মৃত্যু শ্রাবণে। গ্রীষ্মে আগমন আর বর্ষায় প্রস্থান। জন্ম ও মৃত্যুর উপর কারো হাত নেই জেনে কেন যেন মনে হয়, এই দুটি ঋতুকে রবীন্দ্রনাথ একটু আলাদা রকম ভালবেসেছিলেন। শরৎ হেমন্ত শীত বষন্তের চেয়ে গ্রীষ্মবর্ষার বন্দনা একটু বেশিই করেছেন। গীতবিতান খুললে আমরা প্রকৃতি পর্যায়ের ২৮৩টি গান পাই আর তার মধ্যে ১২০ টি গান বর্ষাকে নিয়ে। আমরা বর্ষার গানের তালিকা দেব না। আমরা জানি তার বর্ষার গানের কথা। আমরা দেখতে চাই বর্ষাকে কবি কেমন করে অনুভব করেছেন। আমরা দেখাতে চাই তার বর্ষাভাবনার স্বরূপ।

বিবিধ’ প্রবন্ধে ‘বর্ষার চিঠি’ প্রবন্ধের কথাই ধরা যাক। বর্ষার দিনের অনুপম বিবরণ রয়েছে এতে, ‘মনে করুন পিছল ঘাটে ভিজে ঘোমটায় বধূ জল তুলছে; বাঁশঝাড়ের তলা দিয়ে, পাঠশাল ও গয়লাবাড়ির সামনে দিয়ে সংকীর্ণ পথে ভিজতে ভিজতে জলের কলস নিয়ে তারা ঘরে ফিরে যাচ্ছে; খুঁটিতে বাঁধা গরু গোয়ালে যাবার জন্যে হাম্বারবে চিৎকার করছে; আর মনে করুন, বিস্তীর্ণ মাঠে তরঙ্গায়িত শস্যের উপর পা ফেলে ফেলে বৃষ্টিধারা দূর থেকে কেমন ধীরে ধীরে চলে আসছে; প্রথমে মাঠের সীমান্তস্থিত মেঘের মতো আমবাগান, তার পরে একএকটি করে বাঁশঝাড়, একএকটি করে কুটির, একএকটি করে গ্রাম বর্ষার শুভ্র আঁচলের আড়ালে ঝাপসা হয়ে মিলিয়ে আসছে, কুটিরের দুয়ারে বসে ছোটো ছোটো মেয়েরা হাততালি দিয়ে ডাকছে ‘আয় বৃষ্টি হেনে, ছাগল দেব মেনে’। অবশেষে বর্ষা আপনার জালের মধ্যে সমস্ত মাঠ, সমস্ত বন, সমস্ত গ্রাম ঘিরে ফেলেছে; কেবল অবিশ্রান্ত বৃষ্ট্তি বাঁশঝাড়ে, আমবাগানে, কুঁড়ে ঘরে, নদীর জলে, নৌকোর হালের নিকটে আসীন গুটিসুটি জড়োসড়ো কম্বলমোড়া মাঝির মাথায় অবিশ্রাম ঝরঝর বৃষ্টি পড়ছে।’ বর্ষার এই রূপ হয়তো এখন অনেকখানি বদলে গেছে। তবু রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় যে বর্ষা, তা বাংলারই চিরায়ত রূপ বটে! রবীন্দ্রবিবরণ বর্ষার এই রূপদর্শনে আমরা বিমোহিত না হয়ে পারি না।

বর্ষার প্রাধান্য প্রকাশ করতে তিনি অন্যান্য ঋতুর তুলনা করে বলেছেন যে, ‘ঋতুর মধ্যে বর্ষাই কেবল একা একমাত্র। তাহার জুড়ি নাই। গ্রীষ্মের সঙ্গে তাহার মিল হয় না; গ্রীষ্ম দরিদ্র, সে ধনী। শরতের সঙ্গেও তাহার মিল হইবার কোনো সম্ভাবনা নাই। কেননা শরৎ তাহারই সমস্ত সম্পত্তি নিলাম করাইয়া নিজের নদীনালা মাঠঘাটে বেনামি করিয়া রাখিয়াছে। যে ঋণী সে কৃতজ্ঞ নহে।’ বর্ষাকে তিনি বলেছেন ‘কবির ঋতু’। শ্রীমদ্ভাগবদ্গীতায় বলা হয়েছে, মানুষ শুধু কর্ম করে যাবে, ফল ভোগের আশা সে করবে না। কিন্তু কবি দেখলেন, ‘তাহার কর্মেও অধিকার নাই; ফলেও অধিকার নাই। তাহার কেবলমাত্র অধিকার ছুটিতে; কর্ম হইতে ছুটি, ফল হইতে ছুটি।” এইখানে কবির বাণী গীতার উপদেশকেও অতিক্রম করে গেছে।

প্রত্যেক ঋতুতেই কোনো না কোনো উৎসব আছে বাঙালির। তবে বর্ষায় তেমন কোনো উৎসব ছিল না। কিন্তু কবি বলেছেন যে বিনা কারণেও বর্ষায় যে উৎসব হয়, তার সন্ধান প্‌ওায়া যায় সংগীতের মধ্যে। এই সময় সংগীতের জন্ম হয়। আর সংগীতের ভেতর দিয়েই তো অন্তরের কথা প্রকাশিত হয়। সংগীতশাস্ত্র মতে, সকল ঋতুর জন্য সংগীতের কিছু সুর নির্ধারণ করা আছে। কিন্তু রবীন্দ্রসাথ খেয়াল করলেন যে, ব্যবহারিক দিকে থেকে রাগরাগিণী আছে কেবল বর্ষার আর বসন্তের। বসন্ত কালের জন্য বসন্ত আর বাহার কিন্তু বর্ষাকালের জন্য মেঘ, মল্লার, দেশ প্রভৃতি বেশ কয়েকটি রাগরাগিণী নির্ধারিত। তাই উচ্ছ্বাসের সুরে রবীন্দ্রনাথ বলেন, ‘সংগীতের পাড়ায় ভোট লইলে বর্ষারই হয় জিত’।

বর্ষা ও শরতের মধ্যে কবি যে প্রভেদ খুঁজে পেয়েছেন তা হলো ‘সেই বর্ষার দিনে বাহিরের প্রকৃতিই অত্যন্ত নিবিড় হইয়া আমাকে ঘিরিয়া দাঁড়াইয়াছে, তাহার সমস্ত দলবল সাজসজ্জা এবং বাজনাবাদ্য লইয়া মহাসমারোহে আমাকে সঙ্গদান করিয়াছে। আর, এই শরৎকালের মধুর উজ্জ্বল আলোকটির মধ্যে যে উৎসব তাহা মানুষের। মেঘরৌদ্রের লীলাকে পশ্চাতে রাখিয়া সুখদুঃখের আন্দোলন মর্মরিত হইয়া উঠিতেছে, নীল আকাশের উপরে মানুষের অনিমেষ দৃষ্টির আবেশটুকু একটা রঙ মাখাইয়াছে, এবং বাতাসের সঙ্গে মানুষের হৃদয়ের আকাঙ্ক্ষাবেগ নিঃশ্বসিত হইয়া বহিতেছে।’

কবি সবচেয়ে বেশি তুলনা করেছেন বর্ষা বসন্তের মধ্যে। কবির ভাষায়, ‘বসন্ত উদাসীন, গৃহত্যাগী। বর্ষা সংসারী, গৃহী। বসন্ত আমাদের মনকে চারিদিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়, বর্ষা তাহাকে এক স্থানে ঘনীভূত করিয়া রাখে। বসন্তে আমাদের মন অন্তঃপুর হইতে বাহির হইয়া যায়, বাতাসের উপর ভাসিতে থাকে, ফুলের গন্ধে মাতাল হইয়া জ্যোৎস্নার মধ্যে ঘুমাইয়া পড়ে; আমাদের মন বাতাসের মতো, ফুলের গন্ধের মতো, জ্যোৎস্নার মতো, লঘু হইয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে। বসন্তে বহির্জগৎ গৃহদ্বার উদ্ঘাটন করিয়া আমাদের মনকে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যায়। বর্ষায় আমাদের মনের চারিদিকে বৃষ্টিজলের যবনিকা টানিয়া দেয়, মাথার উপরে মেঘের চাঁদোয়া খাটাইয়া দেয়। মন চারিদিক হইতে ফিরিয়া আসিয়া এই যবনিকার মধ্যে এই চাঁদোয়ার তলে একত্র হয়। পাখির গানে আমাদের মন উড়াইয়া লইয়া যায়, কিন্তু বর্ষার বজ্রসংগীতে আমাদের মনকে মনের মধ্যে স্তম্ভিত করিয়া রাখে। পাখির গানের মত এ গান লঘু, তরঙ্গময়, বৈচিত্র্যময় নহে; ইহা স্তব্ধ করিয়া দেয়, উচ্ছ্বসিত করিয়া তুলে না। অতএব দেখা যাইতেছে, বর্ষাকালে আমাদের “আমি” গাঢ়তর হয়, আর বসন্তকালে সে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে।’

বর্ষাকালেও বিরহ হয়, বসন্তকালেও বিরহ হয়। এই দুই বিরহের মধ্যে ফারাক আছে বিস্তর। রবীন্দ্রনাথ সেটি সূক্ষ্মভাবে অনুভব করলেন। বসন্তকালের বিরহ ধরা পড়ে তাঁর দৃষ্টিতে এমনভাবে, ‘বসন্তকালে আমরা বহির্জগৎ উপভোগ করি; উপভোগের সমস্ত উপাদান আছে, কেবল একটি পাইতেছি না; উপভোগের একটা মহা অসম্পূর্ণতা দেখিতেছি। সেই জন্যই আর কিছুই ভাল লাগিতেছে না। এত দিন আমার সুখ ঘুমাইয়াছিল, আমার প্রিয়তম ছিল না; আমার আর কোন সুখের উপকরণও ছিল না। কিন্তু জ্যোৎস্না, বাতাস ও সুগন্ধে মিলিয়া ষড়যন্ত্র করিয়া আমার সুখকে জাগাইয়া তুলিল; সে জাগিয়া দেখিল তাহার দারুণ অভাব বিদ্যমান। সে কাঁদিতে লাগিল। এই রোদনই বসন্তের বিরহ। দুর্ভিক্ষের সময় শিশু মরিয়া গেলেও মায়ের মন অনেকটা শান্তি পায়, কিন্তু সে বাঁচিয়া থাকিয়া ক্ষুধার জ্বালায় কাঁদিতে থাকিলে তাঁহার কি কষ্ট!’

আর বর্ষাকালের বিরহ সম্পর্কে তাঁর অনুভব, ‘বর্ষাকালে বিরহিনীর সমস্ত “আমি” একত্র হয়, সমস্ত “আমি” জাগিয়া ওঠে;দেখে যে বিচ্ছিন্ন “আমি”, একক “আমি” অসম্পূর্ণ। সে কাঁদিতে থাকে। সে তাহার নিজের অসম্পূর্ণতা পূর্ণ করিবার জন্য কাহাকেও খুঁজিয়া পায় না। চারদিকে বৃষ্টি পড়িতেছে, অন্ধকার করিয়াছে; কাহাকেও পাইবার নাই, কিছুই দেখিবার নাই; কেবল বসিয়া বসিয়া অন্তর্দেশের অন্ধকারবাসী একটি অসম্পূর্ণ, সঙ্গীহীন “আমি” র পানে চাহিয়া কাঁদিতে থাকে। ইহাই বর্ষাকালের বিরহ। বসন্তকালে বিরহিনীর জগৎ অসম্পূর্ণ, বর্ষাকালে বিরহিণীর “স্বয়ং” অসম্পূর্ণ। বর্ষাকালে আমি আত্মা চাই, বসন্তকাল আমি সুখ চাই। সুতরাং বর্ষাকালের বিরহ গুরুতর। এ বিরহে যৌবন মদন প্রভৃতি কিছু নাই, ইহা বস্তুগত নহে। মদনের শর বসন্তের ফুল দিয়া গঠিত, বর্ষার বৃষ্টিধারা দিয়া নহে। বসন্তকালে আমরা নিজের উপর সমস্ত জগৎ স্থাপিত করিতে চাহি, বর্ষাকালে সমস্ত জগতের মধ্যে সম্পূর্ণ আপনাকে প্রতিষ্ঠিত করিতে চাহি।’

সব শেষে বর্ষা নিয়ে রবীন্দ্রনাথ যে ভাবনায় উপনীত হন, তা একান্তই দার্শনিক। বর্ষাকালকে তিনি ‘সুখের জন্য’ মনে করেন না, মনে করেন ‘মঙ্গলের জন্য।’ তাঁর উক্তি ‘বর্ষাকালে উপভোগের বাসনা হয় না, “স্বয়ং”এর মধ্যে একটা অভাব অনুভব হয়, একটা অনির্দেশ্য বাঞ্ছা জন্মে।’ বর্ষাকে কবি এমন তীব্রভাবেই হৃদয়ে ধারণ করেন।

x