রবীন্দ্র-প্রাসঙ্গিকতার গল্প

শনিবার , ১০ আগস্ট, ২০১৯ at ৮:৪২ পূর্বাহ্ণ
16

(তাঁকে স্মরণ করবো বলে আমাদের জন্য তাঁর শেষ উপহার ২২ শে শ্রাবণ)
হায়াৎ মামুদের অনুবাদে হুমায়ূন কবিরের ‘মানবতাবাদের প্রবক্তা রবীন্দ্রনাথ’ প্রবন্ধটি পাঠের পর স্থান-কাল-পাত্র নিরপেক্ষ রবীন্দ্রনাথকে প্রথম চেনা এবং বৈশ্বিক পরিসরে তাঁর অবিকল্প প্রাসঙ্গিকতার স্বরূপ জানা অনেকের পক্ষে সম্ভব হয়েছিল। সেই থেকে রবীন্দ্র-জন্মতিথি ও প্রয়াণদিবস উপলক্ষে ঘুরে ফিরে একটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে দেখেছি আমাদের রবীন্দ্র-ভাবুক, চিন্তক, গবেষক প্রমুখ বিদগ্ধজনদের-কেন রবীন্দ্রনাথ আজও প্রাসঙ্গিক। সুদীর্ঘ জীবনে নানা রূপে আবির্ভূত এবং নানা কর্মে নিমগ্ন রবীন্দ্রনাথের প্রাসঙ্গিতকতা নিয়ে আলোচনায় কখনো কখনো কোনো কোনো ক্ষেত্রে নতুন মাত্রা যুক্ত হলে আমরা সচকিত হই। কবির সার্ধশত জন্মবর্ষে ২২ শে শ্রাবণ উপলক্ষে রবীন্দ্রপ্রাসঙ্গিকতা নিয়ে দৈনিক প্রথম আলোতে (শুক্রবারের সাহিত্য সাময়িকী) লিখেছেন আহমদ রফিক। দেড়শ বছর ধরে রবীন্দ্রনাথ বাংলায় এবং ৭১ থেকে এই বাংলাদেশে কেমন ছিলেন এবং কিভাবে আছেন তার একটি মূল্যবান আলোচনা করেছেন তিনি। প্রসঙ্গত আমাদের নিম্নবর্গীয় সমাজের দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দারিদ্র্য দূরীকরণে এনজিও পরিচালিত ক্ষুদ্র ঋণদান ব্যবস্থার হালে পানি না পাওয়া বর্তমান অবস্থার সঙ্গে তিনি কালিগ্রাম পরগণার গ্রামে গ্রামে রবীন্দ্রনাথের ক্ষুদ্রঋণ বিতরণ ও সমবায় সংগঠনের তুলনা করেছেন। একশ বছর আগে রবীন্দ্রনাথ যেভাবে গ্রামীণ দারিদ্র্য দূরীকরণে ক্ষুদ্রঋণ, সমবায় ও কুটির শিল্পের গুরুত্ব অনুধাবন করেছিলেন আজও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টজনদের সেভাবেই বুঝতে হচ্ছে বলেছেন আহমদ রফিক। এতকাল আগের রবীন্দ্র ভাবনার অর্থবহতা ও প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে তাঁর নামোচ্চরণ না করে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আলোচনা হতে দেখে তিনি অবাক হয়েছেন।
আমাদের সাংস্কৃতিক জীবনে তাঁর অবিচ্ছেদ্যতার প্রমাণ হিসেবে আহমদ রফিক সাপ্তাহিক বিচিত্রার হাত ধরে একদা এখানে যে রবীন্দ্রনাথ বিরোধিতার আয়োজন হয়েছিল সেই বিচিত্রা সম্পাদকের চোখের কঠিন অসুখে অস্ত্রোপচারের ঘটনা নিয়ে একই পত্রিকার প্রচ্ছদ কাহিনীর স্লোগানে ‘অন্ধজনে দেহ আলো’র উদ্ধৃতিকে বলেছেন, ‘চমৎকার প্যারাডক্স’। লেখাটির শেষ পর্যায়ে আমাদের পূর্ব পাকিস্তান পর্বে ১৯৫৪ সালে ২১ দফার বিজয় উদযাপনে কার্জন হলে অনুষ্ঠিত সাহিত্য-সংস্কৃতি সম্মেলনে নারী স্বাধিকারের পক্ষে লায়লা সামাদের জোরালো কন্ঠে উচ্চারিত ‘ঘোমটা ছেড়ে বেরিয়ে এসো নারী’র উল্লেখ করেছেন আহমদ রফিক। বস্তুত, বাঁশিওয়ালার কবি রবীন্দ্রনাথ স্বয়ং সেই বাঁশিওয়ালা এখনও আমাদের সংস্কৃতিতে যাঁর অধিষ্ঠান সবার ওপরে। নারীর আজকের দুর্দিনে দুর্গতিতে নানাভাবে তিনি প্রাসঙ্গিক এখনও।
আসলে ২২ শে শ্রাবণে যাঁকে আমরা চিরদিনের মতো হারিয়ে ফেলেছি তিনি যে হারানোর বা ফুরনোর নন কোনোদিন, তিনি যে আমাদের সকল খেলায় খেলে যাবেন আরো বহু বহুকাল তার নিত্যনতুন ক্ষেত্র আবিষ্কৃত হচ্ছে তাঁরই সৃজনভুবন থেকে। যখন শঙ্খ ঘোষের মতো কথার যাদুকরের মুখ থেকে তেমন গল্প শোনা যায় তখন চিৎকার করে সে গল্প কেউ শুনতে না চাইলেও সকলকে শোনাতে ইচ্ছে করে। হ্যাঁ, প্রিয় পাঠক, বইমেলা জানুয়ারি ২০১৯ এসেছে তাঁর নতুন বই ‘মুখের কথা সভায়।’ ‘রক্তকরবীর’ পঞ্চাশ বছর পূর্তিতে বহুরূপী আয়োজিত শিশির মঞ্চের এক সভায় ২০০৪এ আমন্ত্রিত অতিথি হিসেবে তাঁর বলা কথাগুলো অজন্তা ঘোষের অনুলিখনে এ গ্রন্থে এমনধারা আরও কিছু অনুলিখন বা রেকর্ডকৃত ভাষণের সঙ্গে মুদ্রিত রূপ পেয়েছে। ‘রক্তকরবী প্রযোজনার পঞ্চাশ বছর’ শিরোনামের এই লেখাটিতে রবীন্দ্রনাথের নাটক ও নাটকের রবীন্দ্রনাথ সম্পর্কে বিস্তর কথা বলা হয়েছে। রবীন্দ্রনাথকে কাঠামোবদ্ধ করার চেষ্টা অন্যক্ষেত্রেও দুর্লক্ষ ছিল না তবে নাটকে তাঁকে যাঁরা ‘কাঠামোবন্দী’ করে রেখেছেন দীর্ঘকাল তাদের মধ্যে চলতি সমালোচক, সাধারণ পাঠক এমনকি যাঁরা একটু ব্যতিক্রমী ভাবনাচিন্তা করেন তাঁরাও ছিলেন। কিন্তু সে খাঁচাটা একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করেছে এবং কাঠামোমুক্ত রবীন্দ্রনাথ যে মুক্তির কত আকাশ খুলে দিতে পারেন আমাদের সে চিন্তাটা উশকে দিয়েছেন শঙ্খ ঘোষ।
আমরা কিন্তু শঙ্খ ঘোষ কথিত মঞ্চের মুক্তি বা অন্য আর কোনো বিষয়ে কথা বলবো না। আমরা ‘রক্তকরবী’ নাটকের মধ্যেই থাকবো। এ নাটকে যক্ষ্মাপুরীর মানুষগুলো হয় জেগে আছে নয় ভয় পাচ্ছে নয় তো সন্দেহ করছে। শঙ্খ বলেন, আমরাও সবাই সবসময়েই ভীত,ক্রুব্ধ বা সন্দিগ্ধ। এই সমাজের ভেতরে আমাদের চারপাশে কেবল মন্দির, মসজিদ, মদের ভাঁড়ার এবং গোপন অস্ত্রভাণ্ডার বাড়তে দেখেছি। নাটকটা প্রতীকি না রূপক-নন্দিনী জীবন, রঞ্জন যৌবন এসবের বাইরে আমাদের জীবনের প্রাত্যহিকতার কথাই তো মেলে নাটকে। শঙ্খ ঘোষ বলেন, নন্দিনী আমাদের ঘরের মেয়ে, রঞ্জন চেনা ছেলে আর নাটকটা এ মুহূর্তে জীবনসংকটেরই নাটক।
এ নাটকের অভিনয় দেখার সময় শঙ্খ ঘোষের মনে হয়েছিল ‘…যন্ত্রসভ্যতার সংস্থাটার সঙ্গে যা মেলানো আছে প্রতিস্পর্ধিতায়, তা হলো প্রাণের কথা, মাটির কথা, ‘পৌষ তোদের ডাক দিয়েছে আয়রে চলে আয়’ এই আহবানের কথা। শঙ্খের ভাষ্যে অতঃপর শুনেছি শম্ভু মিত্রের কথা। অনেকদিন পরে শুম্ভু মিত্র লিখেছিলেন ‘আগে তো ভাবিনি যে এই যে পরিবেশ চিন্তা, পরিবেশ নিয়ে এত ভাবা হচ্ছে এখন, সেটা তো রক্তকরবী নাটকে আছে।’ শঙ্খ ঘোষ জানাচ্ছেন, ১৯২৩ সালে যখন নাটকটা লেখেন রবীন্দ্রনাথ তার একটু আগে ১৯২২ সালে শ্রীনিকেতনে এলমহার্স্টকে নিয়ে এসে একটা কর্মযজ্ঞ শুরু করেছিলেন। তখন এলমহার্স্ট একটা বক্তৃতা দিয়েছিলেন, ‘দ্য রবারি অফ দ্য সয়েল’ নামে এবং তখন সেটার ভূমিকা হিসেবে রবীন্দ্রনাথ কিছু কথা বলেছিলেন, কবিতা লিখেছিলেন, গান লিখেছিলেন একটা, গানটা ছিল, ‘ফিরে চল মাটির টানে।’ এই গান, ‘মাটির ডাক’ কবিতা এবং ওই বক্তৃতার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ এই কথাটাই বলেছিলেন যে প্রাণের সঙ্গে মাটির যে যোগ সেটা যদি নষ্ট করে দেওয়া হয় তাহলে আমরা ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যাব। আমরা কীভাবে প্রকৃতিকে ধ্বংস করছি, মাটিকে ধ্বংস করছি সেটা যদি এখনও বুঝতে না পারি তাহলে সর্বনাশ থেকে আমাদের কোনো মুক্তি নেই। তারপর লেখা হলো ‘রক্তকরবী’ নাটক। লেখার কয়েক বছরের মধ্যে হলকর্ষণ উৎসবের প্রচলন করলেন রবীন্দ্রনাথ। শঙ্খ ঘোষ জানাচ্ছেন, ‘হলকর্ষণ, বৃক্ষরোপণ সবই তো একই সূত্রে গাঁথা? পরিবেশ চেতনারই সূত্রে? মাটির থেকে শস্যের থেকে, জল হাওয়া থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করে নিলে যে যন্ত্র মানুষ তৈরি হবে, সেই ভয়ংকরতার কথা, তো গোড়া থেকেই এ নাটকের মধ্যে দিয়ে প্রতিভাত হচ্ছে তাহলে।’
‘রক্ত করবী’ নাটকে রঞ্জনের মৃত্যুকে যৌবনের অপমৃত্যু বা নষ্টমৃত্যু ভেবেছেন এমনকি বহুরূপীর শম্ভুমিত্র নিজেও। কিন্তু শঙ্খ ঘোষ বিষয়টা নিয়ে অনেক ভেবেছেন। শেষে দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলেন, ‘একটা ব্রতের জন্যে, একটা আন্দোলনের জন্যে সচেতনভাবে এগিয়ে এসে কেউ যদি প্রাণ দেয়, তাহলে তো সেটা নষ্ট নয়। সেটা তো নবজীবনের ইঙ্গিত ও প্রেরণা নিয়ে আসে। নন্দিনী তাই বলতে পারে যে ‘আজ থেকে আমার জয়যাত্রা শুরু হলো’। ঠিক সেই সময়টাতে দিল্লীতে নিহত সফদর হাশমির মৃত্যুর পর কোলকাতায় রবীন্দ্র সদনের সিঁড়িতে বিরাট প্রতিবাদ সভায় তাঁর স্ত্রী মালা বলেছিলেন সফদরের মৃত্যু হয়নি, হতে পারে না তার কাজ এগিয়ে নিয়ে যাবো আমরা। এটা শোকের সময় নয়। এটা শপথ নেবার সময়। শঙ্খ পেয়ে যান নন্দিনীকে। বলেন, রঞ্জনদের মৃত্যু নেই। আমরাও দৃঢ় প্রত্যয়ের সঙ্গে বলি মৃত্যু নেই রবীন্দ্রনাথের মতো মনীষীদের। যাঁদের কথা কালে কালে কেবল মিলিয়ে নিতে হয়। যাঁদের কথা কলকলিয়ে ওঠে নিত্য নতুন অনুষঙ্গে। আসলে এঁদের প্রাসঙ্গিকতার গল্প ফুরায় না, তার আলো নেভে না।
প্রিয় পাঠক, রক্তকরবীর প্রাসঙ্গিকতার আরও কিছু মূল্যবান তথ্য রয়েছে এ গ্রন্থেরই ‘দৈনন্দিনে রবীন্দ্রনাথ’ শিরোনামের লেখাটিতে। সেখান থেকে আরও একবার শঙ্খ ঘোষের কাছে ঋণ স্বীকার করে লেখাটি শেষ করবো। রবীন্দ্রনাথ এখনও আমাদের সর্বশ্রেষ্ঠ এবং সর্বশেষ অবলম্বন এমন যাঁরা বলেন শঙ্খ ঘোষ তাঁদের জন্য একটা সতর্কবাণী রেখেছেন।
তিনি বলেন, রবীন্দ্রনাথকে সর্বশ্রেষ্ঠ অবলম্বন বলা যায় কিন্তু ‘সর্বশেষ’ কথাটা মাথায় ঢুকিয়ে দেওয়া ঠিক নয়? কেননা তাতে একটা বন্ধন তৈরি হয়। …মনের মধ্যে একটা খোলা জায়গা সবসময় থাকা দরকার, যেখানে সে বিচার করতে পারে, ভাবতে পারে।….‘সর্বশেষ’ কথাটার মধ্যে একটা মৌলবাদ-এর ভয় থেকে যায়। আমরা বলবো, রবীন্দ্র প্রাসঙ্গিকতার গল্প শোনার জন্য আমাদের বারবার সেই খোলা জায়গাটায় গিয়ে দাঁড়াতেই হবে।

x