রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নারী ভাবনা

ড. আনোয়ারা আলম

শুক্রবার , ১০ আগস্ট, ২০১৮ at ৯:০৫ পূর্বাহ্ণ
175

তরুণ বয়সে বিলেতে গিয়ে ‘ইউরোপ প্রবাসীর’ পত্রে দেশের নারীদের করুণ অবস্থার জন্য পুরুষের আধিপত্যবোধ ও স্বার্থপরতাকে মূল কারণ হিসেবে সহানুভূতি প্রকাশ করলেও দেশে ফিরে সনাতন ঐতিহ্যের টানে মারাঠি নারীবাদী রমা বাইয়ের নারী মুক্তি বিষয়ক বক্তৃতার বিরুদ্ধে কলম ধরেন– ‘প্রকৃতি বলে দিচ্ছে যে বাহিরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না। যদি প্রকৃতির সে রকম অভিপ্রায় না হতোতাহলে মেয়েরা বলিষ্ঠ হয়ে জন্মাত’।

ইবসেনের নোরা লেখা হয়েছিল ১৮৭৯ সালে। নারীর গৃহত্যাগজীবনে কম ঘটলেও সাহিত্যে ঘটে। এ নাটকের আগে টলস্টয়ের আন্না কারেনিনাও ঘর ছেড়েছেতবে পার্থক্য আছেনোরা বিয়েকে চ্যালেঞ্জ করেছে, মাতৃত্বকে অস্বীকার করেছেসংসারের মোহ ত্যাগ করেছেমনের বিপ্লবী চেতনায় জীবনকে গ্রহণ করেছে নতুন ভাবেআন্না কারেনিনা কিন্তু আত্মহত্যা করেছে। ১৯২৯ সালে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের উপন্যাস যোগাযোগের কুমু ও বিদ্রোহী নোরার মতোই– ‘আমি তাদের বড় বউ, তার কি কোন মানে আছে যদি কুমু না হই’। যদিও কুমুকে মাতৃত্বের টানে ফিরতে হয়েছেএ পবিত্র কর্তব্যের ধারণা সমাজেরই সৃষ্টি। রবীন্দ্রনাথের স্ত্রীর পত্রছোট গল্প প্রকাশিত হয়েছে ১৯১৪ সালেনায়িকা মৃনাল স্বামীকে লিখেছে প্রথম ও শেষ চিঠিতেসে কেবলই মৃণালগৃহত্যাগ করেছে, আত্মহত্যা করেনি মৃণাল কারণ সে বাঁচার মতোই বাঁচবে। ‘রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যে নারীদের মধ্যে পুরুষতন্ত্রের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বিদ্রোহী স্ত্রীর পত্র’এর মৃণাল’। (হুমায়ুন আজাদ নারীপৃ. ১১৬)

বাঙালি সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সর্বশ্রেষ্ঠ প্রতিভাবাংলা সাহিত্যের অন্যতম প্রভাব সঞ্চারি লেখক রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জীবনব্যাপী সাধনার মাধ্যমে বাঙালি সংস্কৃতিও সাহিত্যকে যে মাত্রা দিয়ে গেছেন তা অতুলনীয়রবীন্দ্র প্রতিভার বিপুল ব্যাপ্ত সমগ্রতায় সার্বিকভাবে বাংলা সাহিত্য আধুনিক হয়ে ওঠে। তাঁর আবির্ভাব ও জীবনকাল ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ ভাগ আর বিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ পর্যন্ত বিস্তৃত। আধুনিকতার ঢেউ বিশ্বে এবং ভারতবর্ষেনতুন সময়ের মানুষনতুন ভাবনায় আন্দোলিতরবীন্দ্রনাথের মাঝেও এর প্রভাবযদিও তিনি উদ্ভাসিত হন অন্য আলোয় ভিন্নতর মাত্রায়।

রবীন্দ্র সাহিত্যে নারীবা নারী ভাবনা নানা বিচারে, নানা তত্ত্বের ভারে অপার রহস্যময়তায় পরিপূর্ণকবিতা থেকে উপন্যাস ও ছোট গল্প বা নাটক এবং প্রবন্ধে কখনো উদারতাকখনো রক্ষণশীলতাকখনো দুই নারী তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশ। রবীন্দ্র চেতনায় দুই বিপরীতের দ্বন্দ্বমহর্ষি পিতা দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর ও পারিপার্শ্বিক স্থানিক প্রভাবের সঙ্গে আধুনিকতার প্রভাবের দ্বন্দ্ব। দু’দিকের প্রভাবই তিনি আত্মস্থ করেছিলেন বিধায় তাঁর নারী ভাবনা নিয়ে বহু গবেষণাআলোচনা সমালোচনা বা মতামত।

তরুণ বয়সে বিলেতে গিয়ে ‘ইউরোপ প্রবাসীর’ পত্রে দেশের নারীদের করুণ অবস্থার জন্য পুরুষের আধিপত্যবোধ ও স্বার্থপরতাকে মূল কারণ হিসেবে সহানুভূতি প্রকাশ করলেও দেশে ফিরে সনাতন ঐতিহ্যের টানে মারাঠি নারীবাদী রমা বাইয়ের নারী মুক্তি বিষয়ক বক্তৃতার বিরুদ্ধে কলম ধরেন– ‘প্রকৃতি বলে দিচ্ছে যে বাহিরের কাজ মেয়েরা করতে পারবে না। যদি প্রকৃতির সে রকম অভিপ্রায় না হতোতাহলে মেয়েরা বলিষ্ঠ হয়ে জন্মাত’। (১২৯৬ বঙ্গাব্দ) এরপরেই তিনি কৃষ্ণভাবিনীর প্রবন্ধ ‘শিক্ষিতা নারী’র বিষয়ে ‘সাধনা’ পত্রিকায় লিখলেন– ‘নারীর আদর কালক্রমে আপনি বাড়িবে, সেজন্য নারীদিগকে কোমর বাঁধিতে হইবে না, বরঞ্চ আরো অধিক সুন্দর হইতে হইবে’। (১২৯৮ বঙ্গাব্দ)

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মধ্য বয়সটাতে নারী ভাবনায় গভীর রক্ষণশীলতা এবং দুই নারী তত্ত্বে তথা ‘জননী’ ও ‘প্রিয়া’ প্রাধান্য। এ প্রভাব সে সময়কার লেখা উপন্যাসের কাহিনী বিন্যাসে ও নায়কনায়িকার, বিশেষ করে নায়িকার চরিত্র চিত্রণেএকই সাথে অনেক কাব্যেনানা আঙ্গিকে। এর কারণ হিসেবে সত্যেন্দ্র রায় লিখছেন– ‘আদি ব্রাহ্ম সমাজের সেক্রেটারি পদের দায়িত্ব পিতার প্রভাব, সংস্কার বিরোধী ব্রাহ্ম নেতাদের সান্নিধ্য, সর্বোপরি তৎকালীন সমাজ মানসে রবীন্দ্রনাথের মনকে অতীত সচেতন করে তুলেছেএরই ফল পরিণাম নৈবদ্য কাব্য’। একই সাথে শ্রী রায় রবীন্দ্রনাথ কর্তৃক নিজের মেয়েদের বাল্য বিবাহযৌতুক প্রদানের মতো ঘটনাদির উল্লেখ করেছেন সমালোচনার আঙ্গিকে। তবে পিতার মৃত্যু (১৯০৫)-স্বদেশি আন্দোলনের জোয়ার এবং গোরা উপন্যাস রচনার (১৯০৭) কাল থেকে নারী ভাবনায় কবির উত্তরণ পর্বের সূচনা এবং তাঁর ‘নারী প্রসঙ্গ’ (১৯২৩) নিবন্ধে মতামত পূর্ব ধারার ঠিক বিপরীত

শিক্ষায় রাজনীতিতে নারীর অন্তরের প্রেরণা না পেলে কখনো শক্তি সত্য ও গভীর হয় না। . . . নারীর যে মহাশক্তি আছে, তা কেবল তাদের গৃহ সংসারই লুটে নিচ্ছে, দেশ আর নারীর সেবা পাচ্ছে না। . . . হৃদয়ের রস ও কর্মের শক্তি ঘরে ও সংসারেই রয়ে গিয়েছে। এই হেতু দেশ বহু দুঃখগ্রস্ত’।

কবির এ আহ্বান নারীর ব্যক্তিসত্ত্বা বিকাশের অনুকূল, তার ব্যক্তি স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট। এক্ষেত্রে দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ের আর্থসামাজিক প্রেক্ষাপটনব্য রাশিয়াসহ নানা দেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতাস্বদেশে নারী শিক্ষা ও নারীর কর্মক্ষেত্রের বহির্মুখী প্রসার, রাজনীতির পাশাপাশি সামাজিকসাংস্কৃতিক আন্দোলনের প্রভাব, শিক্ষার সঙ্গে ব্যক্তি চৈতন্যে মননশীলতার উদ্ভাসনারী বিষয়ক ভাবনায় গুণগত পরিবর্তনের সাথে এর পেছনে প্রমথ চৌধুরী ও সবুজ পত্রের প্রভাব রয়েছে বলে অনেকে মনে করেনরবীন্দ্র জীবনীকার প্রভাত কুমার মুখোপাধ্যায়ের ভাষায় ‘ নারীর ব্যক্তি স্বাতন্দ্র্যবোধের বিদ্রোহ ধ্বজা উড়িল সবুজ পত্রের মধ্যে’। সত্যেন্দ্র রায়ের মতে এটা ছিল পরিণতির পর্ব বা যথেষ্ট দীর্ঘ।

রবীন্দ্রনাথের প্রথম দিককার উপন্যাস ‘করুণা’বউ রাণীর হাট ও রাজর্ষির পর ‘চোখের বালি’বাংলা উপন্যাসের যুগসন্ধির উপন্যাসযা উনিশ বছরের রেনেসাঁসীয় ঐতিহ্যবাদী রক্ষণশীলতা ও বিশ শতকের আধুনিক চেতনার মিশ্র প্রতিফলন হিসেবে স্বীকার্য। এরপরেও বলতে হয় উপন্যাসের প্রথম দিকে শিক্ষিত আধুনিক ও ব্যক্তিত্বময়ী বিনোদনীর শুধুমাত্র বিধবা বিধায় ‘ননীর পুতুল’ আশার কাছে তাঁর পরাজয় এবং কাশিতে নির্বাসন, যেটিকে তুচ্ছ পরিণাম বলেছেন বুদ্ধদেব বসু। ‘নৌকাডুবি’উপন্যাসেও নারীর স্বাধীন ব্যক্তিসত্তার প্রকাশ ঘটেনি

১৯০৭ সাল থেকে প্রবাসী পত্রিকায় প্রকাশিত হতে থাকে দীর্ঘ উপন্যাস ‘ গোরা’– (১৯১০ সালে সমাপ্ত) তার বিস্তার ও গুণগত মান নিয়ে নিজেই একটি পর্ব

এর কিছুটা হলেও প্রভাব পড়েছে সমকালীন উপন্যাস ঘরে বাইরেরবিমলা চরিত্রে। গোরা থেকে ‘চতুরঙ্গ’প্রায় অর্ধ যুগব্যাপী এ সময়ের মধ্যে রবি ঠাকুরের নারী ভাবনায় ইতিবাচক পরিবর্তন বিষয়ে বিচারের দাবি রাখে-‘দাশিনী’ এবং ‘বিমলা’ দু’জনের মধ্যেই ঘর থেকে বের হওয়ার মানস চেতনা বিশেষতঃ দাশিনী চরিত্র এক অসামান্য সৃষ্টি।

যোগাযোগ ও শেষের কবিতা দুটোই কবির সাতষট্টি বছরে লেখা। যদিও কাহিনী সময় পরিসর ভিন্নশেষের কবিতার লাবণ্য অন্যান্য নারী চরিত্রের মধ্যে বক্তি সত্তার বহিঃপ্রকাশের সাথে প্রেমের যে নতুন সংজ্ঞা দিলেনতা রীতিমতো বিস্ময়কর এখানেই রবীন্দ্রনাথের নারী বিষয়ক আধুনিক চেতনার জয়।

রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পে তিনি দ্বিধা দ্বন্দ্ব থেকে অনেকাংশে মুক্তঅনেকখানি স্বচ্ছন্দঅন্যতম কারণ গ্রাম বাংলার জীবনে এসে জীবন বাস্তবতার অভিজ্ঞতা অর্জনতাঁর প্রায় প্রতিটি গল্পে সামাজিক সমস্যা যেমন যৌতুক প্রথাবাল্য বিবাহের অভিশাপের সাথে যুক্ত হয়েছে নারীর বিদ্রোহী সত্তাযৌতুক প্রথার ‘দেনা পাওনা’ দিয়ে শুরুহৈমন্তীর প্রতিবাদ আত্মহননে শেষ হলেও ‘অপরিচিতার’ কল্যাণীর প্রতিবাদে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বহিঃপ্রকাশ, ‘বোস্টমী’ গল্পেবা ‘পয়লা নম্বরের’ অনিলা নারী সত্তার মুক্তির লক্ষ্যে ঘর ছেড়েছে আবার ‘মানভঞ্জন’ গল্পে গিরিবালার স্বামীর প্রতি যে প্রতিশোধের চিত্র তা ঐ সময়ের প্রেক্ষিতে সত্যিই এক ধরনের চ্যালেঞ্জ-‘বদনাম’ গল্পের সৌদামিনী বা শাস্তির ‘চন্দরা’যেন এক বিস্ময় আর ‘স্ত্রীর পত্র’ তো পাশ্চাত্যের নারীবাদের ছায়ায় তবে তিন সঙ্গীর ল্যাবরেটরি গল্পের সোহিনীর যে বিদ্রোহ তা রবীন্দ্র রচনার পূর্বাপর সতীত্বপত্নীত্ব ও দাম্পত্য প্রেমের এক মাত্রিক ধারণাকে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ভেঙে চুরে দূরে ফেলে দিলেনযেখানে এসেছে স্থানকালবিষয় নির্ভর বহুমাত্রিক ধারণা যা স্থিতিস্থাপক পরিবর্তনশীল কিন্তু ভেঙে পড়ার মতো নয়রবীন্দ্রনাথের জীবনের শেষ প্রান্তে লেখা এ গল্প সত্যিই পাঠক মনকে অভিভূত করে।

কবিতায় রবীন্দ্রনাথ-‘নারী ভাবনায়’ আরো এগিয়ে যেখানে নারী নির্যাতনের ছবিবা ব্যক্তি সত্তার প্রকাশ-‘বলাকা’ ও পলাতকা পর্বে। বিশেষত ‘মুক্তি’ কবিতায় যেমন নারীর কষ্টমুহুয়ার প্রেম পর্বে জীবন সত্যের প্রকাশএমনি ভাবে বিশদ বিচারে উপন্যাসের চাইতে ছোট গল্পেতার চাইতেও বেশি কবিতায় নারীর গুণগত মাত্রা বিচারে কয়েক পা এগিয়ে গেছেযেখানে প্রাধান্য ভাববাদিতার চেয়ে বাস্তববাদিতা। তবে স্বীকার করতেই হয় রবীন্দ্রনাথ নারীকে জিতিয়ে দেয়ার আন্তরিকতায় অনন্য সাধারণ যেমন ‘দর্প হরণ’ গল্পে তেমনি আবার ‘সাধারণ মেয়ে’ কবিতায় মালতীর অনুরোধ শরৎচন্দ্রকে

তাঁর নৃত্যনাট্যে যেমন ‘রক্তকরবীর’ নায়িকা নন্দিনীর আঁচলের ছায়ায় আচ্ছন্ন সমস্ত চরিত্রঅথবা ‘চিত্রাঙ্গদার’ বিদ্রোহী সত্তার আলোতে মুগ্ধতা এবং বলতেই হয়রবীন্দ্রনাথের নারী প্রিয়া বা মাতাঅর্ধেক মানবী কি কল্পনাতিনি যেভাবেই হোক নারী যেন জিতিয়ে দেন। আবার নানাভাবে পুরুষের হীনম্মন্যতাবা সংকীর্ণতা প্রকাশ, এটি চেয়েছেন আন্তরিকভাবে।

রবীন্দ্রনাথ নারীকে এঁকেছেন শব্দতুলির হরেক আচড়েকখনো সে নারী বহুবর্ণা উজ্জ্বল, কখনোবা ধূসর জীর্ণতবে যাই হোক না কেন সবটুকু তারই আবিষ্কারযা রবীন্দ্রনাথেররবির কিরণের ঝলকানিতে। অভিজ্ঞতা সমৃদ্ধ দর্শনঅন্বিত নারী ভাবনা রবীন্দ্রনাথের শেষ জীবনে পরিণত আকার ধারণ করেছিলনতুন যুগকে তিনি গভীরভাবে অনুভবে লিখলেন-‘আমার মনে হয় পৃথিবীতে নতুন যুগ এসেছে . . . নতুন সভ্যতা গড়বার কাজে মেয়েরা এসে দাঁড়িয়েছে।. . . তাদের মুখের ওপর থেকেই যে কেবল ঘোমটা খসল তা নয়যে ঘোমটার আবরণে তারা অধিকাংশ জগতের আড়ালে পড়ে গিয়েছিল সেই মনের ঘোমটাও তাদের খসছে’। (কালান্তর, – রবীন্দ্র রচনাবলী)

তথ্য সূত্র: ধ্রপদী নায়িকাদের কয়েকজনসিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

রবীন্দ্র সাহিত্যের নায়িকারাদ্রোহে ও সমর্পণেআহমদ রফিক

অন্য বিবেচনায় রবীন্দ্রনাথতিতাশ চৌধুরী

x