রবীন্দ্রনাথ ও তাঁর গীতাঞ্জলি

এম আনোয়ার হোসেন

শুক্রবার , ৯ আগস্ট, ২০১৯ at ৭:২৬ পূর্বাহ্ণ
86

তোমার দয়া যদি
চাহিতে নাও জানি
তবুও দয়া করে
চরণে নিয়ো টানি।
আমি যা গড়ে তুলে
আরামে থাকি ভুলে
সুখের উপাসনা
করি গো ফলে ফুলে-
সে ধুলা-খেলাঘরে
রেখো না ঘৃণাভরে,
জাগায়ো দয়া করে বহ্নি-শেল হানি।
‘তোমার দয়া যদি’ কবিতায় গীতাঞ্জলির স্রষ্টা এ কাব্যে বিশ্ব স্রষ্টার নিকট এভাবে মিনতি করেছেন। মিনতির সুরে প্রার্থনা করেছেন যেন কখনও স্রষ্টাকে ভুলে না যায়। যেন সর্বদা জাগিয়ে দেন বিশ্ব প্রভু। গীতাঞ্জলি কাব্যে ১৭৫ টি গীতকবিতা সংকলিত হয়েছে। এ কাব্যগ্রন্থের বেশির ভাগ কবিতাতে রবীন্দ্রনাথ নিজে সুরারোপ করেছিলেন। ১৯০৮-০৯ সালে বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় এ কবিতগুলো প্রকাশিত হয়। এরপর ১৯১০ সালে গীতাঞ্জলি কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। ১৯১২ সালে রবীন্দ্রনাথের “দি সং অফারিংস“ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এতে গীতাঞ্জলি ও সমসাময়িক আরও কয়েকটি কাব্যগ্রন্থের কবিতা রবীন্দ্রনাথ নিজে অনুবাদ করে প্রকাশ করেন। ইংরেজিতে অনুবাদকৃত “ দি সং অফারিংস“ এ কাব্যগ্রন্থটির জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছিলেন। তাতে করে তিনি সাহিত্যে গোটা বিশ্ব জয় ছিনিয়ে এনেছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশে। তিনি ছিলেন ভারতীয় উপমহাদেশের প্রথম নোবেল জয়ী বাঙালি। সাহিত্যে নোবেলে ভুষিত হওয়া অদ্যাবধি তিনিই এ উপমহাদেশের একমাত্র ব্যক্তি। তিনি ছন্দে ছন্দে বিশ্বনিয়ন্তার কাছে প্রায় সময় আরধনা করতেন। যেমন তিনি এ কাব্যগ্রন্থে লিখেছেন,- “অন্তর মম বিকশিত করো/ অন্তরতর হে।/ নির্মল করো,উজ্জ্বল করো,/ সুন্দর কর হে। / জাগ্রত করো,উদ্যত করো,/ নির্ভয় করো হে/ — নন্দিত করো,নন্দিত করো,/ নন্দিত করো হে।/ অন্তর মম বিকশিত করো অন্তরতর হে।। কবির এ প্রার্থনাটি ছিল একই কাব্যের “ অন্তর মম বিকশিত করো” কবিতার। গীতাঞ্জলি কাব্যের অন্তর্গত “ বিপদে মোরে রক্ষা করো” কবিতায় কবি বিশ্ব স্রষ্টার কাছে প্রার্থনা করেছেন এভাবে,- “ বিপদে মোরে রক্ষা করো/ এ নহে মোর প্রার্থনা,/ বিপদে আমি না যেন করি ভয়।/ দুঃখতাপে ব্যথিত চিতে নাই বা দিলে সান্ত্বনা,/ দুঃখে যেন করিতে পারি জয়–”।
কবি এ পৃথিবীর সব কিছু তুচ্ছ জ্ঞান করে মৃত্যুর সাথেও কথা বলেছেন ছন্দে ছন্দে। আফসোস করে তিনি লিখেছেন এভাবে,- “ মরণ যেদিন দিনের শেষে আসবে তোমার দুয়ারে/ সে দিন তুমি কী ধন দিবে উহারে।/ ভরা আমার পরানখানি/ সম্মুখে তার দিব আনি,/ শূন্য বিদায় করব না তো উহারে-/মরণ যে দিন আসবে আমার দুয়ারে।/ কত শরৎ-বসন্ত-রাত,/ কত সন্ধ্যা,কত প্রভাত / জীবনপাত্রে কত যে রস বরষে;/ কতই ফলে কতই ফুলে/ হৃদয় আমার ভরি তুলে/ দুঃখসুখের আলোছায়ার পরশে।/ যা-কিছু মোর সঞ্চিত ধন/ এতদিনের সব আয়োজন/ চরমদিনে সাজিয়ে দিব উহারে-/ মরণ যেদিন আসবে আমার দুয়ারে।” মুলতঃ এতে করে কবি মৃত্যুর কথা স্বরণ করেছেন এবং মৃত্যুরদূতের নিকট থেকে কোন রক্ষা নেই, কে কথাই তুলে তুরেছেন। গীতাঞ্জলি কাব্যে কবি বৈচিত্র্যময় প্রকৃতির বিভিন্ন রূপ তুলে ধরেছেন এভাবে,- “ আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে-/ আসে বৃষ্টির সুবাস বাতাস বেয়ে।/ এই পুরাতন হৃদয় আমার আজি/ পুলকে দুলিয়া উঠিছে আবার বাজি/ নূতন মেঘের ঘনিমার পানে চেয়ে/ আবার এসেছে আষাঢ় আকাশ ছেয়ে।/ রহিয়া রহিয়া বিপুল মাঠের পরে/ নব তৃণদলে বাদলের ছায়া পড়ে।/ এসেছে এসেছে এই কথা বলে প্রাণ,/ এসেছে এসেছে উঠিতেছে এই গান,/ নয়নে এসেছে, হৃদয় এসেছে ধেয়ে।/ আবার আষাঢ় এসেছে আকাশ ছেয়ে।” তেমনি তুলে ধরেছেন বসন্তকে। কবি লিখেছেন,-“ আজি বসন্ত জাগ্রাত দ্বারে।/ তব অবগুন্ঠিত কুন্ঠিত জীবনে/ কোরো না বিড়ম্বিত তারে।/ আজি খুলিয়ো হৃদয়দল খুলিয়ো,/ আজি ভুলিয়ো আপনপর ভুলিয়ো,/ এই সংগীত-মুখরিত গগনে/ তব গন্ধ তরঙ্গিয়া তুলিয়ো।/ এই বাহির ভুবনে দিশা হারায়ে/ দিয়ো ছড়ায়ে মাধুরী ভারে ভারে।–” কবি রবী ঠাকুর গীতাঞ্জলি কাব্যে নিজেকে নিয়ে বিশ্বনিয়ন্তার কর্মের কথা তুলে ধরেছেন। এ নশ্বর পৃথিবী অবিনশ্বর স্রষ্টা ছাড়া আর কিছুই থাকবে না। তাইতো কবি বলেছেন গীতাঞ্জলি কাব্যে বলেছেন এভাবে,-“ এবার নীরব করে দাও হে তোমার/ মুখর কবিরে।/ তার হৃদয়-বাঁশি আপনি কেড়ে/ বাজাও গভীরে।/ নিশীথরাতের নিবিড় সুরে/ বাঁশিতে তান দাও হে পুরে/ যে তান দিয়ে অবাক কর গ্রহশশীরে।/ যা-কিছু মোর ছড়িয়ে আছে/ জীবন-মরণে,/ গানের টানে মিলুক এসে তোমার চরণে।/ বহুদিনের বাক্যরাশি/ এক নিমেষে যাবে ভাসি,/ একলা বসে শুনব বাঁশি অকুল তিমিরে।” গীতাঞ্জলির অন্য এক কবিতায় তিনি লিখেছেন- “ আমার খেলা যখন ছিল তোমার সনে/ তখনকে তুমি তা কে জানত।/ তখন ছিল না ভয় ছিল না লাজ মনে/ জীবনবহে যেত অশান্ত।/ তুমি ভোরের বেলা ডাক দিয়েছ কত/ যেন আমার আপন সখার মতো,/ হেসে তোমার সাথে ফিরেছিলেম ছুটে/ সে দিন কত না বন-বনান্ত।/ ওগো সেদিন তুমি গাইতে যে সব গান/ কোনো অর্থ তাহার কে জানত।/ শুধু সঙ্গে তারি গাইত আমার প্রাণ,/ সদা নাচত হৃদয় অশান্ত।/ হঠাৎ খেলার শেষে আজ কী দেখি ছবি,/ স্তব্দ আকাশ, নীরব শশী রবি,/ তোমার চরণপানে নয়ন করি নত/ ভুবন দাঁড়িয়ে আছে একান্ত।” হার মানতেও সংকোচবোধ কিংবা লজ্জাবোধ অথবা দুঃখ পাওয়াকে তিনি সায় দেন নি। কবি গীতাঞ্জলি কাব্যে তাও তুলে ধরেছেন, তিনি লিখেছেন- “ মেনেছি হার মেনেছি।/ ঠেলতে গেছি তোমায় যত/ আমায় তত হেনেছি।/ আমার চিত্তগগন থেকে/ তোমায় কেউ যে রাখবে ঢেকে/ কোনোমতেই সইবে না সে/ বারেবারেই জেনেছি।/ অতীত জীবন ছায়ার মতো/ চলছে পিছে পিছে./ কত মায়ার বাঁশির সুরে/ ডাকছে আমায় মিছে।/ মিল ছুটেছে তাহার সাথে,/ ধরা দিলেম তোমার হাতে,/ যা আছে মোর এই জীবনে/ তোমার দ্বারে এনেছি।”
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ২৫ বৈশাখ,১২৬৮ বঙ্গাব্দ, ৭ মে ১৮৬১ খ্রি. ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে জন্ম গ্রহন করেন। তিনি ছিলেন একাধারে অগ্রণী বাঙ্গালী কবি, ঔপন্যাসিক, সংগীতস্রষ্টা, নাট্যকার,চিত্রকর, ছোট গল্পকার, প্রাবন্ধিক, অভিনেতা, কন্ঠশিল্পী এবং দার্শনিক। তাকে বাংলা ভাষার সর্বশ্রেষ্ট সাহিত্যিক বলে মনে করা হয়। তিনি বিশ্বকবি,কবিগুরু এবং গুরুদেব অভিধায় ভুষিত ছিলেন। বিশ্বকবির সৃষ্টিশীল কর্মগুলোর মধ্যে,- ৫২ টি কাব্যগ্রন্থ’, ৩৮ টি নাটক, ১৩ টি উপন্যাস, ৩৬ টি প্রবন্ধ এবং অন্যান্য গদ্যসংকলন প্রকাশিত হয়। তার সর্বমোট ৯৫ টি ছোট গল্প, ১৯১৫ টি গান যথাক্রমে গুল্পগুচ্ছ ও গীতবিতান সংকলনের অর্ন্তভুক্ত হয়েছে। রবীন্দ্রনাথের যাবতীয় প্রকাশিত ও গ্রন্থাকারে অপ্রকাশিত রচনা ৩২ খণ্ডে রবীন্দ্র রচনাবলী নামে প্রকাশিত হয়েছে। তার যাবতীয় পত্রসাহিত্য ১৯ খন্ডে চিঠিপত্র ও চারটি পৃথক গ্রন্থে প্রকাশিত হয়েছে। তিনি প্রায় দুই হাজার ছবি এঁকেছিলেন। তার রচনা বিশ্বের বিভিন্ন ভাষায় অনুদিত হয়েছে। বিশ্ব কবি তার জীবনের প্রায় সময় মৃত্যুকে স্মরণ করতেন। স্মরণ করতেন বিশ্বনিয়ন্তাকে যিনি অবিনশ্বর। কবি বিশ্বব্রমান্ডের মহান স্রষ্টার সান্নিধ্য লাভের একান্ত প্রয়াসে গীতাঞ্জলি কাব্যে আরো লিখেছেন,- “ আমার মাথা নত করে দাও হে তোমার / চরণ-ধুলার তলে।/ সকল অহঙ্কার হে আমার/ ডুবাও চোখের জলে।/ নিজেরে করিতে গৌরব দান,/ নিজেরে কেবলি করি অপমান,/ আপনারে শুধু ঘেরিয়া ঘেরিয়া/ ঘুরে মরি পলে পলে।/ সকর অহঙ্কার হে আমার / ডুবাও চোখের জলে।/ আমারে না যেন করি প্রচার/ আমার আপন কাজে;/ তোমারি ইচ্ছা কর হে পূর্ণ/ আমার জীবন মাঝে –।”
বিশাল দেহের অধিকারী রবীন্দ্রনাথ সারাজীবন সুস্বাস্থ্য ভোগ করলেও জীবনের শেষ দিকে রোগে কষ্ট পেয়েছিলেন। তিনি জীবনের শেষ চার বছর দীর্ঘস্থায়ী অর্শ রোগে ভুগেছিলেন। এ চার বছরে তিনি দু‘বার দীর্ঘ সময় অত্যন্ত অসুস্থ অবস্থায় শয্যাশায়ী ছিলেন। ১৯৩৭ সালে তিনি একবার জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলেন। এ সময় কোমায় চলে গিয়ে মৃত্যুকে অত্যন্ত কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন কবি। এ সময় থেকেই তার দীর্ঘকালীন অসুস্থতার সূত্রপাত। ১৯৪০ সালের শেষ দিকে আবার একই ভাবে তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। এবার আর সেরে উঠার সুযোগ পান নি। শেষের এ সময়কালের মধ্যে জীবনের শ্রেষ্ট কিছু কবিতাও রচনা করেন কবি। বিশ্ব কবি শেষ সময়ে দীর্ঘ রোগে ভোগেন এ কথা সত্য। এ সময় তার চিকিৎসায় শল্য চিকিৎসার জটিলতাও অন্যতম কারন বলে জানা যায়। অবশেষে কবি ২২ শ্রাবণ,১৩৪৮ বঙ্গাব্দ, ৭ আগস্ট ১৯৪১ তারিখে কলকাতার জোড়াসাঁকোয় অবস্থিত তার পৈত্রিক বাসভবনে প্রায় ৮০ বছর বয়সে ইহলোক ত্যাগ করেন। এ বাড়িতেই কবির জন্ম, এ বাড়িতে কবির বেড়ে ওঠা। এ দিনকে স্মরণ করে বাংলা ভাষাভাষী জগতে কবির মৃত্যুবার্ষিকী পরম শ্রদ্ধা ও ভাবগাম্ভীর্যের সাথে পালিত হয়ে আসছে। আজও আমরা তাকে স্মরণ করি তার কাব্যে,ছন্দে এবং তার সৃষ্টিকর্মে। আজ তার স্বরলিপি অনেকের মুখে মুখে,- “ যখন পড়বে না মোর পায়ের চিহ্ন এই বাটে, বাইব না মোর খেয়াতরী এই ঘাটে, চুকিয়ে দেব বেচা-কেনা, মিটিয়ে দেব লেনা-দেনা, বন্ধ হবে আনাগোনা এই হাটে- আমায় তখন নাই বা মনে রাখলে,তারার পানে চেয়ে চেয়ে নাই বা আমায় ডাকলে — ।

x