রবীন্দ্রনাথ : আমাদের বিশ্বকবি

ফেরদৌষ আরা আলীম

শনিবার , ২৭ এপ্রিল, ২০১৯ at ১১:১০ পূর্বাহ্ণ
33

বঙ্গাব্দের বৈশাখের একহাতে বাঙালির নববর্ষ, অন্য হাতে রবীন্দ্রনাথ। বৈশাখ সে অর্থে আমাদের দিন গোণার মাস। তার ঝিমধরা, ঘোরলাগা তাপদগ্ধ এবং তপঃক্লিষ্ট দিন একটি একটি করে গুণতে গুণতে আমরা পঁচিশের অসীম দিনটিতে পৌঁছে যাই। ২৫ শে বৈশাখ, আমাদের সব্যসাচী লেখক বলতেন, বাঙালি জাতির জন্মদিন। মানতেই হবে। কারণ এ জাতির প্রতীক তিনি। প্রতিভূও বটে। সেইসঙ্গে বিশেষভাবে ‘নারীর প্রতি পুরুষের উদার, শোভন ও সমতাভিত্তিক দৃষ্টিভঙ্গি’ প্রবর্তনে তাঁর পৌরোহিত্য গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করি। একটা প্রাথমিক দৃষ্টান্ত হয়ে যাক।
১৮৮৯ এর নভেম্বরে, একাদশবর্ষীয়া ভবতারিণীর (পরবর্তীকালে মৃণালিনী) পাণিগ্রহণের প্রায় ছ’বছর পরে শিলাইদহে সপরিবারে এলেন কবি। এক ‘সন্ধ্যাসূর্যালোকে স্বপ্নের মতো আলো-আঁধারিতে’ যে অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হলেন তার কথা জানাচ্ছেন ভ্রাতুষ্পুত্রী ইন্দিরাকে। ৫ম বর্ষীয়া এই কন্যার মুখ দেখে সতের বছরের রবীন্দ্রনাথ একদা লিখেছিলেন ‘আছে মা তোমার মুখে স্বর্গের কিরণ।’ পত্রধারায় ‘ছিন্নপত্র’ পর্যায়ে যে চিঠিগুলি আমাদের অমূল্য সম্পদ (নষ্ট জলবায়ুর কারণে বাংলার ভূগোল যদি অন্ধকারের কোনও মরুঝড়ে নিশ্চিহ্ন বা বিলুপ্ত হয়ে যায় ছিন্নপত্রে তাকে খুঁজে পাবেই বাঙালি) তার অধিকাংশই কিশোরী ইন্দিরাকে লেখা। কবি লিখছেন, ‘… প্রকাণ্ড চর-ধু ধু করছে — কোথাও শেষ দেখা যায় না। সন্ধ্যে বেলা এই বৃহৎ চরের মধ্যে ছাড়া পেয়ে অনুচরসমেত ছেলেরা একদিকে যায়, বলু (বলেন্দ্র নাথ ঠাকুর) একদিকে যায়, আমি একদিকে যাই, দুটি রমণী (তন্মধ্যে একজন মৃণালিনী দেবী) আর একদিকে যায়। ইতিমধ্যে সূর্য সম্পূর্ণ অস্ত যায় অন্ধকারে…কোথায় বালি, কোথায় জল, কোথায় পৃথিবী, কোথায় আকাশ…সবটা জড়িয়ে ভারি একটা অবাস্তব মরীচিকা জগতের মতো বোধ হয়।…’
বোটে ফিরে কবি দেখেন দলের ছেলেরা ফিরেছে কিন্তু বলু নেই, মেয়েরাও নেই। কিছুক্ষণ অন্যত্র মনোনিবেশ করতে গিয়েও যখন পারলেন না তখন তাঁরা দলবেঁধে এক এক দিকে বেরুলেন। কবি জানাচ্ছেন, ‘আমি একদিকে ‘বলু’ ‘বলু’ করে চিৎকার করছি, প্রসন্ন আর একদিকে ডাক দিচ্ছে ‘ছোটে মা’ — মাঝে মাঝে শোনা যাচ্ছে মাঝিরা ‘বাবু’ ‘বাবু’ করে ডুকরে ওঠছে।….কারও সাড়াশব্দ নেই।’
কবির মনে তখন নানা ভাবনা। ভাবছেন, ‘আত্মরক্ষা অসামর্থ যারা নিশ্চিন্তে ঘটায় তারা পরের বিপদ।’ স্ত্রী-স্বাধীনতার বিরুদ্ধে যখন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ হয়ে উঠেছেন তিনি তখনই খবর এল এঁরা চড়ার ওপারে আটকা পড়েছেন। এবারে বোট গেল; ‘বোট-লক্ষ্মী’ ফিরলেন। কবি লিখছেন, সকলেই অনুতপ্ত, শ্রান্ত কাতর সুতরাং আমার ভালো ভালো উপাদেয় ভর্ৎসনা-বাক্য হৃদয়েই রয়ে গেল-পরদিন প্রাতঃকালেও কোনোমতেই রাগতে পারলুম না।’ কবির এই শোভন, সুন্দর, মমতাময় দৃষ্টিভঙ্গির প্রসাদ পেয়েছে তাঁর নারীচরিত্র রবীন্দ্রসাহিত্য জুড়ে।
আমাদের এই ভূখণ্ড রবীন্দ্রনাথকে এবং তাঁর সৃজনশীলতাকে নানাভাবে অনুপ্রাণিত করেছে, উজ্জীবিত করেছে। তাঁর বিশাল সাহিত্যকীর্তির অধিকাংশ লেখা হয়েছে পদ্মাবক্ষে, শিলাইদহের বোটে, কুঠি বাড়িতে, গোরাই, আত্রাই, ইছামতি, নাগরনদী ও চলনবিলের উপরে ভেসে চলা বজরায়। রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর লিখেছেন, ‘শিলাইদহে থাকাকালেই সম্ভবতঃ বাবা সবচাইতে বেশি পরিমাণে লিখেছেন—কবিতা, গান, ছোটগল্প, ভাষণ, প্রবন্ধ। দিনভর তিনি কাজ করেছেন, প্রায়ই গভীর রাত অবধি। চারপাশে সবুজ সতেজ মাঠ, নুয়ে পড়া বাঁশঝাড়ের নীচে ঘুম ঘুম গ্রাম….’। কবি নিজেও অসংখ্যবার ঋতুতে ঋতুতে পদ্মার আতিথেয়তা গ্রহণের কথা বলেছেন। পদ্মাবক্ষে বোটে ‘বাতায়নবর্তী’ রবীন্দ্রনাথ নদীর দুধারে স্নানরতা গ্রাম্য মেয়েদের, বধূদের দেখেছেন। তাদের কাপড় কাচতে দেখেছেন। ভিজে কাপড়ে একমাথা ঘোমটা টেনে (বাম) কাঁখে জলের কলসী নিয়ে ডান হাত দুলিয়ে চলে যেতে দেখেছেন। অন্যত্র লিখেছেন “…. মেয়েদের যেন জলের সঙ্গে বেশি ভাব। পরস্পরের যেন একটা সাদৃশ্য এবং সখিত্ব আছে। জল এবং মেয়ে উভয়েই বেশ সহজে ছল্‌্‌ছল্‌্‌ জ্বলজ্বল করতে থাকে… আমি দেখেছি মেয়েরা জল ভালবাসে, কেননা উভয়ে স্বজাত। অবিশ্রাম সহজ প্রবাহ এবং কলধ্বনি, জল এবং মেয়ে ছাড়া আর কারো নেই।’ ঘাটের এই মেয়েদের উচ্চহাসি, মিষ্টি কণ্ঠস্বর এবং ছোটো ছোটো কথাবার্তা’কে কবির মনে হয়েছে ‘নারকেল পাতার ঝুরঝুর কাঁপুনি, আমবাগানের ঘনছায়া এবং প্রস্ফূটিত সর্ষে ক্ষেতের গন্ধের মতো– বেশ সাদাসিধে অথচ সুন্দর এবং শান্তিময়…।’ বলেছেন, ‘বাংলার যদি কতকগুলো মেয়েলি রূপকথা জানতুম এবং সরলছন্দে সুন্দর করে ছেলেবেলাকার ঘোরো স্মৃতি দিয়ে সরস করে লিখতে পারতুম, তাহলে ঠিক এখানকার উপযুক্ত হত।’ বাংলার মেয়েদের নিয়ে এমন মিষ্টিমধুর ভাবনারাশিকে এক বছরের মধ্যে এর বিপরীত ভাবনায় ক্ষতবিক্ষত হতে দেখেছি। ছিন্নপত্রেরই আরেক চিঠিতে কবি লিখছেন, ‘গৃহস্থের মেয়েরা ভিজে শাড়ি গায়ে জড়িয়ে ঠাণ্ডা হাওয়ায় বৃষ্টির জলে ভিজতে ভিজতে হাঁটুর উপর কাপড় তুলে জল ঠেলে সহিষ্ণু জন্তুর মতো ঘরকান্নার নিত্যকর্ম করে যায়– সে দৃশ্য কোনোমতেই ভালো লাগে না।’ ভালো না লাগার বিষয়টি নিয়ে কবি যে কতটা ভেবেছেন ‘সহিষ্ণু জন্তু’র মতো নারীকে কোন মর্যাদায় মহিমান্বিত করেছেন শাস্তি গল্পের ‘চন্দরা’ তার প্রমাণ। পরবর্তীকালের রবীন্দ্রনাথ নারীমুক্তি নিয়ে, নারীপ্রগতি নিয়ে উল্লেখযোগ্য গল্প-কবিতা লিখেছেন, চরিত্র নির্মাণ করেছেন। কিন্তু প্রগতির ধ্বজাধারী নারীকে তার মানসমুক্তির নান্দনিক স্তর থেকে অর্থনৈতিক মুক্তির স্তরে মুক্তি দিতে পারেন নি কবি। বিদ্রোহী মৃণালের বিদ্রোহকেও আমরা সাত্ত্বিকথায় পৌঁছে যেতে দেখি। একমাত্র চন্দরা স্বামীর নির্দেশ কেমন হেলাফেলায় মাথায় তুলে নিয়ে পূর্ণতার দিকে এগিয়ে যায়। আর সে বদলায় না। তাকে বদলানো যায় না। যে সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে কবির জন্ম ও বেড়ে ওঠা, যে ভাবনা-বলয় থেকে তাঁর জেগে ওঠা সেখান থেকে বিশ্বময় কতদূর ব্যাপ্ত হলে, কতটা গভীরে পৌঁছুতে পারলে একজন রবীন্দ্রনাথ হওয়া সম্ভব তিনি তা দেখিয়েছেন তাঁর জীবনে, তাঁর কর্মে, তাঁর সৃজনে।
এই রবীন্দ্রনাথই আমাদের বিশ্বকবি। আমাদের বিশ্বটাকে আমরা তাঁর মধ্যেই পেয়েছি। আশ্চর্য এই, এখনও পাই। অন্তত আমার মতো কূপমণ্ডুক এখনও যাদের ঘর হতে আঙ্গিনা বিদেশ তার স্বদেশ-বিদেশ সবই তো তিনি। আর দেশপ্রেম? ১৮৯৩ সালের ১১ মে অর্থাৎ ঠিক এমন দিনে (মাত্র ১৫ দিনের ব্যবধানে) কবি লিখছেন, আজ সকাল বেলাটি বড়ো সুন্দর হয়ে উঠেছে… এই রকম সকালবেলায়…শরীরটা ছড়িয়ে দিয়ে সমস্ত কাজ ফেলে চুপচাপ করে পড়ে থাকতে ইচ্ছে করে। মনে হয়,
‘নাই মোর পূর্বাপর
যেন আমি একদিনে উঠেছি ফুটিয়া
অরণ্যের পিতৃমাতৃহীন ফুল।
যেন আমি এই আকাশের, এই নদীর, এই পুরাতন শ্যামল পৃথিবীর।…’
১৬ই মে তে লিখছেন, ‘আমি প্রায় রোজই মনে করি, এই তারাময় আকাশের নীচে আবার কি কখনও জন্মগ্রহণ করব? আর কি কখনও এমন প্রশান্ত সকালবেলায় এই নিস্তব্ধ গোরাই নদীটির উপর, বাংলাদেশের (আহা, বাংলাদেশ!)এই সুন্দর একটি কোণে এমন নিশ্চিন্ত মুগ্ধ মনে… পড়ে থাকতে পারব। হয়তো আর কোনো জন্মে এমন একটি সন্ধ্যেবেলা আর কখনও ফিরে পাব না। তখন কোথায় দৃশ্য পরিবর্তন হবে আর কি রকম মন নিয়েই বা জন্মাব!’ আমার স্বদেশপ্রেম কি এই ভাষাজলে নিত্য সতেজ, নিত্য শুদ্ধ হয়ে ওঠে না?
এক বর্ষায়, বর্ষার দিনের বর্ণনায় কবি লিখেছেন, ‘…এত জলও আকাশে ছিল! ….কাল সমস্তরাত তীব্র বাতাস পথের কুকুরের মতো হু হু করে কেঁদেছিল। আর বৃষ্টিও অবিরাম চলেছে। মাঠের জল ছোটো ছোটো নির্ঝরের মতো নানা দিক থেকে কলকল করে নদীতে এসে পড়ছে…।’ এমনিভাবে প্রতিটি ঋতু আমাদের মনের মধ্যে বাসা বেঁধে রয়েছে বলেই (তিনি সে বাসা গড়েছেন বলে) ছোবলোদ্যত নষ্ট জলবায়ুর খপ্পর থেকে ঋতুদের জন্য ভাবতে ইচ্ছে করে। কোথায় পেতাম এমন বিশ্ব? এমনি ভাবে ‘নারীর বিশ্ব’ও আমরা তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছি। পেয়েছি বলেই বিশ শতকের শেষ প্রান্তে এসে বলতে পেরেছি, ‘নারীর’ চোখে বিশ্ব দেখুন।’ (সে বছর নারী দিবসের প্রতিপাদ্য ছিল এই।)
বিশ্বজনীনতার বিশ্বটির ঠিকানাও তিনি বাতলে দিয়েছিলেন। তাঁর বৈশ্বিক বিস্তৃতিতে প্রকৃতি ও মানুষের মধ্যে সুনিবিড় যোগে গড়ে ওঠা একক বিশ্বে ঐক্য স্থাপনের সূত্রটি ঈশ্বর স্বয়ং। এমন জীবনদর্শনে ক্ষুদ্র ধর্মবোধ নেই, উগ্র জাতীয়তাবাদ নেই। নিউজিল্যান্ডের ক্ষত না শুকোতেই শ্রীলঙ্কায় যা ঘটে গেল এসবই তো সভ্যতার সঙ্কট। তিনি কি সাবধানবাণী দিয়ে যান নি? আর এই সব কিছু মিশিয়েই তো বিশ্বকবি তিনি। ১৫৮তম জন্মদিন উপলক্ষে তাঁকে স্মরণ করি অপার শ্রদ্ধায়, ভালবাসায়।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও অধ্যাপক

x