রবীন্দ্রনাথের ভাবনায় বর্ষা : কথা-কবিতা-গানে

অরুণ দাশগুপ্ত

শুক্রবার , ১৯ জুলাই, ২০১৯ at ৮:৪৪ পূর্বাহ্ণ
61

অনেকেই মনে করেন, গান জিনিসটা কেবল শোনার বিষয়। আর বিষয়টি হলো বিনোদনের জন্যে। বিনোদনের কথা উঠলে মনে এলেই সেটা অনেকটা খানিকটা সময় কাটানোর ব্যাপারটি আপনা থেকেই এসে যায়। কিন্তু তাঁরা ভুলে যান গান শুধু কানের তৃপ্তি নয়, মনের এক ধরনের সন্তুষ্টিও আছে, যা উপলব্ধি ব্যাপারটির সঙ্গে জড়িত। কারণ গান শুধু মন রাঙানো সুর নয়, তার সঙ্গে ‘ভাব’-এর ব্যাপারটিও আছে, সংগীতের দুটো অংশ ভাব ও রূপ, অর্থাৎ কথা বা বাণী ও সুর। এই দুই অংশের সমানুপাত ঘটলেই সংগীতের সৃজন ঘটে’। গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের গান নিছক বিনোদনের জন্য গভীর মনোযোগ দিয়ে কথাটি সর্বাংশে উপলব্ধ হয়। তাঁর ঋতুর গানগুলোতে এ বিষয়টি বিশেষভাবে অভিব্যক্ত হয়েছে। কারণ রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু বর্ষা। তাঁর ‘শেষ সপ্তক’ কাব্যের পাঁচ সংখ্যক কবিতায় কবি বলেছেন,
‘বর্ষা নেমেছে প্রান্তরে অনিমনে;
ঘনিয়েছে সার-বাঁধা তালের চূড়ায়,
রোমাঞ্চ দিয়েছে বাঁধের কালো-জলে।
বর্ষা নামে হৃদয়ের দিগন্তে
যখন পারি তাকে আহ্বান করতে।

সজল মেঘ-শ্যামলের
সঞ্চরণ থেকে বঞ্চিত জীবনে
কিছু শীর্ণতা রয়ে গেল।
বনস্পতির অঙ্গের আরতি
ওই তো দেয় বাড়িয়ে
বছরে বছরে
তার কাষ্ঠফলকে চক্রচিহ্নে স্বাক্ষর যায় রেখে।
তেমনি করে প্রতি বছরে বছরে
আমার মজ্জার মধ্যে রসসম্পদ
কিছু যোগ করে।
এই রসসম্পদে পূর্ণ ছিল তাঁর সমগ্র কবি জীবন।
রবীন্দ্র জীবন সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল সকলেই জানেন প্রকৃতির ছয়টি ঋতুর মধ্যে বর্ষাই ছিল তাঁর সর্বাধিক প্রিয়। রবীন্দ্রনাথের কবি কল্পনাকে সবচেয়ে বেশি উল্লাসিত ও আবিষ্ট করে রেখেছিল কবি জীবনের উন্মেষকাল থেকে অবসান কাল পর্যন্ত। তার ‘জীবন স্মৃতি’ গ্রন্থের ‘বর্ষা ও শরৎ’ নিবন্ধে তাঁর বালক-বয়সের স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলছেন, ‘বাল্যকালের দিকে যখন তাকাইয়া দেখি তখন সকলের চেয়ে স্পষ্ট করিয়া তখনকার বর্ষার দিনগুলি। বাতাসের বেড়ো জলের ছাঁটে বারান্দা একেবারে ভাসিয়া যাইতেছে, সারি সারি ঘরের সমস্ত দরজা বন্ধ হইয়াছে, প্যারীবুড়ি কক্ষে একটি বড় ঝুড়িতে তরিতরকারি বাজার করিয়া ভিজিতে ভিজিতে জলকাপা ভাঙিয়া আসিতেছে আমি বিনা কারণে দীর্ঘ বারান্দায় ছুটিয়া বেড়াইতেছি। আর মনে পড়ে, ইস্কুলে গিয়াছি, দরমায় ঘেরা দালানে আমাদের ক্লাস বসিয়াছে; অপরাহ্নে ঘর ঘোর মেঘের স্তূপে স্তূপে আকাশ ছাইয়া গিয়াছে। দেখিতে দেখিতে নিবিড় ধারায় বৃষ্টি নামিয়া আসিল; থাকিয়া থাকিয়া দীর্ঘ একটানা মেঘ ডাকার শব্দ; আকাশটাকে যেন বিদ্যুতের নখ দিয়া এক প্রান্ত হইতে আর এক প্রান্ত পর্যন্ত কোন্‌্‌ পাগলী ছিঁড়িয়া ফাড়িয়া ফেলিতেছে; বাতাসের দমকায় দরমার বেড়া ভাঙিয়া পড়িতে চায়; অন্ধকারে ভালো করিয়া বইরের অক্ষর দেখা যায় না- পণ্ডিত মশায় পড়া বন্ধ করিয়া দিয়াছেন; বাইরের ঝড়-বাদলটার উপরেই ছুটাছুটি, মাতামাতির বরাত দিয়া বন্ধ ছুটিতে বেঞ্চির উপরে বসিয়া পা দুলাইতে দুলাইতে মনটাকে তেপান্তরের মাঠ পার করিয়া দৌড় করাইতেছি। আরো মনে পড়ে শ্রাবণের গভীর রাত্রি, ঘুমের ফাঁকের মধ্য দিয়া ঘন বৃষ্টির ঝমঝম শব্দ মনের ভিতরে সুপ্তির চেয়েও নিবিড়তর একটা পুলক জমাইয়া তুলিতেছে; একটু যেই ঘুম ভাঙিতেছে মনে মনে প্রার্থনা করিতেছি, সকালেও যেন বৃষ্টির বিরাম না হয় এবং বাহিরে গিয়া যেন দেখিতে পাই, আমাদের গলিতেই জল দাঁড়াইয়াছে এবং পুকুর ঘাটের একটি ধাপও আর জাগিয়া নাই।”
উপরোক্ত শব্দ চিত্রটিতে সদ্য যৌবনপ্রাপ্ত অপূর্ব ভাবকল্পনা, বৈচিত্র্যে ঋদ্ধ ও উপভোগ্য করে তুলেছেন তাতেই বোঝা যায় ছেলেবেলাতেই বর্ষার সঙ্গে তাঁর মনের মিতালী কতটা গভীর ছিল।
‘বিবিধ প্রসঙ্গে’র ‘বসন্ত ও বর্ষার’ নিবন্ধে এ দুই ঋতুর তুলনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ বলছেন,
‘বসন্ত উদাসীন, গৃহত্যাগী। বর্ষা সংসারী, গৃহী। বসন্ত আমাদের মনকে চারিদিকে বিক্ষিপ্ত করিয়া দেয়, বর্ষা তাহাকে এক স্থানে ঘনিভূত করিয়া রাখে। বসন্তে আমাদের মন অন্তঃপুর হইতে বাহির হইয়া যায়, বাতাসের উপর ভাসিতে থাকে, ফুলের গন্ধ মাতাল হইয়া জোৎস্নার মধ্যে ঘুমাইয়া পড়ে; আমাদের মন বাতাসের মতো, ফুলের গন্ধের মতো, জ্যোৎস্নার মতো লঘু হইয়া চারিদিকে ছড়াইয়া পড়ে। বসন্তেত বহির্জগৎ গৃহদ্বার উদ্ঘাটন করিয়া আমাদের মনকে নিমন্ত্রণ করিয়া লইয়া যায়। বর্ষায় আমাদের মনের চারিদিকে বৃষ্টিজলের যবনিকা টানিয়া দেয় মাথার উপরে মেঘের চাঁদোয়া খাটইয়া দেয়। মন চারিদিক হইতে ফিরিয়া আসিয়া এই যবনিকার মধ্যে এই চাঁদোয়ার তলে একত্র হয়। পাখির গানে আমাদের মন উড়াইয়া লইয়া যায়, কিন্তু বর্ষার বজ্রসংগীতে আমাদের মনকে মনের মধ্যে স্তম্ভিত করিয়া রাখে। পাখির গানের মতো এই গান লঘু, তরঙ্গময় বৈচিত্র্যময় নহে, ইহাতে স্তব্ধ করিয়া দেয়, উচ্ছ্বসিত করিয়া তুলে না। অতএব দেখা যাইতেছে বর্ষাকালে আমাদের ‘আমি’ গাঢ়তর হয় আর বসন্তকালে সে ব্যাপ্ত হইয়া পড়ে।”
নিবন্ধটির উপসংহারে কবি বলেছেন- “বর্ষাকাল তোমাকে তোমার বঞ্চিত হিত অর্পণ করুক। বর্ষাকাল তো সুখের জন্য নহে। ইহা মঙ্গলের জন্য। বর্ষাকাল উপভোগের বাসনা হয় না, ‘স্বয়ং’ এর মধ্যে একটা অভাব অনুভব হয়, একটা অনির্দিশ্যে বাঞ্ছা জন্মে’। নিবন্ধটিতে বর্ষাপ্রকৃতির বিচিত্র রূপসজ্জার ছবি অত্যন্ত নিপুণ হাতে এঁকেছেন রবীন্দ্রনাথ।
কবিতাতেও দেখা যায় বর্ষার প্রতি কবির এ ধরনের অনুরাগ। তাঁর ‘মানসী’ কাব্যের ‘বর্ষার দিনে’ ও মেঘের খেলা’ দু’টি কবিতাই ‘বর্ষা’। বিষয়টি রয়েছে। ‘বর্ষার দিনে’র প্রথম তিনটি স্তবক তিনি সুরারোপ করে গানেও রূপান্তর করেছেন। ‘বর্ষার দিনে’ কবিতার এ তিন স্তবক হলো-
এমন দিনে তারে বলা যায়,
এমন ঘন ঘোর বরিষায়।
এমন মেঘস্বারে বাদল-ঝরঝরে
আপনহীন তমসায়।

সে কথা শুনিবে না কেহ আর,
নিভৃত নির্জন চারিধার।
দু’জন মুখোমুখি গভীর দুঃখ-দুখী,
আকাশে জল ঝরে অনিবার

সমাজ সংসার মিছে সব,
মিছে এ জীবনের কলরব।
কেবল আঁখি দিয়ে আঁখির সুধা পিয়ে
হৃদয়ে হৃদি দিয়ে অনুভব।
আঁধারে মিশে গেছে আরসব।
‘ঘন ঘোর বরিষায়’ মনে পড়ছে ‘তারে’ যিনি কবির কথা শুনবেন। এমন কথা যে কথা আর কেউ শুনবে না, একদম একান্তে। গানটি যে বৈষ্ণব পদাবলীর ছায়াপাত ঘটেছে। রাধার বিরহী চিত্ত যেন তাঁর প্রেমিকের সঙ্গ পাওয়ার আর্তিতে সমাজ সংসারকে তুচ্ছ করে বেরিয়ে পড়তে চায়। উপরোক্ত গানটি মিশ্র মল্লার রাগের। মল্লারের সঙ্গে মিশেছে ‘দেশ’ রাগ।
‘মানসী’ কাব্যের বর্ষা বিষয়ক দ্বিতীয় কবিতা ‘মেঘের খেলা’য় কবির বর্ষা প্রীতির প্রকাশ ঘটেছে মেঘের লীলা-খেলার কবি কল্পনায়
কবি বলছেন,
স্বপ্ন যদি হ’ত জাগরণ,
সত্য যদি হ’ত কল্পনা,
তবে এ ভালবাসা হ’ত না হত-আশা
কেবল কবিতার কল্পনা।
মেঘের খেলা-সম ইজ সব
মধুর মায়াময় ছায়াময়।
কেবল আনাগোনা নীরবে জানাশোনা,
জগতে কিছু আর কিছু নয়।
কবিতাটিতে যখন বলা হয় ‘হত-আশা’ কথাটি উচ্চারিত হয়, বর্ষাপ্রকৃতি এক বিরহ বিচ্ছিন্ন মানুষের বেদনাকেই ফুটিয়ে তুলেছে।
বর্ষার আর একটি অনুপম কবিতা কবিগুরুর ‘কল্পনা’ কাব্যগ্রন্থের ‘বর্ষামঙ্গল’। কবিতাটি লেখা হয় ১৭ বৈশাখ ১৩০ বঙ্গাব্দে। কবির বয়স তখন-৩৬ বছর।
ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে
জলসিঞ্জিত ক্ষিতি সৌরভরসে
ঘনগৌরবে নবযৌবনা বরষা
শ্যামগম্ভীর সরসা

গুরুগর্জনে নীল অরণ্য শিহরে,
উতলা কলাপী কেকা কলরব বিহরে।
নিখিলচিত্ত হরষা
ঘনগৌরবে আসিছে মত্ত বরষা

আলো মৃদঙ্গ, মুরজ, মুরালী মাধুরা,
বাজাও শঙ্খ হুলুরব করো বধূরা
এসেছে বরষা, ওগো নব-অনুরাগিনী
ওগো প্রিয়সুখ ভাগিনী।

এসেছে বরষা, এসেছে নবীনা বরষা,
গগন ভরিয়া এসেছে ভুবন ভরসা-
দুলেছে পবনে সনসন বনবীথিকা,
গীতময় তরুলতিকা।

শতেক যুগের কবি দলে মিলি আকাশে
ধ্বনিয়া তুলিছে মত্তমদির বাতাসে
শতেক যুগের গীতিকা
শত শত গীত মুখরিত বনবীথিকা।
কবিতাটি রচনাকালে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের কল্পনাপ্রবণ মন প্রাচীন ভারতের সৌন্দর্য সমুজ্জল ঐতিহ্য-মহিমায় গভীরভাবে আপ্লুত, বিশেষ করে কবি কালিদাসের কাব্য-নাটকের রসে মগ্ন রয়েছেন সানন্দে। কালিদাসের নববর্ষা-সমাগমের আনন্দ উল্লাসময় বর্ণনা রবীন্দ্রনাথের ‘বর্ষামঙ্গল’ কবিতায় খানিকটা প্রতিফলিত হয়েছে, একই সঙ্গে কবির নিজের দেখা বর্ষা ছবিও মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বর্ষার কল্পনা-রঞ্জিত রূপে। ১৩৩২ সালের ভাদ্র মাসে জোড়াসাঁকোর বিচিত্রা ভবনে অভিনীত ‘শেষবর্ষণ’ নাটকের জন্যে এই কবিতার সাতটি স্তবকের মধ্যে প্রথম চারটি ও শেষটি নিয়ে একটি গান তৈরি করে সুরারোপ করা হয়। এতে কবিতার গীতায়ন যেমন সংহত হয়, তেমনি আরো উজ্জ্বল বর্ণময় হয়ে উঠে শব্দ ঝংকৃত বাণীর ঐশ্বর্য এবং চিত্রকল্পগুলো। কবিতাটি রচিত হয়েছে ছয় মাত্রার মাত্রাবৃত্ত ছন্দে। আর গানের বেলায় প্রথম স্তবকটিকে সুরে বাঁধা হয়েছে চার মাত্রার পর্বভাগে ষোল মাত্রার ত্রিতালের ছন্দে। সুরারোপ করা হয়েছে কাফি-কানডায়। ঘনঘটাচ্ছন্ন নববর্ষা সমাগমের ভাষাচিত্রের সঙ্গে এই ধীর লয়ের ছন্দ এই তীর লয়ের ছন্দ এবং কবি কানাডা সুরের প্রয়োগ-নৈপুণ্য যুক্ত হয়ে স্তবকটিতে এক উদাত্ত গম্ভীর বর্ষা পরিবেশ সৃষ্টি করা হয়েছে।
এবার ‘ক্ষনিকা’ কাব্যের ‘নববর্ষা’ কবিতাটির গীতরূপ নিয়ে কিছু আলোচনা করা যেতে পারে। কবিতাটি কবি লিখেছিলেন ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৩০৭ বঙ্গাব্দে; তাঁর ৩৯ বছর বয়সে। ‘হৃদয় আমার নাচে রে আজিকে ময়ূরের মতো নাচে রে’ কবিতাটি দীর্ঘ বর্ণনাবহুল চিত্ররূপময়। এর এক একটি স্তবকে নয়টি চরণ এবং আটটি স্তবকে কবিতাটি সম্পূর্ণ হয়েছে। ১৩৪২ সালে কবিতাটি গানে রূপ দিতে গিয়ে কবি বেছে নিলেন শুধু প্রথম ও ষষ্ঠ স্তবক পুরাপুরি ও অষ্টম স্তবকের শেষ চারটি পংক্তি। ‘বর্ষামঙ্গল কবিতা’ গানটিতে রয়েছে অভ্যাগত বর্ষাকে সমবেতভাবে বরণের আনন্দোচ্ছ্বাস, আর ‘নববর্ষা’ কবিতা-গানটিতে অনুভূত হলো ব্যক্তি হৃদয়ের হর্ষোদ্বেলতা। শব্দ ঝংকৃত বাণী এবং উদাত্ত সুর মিলে বর্ষা উপভোগের গান দুটিকে খুবই প্রাণোচ্ছল করে তুলেছে।
‘নববর্ষা’ গানটি আগের গানের ‘উতলা কলাপি কেকা কলরব বিহরে’র সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যেন গেয়ে উঠল-‘হৃদয় আমার নাচেরে আজিকে ময়ূরের মতো নাচরে।’ এগানে কবি প্রয়োগ করলেন ‘ইমন’ রাগ। ‘ইমন’ যদিও শাস্ত্র নির্দিস্ট বর্ষার রাগ নয়, তবু উল্লাস-উদ্দীপনা সঞ্চারের সুর হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ‘ইমন’-কে নিপুণভাবে প্রয়োগ করলেন গানের ভাববস্তু বিকাশের দিকে লক্ষ রেখে, আর তাতেই বেড়ে গেল গানটির উজ্জ্বল্য ‘নববর্ষা’ কবিতাটি ষন্মাত্রিক পর্বে মাত্রাবৃত্ত ছন্দে রচিত। কিন্তু গীতরূপে এর শব্দগুলোকে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে লঘু গুরু রীতিতে উচ্চারণ করে এক ভিন্নতর ধ্বনি-বৈচিত্র্যের সৃষ্টি করা হয়েছে। আর সে কারণে গানটিকে বাঁধা হয়েছে চতুর্মাত্রিক কাহারবা তালে। প্রাণচাঞ্চল্যে এই গানটি স্বত:স্ফূর্ত আবেগে সত্যিই ময়ূরের মতো নেচে উঠেছে। এই প্রাণোদ্বেল রূপ আরো বেশি করে প্রকাশ পেয়েছে সুরের তারসপ্তকে সঞ্চরনের মধ্য দিয়ে।
রবীন্দ্রনাথ ১২৯৯ বঙ্গাব্দের ২ আষাঢ় তারিখে ভ্রাতুস্পুত্রী ইন্দিরা দেবীকে এক চিঠিতে লিখেছেন-“হাজার বছর পূর্বে কালিদাস সেই যে আষাঢ়ের প্রথম দিনকে অভ্যর্থনা করেছিলেন এবং প্রকৃতির সেই রাজসভায় বসে অমর ছন্দে মানবের বিরহ সঙ্গীত গেয়েছিলেন, আমার জীবনেও প্রতি বৎসরে আষাঢ়ের প্রথম দিন তার সমস্ত আকাশ-জোড়া ঐশ্বর্য্য নিয়ে উদয় হয়” এই চিঠিতে ব্যক্ত সানন্দ অনুভব গীতরূপ পেয়েছে কবির ৬১ বছর বয়সে লেখা (আষাঢ় ১৩ ২৯) ‘বহু যুগের ওপার হতে আষাঢ় এলো আমার মনে’ গানটিতে। এ গানে কবি কেবল কালিদাস আর তাঁর “মেঘদূতের” সমকালীন বর্ষণমুখর আষাঢ়ের রমণীয় পরিপার্শ্বের মনোরম ভাষাচিত্রই তুলে ধরেননি, একই সঙ্গে জড়িত বিরহ-মিলনের ভাবাবেগ যে তাঁর মুগ্ধ মনেও সঞ্চারিত হয়েছে এবং বহু যুগ পূর্বের বিরহী ও বিরহিনীর উদ্বেগী প্রতীক্ষার রোমাঞ্চিত অনুভূতির আবেদন তাঁর যুগেও এতটুকুও কমেনি-এই পরিতৃপ্তিটুকুও ফুটিয়ে তুলেছেন। গানটির সুর ‘কেদারা’ ও তাল হলো ‘কাহারবা’। ‘কেদারা’ বর্ষার রাগ নয়, কিন্তু কবি শাস্ত্রনির্দিষ্ট কেদারা প্রয়োগ করলেন গানের বাণীতে স্ফূর্ত উদাক্ততা সৃষ্টির জন্যে। ‘কেদারা’ সুরের প্রকৃতিতেও সেই উদাত্ততা রয়েছে।
কবির রচিত আষাঢ়ের আর একটি গান ‘আষাঢ়’, কোথা হতে আজ পেলি ছাড়া।’ তাঁর ৬২ বছর বয়সে লেখা এই গানটিতে আমরা পাই ঘনঘটাচ্ছন্ন আষাঢ়ের আগমনে কবির সহর্ষ উল্লাস। সুর প্রযুক্ত হলো মিশ্রমল্লার। স্থায়ীতে ‘আষাঢ়’ সম্বোধনটি এবং ‘কোথাহতে’ কৌতূহলী প্রশ্নটি চমকে দেয় প্রথমে। তার পরন্তরা, সহযাত্রী ও আভোগ অংশে পাওয়া গেল আষাঢ়ের কবির প্রমত্তরূপ যা উপভোগ্য। বিশেষ করে পুঞ্জ পুঞ্জ মেঘে আচ্ছন্ন করে সমাগত আষাঢ়। রবীন্দ্রনাথ তাকে কালিদাসের বিরহী যজ্ঞের মতো স্বাগত জানালেন না, জানালেন আষাড়ের অভ্যুদয়ে সহর্ষ উল্লাস।
রবীন্দ্রনাথের চৌষট্টি বছর বয়সে (১৩৩২) লেখা ‘শেষ বর্ষণ নাটিকার অন্তর্ভুক্ত ‘বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ় তোমার মালা’ গানে আষাঢ়ের মধ্যে একই সঙ্গে পৌরুষ ও লালিত্য এই দুই রূপই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। তাই এই গানের প্রসঙ্গে ‘শেষবর্ষণে’ নটরাজ বলছেন-“মধুরের সঙ্গে কঠোরের মিলন হলে তবেই হয় হরপার্বতীর মিলন, সেই মিলনের গানটি ধরো”। এর আগে ‘আষাঢ় কোথা হতে আজি পোলি ছাড়া’ গানে আমরা দেখেছি আষাঢ়ের বিপুল বিক্রমে জয়ধ্বজা উড়িয়ে গুরু গুরু ধ্বনিতে আবির্ভাব। কিন্তু রবীন্দ্রনাথের দৃষ্টিতে সেই উদ্দাম রূপই আষাড়ের একমাত্র পরিচয় নয় কাঠিন্য আর মাধুর্যের সমন্বয়ই আষাঢ়ের পূর্ণ পরিচয়। ‘বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা’ গানটিতে আষাঢ়ের উক্ত দুইরূপই আমরা পাই। উভয় রূপের কবিত্বময় বর্ণনা আমাদের মোহিত করে। গানটি ‘তিলক কামোদ’ ‘খাম্বাজ’ ‘দেশ’ প্রভৃতি প্রযুক্ত হয়েছে। গায়েন পদ্ধতি বাউলাঙ্গ।
এবারে গুরুদেব রবীন্দ্রনাথের শ্রাবণ নিয়ে লেখা গানের আলোচনা। এক্ষেত্রে অবাক হওয়ার বিষয় তাঁর ষোল বছর বয়সের লেখা প্রথম বর্ষার গানটিই ছিল বৈষ্ণব পদাবলীর অনুসরণে লিখিত ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটানিশীথ যামিনী রে। গানটিতে পাওয়া গেল শ্রাবণের রাতে রাধার অভিসারের উদ্যোগের বর্ণনা। ষোল বছর বয়সের কিশোর কবির লেখা এই গানে পরিণত বয়সের রবীন্দ্রনাথের উপলব্ধ শ্রাবণের সম্যকস্বরূপ পাওয়া যাবে, এমন প্রত্যাশা করা উচিত হবে না। তবে এটা বোঝা যায় যে বর্ষা প্রেমিক রবীন্দ্রনাথের অপেক্ষারত প্রিয় মাসটি ছিল শ্রাবণ তার পরে আষাঢ়ের স্থান। শ্রাবণের প্রতি তাঁর এই সাগ্রহ পক্ষপাতের কারণ হয়তো বা তিনি বুঝি শ্রাবণকে সমগ্র বর্ষার প্রতীক রূপে গ্রহণ করেছিলেন। তাই তাতে আরোপ করেছেন আনন্দ-বেদনা, উল্লাস-আর্তিতে ভরা এক জীবন্ত মানবিক সত্তা, নিজের অনুভূতি দিয়ে মূর্ত করে তুলেছেন তাকে, দেখেছেন নানা বিচিত্রভাবে।
প্রসঙ্গক্রমে তুলে ধরা যেতে পারে কবির ‘শান্তি নিকেতন’ গ্রন্থের ‘শ্রাবণসন্ধ্যা’ নামাংকিত প্রবন্ধটির কিছু কথা-
“অন্ধকারকে ঠিকমতো তার উপযুক্ত ভাষায় যদি কেউ কথা কওয়াতে পারে, তবে সে এই শ্রাবণের ধারাপতনধ্বনি। অন্ধকারে নি:শব্দতার উপরে এই ঝর্‌্‌ ঝর্‌্‌ কলশব্দ যেন পর্দার উপরে পর্দা টেনে দেয়, তাকে আরো গভীর করে ঘনিয়ে তোলে, বিশ্বজগতের নিদ্রাকে নিবিড় করে আনে। বৃষ্টিপতনের এই অবিরাম শব্দ, এ যেন শব্দের অন্ধকার। আজ এই কর্মহীন সন্ধ্যা বেলাকার অন্ধকার তার সেই জপের মন্ত্রটিকে খুঁজে পেয়েছে। বার বার তাকে ধ্বনিত করে তুলেছে-শিশু তার নূতনশেখা কথাটিকে নিয়ে যেমন অকারণে অপ্রয়োজনে ফিরে ফিরে উচ্চারণ করতে যাকে সেই রকম-তার শ্রান্তি নেই, শেষ নেই, তার বৈচিত্র নেই।
আজ বোবা সন্ধ্যাপ্রকৃতির এই যে কন্ঠ খুলে গিয়েছে এবং আশ্চর্য হয়ে স্তব্ধ হয়ে সে যেন ক্রমাগত নিজের কথা নিজের কানেই শুনছে, আমাদের মনেও এর একটা সাড়া জেগে উঠেছে সেও কিছু একটা বলতে চাচ্ছে- ঐরকম বড় করেই বলতে চায়, ঐ রকম জল স্থল আকাশ একেবারে ভরে দিয়েই বলতে চায়-কিন্তু সে তো কথা দিয়ে হবার জো নেই, তাই সে একটা সুরকে খুঁজছে। জলে কল্লোলে, বনের মর্মরে, বসন্তের উচ্ছ্বাসে, শরতের আলোকে, বিশাল প্রকৃতির যা কিছু কথা সে তো স্পষ্ট কথায় নয়-সে কেবল আভাসে ইঙ্গিতে, কেবল ছবিতে গানে। এই জন্যে প্রকৃতি যখন আলাপ করতে থাকে, তখন সে আমাদের মুখের কথাকে নিরস্ত করে দেয়, আমাদের প্রাণের ভিতরে অনির্বচনীয়ের আভাসে ভরা গানকেই জাগিয়ে তোলে।
কথা জিনিসটা মানুষেরই, আর গানটি প্রকৃতির। কথা সুস্পষ্ট এবং বিশেষ প্রয়োজনের দ্বারা সীমাবদ্ধ আর গান অস্পষ্ট এবং সীমাহীনের ব্যাকুলতায় উৎকন্ঠিত। সেই জন্যে কথায় মানুষ মনুষ্যলোকের এবং গানে মানুষ বিশ্ব প্রকৃতির সঙ্গে মেলে।
আজ এই ঘনঘোর বর্ষার সন্ধ্যায় প্রকৃতির শ্রাবণ-অন্ধকারে ভাষা আমাদের ভাষার সঙ্গে মিলতে চাচ্ছে। অব্যক্ত আজ ব্যক্তের সঙ্গে লীলা করবে বলে আমাদের দ্বারে এসে আঘাত করছে। আজ গান ছাড়া কোন কথা নেই।”
রবীন্দ্রনাথের শ্রাবণের গানগুলো যেন তাঁর লেখা ‘শ্রাবণসন্ধ্যা’র গীতরূপ।
এবারে দু-তিনটি শ্রাবণের গান বিশ্লেষণ করে দেখা যাক্‌।
প্রথমেই ধরা যাক কবির আটচল্লিশ বছর বয়সে শান্তিনিকেতনে ১৩১৬ বঙ্গাব্দের আষাঢ় মাসে লেখা ‘আজি শ্রাবণঘন গহন মোহে গোপন তব চরণ ফেলে’ গানটি। এগানে আমরা দেখি, রবীন্দ্রনাথ যেভাবে শ্রাবণকে দেখেছেন, সেই শ্রাবণ কিছুটা স্বরূপে প্রকাশিত হয়েছে। ‘গীতাঞ্জলি’র এই গানটি মাধুর্যময় ঈশ্বরতত্ত্বের সঙ্গে নিবিড়ভাবে সম্পৃক্ত হলেও সেই ঈশ্বর তথা সখা ও প্রিয়তমের সম্মুখ উপস্থিতির জন্যে বর্ষা প্রকৃতির এক অপূর্ব স্নিগ্ধ প্রেক্ষাপট রচিত হয়েছে এতে। এই প্রসঙ্গে অধ্যাপক ক্ষুদিরাম বলেছেন-‘শ্রাবণঘন গহন মোহে’ এই কবি পৌঢ়িতেই শ্রাবণের দিবসের ঘনীভূত বিরহ যেন মূর্তি ধরেছে। কল্পনায় সুন্দরে ও প্রেমিকের অভিসার প্রত্যক্ষ করা হয়েছে। নিলাজ নীল আকাশ ইত্যাদি অভিসারের অনুকূল পরিবেশ। শেষাংশে প্রতীয়মান হৃদয়ের কাতরতার ধ্বনি অনায়াস ভাষা ও চিত্রসম্পদের তুলনাহীন রম্যতা রবীন্দ্র-ঈশ্বরকে তত্ত্বাবিমুক্ত করে কাব্যিকতার পথে রোমান্টিক আধ্যাত্মে নিয়ে এসেছে।’
লক্ষ করা যাচ্ছে, এই শ্রাবণ-পরিবেশে অনির্দেশ্য ‘তুমি’র অভিসার পূর্বোক্ত ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ গানে শ্রীরাধার অভিসারের চেয়ে অনেক বেশি গভীর কাব্যব্যঞ্জনাময়। এখানে সেই প্রমত্ত বর্ষার উদ্দাম রূপ নেই, বর্ষণস্তম্ভিত মেঘাচ্ছন্ন আকাশ, আর শ্রাবণের এক মোহসঞ্চারী গহন গভীর স্তব্ধতা, কবির ভাষায় নিশার মতো নীরব। এই পরিবেশ সবার অলক্ষ্যে যাত্রা পথিকের। সঞ্চারীর ‘কুজনহীন কাননভূমি দুয়ার দেওয়া সকল ঘরে’ বর্ণনা থেকে মনে হয়-এ যেন বাঞ্ছিত পথিকের দিবাভিসাবু নির্জন পথ ধরে। আভোগে বিরহী হৃদয়ের আকুল আর্তি-সেই সখা ও প্রিয়তমের প্রত্যাশিত যেন অবহেলায় পর্যবসিত না হয়। গানটিতে আরোপিত হয়েছে বর্ষার সুর মিশ্র গৌর মল্লার। এ সুর সমগ্র গানটিতে নিবিড় মেঘসঞ্চারে সুর ছড়িয়ে দিয়ে বাঞ্ছিত অভ্যাগতের জন্যে প্রতীক্ষার প্রেক্ষাপট রচনা করে রেখেছে। সুরের স্নিগ্ধ কমনীয় তাই গানটির আবেদন মর্মে পৌঁছে দেয়। শ্রদ্ধেয় প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায় তাল উল্লেখ করেছেন ঝাঁপতাল যাতে পাওয়া যায় ১০ মাত্রার ২+৩/২+৩ পর্বভাগের ছন্দ। কিন্তু দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুরকৃত স্বরলিপিতে গানটির তালের পর্বভাগ দেখা যায় ৩+২=৫, যা রবীন্দ্রনাথের সৃষ্ট ঝম্পক তাল। এটিই গানের বাণীর সুসঙ্গত বলে মনে রঞ্জ করেছেন রবীন্দ্রসঙ্গীত বিশেষজ্ঞ সুবোধরঞ্জন রায়। তিনি বলেছেন “এটিই (ঝম্পক) বাণীর সঙ্গে সুসঙ্গত মনে হয়। কেননা এতে পাঠছন্দ ও গীতছন্দের সঙ্গে কোন ভিন্নতা থাকে না। অন্যদিকে এই বিষম তাল বা ছন্দ গানের ভাবমুকূল ধীর মন্থর গতি বজায় রেখেছে।
এবারে দেখা যাক কবির ৫৩ বছর বয়সে লেখা ‘আবার শ্রাবণ হয়ে এলো ফিরে’ গানটি। সুরুলে বসে ১০ ভাদ্র, ১৩২১ বঙ্গাব্দে লেখা এ গানটিতেও আমরা দেখি রবীন্দ্র উপলব্ধ মাধুর্যময় ঈশ্বরতত্ত্ব অন্তর্লীন হয়ে আছে। তবে গানটির চিত্রময় বাণী আগাগোড়া বর্ষার রূপময়তায় আচ্ছন্ন। মনে হয় প্রতি বছরের মতো

বর্ষা ঋতুই বুঝি শ্রাবণ হয়ে ফিরে এসেছে। সেই শ্রাবণ বর্ষনে আপ্লুত হয়ে থাকার আনন্দই যেন সমগ্র গানটির উপভোগ্য রস। দিনের সূর্য আর রাতের তারাকে মেঘ আঁচলে ঘিরে নিয়ে পথ অন্ধকার করে নদীতে ঢেউ তুলে শ্রাবণরূপে নেমে এলো চিরকালে বর্ষা, আর তাতেই আকাশ ও পৃথিবী ভরে গেল বর্ষণের বাণীতে। অবিরল বৃষ্টিধারায় অন্ধকার রাত হলো বর্ষণগীত ঝংকৃত। সেই সুর সাড়া জাগালো গভীর অনুভূতি পরতে পরতে, তাই ‘বাজে আমার শিরে শিরে’ এই সানন্দ উচ্চারণ মনোঞ্জ। বর্ষার গানরূপেই এটি স্বয়ংসম্পূর্ণ গানটি মিশ্রমল্লারে বাঁধা। আমাদের ধারণা, রবীন্দ্রনাথ গৌড়মল্লার আর মিয়া মল্লারের মিশ্রণেই নিজস্ব ধরনের মল্লার রাগ গড়ে তুলেছেন।
বর্ষার গান শেষ করা যাক ‘শ্যামল ছায়ায় নাই বা গেলে’ গানটি দিয়ে। এটি কবির চৌষট্টি বছর বয়সে লেখা বর্ষা-বিদায়ের গান। দেখা যাচ্ছে, বর্ষা-বিদায়ের কারুন্য গানটিতে তেমন প্রকাশ পায়নি। তার কারণ, সম্ভবত গ্রীষ্মের প্রচন্ড তৎপরতার পরে সমাগত বর্ষা রুক্ষ প্রকৃতির বুকে শ্যামলতা ও সজীবতা স্পর্শ দিয়ে যায় তার বিদায় লগ্নে। এরপর আসে শরত। শরতে গ্রীষ্মের দাবদাহও নেই,. শীতের জীর্ণতাও নেই। তাই, শরতকে প্রসন্নমনে স্বাগত জানান কবি ও প্রকতিপ্রেমীরা। এটা সুবিদিত যে, শরত ও রবীন্দ্রনাথের অন্যতম প্রিয় ঋতু। তাই বর্ষার অপসরনে কবির কোন বেদনা নেই। ‘শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে’ গানটির বাণী ও সুরে কবির এই মনোভাবই ব্যক্ত হয়েছে। ‘শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে’ কথাটিতে বেদনা নেই বলে মনে হয়। তবে উপরোধ আছে। এই উপারোধও বেদনাভরা নয়। কারণ সঞ্চারী অংশে ‘মলিন তোমার মিলাবে লাজ/ শরৎ এসে পরাবে সাজ’ কথাটিতে বেদনার সুর নেই।
রবীন্দ্রনাথের বর্ষার গান নিয়ে বিশদ আলোচনায় বর্ষা সম্পর্কে তাঁর ভাবনা স্বরূপটা অনেকটা জানা গেল। এর আগে কবির বাল্যের স্মৃতিচরণ, তাঁর রচিত প্রবন্ধ নিবন্ধ এবং কবিতায় তাঁর ভাবনার স্বরূপের কিছুটা পেয়েছি। এ সব থেকে আমরা ধরে নিতে পারি মহাকবি কালিদাস ও বৈষ্ণব কবি বিদ্যাপতির মতো ‘বর্ষা’ ছিল মহাকবি রবীন্দ্রনাথেরও প্রিয় ঋতু।

x