রবীন্দ্রনাথের কিশোরকবিতা

কাঞ্চনা চক্রবর্তী

শুক্রবার , ৯ আগস্ট, ২০১৯ at ৭:৩১ পূর্বাহ্ণ
108

একটি নতুন দিন শুরু হয় রবির কিরণ দিয়ে, সেই কিরণে আলোকিত হয় বিশ্বভুবন। ঠিক একইভাবে প্রায় প্রতিটি বাঙালির জীবন আলোকিত হয় রবির আলোয়। এই আলো কবিগুরুর সৃষ্টির আলো। ্ল্ল- এক বিস্ময়কর প্রতিভা (১৯৬১–১৯৪১)। তিনি বাংলা সাহিত্যের ঋষি পুরুষ। যাঁর ছোঁয়ায় বাংলা শিশু সাহিত্য পেয়েছে আকাশ সমান পরিপূর্ণতা। তাঁর শিশু সাহিত্য যেন রংধনুর বর্ণচ্ছটা। সাহিত্যের আকাশ তাঁর লেখনির রং তুলিতে শুধু বর্ণিলই হয়নি, মেলে দিয়েছে এক অপরূপ রং এর মেলা। যার সংস্পর্শে বাঙালির মন-প্রাণ দোলা দিয়ে যায়। বাংলা সাহিত্যের সকল শাখাই কবিগুরুর আশীর্বাদে ধন্য হয়েছে। তিনি সাহিত্যের যেই শাখাতেই হাত দিয়েছেন তাই হয়েছে সরস, সোনালী আর বৈচিত্র্যময়। শিশুরাও তাঁর স্নেহাশীষ থেকে বঞ্চিত হয়নি। শিশুদের জন্য তিনি লিখেছেন ছড়া, কবিতা, গল্প এবং নাটকসহ নানারকম শিশুতোষ সাহিত্য।
বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর মাত্র আট বছর বয়সে কবিতা লেখা শুরু করেন। ষোল বছর বয়সে তাঁর বড়দার সম্পাদিত ভারতীতে লেখা বিষয়ে কবিগুরুর উপলব্ধি —” যে বয়সে ভারতীতে লেখা শুরু করিয়াছিলাম সে- বয়সের লেখা প্রকাশযোগ্য হইতেই পারে না। বালককালে লেখা ছাপাইবার বালাই অনেক। বয়ঃপ্রাপ্ত অবস্থার জন্য অনুতাপ সঞ্চয় করিবার এমন উপায় আর নাই। কিন্তু তাহার একটা সুবিধা আছে ; অক্ষরে নিজের লেখা দেখিবার প্রবল মোহ অল্প বয়সের উপর দিয়া কাটিয়া যায়। আমার লেখা কে পড়িল, কে কি বলিল, ইহা লইয়া অস্থির হইয়া উঠা। লেখার কোনখানটাতে দু”টো ছাপার ভুল হইয়াছে, ইহাই লইয়া কন্টকবিদ্ধ হইতে থাকা। এই সমস্ত লেখা প্রকাশের ব্যাধিগুলো বাল্যবয়সে সারিয়া দিয়া অপেক্ষাকৃত লিখিবার অবকাশ পাওয়া যায়। নিজের ছাপা লেখাটাকে সকলের কাছে নাচাইয়া বেড়াইবার মুগ্ধ অবস্থা হইতে যত শীঘ্র নিষ্কৃতি পাওয়া যায় ততই মঙ্গল।”
সত্যেন্দ্রনাথ ঠাকুরের পত্নী জ্ঞানদানন্দিনী দেবীর সম্পাদনায় প্রকাশিত হত ” বালক’ পত্রিকা। ” বালক ‘ লেখার ভার অনেকটাই নিজের কাঁধে তুলে নিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি এই পত্রিকার কোষাধ্যক্ষ ছিলেন। এই পত্রিকা ছিল মূলতঃ ঠাকুর বাড়ি কেন্দ্রিক পত্রিকা। টানা এক বছর প্রতিটি সংখ্যায় প্রচুর লিখেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। ফলে সৃষ্টি হয়েছিল ছড়া, কবিতা আর গল্পের পসরা। ছোটদের ছোট না ভাবার বিষয়ে এই – ” বালক ‘ পত্রিকার অসাধারণ ভূমিকা রেখে ছিলেন কবিগুরু। প্রথম সংখ্যা প্রকাশ পায় ১২৯২ সালের বৈশাখ মাসে ( ১৮৮৫ সালের মার্চ মাসে) । তখন কবির বয়স ছিল ২৪ বছর।
২.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ” শিশু ‘, ” শিশু ভোলানাথ ‘, ” খাপছাড়া ‘, ” ছড়ার ছবি ‘, এবং “ছবি’ ইত্যাদি ছড়া ও কবিতাগ্রন্থ রচনা করেছেন। “শিশু ‘ (১৯০৩) ও ” শিশু ভোলানাথ ‘ ( ১৯২২) তাঁর অনন্য সৃষ্টি। তিনি তাঁর ছড়াগুলোকে মেঘের সাথে তুলনা করে বলেছেন, ” মেঘ বারিধারায় নামিয়া আসিয়া শিশু – শস্যকে প্রাণদান করিতেছে এবং ছড়াগুলি স্নেহরসে বিচলিত হইয়া কল্পনা বৃষ্টিতে শিশু হৃদয়কে উর্বর করিয়া তুলিতেছে”। কবিগুরু যখন ছোটদের জন্য লিখেছেন তখন তিনি নিজেকে ছোট্ট শিশু ভেবেছেন। শিশুকে সরল ও কোমল দৃষ্টিতে দেখেছেন আর লিখেছেন শিশুপাঠ্য উপযোগী
ভাষাতেই। কবি যখন ছোট নদীর কথা বলেছেন —
” আমাদের ছোট নদী চলে বাঁকে বাঁকে / বৈশাখ মাসে তার হাঁটুজল থাকে।”( আমাদের ছোট নদী — সহজ পাঠ)
কবিতাটি পড়তে পড়তে যেকোন শিশু নিজের চোখে দেখা নদীটির সাথে মিল খুঁজে পায়। আবার কেউ কেউ তার নিজ গাঁয়ের পাশ দিয়ে ছুটে চলা ছোট নদীর কথা কল্পনা করে নদীর সাথে তার মিল খুঁজে নেয়।
প্রকৃতি প্রেমিক কবি প্রকৃতির নানান সৌন্দর্য্য ও দিককে তুলে ধরেছেন শিশুদের ছড়া ও কবিতায়। শিশু মন নিয়ে রবীন্দ্রনাথ প্রকৃতিকে যেভাবে ব্যাখ্যা করেছেন। সেখানে প্রকৃতি নবীন, চঞ্চল, সুন্দর ও পরিপূর্ণ। বর্ষার চপলা, মত্তাবস্থা, শরতের তারুণ্য সুন্দর রূপ তাঁকে যেন বেশি আকর্ষণ করতো। যেমন আষাঢ় মাসের মেঘকে নিয়ে লিখেছেন —
” নীল নবঘনে আষাঢ়গগনে তিল ঠাঁই আর নাহিরে।/ ওগো, আজ তোরা যাসনে ঘরের বাহিরে।” ( আষাঢ় , ক্ষণিকা)
বৃষ্টির পর আকাশে রোদ উঠেছে। রংধনুর সাত রঙের লুকোচুরি খেলা। বেজে উঠেছে স্কুলের ছুটির ঘণ্টা। বাঁধ ভাঙা ছেলে মেয়েদের বাড়ির পানে ছুটে চলা। রংধনুর সাত রঙের সঙ্গে এ সময় ছেলে মেয়েরা আনন্দে মেতে উঠে। এই আনন্দের মুহূর্তে আরও বেশি আনন্দ দিয়ে কবি লিখেছেন —
” মেঘের কোলে রোদ হেসেছে বাদল গেছে টুটি,/ আজ আমাদের ছুটি ও ভাই -আজ আমাদের ছুটি।”
শিশুদের জন্য অসাধারণ কিছু সৃষ্টির মধ্যে – ” কড়ি ও কোমল ” গ্রন্থে ” বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর”, “সোনার তরী ” এবং “দুই পাখি”। প্রকৃতির নানান জিনিস যেমন– বৃষ্টি , নদী, চাঁদ, সূর্য, ফুল ও পাখি প্রভৃতি শিশুদের অতি প্রিয়। আর এই বিষয়গুলো নিয়েই কবিগুরু রচনা করেছেন সব অনবদ্য সৃষ্টি। যেমন “বৃষ্টি পড়ে টাপুর টুপুর ‘ কবিতায় লিখেছেন —
” দিনের আলো নিভে গেল সূর্যি ডোবে ডোবে,/ আকাশ ঘিরে মেঘ জুটেছে চাঁদের লোভে লোভে।”
৩.
রবীন্দ্রনাথের ছড়াগুলোতে তাঁর শিশু মনের অবস্থা সম্পর্কে জানা যায়। কিভাবে অতি সহজেই তিনি শিশুর চিন্তারাজ্যে প্রবেশ করেন! শিশু মনের প্রাণের আবেগ, উচ্ছ্বাসের শুধু কাব্যিক রূপই দেননি। আনন্দ, বেদনা আর কল্পনা শক্তির এক অপূর্ব সমাবেশ ঘটিয়েছেন। ” ক্ষান্ত বুড়ির দিদি শাশুড়ি ” কবিতায় লিখেছেন —
” ক্ষান্তবুড়ির দিদি শাশুড়ির পাঁচ বোন থাকে কালনায়,/ শাড়িগুলো তারা উনুনে বিছায় হাঁড়িগুলো রাখে আলনায়। ”
শিশু মনের কল্পনার ঘুড়িকে তিনি মনের আকাশে ইচ্ছেমতো ছেড়ে দিতে পারতেন। যেমন —
” এক যে ছিল চাঁদের কোণায় চরকা – কাটা বুড়ি, / পুরাণে তার বয়স লেখে সাতশো হাজার কুড়ি। ”
রবীন্দ্রনাথ ছিলেন খেয়ালী মনের মানুষ। তাঁর ছিল বিচিত্র সাধ এবং ইচ্ছা। ছোটদের মতো তাঁর মনটাও যখন যা দেখেছেন তাই করতে চেয়েছেন, হতে চেয়েছেন। তিনি লিখেছেন –
“” যখন যেমন মনে করি তাই হতে পাই যদি,/ আমি তবে এক্ষুণি হই ইচ্ছামতি নদী।”
অথবা,
” মা যদি হও রাজি, / বড় হলে আমি হব খেয়াঘাটের মাঝি। ” ( মাঝি, শিশু)
শিশু ভোলানাথ কাব্যগ্রন্থে ” তালগাছ ”
শিরোনাম কবিতাটি শিশুদের অতি প্রিয় একটি কবিতা। যাকে শিশু ভোলানো কবিতাও বলা হয়ে থাকে।
“” তালগাছ এক পাঁয়ে দাঁড়িয়ে / সবগাছ ছাড়িয়ে / উঁকি মারে আকাশে। ”
এই কবিতাটি শিশুমনের কল্পনা শক্তির অনন্য প্রকাশ। আবার শিশু মনকে আবেশে ভরিয়েও তুলে। কবিতাটি আবৃত্তি করলে মনে হয় কোনো চির পরিচিত গ্রামের দৃশ্য চোখের সামনে ভেসে উঠে। তালগাছটা একটা মানুষ হয়ে এক পাঁয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
আবার শিশু মনের ইচ্ছেকে প্রাধান্য দিয়ে শিশুমনকে মাঝির অবস্থানে বসিয়েছেন। কবিতায় বলছেন—-
” আমার যেতে ইচ্ছে করে নদীটির ওই পারে,/ যেথায় ধারে ধারে –বাঁশের খোঁটায় ডিঙি নৌকা বাঁধা সারে সারে। ‘ ‘( মাঝি)
এভাবে বার বার ছোটদের মতো শিশু হয়ে তিনি বিভিন্ন ছড়া ও কবিতা রচনা করেছেন। আসলে রবীন্দ্র চরিত্রের এক ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য প্রকাশ পায় তাঁর শিশুতোষ ছড়া গ্রন্থগুলোতে।
” খাপ ছাড়া ‘ ছড়াগ্রন্থে তিনি লিখেছেন —
” সহজ কথা লিখতে আমায় কহ যে/ সহজ কথা যায় না লেখা সহজে, / লেখার কথা মাথায় যদি জোটে/ তখন আমি লিখতে পারি হয়তো, /কঠিন লেখা নয়কো কঠিন মোটে,/ যা – তা লেখা তেমন সহজ নয় তে।”
এখানে রবীন্দ্র চিন্তা – চেতনার এক অন্যরূপ প্রকাশিত হয়। আগোছানো সহজ সরল কথাগুলো কি আসলেই গুছিয়ে লেখা সহজ? যেমন–
” ভোলানাথ লিখেছিলো তিন -চারে নব্বই/ গণিতের মার্কায় কাটা গেল সর্বই। তিন চারে বারো হয়,/ মাস্টার তারে কয়/ ” লিখেছিনু ঢের বেশি ‘/ এই তার গর্বই। ’( ছড়া — খাপছাড়া)
শিশু মন নিষ্পাপ। এ যেন এক প্রসারিত আকাশ। তার স্বভাব আর আচরণ সদা চঞ্চল ও মুক্ত। কবিগুরু নিজ চোখ দিয়ে যা দেখেছেন তারই প্রকাশ ঘটিয়েছেন লেখায়।গতানুগতিক লেখাপড়া শিশুর ভাল লাগে না। সে চায় মুক্ত স্বাধীন খোলামেলা জীবন। যেখানে থাকবে না কোন বাঁধা নিষেধ। তাইতে কবিতায় মাকে বলে —
” মাগো আমার ছুটি দিতে বল
সকাল থেকে পড়ছি যে মেলা,
এখন আমি তোমার ঘরে বসে
করব শুধু পড়া পড়া খেলা।”
পাঠশালার আবদ্ধ জীবন শিশুর ভাল লাগে না। তার কল্পনার রাজ্যে সবই সম্ভব। সেটা মাকে স্মরণ করায়। তাইতো সে মাকে বলে —
” তুমি বলছ দুপুর এখন সবে,
না হয় যেন সত্যি হল তাই,
একদিনও কি দুপুর বেলা হলে
বিকেল হল মনে করতে নাই? ”
শিশু মন নির্লিপ্ত। ফেরিওয়ালা দেখে ফেরিওয়ালার হাক শুনে শিশু মনে মনে ফেরিওয়ালা হয়ে যায়। তিনি লিখেছেন —
” আমি যখন পাঠশালাতে যাই
আমাদের এই বাড়ির গলি দিয়ে
দশটা বেলায় রোজ দেখতে পাই
ফেরিওলা যাচ্ছে ফেরি নিয়ে।
ইচ্ছে করে সেলেট ফেলে দিয়ে
অমনি করে বেড়াই নিয়ে ফেরি। ”( বিচিত্র সাধ)
তাঁর ছড়ায় ছড়িয়ে রয়েছে মজা, মিশে রয়েছে অদ্ভুত সব কাহিনী। তিনি কখনো হেঁটেছেন বাস্তবতার জগতে , আবার কখনো কল্পনার জগতে। ছোটদের মনকে বুঝে কখনো ছোট হয়েছেন, আবার কখনো নিজে ছোটদের জন্য বড় হয়েছেন। তিনি লিখেছেন–
” তুই কি ভাবিস দিনরাত্তির খেলতে আমার মন?
কক্ষনো তা সত্যি না মা, আমার কথা শোন।”
(খেলাভোলা)
৪.
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শৈশবে তাঁর মাকে হারিয়েছিলেন। ঠাকুর বাড়ির বৃহৎ একান্নবর্তী পরিবারে তিনি মায়ের একান্ত সান্নিধ্য খুব একটা পাননি। কিন্তু তাঁর মনে চিরন্তন মাতৃমূর্তি ও স্নেহার্ত এক শিশুর মর্মস্পর্শী বেদনা বিশেষ স্থান দখল করে আছে।মাতৃহীনা শিশুর বেদনার হৃদয়গ্রাহী প্রকাশ ঘটেছে তাঁর “আকাশ প্রদীপ ” কবিতায়–
” অন্ধকারে সিন্ধুতীরে একলাটি ওই মেয়ে
আলোর নৌকা ভাসিয়ে দিল আকাশ পানে চেয়ে।
মা যে তাহার স্বর্গে গেছে এই কথা সে জানে,
ওই প্রদীপের খেয়া বেয়ে আসবে ঘরের পানে। ”
শিশুর কাছে মা-ই তার পৃথিবী। মা-ই তার স্বর্গ। সকল সুখ আর আশা ভরসা। মাকে হারিয়ে তাঁর শিশুমন কতটা শূন্য , ব্যাকুল , চঞ্চল ও ব্যথায় ভারাক্রান্ত হয়ে পড়ে তা-ই প্রকাশ পেয়েছে ” মনে পড়ে ” কবিতায়—
” মাকে আমার পড়ে না মনে।
শুধু কখন খেলতে গিয়ে হঠাৎ অকারণে
একটা সুর গুনগুনিয়ে কানে আমার বাজে,
মায়ের কথা মিলায় যেন আমার খেলার মাঝে।’
তাঁর অন্তরে মায়ের জন্য হাহাকার আবার নতুন করে অনুভব করলেন নিজের মাতৃহারা সন্তানদের দেখে। আর তাঁর ব্যক্তিগত জীবনের একট বেদনার ঘটনাই শিশু কাব্য রচনার মূল ইতিহাস। ১৯০২ সালের নভেম্বরে লোকান্তরিত হন কবিজায়া মৃণালিনী দেবী।তাঁর পাঁচ সন্তানের মধ্যে জ্যৈষ্ঠ কন্যা মাধুরীলতা ও দ্বিতীয় কন্যা রেণুকা বিবাহিত। জ্যৈষ্ঠ পুত্র রথীন্দ্রনাথের বয়স ১৪ বছর। শেষ দুই সন্তানের মধ্যে মীরার বয়স ৮ বছর এবং কনিষ্ঠ পুত্র শচীন্দ্রনাথের বয়স ৫ বছর ১০ মাস।
কবিগুরুর শিশুদের কবিতাগুলো শুধু কল্পনা নির্ভর নয়। এগুলি শিশুমনের ইচ্ছা – আকাঙ্খা। শিশু ও মায়ের মনের গহীনে ডুব দিয়ে এরকম অনেক মনিমুক্তা তুলে এনেছেন জহুরী রবীন্দ্রনাথ। তিনি তাঁর কবিতায় কত রূপেই না মা – সন্তানের সম্পর্কের গভীরতা দেখিয়েছেন! যে সম্পর্ক শর্তহীন, বর্ণিল, প্রাণময় আর মায়া মমতায় ভরা। শুধু মায়ের মমতার কথাই নয়, মায়ের প্রতি খোকার ও যে অসীম মায়া আর ভালবাসা রয়েছে তা তিনি
” বীরপুরুষ ” কবিতায় লিখেছেন। ” বীরপুরুষ ” কবিতাটি কবিগুরুর অনবদ্য ও অবিস্মরণীয় একটি সৃষ্টি। তাঁর এই কবিতায় তিনি শিশুদের রঙিন ভুবনের সন্ধান দেওয়ার পাশাপাশি তাদের আত্মবিশ্বাসও জাগিয়ে তুলেছেন —
” এত লোকের সঙ্গে লড়াই ক”রে
ভাবছ খোকা গেলই বুঝি মরে।
আমি তখন রক্ত মেখে ঘেমে
বলছি এসে, লড়াই গেছে থেমে।’
তুমি শুনে পালকি থেকে নেমে
চুমো খেয়ে নিচ্ছ আমায় কোলে।”
মায়ের কাছে কল্পিত অ্যাডভেন্‌ঞ্চার কাহিনী শোনাতে গিয়ে মাকে একদল ডাকাতের হাত থেকে রক্ষা করে ছোট্ট খোকা। ভয়ংকর ডাকাত দলকে কুপোকাত করে নিজের মাকে নিয়ে বীরের বেশে অজানার দেশে পাড়ি জমায় সে। এখানে শিশু মনের বীরত্ব গাঁথা প্রস্ফুটিত হয়েছে।
” মনে করো, যেন বিদেশ ঘুরে
মাকে নিয়ে যাচ্ছি অনেক দূরে,
তুমি যাচ্ছ পালকিতে, মা চ’ড়ে
দরজা দুটো একটুকু ফাঁক করে,
আমি যাচ্ছি রাঙা ঘোড়ার পরে
টগবগিয়ে তোমার পাশে পাশে।”
আবার ” বীরপুরুষ ” কবিতায় ছোট বালকটির অসাধারণ বীরত্ব ছোট বড় সকলকেই মুগ্ধ করে।আমরা শিহরিত হই এবং ভাল লাগার একটা রেশ অনন্তকাল পর্যন্ত থেকে যায়। কবি লিখেছেন যেন নিজেরই মনের কথা—-
” কী ভয়ানক লড়াই হল মা যে
শুনে তোমার গায়ে দেবে কাঁটা।
কত লোক যে পালিয়ে গেল ভয়ে,
কত লোকের মাথা পড়ল কাটা। ”
আসলে এই কবিতার মাধ্যমে তিনি বারবার তাঁর হারানো শৈশবে ফিরে যেতে চেয়েছেন। অর্থাৎ তিনি শৈশবের আনন্দঘন দিনগুলোতে ফিরে যেতে চেয়েছেন।
একটি শিশুর জন্ম রহস্য জানে শুধু তার মা।মা ছাড়া তার জন্ম রহস্য কে শুনাবে? তার সে ব্যাকুল জিজ্ঞাসা ধ্বনিত হয়েছে “শিশু ” কাব্যগ্রন্থের ” জন্মকথা ” কবিতায়—-
“খোকা মাকে শুধায় ডেকে, এলেম আমি কোথা থেকে,
কোনখেনে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে?
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে খোকারে তার বুকে বেঁধে —
ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে। ”
মা ও শিশুর পারস্পরিক এই সম্পর্কের বিনিময়ের যে অসাধারণ মূর্ততা তা রবীন্দ্রনাথের শিশুতোষ লেখার মাধ্যমে বিশ্ব সাহিত্যে অনন্য।
মাকে ঘিরে শিশুর রোমান্টিক কল্পনা চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছে ” বাণী বিনিময় ‘, ” অন্য মা ‘, ” নৌকা যাত্রা ‘ প্রভৃতি কবিতাতে। মা এবং শিশুর সম্পর্ক যে দিক থেকেই দেখি না কেন খুবই কাছের এবং নিবিড়। যেমন—
” মা, যদি তুই আকাশ হতিস
আমি চাঁপার গাছ,
তোর সাথে মোর বিনি–
কথায় হতো কথার নাচ। ”
শিশু কালে মাতৃ লালনের অভাবে যে ক্ষোভ ও বেদনা সঞ্চিত ছিল রবীন্দ্রনাথের মনে তা তিনি ভুলতে পারেননি তার জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত। তাই তাঁর সাহিত্য সৃষ্টিতেও অনিবার্যভাবে এর প্রভাব প্রতিফলিত হয়েছে। যা তিনি পাননি, অথচ যা তিনি পেতে চেয়েছিলেন সে বেদনা নিহিত ছিল কবির অন্তরের গভীরে। তাঁর সৃষ্ট শিশু চরিত্র ও তাই তাঁরই মতো মাতৃ ব্যাকুল ও অভিমানী। যেমন—
” ঐখানে মা পুকুর পাড়ে
জিয়ল গাছের বেড়ার ধারে
হেথায় হব বনবাসী–
কেউ কোথাও নেই।
ঐখানে ঝাউতলা জুড়ে
বাঁধব তোমার ছোট্ট কুঁড়ে,
শুকনো পাতা বিছিয়ে ঘরে
থাকব দুজনেই।”
এখানে মাকে একান্তে একেবারে নিজের করে পাওয়ার তীব্র ইচ্ছা ফুটে উঠেছে। তিনি প্রতি মুহূর্তে মা- কে এইভাবে ফিরে পেতে চেয়েছিলেন তাঁর শৈশবে। মাকে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা তাঁর কাছে স্বপ্নের মতে ছিল। যেন প্রতিদিনের বাস্তব ঘটনার আঘাতে প্রতিনিয়ত সে স্বপ্ন ভেঙে গিয়েছে । ” পথহারা ” কবিতায় ভারি সুন্দরভাবে তিনি ব্যক্ত করেন শৈশবের এই মনোভাব —
” বল দেখি তুই , কেমন করে
ফিরে পেলাম মাকে?
কেউ জানে না কেমন করে ;
কানে কানে বলব তারে?
যেমনি স্বপন ভেঙে গেল
সিঙ্গিমামার ডাকে।”'( শিশু ভোলানাথ)
৫.
রবীন্দ্রনাথের নিজের শৈশব কেন্দ্রিক শিশু ভাবনার অনুসরণে কবির স্মৃতিচারণায় ফিরে গিয়ে তাঁর কথায় বলতে হয় — “” আমরা ছিলাম চাকরদেরই শাসনের অধীনে। নিজেদের কর্তব্যকে সরল করিয়া লইবার জন্য তাহারা আমাদের নড়াচড়া একপ্রকার বন্ধ করিয়া দিয়াছিল। সেদিকে বন্ধন যতই কঠিন থাক, অনাদর একটা মস্ত স্বাধীনতা। সেই স্বাধীনতায় আমাদের মন মুক্ত ছিল। খাওয়ানো, পরানো, সাজানো, গোছানোর দ্বারা আমাদের চিত্তকে চারিদিক হইতে একেবারে ঠাসিয়া ধরা হয় নাই।”
অনাদরের স্বাধীনতা শিশুর কাছে অনেক সময়ই আকাঙ্‌ক্ষার। অনাদরে লালিত স্বাধীন জীবনের জন্য অনেক সময় ব্যাকুলতা অনুভব করে শিশু। কল্পনার জগতে বিরাজ করতে করতে এক সময়ে হয়তো শিশু মন কেঁদে ওঠে অনেক দূর যাওয়ার জন্য একা আর স্বাধীনভাবে। যেমন—
” ভোরের বেলা দেব নৌকা ছেড়ে,
দেখতে দেখতে কোথায় যাব ভেসে। ” ( নৌকা যাত্রা)
কোন সময় ঘোড়া হয়ে দাপিয়ে বেড়াতে মনে ইচ্ছে জাগে, সাধ হয় মাছ হয়ে জলের বহু গভীরে চলে যেতে, আবার পাখি হয়ে খোলা আকাশে উড়তে মন চায়।
” আমি ভাবি ঘোড়া হয়ে মাঠ হবো পার,
কভু ভাবি মাছ হয়ে কাটিব সাঁতার।
কভু ভাবি পাখি হয়ে উড়িব গগনে,
কখনো হবে না সে কি ভাবি যাহা মনে।”
ঘরের মধ্যকার বদ্ধ জীবন থেকে বেরিয়ে যেতে সাধ জাগে, মন চায় অন্য কোন নতুন জায়গায় যেতে —
“” থাকি ঘরের কোণে,
সাধ জাগে মোর মনে,
অমনি করে যাই ভেসে ভাই,
নতুন নগর বনে।”
শিশু বলতে কবি শুধু মানব শিশুকে বুঝিয়েছেন তা নয় বৃক্ষ, পশু সমস্তই তাঁর কাছে সমসাময়িক স্থিত এবং একেই বোধ হয় রবীন্দ্রনাথের শৈশব চেতনার স্বরূপ হিসাবে আখ্যায়িত করা হয়েছে। প্রকৃতির স্বাভাবিক নিয়মে রবীন্দ্রনাথের জীবনে শৈশব এসেছিল। কিন্ত তিনি তা একান্ত ভাবে উপভোগ করতে পারেননি। শৈশবে বিভিন্ন নিয়মের নিগড়ে বাঁধা জীবনে তিনি খেলাধুলা, ঘুড়ি ওড়ানো, গাছে চড়ার মতো অকিঞ্চিৎকর কিছু ঘটনার মধ্য দিয়ে শৈশবের স্বাদ আস্বাদন করতে পারেননি। রবীন্দ্রনাথের মনোধর্মের প্রধান বৈশিষ্ট্য অন্তর্মুখীতা। সে বৈশিষ্ট্য তাঁর চার পাঁচ বছর বয়স থেকেই জাগতে শুরু করেছিল। সে জাগার পক্ষে অত্যন্ত অনুকূল হয়েছিল দিনের বেলায় চাকরদের তাঁবেদারিতে থাকা। তিনি অত্যন্ত নিঃসঙ্গ ছিলেন। সম্ভবতঃ সেই কারণেই তিনি হয়ে উঠেছিলেন কল্পনাবিলাসী। তিনি ঘরে বসে বাইরের জগতটুকু দেখতেন। আর এর কল্পনায় ভাসিয়ে দিতেন তাঁর প্রতিদিনের অভিজ্ঞতাগুলি। তাঁর সেই অভিজ্ঞতায় সকলে স্তব্ধ হয়েছে। এমনকি বাসনওয়ালাও বাদ পড়েনি। যেমন-
“” বাসনওলা থালা বাজায়
সুর ক’রে ঐ হাঁক দিয়ে যায়।”
ঘরের মধ্যে জানালা দিয়ে যে মাঠ দেখতে পেতেন তার শেষ কোথায় তিনি হয়ত বুঝতে পারতেন না। তাই কল্পনার সাহায্যে মনে ভাবতেন—
“” তেপান্তরর পার বুঝি ওই,
মনে ভাবি, ঐখানেতেই
আছে রাজার বাড়ি।”
৬.
” সহজ পাঠ” এ রবীন্দ্র সাহিত্য প্রকাশ পেয়েছে অন্যরূপে। সেখানে প্রকৃতি, মানুষ ও জীবজগত এই সকল কিছুই তাঁর বিচরণ ভূমি। কবি ছোট শিশুদের কাছে স্বরবর্ণ ও ব্যঞ্জনবর্ণ খুবই সহজ এবং সরল
ভাষায় পৌঁছে দিতে চেয়েছেন। নন্দলাল বসুর আঁকা ছবি ও কবির অনবদ্য ভাষা, শব্দ , ছন্দের ব্যবহার সাহায্য করেছে বাংলা অক্ষরগুলির ছবি আঁকতে। লেখা পংক্তি গুলি বারবার বলতে বলতে যেন ছোট শিশুদের জীবজগত, প্রকৃতি ও মনুষ্য সমাজের সঙ্গে এক সুন্দর নিবিড় সম্পর্ক তৈরি হয়ে ওঠে। যদি বলা হয় —
“” ঘন মেঘ বলে ঋণ
দিন বড়ো বিশ্রী।”
অথবা,
” প ফ ব ভ যায় মাঠে
সারাদিন ধান কাটে।”
কিংবা,
“হ্রস্ব উ দীর্ঘ ঊ
ডাক ছাড়ে ঘেউ ঘেউ।”
তাহলে এখানে যে মেঘলা দিন, চাষীদের কথা, কুকুরের কথা বলা হয়েছে তা বুঝতে ছোট বাচ্চার কোন অসুবিধা হয় না। তার উপর আবার এতো সহজে যে ঐ, ঔ প্রভৃতির ব্যবহার শেখানো যায় ছোট ছোট ঘটনার মাধ্যমে তা কবির লেখা উপলব্ধি না করলে বিশ্বাস করা যেত না।
সহজপাঠের সাহিত্য গুণ ও মনোজয়িতা অনন্য সাধারণ। বুদ্ধদেব বসুর মতে, “পাঠ্যপুস্তক বলে যদিও রবীন্দ্রনাথ এখানে তাঁর প্রতিভাকে সীমিত রেখেছিলেন তথাপি তাঁর প্রয়াসে কোন কার্পণ্য করেননি। সহজপাঠ যেন প্রতিভার বেলাভূমিতে উৎক্ষিপ্ত ক্ষুদ্র , নিটোল, স্বচ্ছ একটি মুক্তো। এর ছত্রে ছত্রে প্রকাশ পেয়েছে চরিত্র আর সঙ্গে সঙ্গে ব্যবহার যোগ্যতা, ছন্দোবদ্ধ ভাষায়, কান্তিতে, চিত্ররূপের মালায়, পদ্য ছন্দের বৈচিত্র্যে, অনুপ্রাসের অনুরণনে “সহজপাঠ’ অনবদ্য। ড. অরবিন্দ পোদ্দার ও ধীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ” যে প্রাগাধুনিক মোহরঙিন জগতের দিকে শিশুর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হত না বলেই শিক্ষা তার কাছে বিভীষিকা হয়ে দেখা দিত। রবীন্দ্রনাথ শিশু মনের প্রয়োজনীয় দাবি মিটিয়ে ছিলেন।” (রবীন্দ্রনাথের কিশোর সাহিত্য)
কবিগুরু শিশুসুলভ মন দিয়ে শিশুদের জন্য সাহিত্য সম্ভার রচনা করে শিশু সাহিত্য ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করেছেন। আসলে বাঙালির চিরদিনের হাসি- কান্না, আনন্দ – বেদনা, চাওয়া – পাওয়া, সুখ – দুঃখের ছবি তিনি এঁকেছেন শিশু সাহিত্যের মধ্য দিয়ে। তাঁর শিশু সাহিত্য বাঙালির মানস জগতকে সমৃদ্ধ ও বিস্তৃত করেছে। এই মহান মনীষী ও সাধক পুরুষ এবং আমাদের চেতনার সূর্য তাঁর শিশু সাহিত্য ভাণ্ডারের মাধ্যমে বাংলা সাহিত্যকে দুই হাতে আশীর্বাদ করেছেন।

x