রবীন্দ্রচিত্তের বর্ষানুভব

শ্রেয়সী রায়

শুক্রবার , ৯ আগস্ট, ২০১৯ at ৭:২৭ পূর্বাহ্ণ
58

বর্ষা রবীন্দ্রনাথের প্রিয় ঋতু। গীতবিতানের বর্ষা পর্যায়ের গানগুলিতে কবির বিচিত্র অনুভূতি সঞ্চারিত হয়েছে। কোথাও বর্ষার ঋতু প্রকৃতির বর্ণনা চিত্র সৌন্দর্যে, ধ্বনি স্পন্দনে, বর্ণগন্ধে পুলকিত, কোথাও মাটির গন্ধ। কোথাও নিবিড় মেঘের ছায়ায় উদাসী মনের বিরহ বেদনা।
গীতিবিতানে কবির বর্ষাসঙ্গীতের সংখ্যা ১১৫টি। অবশ্য তাঁর অন্যান্য পর্যায়ের অজস্র গানেও বর্ষার মেঘছায়া পড়েছে, আষাঢ়ের জলকনা লেগেছে, কেতকীগন্ধবারী নিষিক্ত হয়েছে। তাই সংখ্যার হিসেবে রবীন্দ্রনাথের গানে বর্ষার গুরুত্ব বোঝা যাবে না।
দিনেন্দ্রনাথ ঠাকুর একবার লিখেছিলেন-‘মানবহৃদয়ের চিরবিচিত্র চিরপরিবর্তমান ভাবগুলি সম্পর্কে তার অহেতুক বিষাদ আর সুখ, আশা এবং আকাঙ্ক্ষা বুকের হাড়ে বা কোলের কাছটিতে, যা আছে যা নেই অথবা ছিল যেন জননান্তর সৌহৃদানি রূপে, সে সব নিয়েই এক পাওয়া না পাওয়ার আনন্দ বেদনা মিশ্রিত অপূর্ব আকুলতা-এ সবই কবির গানে কী আশ্চর্যভাবেই না ব্যক্ত হয়েছে।’ বর্ষাকে কবি তার হৃদয়ের সমস্ত সত্তা দিয়ে গ্রহণ করেছিলেন, সমস্ত বেদনা দিয়ে প্রকাশিত করেছিলেন এবং আমরা আমাদের সমস্ত জীবনের সমস্ত সাধনা দিয়েও যার মাধুর্য্য নিঃশেষ করতে পারি না। বিষয়ভেদে ঋতু প্রকৃতি, সময়, অভিসার, বিরহবেদনা ও মিলনোৎকণ্ঠা, অতীত স্মৃতি, নিঃসঙ্গতা, বর্ষামঙ্গল, শেষবর্ষণ ও বিচিত্র – এই ধরনের শ্রেণীবিন্যাস কবির বর্ষার গানগুলিকে সাজানো যেতে পারে। অবশ্য এই রকম বিষয়শ্রেণি সঙ্গীতে রস গ্রহণের পক্ষে অর্থহীন, কারণ একই গানে যেমন বর্ষার প্রকৃতরূপের মেদুরচিত্র আছে তেমনি নিঃসঙ্গতার অন্তহীন ক্রন্দনও ছড়িয়ে পড়েছে। বিরহবেদনা তো বর্ষার সবকটি গানেই প্রভাবিত। আবার বর্ষামঙ্গল বলতে বিশেষ কোনো গানকে নির্দিষ্ট করা যায় না, কারণ বর্ষামঙ্গল উৎসব অনুষ্ঠানে সবজাতের বর্ষাগীতই কবি পরিবেশন করেছেন।
বর্ষার নৈসর্গিক রূপে রবীন্দ্রনাথের সঙ্গীতগুলি অপরূপতা লাভ করেছে। কোথাও আকাশ ও মৃত্তিকার প্রলয়মত্ত একাকার বনভূমির উত্তালতা, নিশিথরাত্রির চকিত বিদ্যুৎ শিহরণ, ভীরু কেতকীর অভিসার যাত্রা, নিদ্রাহীন রাত্রির ব্যাকুলতা, তমাল অরণ্যে গোধুলীর শেষ কেকাধ্বনি, মেঘের কোলে বহমান বলাকাপংক্তি – তাঁর গানে কি বিপুল বৈচিত্র্য। অসংখ্য গান যেন ঋতুরূপের চিত্রশালা। প্রথম আষাঢ়ের সমারোহ থেকে শ্রাবণের বিরামহীন বিদ্যুৎচকিত নিদ্রাহীন রাত্রি, ভাদ্রের প্রলয়ধারা সবাইকে ছুঁয়ে গেছে তাঁর গান। মল্লার, দেশ, মেঘ, কানাড়া, কীর্তন, বাউলে বাদলের মাদল, ডমরু, একতারা সব একসঙ্গে বেজে উঠেছে। শালের বনে, ধানের খেতে, ঝড়ের দোলা, তমালবনে মর্মরিত, বায়ুবেগ, জামের বনে, আমের বনে হাওয়ায় হাহাকার, কদম্বের কাননে আষাঢ় মেঘের ছায়া, শ্রাবণ গগনাঙ্গনে পথিক মেঘের সমাবেশ, কূজনহীন কাননভূমির নিস্তব্ধতা, গানের সুর এইগুলিকে সঞ্চার করে দেয় আমাদের হৃদয়ে। নববর্ষাপাতে প্রতিটি মালতীর ফুটে ওঠার গন্ধ পাই তাঁর গানে। কোথাও কবি বর্ষাকে আদি প্রাণের যুক্ত করেছেন। কোন পুরাতন প্রাণের টানে কবির মন ছুটে যায় মৃত্তিকার কাছে, চোখ ডুবে যায় নবাঙ্কুরে, ‘কখন বাদল ছোঁয়া লেগে’ গানে যাদের সম্পর্কে বলেছেন-
ওরা যে এই প্রাণের রণে মরুজয়ের সেনা
ওদের সাথে আমার প্রাণের প্রথম যুগের চেনা।
‘আজ শ্রাবণের আমন্ত্রণে’ গানে একটি প্রতিধ্বনি শুনি –
প্রথম যুগের বচন শুনি মনে
নব শ্যামল প্রাণের নিকেতনে।
এই শ্রাবণের বুকের গহনে একদিকে বিরহবেদনার স্তম্ভিত স্ফটিক, অন্যদিকে আছে অগ্নিতেজ, বজ্রমানিক দিয়ে গাঁথা আষাঢ়ের মালা গাঁথা এবং শ্যামল শোভার বক্ষে বিদ্যুৎজ্বালার পরিকল্পনা, বনলক্ষ্মীর কম্পিতকায় ও ঝিল্লীর ঝংকৃত মঞ্জরী, কদম্বের পল্লবে শ্রাবণের বীনাপানির বর্ষণসঙ্গীত রেখে যাওয়া কিংবা পূর্বসাগর প্রান্তবাসীর হাওয়ায় হাওয়ায় শন শন সাপ খেলাবার বাঁশী বাজানো – এই বিচিত্র চিত্রকল্পগুলি কত সহজে এক একটি বাক্যে স্তবকে, কয়েকটি বৃষ্টি বিন্দুর মত চরণে ঝরে ঝরে পড়েছে।
অনেকগুলি গানে পদাবলীর অভিসারের ইঙ্গিত আছে। যদিও নায়কনায়িকার চিত্রপট স্পষ্ট নয়। ‘মনে হল যেন পেরিয়ে এলেম’ কিংবা ‘বর্ষণমদ্রিত অন্ধকারে এসেছি তোমারি দ্বারে’ এগুলি এক হিসেবে অভিসারেরই পদ, যদিও পদাবলীর মত অভিসারের স্বকীয়া-পরকীয়া লক্ষণ রবীন্দ্রনাথের কাছে তত্ত্বগতভাবে প্রাধান্য লাভ করেনি। এই অভিসার কখনো লোকায়ত প্রেমের দিক থেকে ঘটেছে। কখনো প্রিয়তম অর্থে ঈশ্বরও কবির অভিপ্রেত হয়ে উঠেছে। ‘আমারে যদি জাগালে আজি নাথ’, ‘আজি ঝড়ের রাতে তোমার অভিসার’, ‘মেঘের পরে মেঘ এসেছে’ এই গানগুলি বর্ষাভুক্ত হলেও গীতাঞ্জলি-গীতিমাল্য পর্বের ভক্তি আত্মনিবেদনের সুর রণিত। ‘আজ কিছুতেই যায় না মনের ভার’ ব্যর্থ দিবাভিসারের গান। ‘তিমির অবগুঠনে বদন তব ঢাকি’ গানে অভিসারিকার মূর্তি স্পষ্ট এবং মিলানোৎকণ্ঠাও তীব্র। ‘মম মন-উপবনে চলে আভিসারে’ পদাবলীর মানস অভিসারকে স্মরণ করিয়ে দেয়। ‘শাওন গগনে ঘোর ঘনঘটা’ তে পদাবলীর রাধারই অভিসার প্রস্তুতি। ‘স্বপ্নে আমার মনে হল কখন ঘা দিলে আমার দ্বারে’ গানটিও ব্যর্থ নিশাভিসারের উদাহরণ।
কিন্তু বর্ষার গানে ঐশ্বর্য অসীম বিরহানুভূতিকে কবির নিবিড় নিঃসঙ্গতাবোধে, অতীত স্মৃতি উন্মত্থিত বেদনায় ও অনন্ত বিচ্ছিন্না মানসসুন্দরীর সঙ্গে নিরুপায় মিলনের নিমেষহারা উৎকণ্ঠায়। এই গানগুলিই কবির বর্ষাসঙ্গীতের প্রতিনিধিমূলক গান, এই গুলি তার হৃদয়ের নিভৃত গোপন রহস্যান্ধকার অন্তঃপুর থেকে উৎসারিত।
কতগুলি বর্ষার গানে কবি বর্ষাকে ঋতু হিসেবে অভ্যর্থনা করেছেন। বর্ষাঋতুর পরিবেশ বর্ণনা ছাড়াও এই গানগুলিতে একটি সামাজিক উৎসবের আয়োজন, সমারোহ, বরণ প্রত্যুদগমনের অভিনব প্রকাশনা প্রকাশ পেয়েছে। বাংলাদেশের বর্ষামঙ্গল উৎসবকে রবীন্দ্রনাথই আমাদের জাতীয় জীবনের ছন্দে ও সাংস্কৃতিক সম্পদে অপরিহার্য করে তুলেছেন। তেমনি করে শেষ বর্ষন ব্যাপারটিকেও তিনি একটি উৎসবে রূপ দান করেছেন। ‘ঐ আসে ঐ অতি ভৈরব হরষে’ কল্পনার বর্ষামঙ্গলে কবিতাটিকে সুরারোপিত করে তিনি এই বর্ষামঙ্গলের উদ্বোধনী সঙ্গীতে পরিণত করেছেন। এছাড়া ‘এসো শ্যামল সুন্দর’, ‘এসো নীপবনে’, ‘ধরণীর গগনের মিলনের ছন্দে’, ‘নমো নমো নম’, ‘তপের গানের বাঁধন কাটুক’, ‘এসো হে এসো সজল ঘন’, ‘কোন্‌্‌ পুরাতন প্রাণের টানে’, ‘আবার এসেছে আষাঢ়’, প্রভৃতি গানগুলি বিশেষভাবে বর্ষামঙ্গল গীত হয়ে উঠেছে। ‘শ্যামল ছায়া নাই বা গেলে’, ‘শ্রাবণ তুমি বাতাসে কার আভাস পেলে’, ‘শ্যামল শোভন শ্রাবণ তুমি’, ‘কেন পান্থ এ চঞ্চলতা’, ‘থামাও রিমিকঝিমিক বরিষণ’ প্রভৃতি গানে বর্ষা বিদায়ের বিশেষ স্বতন্ত্র ব্যঞ্জনা পাওয়া যায় বলে এগুলিকে শেষে বর্ষনের গান বলা যেতে পারে।
শেষ বয়সের একটি গানে কবি জানিয়েছিলেন – প্রকৃতির দান ঋতু অবসানে যদি বা রিক্ত হয়, কবির শ্রাবণসঙ্গীত বেঁচে থাকবে, বিস্মৃতির স্রোতের উজান ঠেলে ফিরে ফিরে আসবে এ তরণী। বর্ষাদিবসের প্রথম প্রস্ফুটিত কদম্বকুসুমের মতো, কবির মেঘাবৃত অন্ধকারের আবরণে ঢাকা সুরের খেতের প্রথম স্বর্ণশস্যতুল্য রবীন্দ্রসঙ্গীতটি –
বাদল দিনের প্রথম কদমফুল করেছ দান / আমি দিতে এসেছি শ্রাবণের গান।

x