রফতানি খাতে সব সুবিধা শুধু তৈরি পোশাককে নয় ॥ খাতকে সমান সুবিধা দরকার

মঙ্গলবার , ৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ১১:০৪ পূর্বাহ্ণ
73

গত অর্থবছর ৪০ বিলিয়ন ডলারের বেশি পণ্য রফতানি করেছে বাংলাদেশ। এ রফতানির ৮০ শতাংশের বেশি পোশাক পণ্য। রফতানি আয়ে পোশাক পণ্যের ওপর এ নির্ভরতা প্রতি বছরই বাড়ছে। কিন্তু পিছিয়ে পড়ছে পোশাকপণ্য বহির্ভুত বা নন আরএমজি পণ্যের রফতানি। পোশাকের বাইরে অন্যখাতের প্রবৃদ্ধি বাড়ছে না। বড়ও হচ্ছে না মোট রফতানিতে এর অংশ। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) পরিসংখ্যান বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে বাংলাদেশ থেকে রফতানি হয় ৩ হাজার ৪৬৫ কোটি ডলারের পণ্য। এর মধ্যে ৮১ দশমিক ২২ শতাংশই ছিল পোশাকপণ্য। পরের অর্থবছর মোট রফতানিতে পোশাক-পণ্যের অংশ আরো বেড়ে যায়। ৩ হাজার ৬৬৬ কোটি ডলারের রফতানিতে পোশাকপণ্যের অংশ ৮৩ দশমিক ৪৯ শতাংশে উন্নীত হয়। সর্বশেষ গত ২০১৭-১৮ অর্থ বছর মোট রফতানিতে পোশাকপণ্যের অংশ আরো বেড়েছে। মোট ৪ হাজার ৫৩ কোটি ডলারের রফতানিতে পোশাকপণ্যই ছিল ৮৪ দশমিক ২ শতাংশ। মোট রফতানিতে পোশাক খাতের অংশ বৃদ্ধির বিপরীতে কমছে পোশাকপণ্য বহির্ভূত পণ্যের অবদান। ২০১৬-১৭ অর্থ বছরে মোট রফতানিতে নন-আরএমজি পণ্যের অবদান ১৮ দশমিক ৭৭ শতাংশ থাকলেও পরের অর্থবছর তা ১৬ দশমিক ৫০ শতাংশে নেমে আসে। গত অর্থবছর এ অবদান আরো কমে দাঁড়ায় ১৫ দশমিক ৭৯ শতাংশে। একই চিত্র খাতভিত্তিক রফতানি প্রবৃদ্ধিতেও। ইপিবির পরিসংখ্যান বলছে ২০১৭ সালের জানুয়ারিতে পোশাকপণ্য প্রবৃদ্ধি ৭ শতাংশ থাকলেও চলতি বছরের একই সময়ে তা ১১ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অন্যদিকে ২০১৭ জানুয়ারিতে নন আরএমজিতে খাতে রফতানি প্রবৃদ্ধি ছিল ৭ শতাংশ। ২০১৮ সালের মাঝামাঝি সময়ে তা ঋণাত্মক হয়ে যায়। তবে গত জানুয়ারি থেকে নন আর এমজি পণ্য রফতানি ঋণাত্মক প্রবৃদ্ধি থেকে ঘুরে দাঁড়াতে শুরু করেছে। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এখবর প্রকাশিত হয়।
দেশে দীর্ঘদিন ধরে প্রচেষ্টা চলছে রফতানি পণ্যে বৈচিত্র্য আনার। কিন্তু এই প্রয়াসের তেমন কোন সুফল মেলেনি। ঘুরেফিরে রফতানি আটটি পণ্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। মোট রফতানি আয়ের ৯৬ শতাংশই আসে ওই আটটি পণ্য থেকেই। রফতানি তালিকায় রয়েছে পাঁচ হাজার পণ্য। কিন্তু ওই আটটি ছাড়া অবশিষ্ট পণ্যগুলো কদাচিৎ কখন কোথায় রফতানি হয় জানাও যায় না। আবার আটটি পণ্যের মধ্যে তৈরি পোশাকের প্রভাব নিরংকুশ। রফতানি আয়ে পোশাক শিল্পের অবদান ৮০ শতাংশেরও বেশি। আবার পোশাক খাতের মধ্যেও বৈচিত্র্য সংকট রয়েছে। ঘুরে ফিরে কম দামের গতানুগতিক পণ্যের গণ্ডিতে ঘুরপাক খাচ্ছে, এর বাইরে যেতে পারছে না। এসব পণ্যের দরও খুবই কম। বিশেষজ্ঞদের মতে একক বাজার ও একক পণ্যের ওপর অতি নির্ভরশীলতার অর্থ হচ্ছে, বিদেশি মুদ্রা আহরণের প্রধান উৎস বড় ধরনের ঝুঁকিতে রয়েছে। কূটনৈতিক কিংবা অর্থনৈতিক কোন কারণে অতিনির্ভরশীল বাজার হারালে রফতানি খাত পুরোটাতে ধস নামবে। আবার একক পণ্যের ওপর নির্ভরতার কারণে একই পরিণতি হতে পারে। এমন কি প্রধান পণ্য তৈরি পোশাকের উদ্যোক্তারাও একই কথা বলে আসছেন। একক পণ্য নির্ভরতা শুধু রফতানি খাতকে নয়, দেশের সম্পূর্ণ অর্থনীতিকেই ঝুঁকিতে ফেলেছে। যে কোন কারণে পোশাক খাত মার খেলে ৪০ লাখ শ্রমিকসহ এ খাত ঘিরে পরিচালিত ব্যাংক, বীমাসহ অন্যান্য সেবা ও শিল্পখাতও মার খাবে। ফলে পণ্যে বৈচিত্র্য আনা দরকার। নতুন নতুন বাজারও দরকার। অথচ এটা আশানুরূপভাবে হচ্ছে না। এটা দেশের সার্বিক অর্থনীতির শুভ লক্ষণ নয়। শ্রমঘন ও রফতানি আয়ের উৎস হওয়ায় পোশাক খাতের দিকে আমাদের সব সময় নজর রাখতে হবে। কী কী পদক্ষেপ নিলে পোশাক খাত আগামী দিনে আরও উন্নতি করবে, তা নিয়ে গবেষণা করা অত্যাবশ্যক। আমরা মনে করি নতুন নতুন বাজার খুঁজে নেওয়া এ খাতের উন্নতিতে খুবই সহায়ক হবে। শুধু তৈরি পোশাক খাতকে গুরুত্ব দিলে হবে না। এতে রফতানি আয়ে আরো ঝুঁকি সৃষ্টি হবে। হিমায়িত খাদ্য এবং মাছ থেকে শুরু করে চামড়া ও প্লাস্টিকের মতো পণ্য উৎপাদনে নজরদারি বাড়াতে হবে। চামড়া খাত নিয়ে যে বড় সম্ভাবনার সৃষ্টি হয়েছিল, তা যেন ক্রমেই কমে আসছে। কেন চামড়া খাতের সক্ষমতার সর্বোচ্চ ব্যবহার হচ্ছে না, সেটা খতিয়ে দেখতে হবে। এ খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, আমদানি-রফতানির লিড টাইম নিশ্চিত করা এবং চট্টগ্রাম বন্দরের দক্ষতা বাড়ানো খুবই জরুরি। বিষয়টির দিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি দেওয়াটাও দরকার। পাট ও পাটজাত পণ্য নিয়েও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা প্রয়োজন। পাট ও পাটজাত পণ্য থেকে রফতানি আয় বেড়েছে। তবে এতে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নেই। পাটসহ প্রতিটি রফতানিযোগ্য পণ্যের জন্য নিয়মিত নতুন নতুন বাজার খোঁজা খুবই দরকার। দু একটি পণ্য ও হাতেগোনা দু একটি পণ্য এবং কয়েকটি বাজারের ও নির্ভরশীল হয়ে পড়লে রফতানি আয় ঝুঁকিগ্রস্ত হবে। রফতানি খাতকে আরও সুসংহত করতে নীতি ও নগদ প্রণোদনায় বিষয়টি সরকারের ভাবার সময় এসেছে। মনে রাখতে হবে, রফতানি খাতে যত বেশি বৈচিত্র্য আনা যাবে ততই বাড়বে আয়ও। রফতানি খাতে বহুমুখী শিল্পায়ন নিশ্চিত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া একান্ত প্রয়োজন। সরকারি ও বেসরকারি খাতে উদ্যোগ আশানুরূপ না হওয়ায় এবং সুষ্ঠু পরিকল্পনার অভাবে পণ্যের বহুমুখীকরণ হচ্ছে না। এতে রফতানি বাণিজ্যে পিছিয়ে পড়ছে দেশ।
রফতানি বাণিজ্য টেকসই করতে হলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো ও সরকারি সহায়তা আরও বাড়ানো অত্যাবশ্যক। আর রফতানি পণ্য বহুমুখীকরণে সরকার ও বেসরকারি উদ্যোক্তাদেরই বেশিভূমিকা পালন করতে হবে। রফতানিকারকরা একই ধরনের ব্যবসা না করে ভিন্ন ভিন্ন ব্যবসা করলে এর সমাধান হবে। ব্যবসায়ীরা তাদের উদ্ভাবনী শক্তিকে ব্যবহার করতে পারলে তারা অবশ্যই লাভবান হবেন বলে আমাদের বিশ্বাস। বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বলছেন, এখনও নীতি সহায়তার বাইরে রয়ে গেছেন চার হাজার উদ্যোক্তা। এ কারণে শুল্কমুক্ত বাজার সুবিধা থাকা সত্ত্বেও বাংলাদেশের রফতানি ইপ্সিত গতিতে এগোচ্ছে না। রফতানিতে দীর্ঘদিনের সংকট দুর করতে হলে সব রফতানি খাতকে সমান সুযোগ দিতে হবে। যেমন শুল্কমুক্ত কাঁচামাল ও যন্ত্রপাতি আমদানি সুবিধা। রফতানি উন্নয়ন তহবিল থেকে স্বল্প সুদে ঋণ দেওয়া ইত্যাদি সব ধরনের সুবিধা এক্ষেত্রে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, রফতানি খাতের জন্য একটি দীর্ঘ মেয়াদি নীতি তৈরি করে দেওয়া উচিত যাতে প্রতিবছর বাজেটের আগে এনবিআরে এসে ধর্ণা দিতে না হয়। এছাড়া রফতানি খাতকে দেওয়া সুযোগ-সুবিধার সম্পূর্ণ অটোমেশন প্রয়োজন।

x