রত্নগর্ভা এক মায়ের সংগ্রামী জীবনের গল্প

অপু ইব্রাহিম, সন্দ্বীপ

রবিবার , ১২ মে, ২০১৯ at ১:১৭ অপরাহ্ণ
161

শাহজাহান বেগম (৬৫)। এক সংগ্রামী মা। সংগ্রামের শুরু তার শৈশব থেকে। তবে সবকিছু ছাপিয়ে এখন তার বড় পরিচয় তিনি একজন সফল মা । তিনি রত্নগর্ভা। মানুষ গড়ার কারিগরে নিয়োজিত ৩ শিক্ষকের এই জননী নিজে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে অল্প শিক্ষিত হলেও প্রতিটি সন্তানকে শিক্ষার পরিপূর্ণ আলোয় আলোকিত করে তুলেছেন। যারা স্বমহিমায় উজ্জ্বল।

তার ২ ছেলে এবং ৭ মেয়ের মধ্যে বড় দুই মেয়ে স্বশিক্ষিত। ৩য় মেয়ে ঝর্না বেগম উচ্চ ম্যাধ্যমিক পাস করে শিক্ষকতার চাকরি পেলেও করতে পারেন নি স্বামী আলেম বলে। ৪র্থ মেয়ে রোকেয়া বেগম, ৫ম মেয়ে পারভীন আকতার, ৬ষ্ঠ মেয়ে রোজিনা রুপা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক।

বড় ছেলে রিদোয়ান রবিন এসএসসি পাস করে প্রবাসে আছেন। ছোট মেয়ে শিরিন শীলা স্নাতক পাস করে স্বামীর সংসারে আছেন। সেও শিক্ষক হওয়ার জন্য দৌঁড়ঝাপ চালিয়ে যাচ্ছেন। ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন শাহীন এমবিএ পড়ছেন। অত্যন্ত মেধাবী ছিলেন মা শাহজাহান। পড়াশোনার প্রতি ছিল অগাধ আগ্রহ। সংসারে বড় হওয়া শাহজাহান সুযোগ পেলেই বসে যেতেন বই নিয়ে। তবে তার পড়াশোনায় ছিল নিষেধাজ্ঞা। তাই লোকচক্ষুর আড়ালে গিয়ে তিনি বই পড়তেন। কিন্তু এই মেধাবী নারীর পড়াশোনার ইতি ঘটে পঞ্চম শ্রেণিতেই। খুব অল্প বয়সে বিয়ে হয় তার। তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় নারী শিক্ষার ধর্মীয় পশ্চাৎপদতার কারণে আর এগোয়নি তার লেখাপড়া।

সন্দ্বীপের মুছাপুর ইউনিয়নের সামছুল হকের সাথে সঙ্গে বিয়ে হয় তার। শাহজাহান পরিবারের ছোট বউ হলেও তার দায়িত্বটা ছিল একটু বেশি। শ্বশুরের ভালবাসা ও স্নেহের কথা স্মরণ করে এখনো চোখ ভিজে যায় এ নারীর। স্বামীর সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকায় সাংসারিক জীবনের অনেক ঝামেলায় সমাধান করতে পারতেন সহজে। মেয়ে বেশি থাকায় পরিবারের অন্য কারও কাছ থেকেই পাননি ইতিবাচক সাড়া। তাই তখন থেকেই সংকল্প করেন শাহজাহান সন্তানদের উচ্চশিক্ষিত করে গড়ে তোলার।

প্রায় ৩৫ জন সদস্যের বিশাল সংসারে উদয়-অস্ত পরিশ্রম করতে হত তাকে। নিজের ও সন্তানদের জন্য ছিল না কোন সময়। তাই সেই প্রত্যন্ত গ্রামে থাকা এ নারী তার সন্তানদের পড়াশোনা করানোর জন্য বেছে নেন এক অভিনব সময়। রান্না করার সময় রান্নাঘরে চুলার পাশে পাটি বিছিয়ে তার সন্তানদেরকে পড়াতে বসাতেন। পঞ্চম শ্রেণি পাশ এই মায়ের হাতেই হয়েছে সন্তানদের পড়ালেখার হাতেখড়ি। এমনকি তার সব সন্তানকে তিনি নিজেই পড়িয়েছেন পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত। এ বিরুপ সামাজিক অবস্থার মধ্যে থেকে থেকে শাহজাহান তার সন্তানদেরকে তুলে এনেছেন। এজন্য অনেক কাঠখড় পোড়াতে হয়েছে তাকে।

সেসময় এত বড় সংসার সামলিয়ে নয় সন্তানকে বড় করে তোলা ছিল সত্যিই এক দুঃসাধ্য বিষয়। স্বল্পশিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে সমাজের নেতিবাচক প্রভাব থেকে সন্তানদের মুক্ত করে ধারা পরিবর্তনের কৃতিত্ব এই নারীর। মায়ের স্মৃতিচারণ করে শাহজাহানের ৪র্থ মেয়ে উত্তর মগধরা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক রোকেয়া বেগম বলেন, আমার মা আমাদের সবচেয়ে বড় বন্ধু, কড়া প্রশাসক। অনেক ব্যক্তিত্ত্বসম্পন্ন একজন নারী। পড়াশোনার বিষয়ে মা কখনোই আমাদেরকে কোন ছাড় দিতেন না। এই পড়ার কারণে মায়ের কাছে মার খেয়েছি অনেক।

শৈশবের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, একদিন মা চুলার পাশে বসে পড়াচ্ছিলেন। তখন আমি ক্লাস ওয়ানের ছাত্রী। মা তরকারি নাড়ছিলেন আর আমাকে পড়াচ্ছিলেন। এমন সময় আমি কিছুটা আনমনা হয়ে পড়লে মা খুন্তি উঁচু করে আমাকে মারার ভয় দেখান। মায়ের একথায় আমি অনেক ভয় পেয়ে যাই। মায়ের কড়া শাসন আর সচেতনতার কারণেই মনে হয় আজ এ অবস্থানে আসতে পেরেছি। ভোর থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত কঠোর পরিশ্রম করা এই মা এতটাই ক্লান্ত থাকতেন যে, মাঝে মাঝে এশার নামাযে বসে সেজদায় যেয়ে প্রায়ই ঘুমিয়ে যেতেন। তিনিই আবার সন্তানরা যখন রাত জেগে পড়াশোনা করত তখন তাদের সাহস যোগাতে সারারাত বসে থাকত।

ছোট ছেলে আনোয়ার হোসেন শাহীন বলেন, আমার মা মানুষ গড়ার কারিগর। মা ছিলেন সুশাসন, শিক্ষা ও নিয়মানুবর্তিতায় কঠোর। ছোটবেলায় কেউ মারলে মায়ের কাছে এসে নালিশ করলে মা উল্টো মারতেন আর বলতেন ওখানে গিয়েছিলি কেন? এভাবেই আমার মা আমাদের নীতি-নৈতিকতা ও আদর্শের শিক্ষা দিয়ে বড় করে তুলেছেন।

x