রণধীর মল্লিকের গল্পগ্রন্থ ‘রোদের ছায়া’

মুহাম্মদ বাবুল হক বাবর

শুক্রবার , ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:৩৮ পূর্বাহ্ণ
25

মানুষের মন গল্পের মন। মানুষ গল্প করতে,গল্প শুনতে,গল্প পড়তে খুবই ভালোবাসে।ঘুমাতে গিয়েও মানুষ গল্প শুনে,গল্প বলে। ঠাকুরমার ঝুলি’বা ঠাকুরদার থলে রূপকথার অনেক গল্প পড়েছি বা শুনেছি। কিন্তু মানুষ চায় বাস্তবতার গল্প।লেখক বাস্তব জীবনে তার স্বচক্ষে দেখা ঘটনা গুলোকে অত্যন্ত সহজ সরল ভাবে পাঠক সমাজে উপস্থাপন করতে সক্ষম হয়েছেন।তার লেখা অন্যান্য বইগুলোর মধ্যে একটি স্মৃতিকথামূলক,একটি গবেষণামূলক,তিনটি নাটক ব্যাপক সাড়া জাগায়।
পাঠকের ভালোবাসায় সিক্ত রণধীর মল্লিক’র সামপ্রতিক প্রকাশিত গল্পগ্রন্থ ‘রোদের ছায়া’বইটিতে ৬০টি মৌলিক ছোটগল্প স্থান করে নিয়েছে। অধিকাংশ গল্প লেখকের প্রত্যক্ষ দেখা সমাজ বাস্তবতা এবং পারিবারিক ভাবনা নিভূর। লেখক যে কালের মানুষ সেই কালেরই কিছু ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশ টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে এনে ফ্রেমে বেঁধেছেন। জীবনের প্রাত্যহিকতায় ও তুচ্ছতার মধ্যেই যে ভিন্নমুখী প্রকৃতি ও প্রবৃত্তির জটিল জীবনকাব্য, তার মাধুর্য,তার ঐশ্বর্য,তার মহিমা,তার গ্লানি,তার দুর্বলতা,তার বঞ্চনা-বিড়ম্বনা,তার শূন্যতার যন্ত্রণা ও আনন্দিত স্বপ্ন নিয়ে কলেবরে ও বৈচিত্র্যে স্ফীত হতে থাকে,লেখক তার চিন্তা চেতনায় তা ধারণ করতে পেরেছেন।সুদক্ষ গল্পকার রণধীর মল্লিক’র ‘রোদের ছায়া’ গল্পগ্রন্থে যে মন কাঁদে,আকাশ এতো মেঘলা,সাগর সৈকতে,হঠাৎ একদিন,নীড় ছোট, রিক্তের বেদন,চাটুকারিতা, লবণ কথা, বিদ্যাসাগর বনাম বঙ্কিম,চিতা লেখকের সবকটি গল্পে চরিত্র চিত্রনে সাহিত্যিক গুণাবলী বিদ্যমান।তৎমধ্যে উল্লেখযোগ্য কয়েকটি গল্প নিয়ে আলোচনা করা হল।
‘রোদের ছায়া’(সেঁজুতি) ৭১’সালে সেঁজুতির বয়স ছিলো মাত্র ১৬ বছর।দেখতে সুশ্রী মধ্য অবস্থাপন্ন ঘরের মেয়ে সেঁজুতিকে পান্‌জাবিরা তুলে নিয়ে যায়।দেশ স্বাধীন হলেও সেঁজুতি আর ফিরে আসেনি।গল্পটিতে পান্‌জাবি সৈন্যদের হিংসাত্মক কর্মতৎপরতার করুণ চিত্র ফুটে উঠেছে।(বিজয়া) চঞ্চল,চপলা বিজয়াকে এখন আর কেউ ভালোবাসে না।এমন কি মা বাবাও না।যৌতুক লোভী স্বামীর অত্যাচারে সে বেছে নেয় আত্মহত্যার পথ।(সেই শিশুটি)শিশুটি জানে না তার মা কেনঐখানে ঐ রাস্তার পাশে বসেছে।তার মা লোকের কাছে হাত পাতে,কেউ কেউ দয়া করে ২/১ টাকা দেয়।সে নিজেও অনেক সময় হাত পেতে নেয়।শিশুটির জন্মের পর বাবা তাদের ত্যাগ করে অন্যত্র চলে যায়।হঠাৎ একদিন গাড়ি চাপা পড়ে শিশুটি।মায়ের বুকফাটা আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠে। ভিক্ষার থালা নিয়ে মা এখনও রাস্তার পাশে উদাস হয়ে বসে থাকে।চোখ মুখ বিবর্ণ। শুধু তার কোলে নেই আদরের সেই শিশুটি। (কন্‌জুষ) হাড়কিপটে অতীস বাবুকে পাড়ার সবাই কন্‌জুষ নামে চিনে।তাকে নিয়ে এলাকার সবাই ঠাট্টা-তামাশা করে। তিনি এসব গায়ে মাখেন না।এলাকার মানুষের চিন্তা চেতনাকে প্রাধান্য দিয়ে অতীস বাবু তার সারা জীবনের কষ্টার্জিত অর্থে স্কুল প্রতিষ্ঠায় এগিয়ে আসেন। শিশুদের পাঠের কলরব শুনে অতীস বাবু স্কুলের পাশে দাঁড়িয়ে থাকেন।তখন তার মনটা আত্মতৃপ্তিতে ভরে উঠে।(বন্ধুর বোন) কাব্য আর অর্ঘ্য দুই বন্ধু। লেখাপড়ার সুবাদে অর্ঘ্য কাব্যদের বাসায় যায়।কাব্যের বোন নন্দা অর্ঘ্যকে পছন্দ করে।এক পর্যায়ে নন্দা অর্য্যকে প্রেম নিবেদন করলে অর্ঘ্য তাতে সাড়া দেয়নি।সে ভাবে নন্দা কাব্যের বোন তার প্রেমে সাড়া দেওয়া হবে অপরাধ।কাব্য ও তার মা তাকে ভুল বুঝবে।নন্দার হৃদয়ে বেজে উঠে হারানোর করুণ সুর।তার দুচোখে জলের ধারা।(নীড় ছোট) সুবর্ণ এবং সরোজ দুজনেই স্বামী স্ত্রী।বিয়ের পনর বছর অতিক্রান্ত হলেও তাদের কোন সন্তানাদি হয়নি।সুবর্ণ মাঝে মাঝে অন্ধকারে মুখ লুকিয়ে কাঁদে। সরোজ সুবর্ণকে সান্ত্বনা দেয়; বলে, পৃথিবীতে অনেক দম্পতিই তো নিঃসন্তান।তারা সামাজিক কাজে নিজেকে ব্যস্ত রেখে সন্তানের দুঃখ ভুলেছে।লেখক তার গল্পে চেনা জানা স্থান,কাল পাত্রের সন্নিবেশ ঘটিয়ে গল্পগুলোকে বেশ আকর্ষনীয় করার প্রয়াস পেয়েছেন যা প্রশংসার দাবি রাখে।
গল্পকার রণধীর মল্লিক পেশাগত জীবনে একজন শিক্ষক। এত ব্যস্ততার মাঝেও তিনি প্রবন্ধ,গল্প,স্মৃতিকথা,গবেষণামূলক অনেক লেখা সমানে লিখে চলেছেন।প্রচারবিমুখ লেখক যশস্বী শিক্ষক রণধীর মল্লিক’র গল্পগ্রন্থ ‘রোদের ছায়া’র প্রচ্ছদ এঁকেছেন অপূর্ব দাশ।দুইশত চল্লিশ পৃষ্ঠার এই গল্পগ্রন্থটির মূল্য দুইশত পঞ্চাশ টাকা।

x