রঙিন ফানুস

সাবিহা মুসা

শুক্রবার , ২৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:৪০ পূর্বাহ্ণ
36

কনা ও মুনা, নাম শুনলে মনে হয় দুই বোন, আসলে দুই বান্ধবী। একেবারে শিশুশ্রেণি থেকে লেখাপড়াসহ চলাফেরা সব একসাথে, পাশাপাশি বাড়িতে বসবাস, তাদের বাবারা, মায়েরা, একে অপরের শুভাকাঙ্ক্ষী।
কনা, মুনা বান্ধবী হলেও স্বভাবে মিলের চেয়ে অমিল বেশি। তারপরও স্নেহ ভালবাসার কমতি নেই। কনা চঞ্চল স্বভাবের, কথা বেশি বলে, স্বামী রনী প্রতিষ্ঠিত ব্যবসায়ী, বিশিষ্ট সমাজসেবী, ক্ষেত্র বিশেষে দানবীর হিসেবে পরিচিত।
মুনা একটি বেসরকারি কলেজে অধ্যাপনা করে। ব্যস্ততার শেষ নেই। স্বামী ইমরান ডাক্তার, তিনিও ব্যস্ত মানুষ। মুনার আজ কলেজ ছুটি তাই কিছু জমানো কাজ শেষ করে। বিশ্রাম নেবে দুপুরে, ঘুমিয়ে।
মোবাইল বাজছে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও ধরলো। ও দিক থেকে কনা গেয়ে উঠলো। আমি হৃদয়ের কথা বলিতে ব্যাকুল শুধাইল না কেহ। বুঝলি, তা বুঝলাম, ঘুমাতে দিলি না, তোকে আবার-
শুধাবো কি, বলতে তো কিছু বাকী রাখবি না। বল, কি সমাচার, মোবাইলে বেশি কথা বললে কানের ক্ষতি হবে- সতর্ক বার্তা দিয়েছে ডাক্তার। কনা বললো, ডাক্তাররা যত সদুপদেশ রোগীদের দেয় নিজেরা তার কিছুই মানে না। বলার আছে তাই বলে তুই তো আবার ডাক্তার গিন্নি, মাইন্ড করিস না। আচ্ছা ঠিক আছে, তুই তো মাষ্টার, মানুষ চিনিস। আচ্ছা কনা, মানুষ চেনার কি কোন যন্ত্র আছে, মিশলে বা তার আচার ব্যবহারে কিছুটা চেনা যায়? ভাল মন্দ মিশিয়ে তো মানুষ, তা তুই কি আমাকে মানুষ চেনাবার জন্য ফোন করেছিস? দুপুরের আরামটা তো দিলি হারাম করে। মুখে বললেও মুনা বিরক্ত হয় না। কনার গল্প করার ভঙ্গি মুনা খুব উপভোগ করে, যদিও সত্যি কথা বলে, কিন্তু সমালোচনা তো গীবতের পর্যায়ে পড়ে, গুনাহ হবে, এই ভয়ে কনাকে নিভৃত করে। কিন্তু কনা শুনলে তো। বলে সত্যি কথা বললে গুনাহ হবে কেন। না কনা, সত্যি হলেও বলবি না। তোকে আমি গুনাহগার হতে দেব না।
বাহ্‌ চমৎকার, গুনাহ না করতে দেওয়ার এজেন্সি নিয়েছিস নাকি? শোন বিত্তবানরা এত অহংকারী হয় কেন? মিসেস শাকিলকে তো চিনিস, সব সময় তার মুখে নিজের ও সন্তানদের ও স্বামীর কৃতিত্বের কথা গায়ে পড়ে মানুষকে শোনাবে, যেহেতু বিত্তবান, কিছু চামচা টাইপের মহিলা তাকে খুশি করার জন্য এগুলো শুনাবে, অন্যদের কাছে গল্প করবে।
সে দিন এক অনুষ্ঠানে গল্প করছিল, জানেন, এই শাড়িটা বোম্বে থেকে কিনেছি, চল্লিশ হাজার টাকা দাম, গহনার সেটটাও পাঁচলক্ষ টাকা নিয়েছে। হ্যাঁ হ্যাঁ খুব সুন্দর, আপনাকে খুব মানিয়েছে। প্রশংসা শুনে আরো খুশি। আমার মেয়ে রুমানাকে চিনেন না? টিভিতে গান গায়, কবিতা আবৃত্তি করে, সবাই ওকে চেনে, ছেলেটা লেখাপড়ায় খেলাধুলায় খুব ভাল। অনেক পুরস্কার পেয়েছে। আসেন না একদিন আমাদের বাড়িতে, সব দেখাবো, আসলে খুশি হব।
কনা বললো- আসলে, ভাবী এখন কারো বাড়ি তেমন একটা যাওয়া হয় না। বাড়ি চেনাও মুশকিল। অনুষ্ঠানে দাওয়াত করে কমিউনিটি সেন্টারে, ঠিক-আছে একদিন ঘুরতে ঘুরতে যেয়ে হাজির হবো, ঠিকানা ফোন নাম্বার নিয়ে রাখলো। কিছুটা কৌতূহল নিয়ে কনা ঠিকানা মিলিয়ে শাকিল সাহেবের বাড়িতে হাজির। ফয়েজ লেকের কাছে পাহাড়ের উপর আলিশান বাড়ি, সামনেই সুন্দর ফুলের বাগান। নানা রঙের ফুল ফুটে আছে। সুইমিংপুল, ঘরে দামী আসবাব, সাজানো গোছানো সুন্দর বাড়ি, দারোয়ানকে পরিচয় দিয়ে ভিতরে গিয়ে ড্রইং রুমে বসলো।
মিসেস শাকিল বাড়ি নেই। একজন বৃদ্ধামহিলা এসে কনার পাশে বসলো, পরিচয় দিলেন উনি শাকিল সাহেবের মা, সাধারণ সুতার শাড়ি পরা, ইমিটেশনের দুটি চুড়ি হাতে, কনাকে দেখে খুব খুশি হলো। কথা বলার সুযোগ পেয়েছে, শোনাবার মানুষ পেয়েছে, এক নাগাড়ে বলে যেতে লাগলো। জানো মা, এই সংসারে আমি একমাত্র মূল্যহীন, একদিকে পড়ে আছি, ছেলে বাইরে, বৌ সভা সমিতি নিয়ে ব্যস্ত, কি খাবো কি পরবো কাজের মানুষরা যেটুকু দেখা শোনা করে। নিচের একটি ছোট রুমে পরে থাকি। শাকিলের বাবা মারা যাওয়ার পর অনেক কষ্টে ছেলেটাকে মানুষ করেছি। ছেলে বৌ সারাদিন ঝগড়া করে। অশান্তি, ছেলে মেয়ে দুটিই মা-বাবার অবাধ্য, নিজেদের ইচ্ছেমত চলে। বন্ধু-বান্ধব নিয়ে সারাদিন হৈ চৈ করে। ধর্ম কর্মের দিকে কারো মন নেই। আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করি, দয়াময় যেন ওদের সুমতি দেয়, হেদায়েত করে। মা, কারো সামনে আমাকে যেতে দেয় না। কারো কাছে মনের দুঃখের কথা বলতে পারি না। আত্মীয় স্বজন তেমন কেউ আসে না। বন্ধু-বান্ধবরাই আসে। এত অবহেলা অপমানের জীবন ভাল লাগে না। এর চেয়ে মরে গেলে ভাল হতো। শুধু আমার ছেলেটার জন্য চিন্তা হয়। কি গুনাহ করেছি জানি না।
কনা উনার মাথায় হাত বুলিয়ে বলে, খালাম্মা, চিন্তা করবেন না। আপনি মুরব্বী মানুষ, দোয়া করবেন, নিশ্চয়ই শান্তি পাবেন, আজ আমি উঠি, ভাবীর সাথে দেখা হলো না। আপনাকে দেখতে আবার আসবো। বৃদ্ধা ছলছল চোখে বিদায় দিলো। এসো মা, তোমাকে খুব ভাল লাগলো। গাড়িতে উঠে কনা যেন চিন্তার রাজ্যে হারিয়ে গেল। এত বিত্ত বৈভব থাকা সত্ত্বেও কেন মনের দিক দিয়ে এরা এত দেউলিয়া, দামী শাড়ি গহনা ও মিথ্যা সুখের গল্পের আড়ালে এরা সাময়িক সুখ খোঁজে। তৃপ্তি পায় কি? জীবন নিয়ে সংগ্রাম করা একজন ত্যাগী মাকে খুশি রাখতে পারে না। শান্তি দিতে পারে না। নিজের হাতে গড়া ভালবাসার সংসার থেকে কত দুঃখ নিয়ে বৃদ্ধাশ্রমের জীবনে একে অন্যের সমব্যাথী হয়ে সুখে থাকতে চায়। এতক্ষণে মুনা বলে, কনা ফোনটা এবার রাখ কানটা সত্যি ব্যথা করছে। কনা ফোন রেখে দিল।
পরদিন সকালে চা খেতে খেতে পত্রিকার পাতায় একটা ছবি দেখে অবাক হয় কনা, দুই পাশে পুলিশ মাঝখানে মুখ নীচু করা হাতকড়া লাগানো শাকিল সাহেবের ছবি। খবরের হেডিং ইয়াবা টেবলেট সহ চোরা চালানকারী ব্যবসায়ী শাকিল আহমেদ গ্রেফতার। এতটুকু দেখে কনার বিশ্বাস হচ্ছে না, শাকিল সাহেব একজন চোরাচালানী, ইয়াবা পাচারকারী, বিত্তের উৎস তাহলে এই ঘৃণ্য পথে। মিসেস শাকিলকে করুণা করতে ইচ্ছে করে। অহংকারের পতন এভাবেই আসে। তারপরও এরা সমাজে মাথা উঁচু করে চলে। মুখের জোরে মিথ্যাকে প্রতিষ্ঠা করে।

x