রক্তে অতিরিক্ত চর্বি, কী করি?

ডা. রজত শংকর রায় বিশ্বাস

শনিবার , ২৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৯ at ৮:৫৮ পূর্বাহ্ণ
209

দেহ রক্ষা, রোগ প্রতিরোধ আর সুস্বাস্থ্যের জন্য আমরা খাবার খাই। আমাদের দৈনন্দিন খাবারে পর্যাপ্ত পরিমাণ শর্করা, আমিষ, চর্বি, ভিটামিন, খনিজ লবণ, আঁশযুক্ত খাবার আর পানি থাকতে হয়। পশ্চিমা খাবারের দৈনন্দিন খাদ্যতালিকায় চর্বিযুক্ত খাবারের পরিমাণ বেশি থাকে। আর আমাদের মতো উপমহাদেশীয় খাদ্য তালিকায় শর্করার পরিমাণ বেশি। তবে কথায় আছে, যে খাবার যতোবেশি সুস্বাধু তাতে ততোবেশি চর্বি। আমদের দেহ গঠনের জন্য চর্বির প্রয়োজন কিন্তু রক্তে এর পরিমাণ বেড়ে গেলেই যতো বিপত্তি।
কেইস স্টাডি এক : নাহার বেগম; বয়স ৪৭। তাঁর ডাসাবেটিসের সমস্যা। ডাক্তারের পরামর্শ মতে কিছু নিয়ম মানেন আর ট্যাবলেট খান। ডায়াবেটিস মোটামুটি নিয়ন্ত্রণে। কিন্তু ডাক্তার তাকে বললেন তার দেহে ট্রাইগ্লিসারাইড (টিজি) বেশি। তাকে ভাত কম খেতে বলা হল। আরো বললেন যে, তার রক্তের চর্বি তিন মাস পর আবার পরীক্ষা করতে হবে। আর প্রয়োজনে এর জন্য ওষুধ সেবন করতে হবে।
কেইস স্টাডি দুই : রহিম; বয়স ৫০। প্রেসারের রোগী। নিয়মিত প্রেসারের ওষুধ সেবন করে ভালো আছেন। তবে সমস্যা হল তার রক্তে অতিরিক্ত চর্বির উপস্থিতি ধরা পড়েছে। লো ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এলডিএল) তার রক্তে স্বভাবিক মাত্রার চাইতে অনেক বেশি। তিনি কি করতে হবে এটা ভেবে এখন অস্থির।
আলোচনা : চর্বি দেহকোষের খাবার, আবার রক্তে অতিরিক্ত চর্বি দেহের জন্য শত্রু। জিনগত ত্রুটি থাকলে অল্প বয়সে রক্তে অতিরিক্ত চর্বি হতে পারে। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে রক্তে চর্বি বাড়ার সম্ভাবনা অনেক বেড়ে যায়। আমাদের কাজের প্রকৃতি, দৈহিক শ্রম, খাদ্যাভ্যাস, দেহে অন্যান্য রোগ যেমন-ডায়াবেটিস/উচ্চ রক্তচাপ, অতিরিক্ত দৈহিক স্থুলতা ইত্যাদি রক্তে চর্বির পরিমাণ বাড়িয়ে দেয়। সাধারণত চার ধরনের কোলেস্টেরল বা চর্বি আছে যেগুলি রক্ত পরীক্ষা করে দেখা হয়। টোটাল কোলেস্টেরল (টিসি), লো-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এলডিএল), হাই-ডেনসিটি লাইপোপ্রোটিন (এইসডিএল) আর ট্রাইগ্লিসারাইড (টিজি) এই চার ধরনের চর্বি রক্তে দেখা হয়। এগুলোকে একসঙ্গে লিপিড প্রোফাইলও বলে। সাধারণত রাতের ১০-১৬ ঘন্টা না খেয়ে থেকে পরদিন সকালে খালিপেটে এ লিপিড প্রোফাইল পরীক্ষাটি করতে হয়।
এ চার ধরনের রক্ত চর্বির মধ্যে এলডিএলকে ব্যাড কোলেস্টেরল আর এইসডিএলকে গুড কোলেস্টেরল বলে। ঋতুবতি মহিলাদের এইসডিএল বা গুড কোলেস্টেরল বেশি থাকে। তাই এ সময়ে স্ত্রীলোকের চর্বির সমস্যা কম হয়। রক্তের অতিরিক্ত চর্বিতে দেহের বিভিন্ন প্রয়োজনীয় অঙ্গ ধীরে ধীরে আক্রান্ত হতে পারে। অতিরিক্ত চর্বি রক্তণালীর গায়ে ধীরে ধীরে জমা হয়ে একে সরু করে ফেলে। তারপর হঠাৎ করে এসব রক্তনালী পুরোপুরী বন্ধ হয়ে ঐ অঙ্গকে বিকল করে দিতে পারে। এর মধ্যে অন্যতম হল হৃ্‌দপিন্ড (হার্ট), মস্তিষ্ক (ব্রেইন), চোখ আর দেহের রক্তণালী। প্রতিবছর আমাদের দেশে রক্তণালী বন্ধ হয়ে হার্টএটাক (হৃদপিন্ডে হয়) আর স্ট্রোকে (ব্রেইনে হয়) অনেক লোক আক্রান্ত হয় আর এদের মধ্যে অনেকে চিরতরে পঙ্গু হয় বা মারাও যায়। রক্তের চর্বি নিয়ন্ত্রণ করে এসব রোগ থেকে নিজেকে অনেকাংশে রক্ষা করা যায়।
আমাদের দৈনন্দিন খাবারে চর্বির উপস্থিতি কমাতে হবে। প্রচুর শাকসব্জি আর ফলমুল খেতে হবে। মাছ আর মাছের তেল রক্তে চর্বি বাড়ায় না তাই বেশি বেশি খাওয়া যাবে। তবে চিংডিমাছ আর কাকড়াতে চর্বি বেশি থাকে তাই পরিত্যজ্য। গরুর মাংস আর খাসীর মাংসে চর্বি বেশি থাকে তাই খেতে হবে নিয়ন্ত্রিতভাবে। মুরগী আর কবুতরের মাংসে চর্বি অপেক্ষাকৃত কম থাকে। ভাতে টিজি বেশি থাকে তাই যাদের টিজি বেশি তারা ভাত কম খাবে। প্রচুর হাটতে হবে আর শরীর চর্চার অভ্যাস করতে হবে। এর পরেও রক্তে চর্বি যদি বেড়েই যায় ডাক্তারের পরামর্শ মতে ওষুধ সেবন করতে হবে। স্ট্যাটিন আর ফাইব্রেট এ দুই ধরনের ওষুধ বেশি ব্যবহার করা হয়। ডাক্তার যে ডোজে দেন সেভাবে সেবন করা উচিত। চর্বির মাত্রা নিয়মিত পরীক্ষা করে দেখে ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করা হয়। তবে এসব ওষুধের কিছু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে যা ডাক্তার থেকে জেনে নিতে হবে আর তা দেখা দিলে ওই ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী চলতে হবে।
ফিরে দেখা : প্রথম রোগীর টিজি বেশি যা ডায়াবেটিসের কারণে আরও বাড়তি। রক্তে টিজির পরিমাণ দেখে ডাক্তার ওষুধ দেবে আরা তাকে ভাতের পরিমাণ কমাতে হবে। কারণ টিজির অন্যতম উৎস হল ভাত। দ্বিতীয় রোগীর এলডিএল বেশি, তাকে নিয়ম মানতে হবে। উচ্চ রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে রাখতে হবে। এলডিএলর মাত্রা দেখে ডাক্তার যে ওষুধ দেবে তা নিয়মিত সেবন করতে হবে। নিয়মিত রক্ত পরীক্ষা করে চর্বির মাত্রা দেখতে হবে আর ওষুধের ডোজ নির্ধারণ করতে হবে। মনে রাখতে হবে, এ ওষুধ তাকে দীর্ঘদিন সেবন করতে হবে। অনেক ক্ষেত্রে আজীবন সেবন করতে হয়। আমাদের জীবনযাপন প্রণালী, খাদ্যাভ্যাস আর কাজের ধরন রক্তে চর্বির উপস্থিতির জন্য অনেক ক্ষেত্রে দায়ী। তাই আমাদের সচেতন হতে হবে যা আমাদের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করবে।

x