রং-তুলিতে কবি

রেজাউল করিম

বুধবার , ৮ আগস্ট, ২০১৮ at ৭:৫১ পূর্বাহ্ণ
32

রবীন্দ্রনাথ শুধু বিশ্বকবি নন, তিনি চিত্রশিল্পীও বটে। তাঁর সমগ্র জীবন ও সাহিত্যসাধনায় দেবেন্দ্রনাথের প্রভাব ছিল ব্যাপক। সে যুগে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবার ছিল সাহিত্যসংস্কৃতি, মুক্তচিন্তা ও প্রগতিশীল ভাবধারার অন্যতম পীঠস্থান। একদিকে দেবেন্দ্রনাথের ধর্মানুশীলন এবং তাঁর পরিবারের স্বাদেশিকতা, সঙ্গীতসাহিত্য ও শিল্পচর্চার পরিশীলিত আবহ, অন্যদিকে দেশের নানাবিধ পরিবর্তন রবীন্দ্রনাথের জীবনে গভীর তাৎপর্য বয়ে আনে। ১৯১৬ সালে কবি জাপান যান। এই ভ্রমণে তাঁর সঙ্গে ছিলেন দুজন ভারত অনুরাগী উইলিয়াম পিয়ারসন ও সিএফ এন্ড্রুজ এবং তরুণ শিল্পী মুকুল দে। জাপান সংস্কৃতির সঙ্গে রবীন্দ্রনাথের পরিচয় ঘটেছিল কলকাতায় চিত্রশিল্পী ওকাকুরার সান্নিধ্যে।

শিল্পকলা ঠাকুরকে আশৈশব খুব টানতো। তাঁকে আকৃষ্ট করেছিল রেখা ও রঙের সমবায়ে যে ছবি নির্মিত হয় তার মধ্যে প্রাণ ও বাণী সঞ্চারণের ব্যাপারটি । খেলার ছলেই তিনি আঁকতে শুরু করেছিলেন, তারপর একসময় তা নেশা হয়ে দাঁড়ায়। কার্যত রেখা ও রং থেকে ছবি ফুটিয়ে তোলার স্বীয় শক্তির দৈনিক পরীক্ষায় পরিণত হয়। চিত্রকলায় ঠাকুরের কোন প্রথাগত বা আনুষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ ছিল না। আঁকতে আঁকতে এক ধরনের দক্ষতা অর্জন করেন তিনি। আর ছবির সংখ্যা যখন আড়াই হাজার ছাড়িয়ে যায়, তখন তা আর নিছক খেলা থাকে না, তাকে চিত্রসাধনা বলেই স্বীকার করে নিতে হয়। ঠাকুর ছবির নামাকরণের বিরোধী ছিলেন, কেননা তিনি বাস্তবের প্রতিচ্ছবি রূপায়ণের লক্ষ্য নিয়ে ছবি আঁকেননি। তার মতে, ছবি প্রকৃতপক্ষে তাই ছবিটি দেখে যা মনে হয়। কার্যত কী আঁকবেন স্থির না করেই তিনি কলমকাগজ নিয়ে বসেছেন। আর এভাবেই এক সময় কাগজে ছবির আভাস ফুটে উঠেছে।

রবীন্দ্রনাথ তাঁর সাহিত্যকর্ম এবং গানের জন্যই খ্যাতিমান, চিত্রশিল্পী হিসাবে তাঁর পরিচয়টি গৌণ। কিন্তু তাঁর আঁকা ছবির ভাণ্ডার বিশাল যদিও তা একজন সাহিত্যে নোবেল বিজয়ী একজন মহৎ কবির শেষ বয়সের ক্রীড়া হিসেবে সৃষ্টিকর্মের সীমানার বাইরে পড়ে থাকে। তাঁর আঁকা ছবির সংখ্যা আড়াই হাজরের বেশি। তাঁর চিত্রকলার প্রধান বৈশিষ্ট্য তাঁর বর্ণিত স্বকীয় পদ্ধতি। এ পদ্ধতি অদ্ভুত, অস্বাভাবিক, ফলে এক্ষেত্রে তার অনুসারী কেউ নেই। তাঁর ছবি ভারতীয় ঐতিহ্যগত চিত্রকলার কোন কাঠামোতেই শ্রেণীবিন্যাস করা যায় না।

রবিঠাকুরের চিত্রকলায় রয়েছে মুখমণ্ডল, অদ্ভুত কাল্পনিক প্রাণীর ছবি, প্রাকৃতিক দৃশ্য। এর বাইরেও ছবি আছে। মুখমণ্ডলের ছবি বেশি এঁকেছেন তিনি। কী আঁকবেন স্থির না করেই কবি কলমকাগজ নিয়ে আঁকতে বসতেন। শুরু করতেন কলমের টানে রেখার পর রেখা, বিন্দুর পর বিন্দু, তুলিতে ছোপের পরে ছোপ দিয়ে গেছেন একের পর এক। প্রথমে একটি আকৃতির আভাস ফুটে উঠেছে, কলমের পরের খোঁচায় ভিন্ন আরেকটি আকৃতি পরিস্ফুট হয়েছে। আর এভাবেই একএকটি অস্তিত্ব দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। এ রকম একটি অনিশ্চিত পদ্ধতির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই পরিচিত আদলের পরিবর্তে অচেনা অবয়ব ফুঠে উঠেছে, চেনা মুখ ফুটে উঠেছে অদ্ভুত আকৃতি নিয়ে, আর তাকেই রবি ঠাকুর সাদরে গ্রহণ করেছেন। কেবল রেখাকে ঘুরিয়েবাঁকিয়ে তার মধ্যে প্রাণ সঞ্চারের এই প্রচেষ্টা আর কারো মধ্যে দেখা যায় না। তিনি এঁকেছেন অদ্ভুতভাবে, তাঁর কাগজের মাপ ঠিক ছিল না; ঠিক ছিল না রংয়ের। ভালো মানের সামগ্রী নাহওয়ায় বেশ কিছু ছবি নষ্ট হয়ে গেছে। কখনো কলম, কখনো পেন্সিল, কখনো তুলি এমনকী ওভারকোটের হাতায় রং মাখিয়ে পর্যন্ত এঁকেছেন। মহৎ ছবি সৃষ্টির চেয়ে অংকনটি আদৌ ছবি হয়েছে কিনা তাই নিয়ে তিনি ভাবতেন। ছবিটা ছবি হলো কিনা সেটাই দেখতে বলেছিলেন রবি ঠাকুর। রেখা ও বিন্দুপুঞ্জের এই যে সুপ্ত শক্তি তা কবির বোধে গভীরভাবে ধরা পড়েছিল। আর সে কারণেই তিনি রেখাকে ঘুরিয়েফিরিয়ে অস্তিত্বের প্রতিরূপ গড়েছেন। রংয়ের ছোঁয়ায় তাকে করেছেন বৈচিত্র্যময়। রেখার প্রতি এই যে অভিনিবেশ তার প্রমাণ পাওয়া যায় তুলির পরিবর্তে কলমের ব্যবহারে তার প্রবণতার মধ্যে।

১৯৩০ সালে প্যারিসের পিগ্যাল আর্ট গ্যালারিতে কবিগুরুর প্রথম শিল্প প্রদর্শনী অনুষ্ঠিত হয়। এ ব্যাপারে উদ্যোগী ভূমিকা যিনি নিয়েছিলেন তিনি ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। এরপর পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে তাঁর ছবির প্রদর্শনীর আয়োজন করা হয়। প্রতিটি প্রদর্শনী সমসাময়িক চিত্র সমালোচকদের আকৃষ্ট করেছে। ইউরোপীয় সমালোচকরা তাঁর ছবিতে আধুনিক ইউরোপীয় অঙ্কনরীতির সাযুজ্য পরিলক্ষ করেছেন।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১২৬৮ বঙ্গাব্দের ২৫ বৈশাখ কলকাতার জোড়াসাঁকোর অভিজাত ঠাকুর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং পিতামহ দ্বারকানাথ ঠাকুর। এই পরিবারের পূর্বপুরুষ পূর্ববঙ্গ থেকে ব্যবসায়ের সূত্রে কলকাতায় বসবাস শুরু করেন। দ্বারকানাথ ঠাকুরের চেষ্টায় এ বংশের জমিদারি এবং ধনসম্পদ বৃদ্ধি পায়। ইংরেজি শিক্ষা ও সংস্কৃতিতে লালিত এবং আত্মপ্রতিষ্ঠিত দ্বারকানাথ ব্যবসাবাণিজ্যের পাশাপাশি জনহিতকর কাজেও সাফল্য অর্জন করেন। জমিদার বংশের হয়েও রবীন্দ্রনাথ একাধারে কবি, সঙ্গীতজ্ঞ, কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, চিত্রশিল্পী, প্রাবন্ধিক, দার্শনিক, শিক্ষাবিদ ও সমাজসংস্কারক। মূলত কবি হিসেবেই তাঁর প্রতিভা বিশ্বময় স্বীকৃত। ১৯১৩ সালে তাঁকে নোবেল পুরস্কারে ভূষিত করা হয়। এশিয়ার বিদগ্ধ ও বরেণ্য ব্যক্তিদের মধ্যে তিনিই প্রথম এই পুরস্কার জয়ের গৌরব অর্জন করেন। ১৩৪৮ বঙ্গাব্দের ২২ শ্রাবণ এই ধরাধাম থেকে বিদায় নেন কবি।

রবীন্দ্রনাথের সমগ্র জীবনের প্রেক্ষাপটেই তাঁর কবিমানস ও সাহিত্যকর্মের স্বরূপ অনুধাবন সম্ভব। জীবনের পর্বে পর্বে তাঁর জীবনজিজ্ঞাসা ও সাহিত্যাদর্শের পরিবর্তন ঘটেছে। যুগে যুগে পৃথিবীতে সাহিত্য, সংস্কৃতি, সভ্যতা, দর্শন ও জ্ঞানবিজ্ঞানের ক্ষেত্রে যে রূপান্তর ঘটেছে, রবীন্দ্রনাথ সবকিছুকেই আত্মস্ত করেছেন গভীর অনুশীলন, ক্রমাগত নিরীক্ষা এবং বিশ্বপরিক্রমার মধ্য দিয়ে। তাই তাঁর সাহিত্যজীবনের নানা পর্যায়ে বিষয় ও আঙ্গিকের নিরন্তর পালাবদল লক্ষণীয়। এই পরীক্ষানিরীক্ষার ফসল তাঁর অসংখ্য কবিতা, গান, ছোটগল্প, উপন্যাস, প্রবন্ধ, নাটক, গীতিনাট্য, নৃত্য্যনাট্য, ভ্রমণকাহিনী, চিঠিপত্র এবং দেশে বিদেশে প্রদত্ত বক্তৃতামালা। তাঁর অন্তর্নিহিত জীবনবোধ ছিল স্থির এবং বহু পরিবর্তনকে স্বীকার করে নিয়েও আপন আদর্শে প্রতিষ্ঠিত, অন্যদিকে তাঁর সৃজনশীল রূপটি ছিল চলিষ্ণু ও পরিবর্তনশীল। রবীন্দ্রনাথ কেবল তাঁর কালের কবি নন, তিনি কালজয়ী। বাংলা কাব্যসাহিত্যের ইতিহাসে তাঁর আবির্ভাব ছিল এক যুগান্তর।

নিজের আঁকা ছবি সম্পর্কে কবি নানা মন্তব্য করেছেন। তিনি বলেছেনঐগুলি কেবল রেখাই নয়, ঐগুলি তার থেকেও কিছু বেশি, আমার চিত্রাঙ্কিত স্বপ্ন এক কাব্যিক কল্পনার দর্শন। আমার চিত্র রেখার ছন্দে আবদ্ধ কবিতা। আমি বিশ্ব সংসারকে কল্পনা করতে পারি রেখার জগৎ সংসার হিসেবে যেগুলো তাদেরকে মূর্ত প্রবাহের অন্তহীন শৃঙ্খলে পর্বতশ্রেণী ও মেঘমালা, বৃক্ষরাজি, ঝর্ণাধারা, অগ্নিগর্ভ জ্যোতিষ্কমণ্ডল, নিরন্তর জীবনস্রোত, নিশ্চুপ মহাকাল নিরবধি মহাশূন্য পেরিয়ে ভঙ্গিমারাজির মহাসংগীত মিলিত হয়ে যায় রেখাপুঞ্জের আর্তনাদে, যেন তারা আকস্মিক ইচ্ছাপূরণের আকাঙ্ক্ষায় সংগীহীনা বেদেনীর লক্ষ্যহীন ঘুরে বেড়ানো। তিনি ছিলেন প্রকৃতির চিরন্তন সৌন্দর্যের কবি। মৃত্যুকে তিনি দেখেছেন মহাজীবনের যতি হিসেবে। জীবনমৃত্যু ও জগৎসংসার তাঁর নিকট প্রতিভাত হয় এক অখণ্ড রূপে। তাই তাঁর গানে জীবনলীলার সুর বাজে এভাবে-‘আছে দুঃখ আছে মৃত্যু বিরহদহন লাগে/ তবুও শান্তি তবু আনন্দ তবু অনন্ত জাগে।’

x