যৌন হয়রানির প্রতিবাদে স্বল্পদৈর্ঘ্য চিত্র নির্মাতাদের উদ্দেশ্যে

ফেরদৌস আরা আলীম

শনিবার , ৪ আগস্ট, ২০১৮ at ৯:০৩ পূর্বাহ্ণ
11

কর্মক্ষেত্রে অবমাননালাঞ্ছনা এমনকি যৌন নিপীড়নও বহুকাল ধরে বিশ্বনারীর জন্য ছিল মুখ বুজে সয়ে যাবার বিষয়। কিন্তু ঘুরে দাঁড়িয়েছে নারী। হলিউডের নারীর ঘুরে দাঁড়ানোর সাফল্য বিশ্বজুড়ে তোলপাড় তুলেছে। ওদের ‘হ্যাশ ট্যাগ মি টু’ এবং পরবর্তী ‘টাইমস আপ’ কর্মসূচি নারীর প্রতি সহিংসতা রোধের নানামাত্রিক আন্দোলনে নানাভাবে প্রেরণা যুগিয়ে চলেছে। সম্প্রতি আমাদের কয়েকজন তরুণ চিত্র নির্মাতা নারীর প্রতি যৌন হয়রানির প্রতিবাদে ৮টি স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি তৈরি করেছেন। ওঁদের নিয়ে, ওঁদের জন্যই আমাদের আজকের গল্প।

গত ১৮ জুলাই প্রথম আলোর বিনোদন প্রতিবেদকের ‘নারীর প্রতি সহিংসতা ঠেকাতে এগিয়ে এসেছেন তারা’ শিরোনামের প্রতিবেদনটি রুদ্ধশ্বাসে পাঠ করেছি। জেনেছি; আমাদের ন’জন নির্মাতা হ্যাশ ট্যাগ দিয়ে ‘উই স্ট্যান্ড ফর উইমেন’ শীর্ষক একটি উদ্যোগ হাতে নিয়েছেন। এঁরা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবি বানিয়েছেন। যাঁরা এসব ছবিতে অভিনয় করেছেন তাঁরাও এ উদ্যোগের ভাগীদার। কার্যক্রমটি শুরু হয় নির্মাতা আফজাল হোসেন মুন্নার সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেওয়া একটি পোস্ট থেকে। মুন্না লিখেছেন, চলচ্চিত্র তো শুধু বিনোদনের জন্য নয়, চলচ্চিত্র যাপিত জীবনের দিকনির্দেশনাও বটে। মুন্নার দু’টি গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল প্রতিশ্রুতির মতো। তিনি বলেছেন, যৌন হয়রানির ভয়াবহতা তুলে ধরতে হবে এবং সেই সঙ্গে জনসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে।

আমরা জানি না যৌন হয়রানি বা তার চরম রূপ ধর্ষণের ভয়াবহতা ছবিতে কিভাবে আসবে, কতটা আসবে। ধর্ষণ তার স্বরূপেই ভয়াবহ। নৃশংসতার, বিভৎসতার এ এক চরম রূপ এমনকি দাম্পত্য ধর্ষণের ক্ষেত্রেও। বীশেষজ্ঞজনেরা বলেন, সমাজপরিবারবিচ্ছিন্ন, নেশাসক্ত বা হতাশাগ্রস্তরাই ধর্ষক। আমরা কিন্তু সুবেশ, নিপাট, দায়িত্বশীল পদে আসীন সম্মানজনক পেশায় রয়েছেন এমন ধর্ষকের খবরও প্রতিনিয়ত পাচ্ছি। বয়সও এদের জন্যে ধর্তব্য বিষয় নয়। নানা কারণে পরিবার ও সমাজবিচ্ছিন্ন বখাটে, লম্পট ধর্ষকের তো এখন সংখ্যা শুমার নেই। এই সেদিন এক যুবক প্রবীনা এক নারীকে তার ভাত রেঁধে দেবার জন্য ঘরে ডেকে নিয়ে ধর্ষণ করে এবং পরবর্তীতে তাকে হত্যা করে। ওই নারীর খোঁজ করতে গিয়ে পাড়া প্রতিবেশিরা ঘটনাটি আবিষ্কার করে। জানা যায় একটি শিশুকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার হওয়া এই যুবক সম্প্রতি জামিনে ছাড়া পেয়েই এই একই অপরাধে আবার ধরা পড়ল। প্রসঙ্গত ধর্ষণের ভয়াবহতার আরও দু’টি দৃষ্টান্ত দিচ্ছি। গত জুন মাসে (২০১৮) পূর্ব জুরাইনের (দুটি ঘটনাই পূর্ব জুরাইনের) পারুল বেগমের হাতপা বাঁধা লাশ উদ্ধার করা হয়। একটা ওষুধ কোম্পানির কর্মচারী পারুলের স্বামী গাড়ি চালকের কাজে প্রায়ই বাইরে থাকে; থাকতে হয় তাঁকে। পারুলের সহকর্মী রাজিব তার বন্ধু জামালসহ পারুলের বাসায় ডাকাতির পরিকল্পনা করে। রোজার মাস; ইফতারের পর ফোন করে হালিম ও কোমল পানীয়ের সঙ্গে ঘুমের ওষুধ মিশিয়ে তারা পারুলের বাসায় যায় এবং পারুলকে তা খাওয়ায়। পারুল ঘুমে ঢলে পড়ার পর দু’জন তাকে ধর্ষণ করে। পারুলের মধ্যে জেগে উঠার লক্ষণ পেয়ে তার মুখ চেপে গলা টিপে মৃত্যু নিশ্চিত করে ধর্ষকেরা একটি নাকফুল, পারুলের মোবাইল ও কিছু টাকা নিয়ে চলে যায়। গত ১০ জুলাই পূর্ব পরিচয়ের সূত্রধরে (একই পোশাক কারখানায় ফরিদার সহকর্মী) রফিকুল, মফিজ ও জাকির ফরিদা খানমের বাসায় যায়। স্বামী মারা যাওয়ার পর ফরিদার একা থাকার বিষয়টা রফিকুল জানত। ওরা ৩ জন ধর্ষণের পরিকল্পনা করেই আসে। এরা জোরপূর্বক ফরিদাকে ধর্ষণ করে পরপর। এক পর্যায়ে ফরিদা চিৎকার করার চেষ্টা করলে মফিজ ওর মুখে চাকু ঢুকিয়ে দেয়। রফিকুল শিল দিয়ে ফরিদার মাথায় আঘাত করে। জাকির ধর্ষিতার গলায় ফাঁস লাগিয়ে শ্বাসরোধ করে হত্যা করে। পরে লাশ ভেতরে রেখে বাইরে দরজায় তালা লাগিয়ে ওরা চলে যায়। আমরা জানি না আমাদের এই নির্মাতারা ভয়াবহতার কোন পর্যায় পর্যন্ত পৌঁছুতে পেরেছেন বা চেয়েছেন ।

আফজাল হোসেন মুন্নার স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির নাম ‘দ্য ওল্ড ম্যান অ্যান্ড দ্য গার্ল’ জসিম আহমেদের ছবি ‘চকলেট’। খিজির হায়াত খান তৈরি করেছেন ‘সে নো টু রেপ’ ছবিটি। সাকি ফারজানার ছবির নাম ‘দ্য পার্ক, দ্য বেঞ্চ অ্যান্ড দ্য গার্ল।’ আশিকুর রহমানের ছবি, ‘যে গল্পের কোনও নাম নেই।’ (বাংলা নামের স্বস্তি, আহা!) রাজু আহসানের ছবির নাম ‘লিপস্টিক’। এবং আসিফ খান বানিয়েছেন, ‘দ্য মাদার’ ছবি। ‘সিনেমা হোক অন্যায়ের বিরুদ্ধে বিপ্লবের হাতিয়ার-’ এই শ্লোগান নিয়ে তৈরি হয়েছে এই ৮টি স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র। ৮ তরুণ নির্মাতা নিজেদের খরচে এসব ছবি তৈরি করেছেন। নির্মাতা জসিম আহমেদ জানিয়েছেন উদ্বোধনী প্রদর্শনীর পর বিভিন্ন জেলায় ছবিগুলো দেখানো হবে। তিনি আরও জানিয়েছেন এ কার্যক্রমের দ্বিতীয় ধাপের জন্য আরও অনেক নির্মাতা এগিয়ে এসেছেন। নারীর উপর যৌন নিপীড়ন বন্ধে সুতরাং ধরে নিতে পারি আরও বেশ কিছু স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র তৈরি হবে। কি থেকে কী হয়, কোথাকার জল কোথায় গড়ায় আমরা জানি না। তবে এটা বুঝি যে হলিউডের আন্দোলনের সঙ্গে এর তুলনা চলে না। হলিউডের বিষয়টি সম্পূর্ণ চিত্রজগত কেন্দ্রিক। কমপক্ষে ৭০ জন নারী প্রযোজক হার্ভির বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছিল। এদের মধ্যে দু’জনের অভিযোগ আমলে নিয়ে ধর্ষণের ১ম ও ৩য় ধারায় এবং একটি অপরাধমূলক যৌন আইনের প্রথম ধারায় হার্ভিকে অভিযুক্ত করেছে ম্যানহাটন আদালত। দোষী সাব্যস্ত হলে ৬৬ বছর হার্ভির ৫ থেকে ২৫ বছরের সাজা হতে পারে। এটা ঠিক যে এ ঘটনার ইতিবাচক একটা প্রভাব বিশ্বজুড়ে মুখ বুঁজে থাকা বা মুখ বন্ধ রাখা ফিল্মী দুনিয়ায় অনেক নারীকে অনুপ্রাণিত করেছে। পাকিস্তানে গায়ক অভিনেতা আলী জাফরের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় অনুপ্রাণিত মিশা শফি (গায়িকাঅভিনেত্রী) মুখ খোলার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে টুইটারে ঝড় তুলেছে আরও কয়েকজন। মেকআপ শিল্পী লীনা ঘানি তাঁর তিক্ত অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে মিশার সাহসের প্রশংসা করে বলেন, আর চুপ করে থাকা গেল না। আলী জাফর বন্ধুত্বের সীমা লঙ্ঘনকারী। নারীদের প্রতি তার কোনও শ্রদ্ধা নেই।

আমাদের তরুণ চিত্র নির্মাতারা যে কাজটি হাতে নিয়েছেন, করেছেন এবং ভবিষ্যতে করবেন আরও কিছু কাজ আমরা জানি তার প্রেক্ষাপটে থাকবে এদেশের শ্যামলকোমল মানবজমিন এবং এঁদের মন জুড়ে থাকবে নারীর প্রতি সম্মান ও ভালোবাসা। আমাদের কন্যা শিশুদের নির্মল, নিরাপদ শৈশবের কথা এঁরা ভাববেন, ভাববেন এদের নির্বিঘ্ন শিক্ষা জীবনের কথা। আমরা জানি প্রাথমিক পর্যায় থেকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল পর্যায়ে শিক্ষক থেকে পিয়ন বা দফতরি কারও হাত থেকে নিস্তার পাচ্ছে না আমাদের মেয়েরা। শিক্ষাঙ্গনে যৌন নিপীড়ন রোধে উচ্চ আদালত ২০০১ সালে একটি নির্দেশনা দিয়েছিলেন। সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে নিপীড়ন বিরোধী নীতিমালা প্রণয়ন ও কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছিল তাতে। পাশাপাশি রাষ্ট্রকেও যৌন নিপীড়ন বিরোধী আইন প্রণয়ন করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু এ নির্দেশনা বিশেষ কাজে আসেনি। তবে ২০১৫ সালের ২১ মে যমুনা ফিউচার পার্কের এক দোকান কর্মচারী বাসের জন্য অপেক্ষাকালে একদল যুবকের ধর্ষণের শিকার হয়। তাকে একটি মাইক্রোবাসে তুলে নেওয়া হয়েছিল। ঘটনার পর মামলা দায়ের করতে গিয়ে থানায় থানায় ঘুরে তার অভিভাবকদের প্রচুর ভোগান্তি পোহাতে হয়। এ নিয়ে নারীপক্ষ, বাংলাদেশ মহিলা পরিষদ, জাতীয় আদিবাসী পরিষদ, আইন ও সালিশ কেন্দ্র এবং রাষ্ট্র হাইকোর্টে রিট করে। প্রাথমিক শুনানি নিয়ে ওই বছরের ২৫ মে হাইকোর্ট রুল দেন। রুলের উপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে চলতি সালের (২০১৮) ২৭ মে হাইকোর্টের যুগান্তকারী এক রায় (ধর্ষণ বিষয়ে) এবং ১৮টি নির্দেশনা নারীকে নতুন আশায় উজ্জ্বীবিত করেছে। ধর্ষণ অপকর্মের অনুসন্ধান ও বিচারে এই ১৮ দফা নির্দেশনার সফল বাস্তবায়ন নারীর প্রতি যে কোনও ক্ষেত্রে (শিক্ষাঙ্গনে, কর্মক্ষেত্রে, যানবাহনে, ঘরেবাইরে) যে কোনও ধরনের সহিংসতার বিরুদ্ধে আইনি সহাযতা পেতে সবিশেষ সাহায্য করবে। ইতিমধ্যে ধর্ষণের শিকার নারীর স্বাস্থ্য পরীক্ষায় অবমাননাকর ও অবৈজ্ঞানিক টুফিঙ্গার টেস্টও হাইকোর্ট বাতিল করেছেন। যৌন হয়রানির বিরুদ্ধে বা এর প্রতিবাদে আমাদের তরুণ নির্মাতারা স্বল্পদৈর্ঘ্য ছবির যে কার্যক্রম হাতে নিয়েছেন এবং ভবিষ্যতে যে কাজ করবেন তাতে সাধারণ মানুষের জন্য এ বিষয়গুলি অবহিতকরণের কাজটিও নিশ্চয়ই থাকবে।

আমরা জানি ধর্ষণ পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। আমাদের ঘুমন্ত শিশুকন্যার ক্ষতবিক্ষত লাশ পাওয়া যাচ্ছে ধানের ক্ষেতে। হাসপাতালে রোগী মানানীর সহায়তায় সঙ্গে থাকা কিশোরী তরুণীকে কর্তব্যরত কর্মচারী থেকে চিকিৎসকের হাতেও লাঞ্ছিত হতে হচ্ছে। গ্রামেগ্রামান্তরে অপহৃত মেয়েদের দিনের পর দিন, মাসের পর মাস আটকে রেখে ধর্ষণ করা হচ্ছে। গণপরিবহনে বিশেষ করে বাসে ধর্ষণ ও হত্যার ঘটনায় দেশে তোলপাড় হয়ে গেছে। রাজবাড়িতে অটোতে এক চিকিৎসক নারী গণধর্ষণের শিকার হয়েছে এ বছর ফেব্রুয়ারি মাসে। নৌপথে (দেশের দক্ষিণাঞ্চলে) ৮৬.৪ শতাংশ নারী যৌন হয়রানির শিকার হচ্ছে। (বরিশাল ইয়ুথ সোসাইটির একটি সাম্প্রতিক জরিপ মতে।) ধর্ষণের ভিডিও করে এবং তা প্রকাশের ভয় দেখিয়ে ছাত্রী ধর্ষণ করে গেছে শিক্ষক বছরের পর বছর, এমন কি গর্ভপাতও ঘটিয়েছে। কোচিং সেন্টারেও ছাত্রী ধর্ষণের খবর প্রকাশিত হয়েছে।

দৈনিক প্রথম আলো গুরুতর ৬টি অপরাধে ঢাকার ৫টি ট্রাইব্যুনালে আসা প্রায় ৮০০০ মামলার বিচার পরিস্থিতি নিয়ে দীর্ঘ ধারাবাহিক অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ছেপেছে সম্প্রতি। যাঁরা পড়েন নি বেঁচে গেছেন তাঁরা। যাঁরা পড়েছেন তাঁদের অনেকে মুষড়ে পড়েছেন। তাঁদের আদরের কন্যাদের কোথায় লুকোবেন তাঁরা?

এমন একটি সময়ে স্বল্পদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্র আন্দোলনের মধ্য দিয়ে যাঁরা নারীর প্রতি সহিংসতা ঠেকাতে এগিয়ে এসেছেন আমরা তাঁদের প্রতি কৃতজ্ঞ। নারী নির্যাতন রোধে নারী আন্দোলনকর্মী, মানবাধিকার সংগঠন ও নানা নারী সংগঠনের দীর্ঘদিনের সংগ্রামে তাঁরা নতুন মাত্রা যোগ করেছেন, তাঁদের জয় হোক।

x