যে দুর্গ থেকে ফেরেনি কেউ

আরিফ রায়হান

বুধবার , ১০ অক্টোবর, ২০১৮ at ১২:১৯ অপরাহ্ণ
56

এশিয়া মহাদেশের সবচেয়ে ভয়ানক স্থানগুলোর অন্যতম ভানগড়ের কেল্লা। রহস্যে ভরা এই কেল্লা ভারতের রাজস্থানের আলবর জেলায় অবস্থিত। সপ্তদশ শতকে গড়া এ দুর্র্গ নিয়ে একাধিক কাহিনি প্রচলিত আছে। একটি কাহিনি রয়েছে রাজা মাধু সিং আর সাধক গুরু বালু নাথকে নিয়ে। শোনা যায়, বালু নাথ ধ্যান করতেন সেখানে। মাধু সিং এই সাধকের অনুমতি নিয়ে সুবিশাল দুর্গটি গড়ে তোলেন। বালু নাথ তাঁকে শর্ত দিয়েছিলেন যে রাজা তাঁর প্রসাদদুর্গ গড়ে তুলতে পারবেন, কিন্তু এর কোনো ছায়া যেন সন্ন্যাসীর ধ্যানের জায়গায় গিয়ে না পড়ে। তা যদি পড়ে, তাহলে ধ্বংস হয়ে যাবে রাজার এই স্বপ্নসাধ। কিন্তু এই দুর্গটি যখন গড়ে তোলা হলো, দেখা গেল যে ভয়টা ছিল সেটাই সত্যি হয়েছে। দুর্গের ছায়া গিয়ে পড়েছে বালু নাথের মন্দিরে। সাধুর কথা বৃথা যায়নি। হাড়ে হাড়ে ফলেছে। গোটা দুর্গটাই ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। পরে নতুন করে গড়ে তোলা সম্ভব হয়নি।
এদিকে বিশ্বের সেরা দশটি হন্টেড স্থানের একটি হিসেবে ধরা হয় ভানগড় কেল্লাকে। সন্ধ্যা ৬টার পর কেল্লার ভেতরে কাউকে অবস্থান করতে দেওয়া হয় না- এটা রীতিমতো সরকারি আদেশ। তাই বিকাল সাড়ে ৫টা থেকেই কেল্লার ভেতর থেকে পর্যটকদের বের করে দেওয়া হয়। প্রচলিত আছে, গভীর রাতে এই কেল্লায় প্রেতাত্মারা নাচসহ নানা অতিপ্রাকৃত ঘটনা ঘটে। যদিও কিছু দুঃসাহসী সেখানে রাতের অন্ধকারে ঢোকার চেষ্টা করেছিল। কিন্তু তাদের পরিণতি ভালো হয়নি। একইভাবে দুই স্থানীয় দুঃসাহসী তরুণও সন্ধ্যা ঘনিয়ে যাওয়ার পর দুর্গের পাঁচিল টপকে ভেতরে ঢুকেছিল। কিন্তু তারাও আর ফিরেনি। আরো কিছুকাল পরে আরেকটি গ্রুপ যায় সেখানে। তিনজনের দলটি ভূতের অভিজ্ঞতা নিতে সন্ধ্যার পর আলো জালিয়ে প্রবেশ করেন দুর্গের ভেতর। এক বন্ধু চাইলো পুরো রাতটা সেখানে কাটিয়ে দিতে। সঙ্গীরা তাকে নিষেধ করলো। কিন্তু অসম্ভব সাহসী এই বন্ধু তাদের অবাধ্য হয়ে অবস্থান করেন দুর্গের ভেতর আর তার জন্য বাইরে গাড়িতে অপেক্ষা করতে থাকেন তার বন্ধু ও গাড়ির ড্রাইভার। রাত পোহালে সকালে কেল্লার ভেতরে তাকে খুঁজতে প্রবেশ করেন তার বন্ধু ও গাড়ির চালক। দুর্গের ভেতর গিয়ে দেখা যায় অর্ধমৃত অবস্থায় পড়ে আছে তার দেহ। পরে তাকে উদ্ধার করে যখন দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল তখন মাঝপথে গাড়িটি আকস্মিক দুর্ঘটনার শিকার হয়। এতে ঘটনাস্থলেই মারা যায় দুই বন্ধুসহ গাড়ির ড্রাইভার। এরপর থেকে সেই ভয়ানক কেল্লায় রাত কাটানোর সাহস কেউ করেন না। আর সরকারিভাবে তা একেবারেই নিষেধ করে দেয়া হয়। আবার কেল্লাটির ভীতিকর কাহিনী চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে এবং দিনদিন এর সঙ্গে যুক্ত হয় আরও নানা কল্পিত কাহিনী।
ভানগড়ের আরেকটি কাহিনি রাজকন্যা রত্নাবতীকে নিয়ে। এই রাজকন্যা ছিল পরমা সুন্দরী। তার রূপের সুখ্যাতি দেশ-দেশান্তরে ছড়িয়ে পড়ে। রাজকন্যা যখন ১৮ বছরে পা দিল, তখন তাকে বিয়ে করার জন্য রাজকুমাররা সব একে একে এসে ধরনা দিতে লাগল ভানগড়ের রাজ দরবারে। ভানগড়ে ছিল সিঙ্গিয়া নামের এক জাদুকর। সে তেলপড়া দিয়ে বশ করার চেষ্টা করে রত্নাবতীকে। কিন্তু তার এই জাদুমন্ত্রের কথায় রত্নাবতী এই ফাঁদে পা দেয়নি। মন্ত্রপূত তেল বরং উল্টো সিঙ্গিয়ার ওপরই কাজ করে। মারা যাওয়ার আগে সিঙ্গিয়া অভিশাপ দিয়ে যায়। সে অভিশাপে ধ্বংস হয় ভানগড়। নতুন করে এই নগর অর গড়ে ওঠেনি। আজবগড় আর ভানগড়ের মধ্যে যুদ্ধে নিহত হয় রত্নাবতী। সেই থেকে এই দুর্গ অভিশপ্ত বলে পরিচিত। স্থানীয় লোকজনের বিশ্বাস, রত্নাবতী কোনো একদিন আবার ফিরে আসবে। অভিশাপমুক্ত হয়ে আবার জেগে উঠবে ভানগড়।
বিজ্ঞানীরা এসব গল্প বানোয়াট কাহিনি বলে উড়িয়ে দেন। কিন্তু লোকজন তাদের বিশ্বাসে অটল। তারা ভাবে যে এখানে প্রেতাত্মারা ঘোরাফেরা করে। গভীর রাতে সেখানে অদ্ভুত সব শব্দ শোনা যায়। বহু দূর থেকেও তা শুনতে পায় অনেকে। কেউ কেউ অশরীরী কারও বিচরণের প্রমাণ পাওয়ার কথা দাবি করেছে।

x