যে ট্রফির জন্য এমন মরণপণ লড়াই

ইন্তেখাব সিয়াম

বৃহস্পতিবার , ১৪ জুন, ২০১৮ at ১:০৪ অপরাহ্ণ
78

বিশ্বকাপ ট্রফি এমন এক স্বপ্নের ট্রফি যেটি ছুয়ে দেখতে উন্মুুখ থাকে বিশ্বের সব ফুটবলার। ফুটবল খেলাটা সার্থক হবে যদি একবার এই বিশ্বকাপটাকে হাতে নেওয়া যায়। কিন্তু সব ফুটবলারের ভাগ্যে সেটা হয়না। বিশ্বকাপ ছুয়ে দেখাতো দূরের কথা বিশ্বকাপের মত বিশ্ব মঞ্চে খেলার সৌভাগ্যও হয়নি বিশ্বের অনেক বড় বড় তারকা ফুটবলারের। আবার কেউ কেউ খেললেও বিশ্বকাপ ছুয়ে দেখা হয়নি। কারণ দীর্ঘ লড়াই শেষে একটি দলের ২৩ জন ফুটবলারের পক্ষে সম্ভব হয় এই বিশ্বকাপ হাতে নেওয়ার। কারণ চ্যাম্পিয়ন হয় একটি দল। বিশ্বকাপের ৮৮ বছরের ইতিহাসে ৮টি দলের ফুটবলাররা এমন স্বপ্ন পূরণের স্বাদ পেয়েছে। গেল ২০টি আসরের মত এবারের আসরেও ৩২ দলের ফুটবলারদের চোখ এখন সে স্বপ্নের ট্রফির দিকে। যে ট্রফির জন্য সারা জীবনের অপেক্ষা ফুটবলারদের সে ট্রফিতে কি আছে। কি দিয়ে তৈরি এই বিশ্বকাপ ট্রফি। কিভাবে হলো এর বিবর্তন। তা জানার চেষ্টা করছি।

বিশ্বকাপের আজকের ট্রফিটা সেই শুরু থেকে আজকের মত ছিলনা। ১৯৩০ সালে যখন বিশ্বকাপ ফুটবলের আয়োজন করা হয় তখন যে ট্রফি দেওয়া হতো সেটা আজকের ট্রফিটার মত ছিলনা। প্রথম দিকে ভিক্টরি নামে একটি ট্রফি দেওয়া হতো বিশ্বজয়ীদের। যার নাম ছিল বিশ্বকাপ বা কোউপন্ডু মোন্ড। পরবর্তীতে ১৯৪৬ সালে ফিফার তৃতীয় সভাপতি জুলেরিমের নাম অনুসারে ট্রফিটির নামকরণ করা হয় জুলেরিমে ট্রফি। ফ্রান্সের ভাস্কর অ্যাবেল লাফলিয়ার স্টার্লিং সিলভার এবং নীলকান্ত মনি দিয়ে তৈরি করেছিলেন এই ট্রফি। ফরাসি ভাস্কর এই ট্রফিটির নাম দেন ‘গোল্ডেন গডেজ’। ট্রফিটির উচ্চতা ছিল ৩৫ সেন্টিমিটার আর ওজন ছিল ৩.৮ কিলোগ্রাম। ট্রফিটিতে অংকিত ছিল বিজয়ের প্রতিক গ্রীক দেবী ‘নাইকির’ ছবি। অষ্টকোনী মশাল মাথার উপর নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন তিনি। ১৯৩০ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত যারা বিশ্বকাপ জিতেছে তাদের নাম লেখা রয়েছে এই ট্রফির ভিত্তিপ্লেটে। এই ট্রফিটি নিয়ে রয়েছে নানা কাহিনী।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটির নিরাপত্তার জন্য এক অভিনব পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া হয়। ১৯৩৮ সালে ট্রফিটি ছিল তৎকালীন চ্যাম্পিয়ন ইতালির কাছে। কিন্তু বিশ্বযুদ্ধের সময় ট্রফিটি কোথায় রাখা হবে তা নিয়ে যখন ভাবনার অন্ত ছিলনা তখন ফিফার তৎকালীন সহ সভাপতি ও ইতালি ফুটবলের সভাপতি অট্টরিনো বারাসিস ট্রফিটিকে ব্যাংক থেকে তুলে নিয়ে একটি জুতার বাক্সে করে নিজের বিছানার নিচে লুকিয়ে রাখেন। কিন্তু ১৯৬৬ সালে ঘটে ট্রফিটি প্রথম চুরির ঘটনা। সেবার বিশ্বকাপ শুরুর মাত্র ৪ মাস আগে লন্ডনের ওয়েস্ট মিনিস্টার সেন্ট্রাল হলে প্রদর্শনীর সময় চুরি হয়ে যায় ট্রফিটি। আর ভয়ানক সে চোর ট্রফি ফিরিয়ে দেওয়ার বদলে ১৫ হাজার পাউন্ড দাবি করে বসে। তবে ট্রফিটি উদ্ধার করতে বেশি সময় লাগেনি। মাত্র সাতদিন পর লন্ডনের আপার নরউড অঞ্চলের একটি বাগানে খবরের কাগজ মোড়ানো ট্রফিটি উদ্ধার করে পিকলস নামক একটি কুকুর। ধরা হয় সে চোরকে। ট্রফিটি উদ্ধার করা কুকুরকে দেওয়া হয় ৬ হাজার ডলার পুরস্কার আর চোরকে দেওয়া হয় দুই বছরের জেল।

১৯৭০ সালে তৃতীয়বার চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় ট্রফিটি দিয়ে দেওয়া হয় ব্রাজিলকে। কিন্তু আবার চুরি হয়ে যায় ট্রফিটি। এবার ১৯৮৩ সালের ২০ ডিসেম্বর রিও ডি জেনেরিওর প্রদর্শনী বক্স ভেঙে এবার ট্রফিটা নিয়ে যায় চোর। তবে আর ট্রফিটা পাওয়া যায়নি। পরে ব্রজিল ফুটবল কনফেডারেশন ইস্টম্যান কোডাক নামক একটি প্রতিষ্ঠানকে দিয়ে ১.৮৮ কেজি ওজনের একটি স্বর্ণেল রেপ্লিকা তৈরি করে নেয়।

জুলেরিমে ট্রফির যুগ শেষ হওয়ার পর ১৯৭৪ সালে বর্তমান ট্রফিটি তৈরি করা হয়। বর্তমান ট্রফিটির ৭৫ ভাগ ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে তৈরি। ৩৬.৮ সেন্টি মিটার উচ্চতা এবং ৬.১৭৫ কেজি ওজনের বর্তমান ট্রফিটির ভিত্তির ব্যাস ১৩ সেন্টি মিটার। বর্তমান ট্রফিটির শরীরের নকশায়ও আনা হয়েছে পরিবর্তন। যেখানে গ্রিক দেবি নাইকির পরিবর্তে ট্রফিতে অংকিত রয়েছে দুজন মানুষের প্রতিকৃতি। যারা পৃথিবীটাকে উপরের দিকে ধরে আছে। ইতালির সিলভিও গাজ্জানিজা নামক একজন স্থপতি এই ট্রফিটির নকশা করেন। ৭টি দেশের ভাস্কর্য শিল্পীরা ৫৩টি নকশা জমা দিয়েছিলেন এই ট্রফির জন্য। যেখান থেকে গাজ্জানিজার নকশাটি নির্বাচন করে আয়োজকরা। ট্রফির সামনের অংশের নিচের দিকে লেখা রয়েছে ফিফা ওয়াল্ড কাপ শব্দটি। ট্রফির গায়ে দুজন মানুষের পৃথিবীকে উপরের দিকে তুলে ধরা প্রসঙ্গে ভাস্কর বলেন বিশ্বকাপ জেতা মানেতো বিশ্ব জয় করা। তাই এটা দেওয়া হয়েছে। ট্রফিটির নিচের অংশে ১৯৯৪ সালে সংযোজন করা হয় ১৯৭৪ সাল থেকে বিশ্বকাপ জেতা দলের নাম। যেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে ২০১৪ সাল পর্যন্ত বিজয়ীর নাম। ১৯৭১ সালে ইতালির ট্রফি ও মেডেল নির্মাতা প্রতিষ্ঠান বার্তোনি মিলানো থেকে তৈরি করা হয় এই ট্রফি। আপাত দৃষ্টিতে ট্রফিটাকে সলিড একটি ট্রফি মনে করা হলেও আসলে এটি একটি ফাফা ট্রফি। ব্রিটিশ রসায়নবিদ মার্টিন পলিয়াকফ জানিয়েছেন যদি ১৮ ক্যারেট স্বর্ণ দিয়ে সলিড ট্রফি বানানো হতো তাহলে এর ওজন হতো ৭০ থেকে ৮০ কেজি। ফলে তা আর হাতে নেওয়া সম্ভব হতো না।

বর্তমান ট্রফিটা আর কাউকে দেওয়া হয়না। শুধু ফাইনালের দিন ট্রফিটা একটি বাক্সে করে মাঠে আনা হয়। এরপর চ্যাম্পিয়ন দলকে গোল্ড প্লেটের একটি ব্রোঞ্জ ট্রফি দেওয়া হয়। ট্রফিটি বর্তমানে সুইজারল্যান্ডের জুরিখে ফুটবল জাদুঘরে রাখা আছে। বর্তমান ট্রফির বেদিমুলে ১৭টি দেশের নাম লেখা যাবে। ফলে ২০৪২ সালের আর কোন নাম লেখা যাবেনা। ফলে তখন নতুন বিশ্বকাপ বানানোর চিন্তা করতে হবে ফিফাকে। তবে এরই মধ্যে এবারে শুরু হচ্ছে এই স্বপ্নের ট্রফি জয়ের লড়াই। ৩২ টি দেশ রাশিয়ায় লড়াইয়ে নামছে ট্রফিটি জয়ের জন্য। কার হাতে উঠে এবারে সে স্বপ্নের ট্রফি সেটি দেখাতে উম্মুখ পুরো বিশ্ব।

x