যে কারণে থমকে আছে উচ্ছেদ

দুরবস্থা দেখে নদী কমিশনের চেয়ারম্যান বললেন, কর্ণফুলীকে বাঁচান

সবুর শুভ

বুধবার , ২৪ এপ্রিল, ২০১৯ at ৬:৫৪ পূর্বাহ্ণ
240

কর্ণফুলী নদীর তীরে অবৈধ স্থাপনাগুলো এখনো ‘মাথা উঁচু’ করে দাঁড়িয়ে। কর্ণফুলীর বুক ক্ষতবিক্ষত করে ভরাট চলছেই। উচ্চ আদালত অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশ দানের মাধ্যমে তাকিয়ে আছে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনের দিকে। জেলা প্রশাসন তাকিয়ে আছে আদালতের (চট্টগ্রাম ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ) দিকে। কাঁদছে শুধু কর্ণফুলী। নিজেকে বাঁচানোর কান্না। চট্টগ্রামকে বাঁচানোর কান্না। রক্তক্ষরণ হচ্ছে চট্টগ্রামের মানুষের। যারা যুগ যুগ ধরে অর্থনীতির সৌধ রচনা করে এসেছেন এ কর্ণফলীর বুকে।
এ অবস্থায় জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার কর্ণফুলী নদীতে স্পিডবোট নিয়ে ঘুরলেন গত রোববার ভর দুপুরে। দেখলেন কীভাবে অবৈধ স্থাপনায় পুরো ঢেকে দেওয়া হয়েছে দেশের অর্থনীতির প্রাণ ভোমরা কর্ণফুলী নদীকে।
বিস্ময় প্রকাশ করলেন নদী ভরাট করে সরকারি ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের স্থাপনা নির্মাণ দৃশ্য দেখে। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চার সদস্য ও কর্ণফুলী উচ্ছেদে নেতৃত্ব দেওয়া নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মোহাম্মদ তৌহিদুল ইসলামও। ক্লান্তিকর দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর গত ৪ ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসনের নেতৃত্বে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদ শুরু হয়। চলে মাত্র ৫ দিন। ৮ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত। এরপর থেকে লম্বা বিরতি। এখনো শুরু করা যায়নি অভিযান। আইনগত ঝামেলা ডালপালা বিস্তার করছে দিনকে দিন। আপিল বিভাগের রায়ের পর আইনি ঝামেলা শেষ হওয়ার আশা করা হলেও চট্টগ্রামের আদালতে আবার নালিশ হয়েছে। এ মামলায় থমকে দাঁড়িয়েছে উচ্ছেদ কার্যক্রম।
এ মামলায় উচ্ছেদে নেতৃত্বদানকারী সংস্থা চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসনকে শো’কজ করা হয়েছে ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতের তরফে। এ বিষয়ে সরকার পক্ষে আদালতে প্রতিনিধিত্বকারী চট্টগ্রামের জিপি অ্যাডভোকেট নাজমুল আহসান খান আলমগীর বলেন, মামলায় আমরা সময় চেয়েছি। হাই কোর্ট ও আপিল বিভাগের বিভিন্ন আদেশের কপির জন্য অপেক্ষা করছি। তিনি আরো বলেন, কর্ণফুলীর তীরে অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের আদেশগুলো দ্রুত আদালতে উপস্থাপনা করা হবে।
এদিকে, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে গঠিত আপিল বিভাগের বেঞ্চে কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের করা আপিল খারিজের পর তারা মামলা করে চট্টগ্রামের ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে। গত ১৬ এপ্রিল কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের পক্ষে এ মামলা (অপর মোকাদ্দমা নং-১৫৪/১৯) দায়েরের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট স্থাপনা উচ্ছেদ কিংবা ভাঙার বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন (আলাদা দরখাস্তের মাধ্যমে) করা হয়। কর্ণফুলী কোল্ড স্টোরেজের পাঁচতলা ভবন (লাল চিহ্নিত অংশ) উচ্ছেদেও একইসাথে নিষেধাজ্ঞা চাওয়া হয়। এ মামলায় বিবাদী করা হয়েছে চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ও সহকারী কমিশনার সদরকে (ভুমি)।
মামলার বাদী হচ্ছেন কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের পক্ষে ইঞ্জিনিয়ার (আরজি অনুযায়ী) মোহাম্মদ আবদুর রশিদ। মামলায় সম্পত্তির মূল্যমান দেখানো হয়েছে ২০ কোটি টাকা। মামলা দায়েরের সময় ৪৬ হাজার টাকা কোর্ট ফি পরিশোধ করা হয় বাদীপক্ষে।
আদালতের বিচারক মামলাটি (অপর মোকাদ্দমা নং ১৫৪/১৯) বালামভুক্ত করার আদেশ দেন। বাদীর আইনজীবীর বক্তব্য পর্যালোচনা করে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার দরখাস্ত আপাতত গ্রহণ করা হলো বলেও আদেশ দেওয়া হয়। একইসাথে বিবাদীদের বিরুদ্ধে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আদেশ দ্বারা কেন বারণ করা হবে না তা নোটিশ প্রাপ্তির ২৪ ঘণ্টার মধ্যে কারণ দর্শানোর নির্দেশ দেন আদালতের বিচারক। আদেশের শেষ প্যারায় উল্লেখিত তিন বিবাদী বরাবর অতি সত্বর কারণ দর্শানো নোটিশ ইস্যু করার কথা বলা হয়।
এর প্রেক্ষিতে সরকার পক্ষে চট্টগ্রামের জিপি অ্যাডভোকেট নাজমুল আহসান খান আলমগীর উল্লেখিত আদালতে উপস্থিত হয়ে জবাব দেওয়ার জন্য সময়ের আবেদন জানান।
এদিকে, ৩য় যুগ্ম জেলা ও দায়রা জজ আদালতে দায়ের করা মামলার বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ বলেন, প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের বেঞ্চ যেখানে এ সংক্রান্ত আপিল খারিজ করে দিয়েছেন, সেখানে চট্টগ্রাম আদালতে মামলা হয় কীভাবে? এখানে এটা হতে পারে, নিম্ন আদালতের সামনে হয়ত আপিল বিভাগের আদেশের তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপন করা হয়নি। উচ্চ আদালতের রায়ের ওপর কোনো ধরনের হস্তক্ষেপ আদালত অবমাননারই শামিল।
দরখাস্তে আরো বলা হয়, চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত নকশা অনুসারে পাঁচতলা পাকা ভবন নির্মাণের মাধ্যমে কর্ণফুলী কোল্ড স্টোরেজ প্রতিষ্ঠা করা হয়। এতে বিভিন্ন প্রজাতির মৎস্য ও ফল হিমায়িত অবস্থায় রাখে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
এ বিষয়ে বাদীর আইনজীবী অ্যাডভোকেট পরিমল চন্দ্র বসাক বলেন, কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের পক্ষে মামলা দায়ের করার মাধ্যমে আদালতের কাছে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞার আবেদন করেছি। আদালত বিবাদীদের একদিনের মধ্যে কারণ দর্শানোর আদেশ দিয়েছেন।
এদিকে, কর্ণফুলীর তীরে অবৈধ স্থাপনা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর গত ১৫ এপ্রিল আবার উচ্ছেদ অভিযান শুরু করার রাস্তা পরিষ্কার করেছিল আপিল বিভাগ। প্রধান বিচারপতির নেতৃত্বে আপিল বিভাগের একটি বেঞ্চের আদেশে এ রাস্তা পরিষ্কার করা হয়। কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের দায়ের করা এ আপিল খারিজ করার পর চট্টগ্রাম আদালতে এ মামলা দায়ের করার ঘটনায় বিস্ময় প্রকাশ করেন অ্যাডভোকেট মনজিল মোরসেদ। তিনি জানান, কর্ণফুলী নদীর অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষ থেকে একটি রিট দায়ের করা হয়েছিল। ওই রিটের প্রেক্ষিতে জেলা প্রশাসন থেকে একটি জরিপ প্রতিবেদন দিয়েছিল। সেখানে প্রায় ২১শ অবৈধ স্থাপনা ছিল। এরপর ২০১৬ সালে একটি রায় হয়, যেখানে এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের নির্দেশ দিয়েছিলেন আদালত। ওই রায়ের আলোকে গত ৪ ফেব্রুয়ারি জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে উচ্ছেদ অভিযান শুরু করে। প্রথম দফায় ৫ দিনের এ উচ্ছেদ অভিযান থামে ৮ ফেব্রুয়ারি। এরই মধ্যে কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠান গত ৬ ফেব্রুয়ারি চেম্বার জজ আদালতে আবেদন করে স্থগিতাদেশ নিয়ে যায়। এরপর তাদের ওই আবেদনটি আপিল বিভাগে শুনানি হয়। আদালত শুনানি শেষে গত ১৫ এপ্রিল তাদের আবেদন খারিজ করে দিয়েছেন। এর ফলে কর্ণফুলী শিপ বিল্ডার্সের যতটুকু জায়গায় নদীর অংশে পড়েছে সেটুকু ভাঙতে আর কোনো বাধা থাকে না।
প্রসঙ্গত, ২০১০ সালের ১৮ জুলাই পরিবেশবাদী সংগঠন হিউম্যান রাইটস পিস ফর বাংলাদেশের পক্ষে জনস্বার্থে করা এক রিট আবেদনের প্রেক্ষিতে হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ কর্ণফুলী নদী দখল, মাটি ভরাট ও নদীতে সব ধরনের স্থাপনা নির্মাণ বন্ধের নির্দেশ দেন। একইসঙ্গে স্থানীয় প্রশাসনকে পরবর্তী ছয় মাসের মধ্যে নদীর প্রকৃত সীমানা নির্ধারণ করে প্রতিবেদন দিতে বলেন।
আদালতের নির্দেশের পর চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসন ২০১৪ সালের ৯ নভেম্বর কর্ণফুলীর দুই তীরে সীমানা নির্ধারণের কাজ শুরু করে। নেভাল একাডেমি সংলগ্ন নদীর মোহনা থেকে মোহরা এলাকা পর্যন্ত অংশে ২০১৫ সালে জরিপের কাজ শেষ করা হয়। জরিপে নদীর দুই তীরে দুই হাজারের বেশি অবৈধ স্থাপনা চিহ্নিত করে জেলা প্রশাসন। প্রতিবেদনটি ২০১৫ সালের ৯ নভেম্বর উচ্চ আদালতে দাখিল করা হয়। এরপর ২০১৬ সালের ১৬ আগস্ট হাই কোর্টের একটি বেঞ্চ কর্ণফুলীর দুই তীরে গড়ে ওঠা স্থাপনা সরাতে ৯০ দিনের সময় বেঁধে দেন। ২০১৭ সালের ২৫ নভেম্বর উচ্ছেদ কার্যক্রম পরিচালনার জন্য এক কোটি ২০ লাখ টাকা অর্থ বরাদ্দ চেয়ে ভূমি মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয় জেলা প্রশাসন।
দখলে দূষণে বিপর্যস্ত কর্ণফুলী বাঁচাতে জনস্বার্থে হাই কোর্টে রিটকারী অ্যাডভোকেট মনজিল মোরশেদ কর্ণফুলীর তীরে দ্রুত উচ্ছেদ অভিযান শুরু করতে (বন্ধ হওয়ার পর) সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে ৭ দিনের আল্টিমেটাম দিয়ে যান গত ৪ এপ্রিল। অন্যথায় তিনি আদালতের নির্দেশ প্রতিপালন না করার অভিযোগ এনে হাই কোর্টে আদালত অবমাননার আবেদন করবেন বলেও সতর্ক করে যান।
গত রোববার কর্ণফুলীর তীর পরিদর্শনের পর বিস্ময় ও ক্ষোভ প্রকাশ করে জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মুজিবুর রহমান হাওলাদার বলেন, যেভাবে ড্রাইডক ও ইনকনট্রেড কোম্পানিসহ বিভিন্ন সরকারি ও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের নদী ভরাটের দৃশ্য দেখলাম তাতে এ নদী আর কতদিন বাঁচে তাই দেখার বিষয়।
তিনি আরো বলেন, আপনারা সবাই মিলে কর্ণফুলীকে বাঁচান। যেভাবে চলছে যদি অবৈধ স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া না হয়, তাহলে ২/৩ বছরে কর্ণফুলী আরো মরে যাবে।

x