যে কারণে কমছে জিপিএ ফাইভ

ফল বিশ্লেষণ

রতন বড়ুয়া

মঙ্গলবার , ৭ মে, ২০১৯ at ৫:৪১ পূর্বাহ্ণ
259

এসএসসিতে চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে পাসের হার কিছুটা বেড়েছে এবার। এবার বোর্ডের গড় পাসের হার ৭৮.১১ শতাংশ। যা গতবারের তুলনায় ২.৬১ শতাংশ বেশি। গতবার পাসের হার ছিল ৭৫.৫০ শতাংশ। তবে পাসের হার কিছুটা বাড়লেও কমেছে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা। এবার সর্বোচ্চ জিপিএ-৫ পেয়েছে ৭ হাজার ৩৯৩ জন। জিপিএ-৫ প্রাপ্তির এ সংখ্যা গতবারের তুলনায় ৭০১টি কম। গতবার (২০১৮ সালে) জিপিএ-৫ পায় মোট ৮ হাজার ৯৪ জন। কেবল এই বছরই নয়, বিগত বেশ কয় বছর ধরেই জিপিএ-৫ প্রাপ্তির এ সংখ্যা ধারাবাহিক ভাবে কমছে। শিক্ষাবোর্ডের চার বছরের তথ্য পর্যালোচনায় এ চিত্র পাওয়া গেছে। বোর্ড থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী- ২০১৬ সালে জিপিএ-৫ পায় মোট ৮ হাজার ৫০২ জন শিক্ষার্থী। কিন্তু পরের বছর (২০১৭ সালে) এ সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৩৪৪ জনে। ২০১৮ সালে জিপিএ-৫ প্রাপ্তের সংখ্যা আরো কমে দাঁড়ায় ৮ হাজার ৯৪ জনে। সর্বশেষ এবার (২০১৯ সালে) ৭ হাজার ৩৯৩ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছে। পর্যালোচনায় দেখা যায়, ২০১৬ সালের পর থেকে ধারাবাহিকভাবে জিপিএ-৫ প্রাপ্তির সংখ্যা কমছে এসএসসিতে। বোর্ডের তথ্য বলছে, এবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক জিপিএ-৫ কমেছে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে। ২০১৮ সালে ব্যবসায় শিক্ষা বিভাগে জিপিএ-৫ পায় ৭৮৩ জন। এবার পেয়েছে ৪১২ জন। বিজ্ঞান বিভাগে ২০১৮ সালে জিপিএ-৫ পায় ৭ হাজার ২৮৫ জন। যা কমে এবার দাঁড়িয়েছে ৬ হাজার ৯৫৪ জনে। মানবিকে গতবছর জিপিএ-৫ পায় ২৬ জন। এবার এ সংখ্যা ২৭ জন। এদিকে, এসএসসিতে ২০১২ সাল থেকে ৮ বছরের মধ্যে পাসের হারে গতবারই (২০১৮ সালে) সবচেয়ে খারাপ ফল ছিল চট্টগ্রাম শিক্ষাবোর্ডে। গতবার (২০১৮ সালে) পাস করে ৭৫.৫০ শতাংশ শিক্ষার্থী। যা ২০১৭ সালের তুলনায় ৮.৪৯ শতাংশ কম। ২০১৭ সালে পাসের হার ছিল ৮৩.৯৯ শতাংশ। ২০১৬ সালে পাস করে ৯০.৪৫ শতাংশ। ২০১৫, ২০১৪, ২০১৩ ও ২০১২ সালে এই হার ছিল যথাক্রমে ৮২.৭৭, ৯১.৪০, ৮৮.০৪ ও ৭৯.০১ শতাংশ।
এমন দুর্বল ফলের কারণ হিসেবে গতবার পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের আতঙ্কের বিষয়টি জোর আলোচনায় ছিল। তবে মূলত ২০১৭ সালে কার্যকর হওয়া নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি ঘিরে ভয় না কাটাকে দায়ী করেন শিক্ষাবিদসহ শিক্ষা সংশ্লিষ্টরা। অবশ্য, গণিতে বেশি সংখ্যক শিক্ষার্থীর ফেল করাটাও দুর্বল ফলাফলের অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন শিক্ষাবোর্ড সংশ্লিষ্টরা। গণিতের ফেলের পাশাপাশি এবার যুক্ত হয়েছে আরো কয়েকটি বিষয়ে ভালো নম্বর তুলতে না পারা বা জিপিএ-৫ না পাওয়া। যদিও এসব বিষয়ে পাস করছে শিক্ষার্থীরা। কিন্তু জিপিএ-৫ পাওয়ার শর্ত হিসেবে শিক্ষার্থীরা ন্যূনতম ৮০ নম্বর তুলতে পারছেনা। যার কারণে জিপিএ-৫ ধারাবাহিক ভাবে কমছে। তথ্য বলছে, নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণেই গণিতে বেশি সংখ্যক ফেলের পাশাপাশি আরো কয়েকটি বিষয়ে ভালো নম্বর তুলতে সক্ষম হচ্ছেনা শিক্ষার্থীরা।
নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি : ২০১৬ সাল পর্যন্ত একশ নম্বরের প্রতিটি বিষয়ে ছয়টি সৃজনশীল (৬০ নম্বর) ও ৪০ নম্বরের এমসিকিউ প্রশ্নের উত্তর করতে হতো এসএসসি পরীক্ষার্থীদের। কিন্তু ২০১৭ সাল থেকে এ নিয়ম পরিবর্তনের ঘোষণা অনেকটা আগেভাগেই দেয় শিক্ষামন্ত্রণালয়। ২০১৫ সালের শেষ দিকে মন্ত্রণালয়ের সিদ্ধান্তে জানানো হয়- আগের ৬০ নম্বরের সৃজনশীল (তত্ত্বীয়) প্রশ্নের স্থলে ৭০ নম্বর এবং এমসিকিউ অংশে ৪০ নম্বরের স্থলে ৩০ নম্বরের উত্তর লিখতে হবে শিক্ষার্থীদের। আর বিজ্ঞানের বিষয়গুলোসহ ব্যবহারিক যুক্ত বিষয়ে সৃজনশীল ৪০ নম্বরের স্থলে ৫০ এবং এমসিকিউ অংশে ৩৫ এর স্থলে ২৫ নম্বর নির্ধারণ করা হয়। ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষা থেকে এ নতুন পদ্ধতি কার্যকরের কথা বলা হয় মন্ত্রণালয়ের ঘোষণায়। জানতে পেরে তখনই (২০১৫ সালের শেষ দিকে) এ ঘোষণার বিরুদ্ধে আন্দোলনে নামে ওই সময় নবম শ্রেণি অধ্যয়নরত শিক্ষার্থীরা। যারা ২০১৭ সালের এসএসসি পরীক্ষার্থী। ‘আমরা মানুষ, রোবট না/ সাতটি সৃজনশীল লিখবো না’, এমন স্লোগানে রাজপথে দীর্ঘদিন মানববন্ধন ও বিক্ষোভ-সমাবেশ করে শিক্ষার্থীরা। শিক্ষার্থীদের দাবি ছিল- ‘ছয়টি সৃজনশীল প্রশ্নের উত্তর দেয়াই কঠিন, সেখানে আরো একটি বেশি (সাতটি) প্রশ্ন লিখতে হলে পরীক্ষায় নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। ভালো ফল করা সম্ভব হবে না।’ নতুন পদ্ধতি ঘিরে এই ভয়কে অধিকাংশ শিক্ষার্থী-ই শেষ পর্যন্ত জয় করতে পারেনি। যার প্রভাব পড়েছে ২০১৭ সালের এসএসসির ফলাফলে। ২০১৬ সালের ৯০.৪৫ শতাংশ থেকে পাসের হার এক ধাক্কায় ৮৩.৯৯ শতাংশে নেমে আসে ২০১৭ সালে। কমে যায় জিপিএ-৫ প্রাপ্ত শিক্ষার্থীর সংখ্যাও। আর নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি সবচেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে গণিত বিষয়ে। এক ধাক্কায় গড় পাসের হার কমে যায় ৫ শতাংশেরও বেশি।
গণিতের উত্তরপত্র মূল্যায়নের সাথে সম্পৃক্ত একাধিক শিক্ষকের সাথে কথা বলে জানা যায়- পাস করতে হলে দুটি (সৃজনশীল ও এমসিকিউ) অংশে আলাদা ভাবে র্নিধারিত ন্যূনতম নম্বর তুলতে হয় শিক্ষার্থীদের। এর বাইরে দুটি অংশের যোগফল আবার ন্যূনতম ৩৩ হলেই কেবল একজন শিক্ষার্থীকে পাস ধরা হয়। তবে একটি অংশে ন্যূনতম নির্ধারিত নম্বর তুলতে না পারলে অন্য একটি অংশে ৩৩ বা তদুর্ধ্ব নম্বর পেয়েও একজন শিক্ষার্থী পাসের যোগ্য বলে বিবেচিত হয়না। নতুন নম্বর বিভাজনে দুর্বল শিক্ষার্থীদের জন্য পাস করা একটু কঠিন মন্তব্য করে গতবারের মতো এবারও নতুন নিয়মই ফলাফলে অন্যতম নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে বলে মনে করেন এই শিক্ষকরা। গত চার বছরের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়- ২০১৬ সালে গণিতে গড় পাসের হার ছিল ৯৬.৮১ শতাংশ। কিন্তু নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকরের পর ২০১৭ সালে এক ধাক্কায় গণিতে গড় পাসের হার কমে দাঁড়ায় ৯১.৭৭ শতাংশে। ২০১৮ সালে বিষয়টিতে গড় পাসের হার আরো কমে দাঁড়ায় ৮৮.১১ শতাংশ। আর ধারাবাহিকতায় এবার বিষয়টির গড় পাসের হার ৮৬.৪৩ শতাংশ। অর্থাৎ ২০১৭ সালে নতুন মূল্যায়ন পদ্ধতি কার্যকরের পর থেকে ধারাবাহিক ভাবেই বিষয়টিতে পাসের হার কমছে। বিষয়টি এক প্রকার স্বীকার করেছেন শিক্ষাবোর্ড সংশ্লিষ্টরা। বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক মোহাম্মদ মাহবুব হাসান বলছেন- এবার সবচেয়ে পাসের হার কম গণিত বিষয়ে। তাছাড়া বাংলা, বিজ্ঞান ও ফাইনান্স বিষয়ে শিক্ষার্থীরা আগের মতো ভালো নম্বর তুলতে পারছেনা। পাস করে গেলেও বিষয়গুলোতে ‘এ প্লাস’ পাওয়ার সংখ্যা অনেক কমে গেছে। যার কারণে সার্বিক ফলাফলে জিপিএ-৫ এর সংখ্যা কমেছে। বোর্ড সূত্রে জানা যায়, গত বছর বাংলায় এ-প্লাস পেয়েছিল ১০ হাজার ২২৯ জন পরীক্ষার্থী। এবার পেয়েছে ৬ হাজার ৫১৮ জন। একইভাবে ২০১৮ সালে গণিতে এ-প্লাস পেয়েছিল ১৩ হাজার ৭৮৭ জন। এবার পেয়েছে ৮ হাজার ৭১২ জন। গতবার সাধারণ বিজ্ঞান বিষয়ে এ-প্লাস পেয়েছিল ৬ হাজার ২৩০ জন। এবার সেটা কমে হয়েছে ৪ হাজার ৭৩১ জন। ফিন্যান্স ও ব্যাংকিং বিষয়ে গতবার ‘এ প্লাস’ পেয়েছিল ৩ হাজার ১১২ জন। এবার তা কমে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৫৫২ জনে। নম্বর বন্টনের নতুন পদ্ধতি শিক্ষার্থীদের মনে প্রভাব ফেলেছে বলে মনে করেন চট্টগ্রাম কলেজের প্রাক্তন অধ্যক্ষ প্রফেসর জেসমিন আক্তার। অবসরে যাওয়া এই শিক্ষকের মতে- ‘নম্বর বন্টনের এই নতুন নিয়ম নিয়ে শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরণের ভয় ছিল। প্রথমবার (২০১৭ সালে) তারা তা কাটিয়ে উঠতে পারেনি। ধারাবাহিক ভাবে (এবারও) এই ভয় কাটিয়ে উঠতে পারেনি তারা। গণিতের পাসের হার সেটাই বলছে। এটি মোটামুটি স্পষ্ট।’
তবে বোর্ড সংশ্লিষ্টদের দাবি- পার্বত্য অঞ্চল ও মফস্বলের ফলাফল তুলনামূলক ভালো হলে সামগ্রিক ভাবে বোর্ডের ফলও ভালো হয়। আবার উল্টোটা হলে উল্টোটা ঘটে। মফস্বল এলাকার দুর্বল ফল বরাবরই বোর্ডের সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলে বলে জানান বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর শাহেদা ইসলাম। এ জন্য গ্রামাঞ্চলে গণিত-ইংরেজির পাশাপাশি বিজ্ঞানের বিষয়গুলোতে যোগ্য ও অভিজ্ঞ শিক্ষক না থাকাই কারণ বলে মনে করেন বোর্ড চেয়ারম্যান। ফলাফলে এসব অঞ্চল বরাবরই পিছিয়ে থাকে মন্তব্য করে শিক্ষাবোর্ড চেয়ারম্যান বলেন, দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিক্ষকের অভাবসহ সামগ্রিক নানা সীমাবদ্ধতার দরুণ পার্বত্য অঞ্চল ও দ্বীপ অঞ্চলের শিক্ষার্থীরা বরাবরই পিছিয়ে থাকছে। যা সামগ্রিক ফলাফলে প্রভাব ফেলে। এটি ধারাবাহিক ভাবেই হয়ে আসছে।

x