যে অপবাদ শুধু নারীর…

নিপা দেব

শনিবার , ২০ এপ্রিল, ২০১৯ at ৮:৪৩ পূর্বাহ্ণ
31

অনেক সময় এই নারীরা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অপরাধ না করেও এর দায় স্বীকার করত, প্রাণভিক্ষা চাইত। এতে করে ধর্মযাজকরা এই নারীদের ডাইনী প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের মাঝে ভয় ঢুকিয়ে দিত। তাই এই নারীদের হত্যা করলেও সমাজে এর কোনো প্রতিবাদ হত না।

শিশুসন্তান ভাত খেতে না চাইলে আমরা তাকে রূপকথার ‘ডাইনী বুড়ি’র গল্প শুনিয়ে তার মনে ভয় উৎপাদন করে খাওয়ানোর চেষ্টা করি। আমাদের দেশের কী-শহরে, কী-গ্রামে সবখানেই এই প্রবণতা লক্ষণীয়। উপরন্তু, কোনো নারী যদি সাধারণ গড়পড়তা নারীর উচ্চতার চেয়ে একটু বেশি লম্বা হয়, তাঁর পেশিবহুল শরীর থাকে (নিয়মিত ব্যায়াম বা শারীরিকভাবে পরিশ্রমী নারীর এমন শরীর হতেই পারে), যদি তাঁর চাল-চলনে স্বাধীনচেতা হয় কিংবা যদি সেই নারী একটু বেশি খাবার-দাবারে অভ্যস্ত হয় বা সমাজের কোনো অন্যায়ের জোর প্রতিবাদ করে- তবে সেই নারীকে সমাজ ‘ডাইনী’ আখ্যা দিতে ছাড়ে না। কিন্তু ইতিহাস দেয় ভিন্ন সাক্ষ্য। কেননা, অন্যায়ের প্রতিবাদকারী নারীকে নেতিবাচকরূপে উপস্থাপন করে তার শাস্তি নিশ্চিত করতেই ইউরোপে একসময় ‘ডাইনী’ শব্দটির প্রচলন শুরু হয়।
ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায়- ‘১৪০০ সালে সমস্ত ইউরোপে একটা রহস্যময় প্লেগ রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা দেয়। এই রোগের নাম ছিল- ব্ল্যাক ডেথ। ইউরোপে প্রতি তিনজনের মধ্যে একজন এই রোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছিল। সমস্ত ইউরোপে তখন ভীতি ছড়িয়ে পরে আর সেই সময় ধর্ম যাজকরা প্রচার করে এটা শয়তান করছে। আর শয়তানের সেবক সন্দেহ করা হয় অনেক নারীকেই। অতপর, ১৬০০ সালের দিকে প্রচার করা হয় ডাইনীরা আকাশে উড়ে বেড়ায় এবং সাধারণ মানুষ সেটা বিশ্বাস করত যে ডাইনীরা উড়তে পারে। জার্মান চিকিৎসক ইউহান বেয়ার্স এই অদ্ভুত ধারণার কারণ ব্যাখ্যা করেছিল। সেই সময় দাতুরা নামের একটা ওষুধের খুব প্রচলন ছিল। এটা নিলে হ্যালুসিনেশন হত। এই ড্রাগের প্রভাবেই এমন ধারণা জন্মেছিল। এখানে খুব ইন্টারেস্টিং একটা বিষয় হল যাদেরকে ডাইনি বলা হত, এরা অনেকেই ছিল সিঙ্গেল মাদার। মানে যখন কোন অবিবাহিত নারী গর্ভবতী হত সমাজ তাকে ডাইনী অপবাদ দিয়ে হয় সমাজচ্যুত করত অথবা মেরে ফেলত। তার অনাগত সন্তানের পিতা বলা হত শয়তানকে। আর সেই সন্তান জন্মাবার সাথে সাথে মেরে ফেলা হত। এই নারীদের ওপর অমানবিক অত্যাচার চালানো হত। অত্যাচারের সময় একটা নিয়ম ছিল, ঐ নারীর চোখের দিকে তাকানো যাবে না। ধর্ম যাজকরা বলত- ডাইনীর শক্তি থাকে তার চোখে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, একটা নিরপরাধ মেয়ের চোখে যে যন্ত্রণা ফুটে উঠত সেটা দেখলে মায়া জেগে উঠতে পারে তাই ধর্মযাজকরা ইচ্ছা করেই এই নিয়ম করেছিল। অনেক সময় এই নারীরা অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে অপরাধ না করেও এর দায় স্বীকার করত, প্রাণভিক্ষা চাইত। এতে করে ধর্মযাজকরা এই নারীদের ডাইনী প্রমাণ করে সাধারণ মানুষের মাঝে ভয় ঢুকিয়ে দিত। তাই এই নারীদের হত্যা করলেও সমাজে এর কোন প্রতিবাদ হত না।
১৪৮০ থেকে ১৭৫০ সাথে ইউরোপের ধর্ম যাজকরা ডাইনি অপবাদ দিয়ে লক্ষ-লক্ষ নারী হত্যা করেছিল। ১৬০০ শতকে সবচেয়ে ভয়াবহ হত্যা হয়েছিল জার্মানির উর্জবার্গে। সেখানকার ম্যাজিস্ট্রেট-এর হুকুমে সমস্ত নারীদের ডাইনি আখ্যা দিয়ে হত্যা করা হয়েছিল।
একসময় এই হত্যাকাণ্ডের বিরোধিতা করা হয়। ইউহানাস ভিয়ার নামের একজন ডাচ চিকিৎসক সর্বপ্রথম ডাইনী হত্যার আইনের যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি উপলব্ধি করেছিলেন যে- ডাইনী অপবাদ দিয়ে যাঁদের হত্যা করা হচ্ছে তাঁরা আসলে ভিন্ন চিন্তার নারী আর কেউ কেউ মানসিকভাবে অসুস্থ। ১৫৬৩ তে তিনি একটি জার্নাল প্রকাশ করেন যেখানে প্রসিকিউশনের বিরোধিতা করে বক্তব্য তুলে ধরেন যে- এই হত্যাকাণ্ড সম্পূর্ণ অনৈতিক। এরপর সামাজিকভাবে এই হত্যাকাণ্ড বন্ধের আলোড়ন ওঠে যদিও প্রকাশ্যে এই হত্যা বন্ধ হতে ইউরোপের এরপর আরও ২০০ বছর লেগে যায়’ (সূত্র: ওয়েবসাইট, লেখক: ব্লগার ক্যামেলিয়া)।
সুতরাং আমরা দেখি- ‘ডাইনী’ আখ্যা দিয়ে লক্ষ-লক্ষ নারীকে তখন হত্যা করা হয়েছিল পুরুষতান্ত্রিক ভাবাদর্শ টিকিয়ে রাখার জন্য। এ বিষয়ে গবেষক-শিক্ষক সুস্মিতা চক্রবর্তীর ‘ফোকলোর ও জেন্ডার, লোককাহিনী ও পুরুষতন্ত্র: নারীর লিঙ্গায়িত সামাজিক পরিচয় নির্মাণ ও স্বতন্ত্র স্বর’ গ্রন্থ থেকেও উদ্ধৃত করা যাক। তিনি ওই গ্রন্থে লেখক-অধ্যাপক আনু মুহাম্মদকে উদ্ধৃত করে বলেছেন, ‘ইউরোপের সামন্তযুগে রাজা ও চার্চের একটানা স্বৈর-আধিপত্য যখন নানাভাবে প্রশ্নের মুখোমুখি হচ্ছিল এবং এগুলোকে দমন করবার জন্য নারকীয় পথ অবলম্বন করা হয়েছিল; তখনই সৃষ্টি হয় প্রতিবাদী বা নিয়ম ভঙ্গকারী নারীকে ডাইনী আখ্যা দিয়ে হত্যা করার অযুত ঘটনা। সবচাইতে গ্রহণযোগ্য সংখ্যা হচ্ছে ৬০ লাখ। যুদ্ধ ছাড়া এটিই সবচাইতে ব্যাপক গণহত্যা।’
আমাদের এই ভারতীয় উপমহাদেশেও এই অপবাদের ধোয়া তুলে বহু নারী হত্যা করা হয়েছে। বিশেষ করে ভারতের কিছু কিছু আদিবাসী জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে ব্যাপকহারে ডাইনী অপবাদে নারী হত্যার ঘটনা ঘটেছে (কবি মল্লিকা সেনগুপ্ত, ১৯৯৪: ৯৪)। এছাড়া ওয়াশিংটন পোস্টে পূজা সিঙ্ঘাল নামের এক লেখিকা জানিয়েছেন, ২০০০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত ভারতে সরকারি হিসেবে ২ হাজার ১০০ নারীকে ডাইনী অপবাদ দিয়ে হত্যা করা হয়েছে। তাদেরকে সমাজ থেকে ছুঁড়ে ফেলা, তাদের সম্পদ দখল করা, তাদের প্রতিবাদী কণ্ঠকে চুপ করিয়ে দেওয়াসহ নারীদের পুরুষের অধীনস্থ করাই ছিল এই হত্যাকাণ্ডের মূল কারণ।
অর্থাৎ পুরুষাধিপত্য টিকিয়ে রাখতে, নারীরা যাতে সামাজিক রীতিনীতির যৌক্তিকতা নিয়ে কোনো প্রশ্ন তুলতে না পারে সেই কারণেই নারীকে এই ‘ডাইনী’ খেতাব দিয়েছে অত্যাচারী রাজা তথা পুরুষতন্ত্র। ক্রমে ভারতবর্ষের সাহিত্য এমনকি বাংলার লোকসংস্কৃতিতেও ‘ডাইনী’ চরিত্রটি নারীর নেতিবাচক রূপ প্রকাশে জায়গা করে নিয়েছে। যার নিচে চাপা পড়ে গেছে নারীর প্রতিবাদী চরিত্রটি। অথচ- ‘ডাইনী’ আখ্যার বিপরীতে পুরুষের জন্য কোনো শব্দ চালু নেই। কারণ, পুরুষ তথা পুরুষতন্ত্র তখনো ছিল শক্তিশালী এবং সমাজের প্রভু। অত্যাচারী কখনো নিজেকে অত্যাচারী হিসেবে স্বীকৃতি না দেওয়ারও বাস্তবতা এটি।
প্রকৃত অর্থে- মেধায়, বুদ্ধিতে, মননে নারী যতই এগিয়ে যাক না কেন পুরুষতান্ত্রিক সমাজ সবসময়ই নারীর উপর আগ্রাসন চালিয়ে আসছে। একারণেই প্রতিবাদী নারীকে নানাসময়ে ‘অশুভ’, ‘অপয়া’, ‘নষ্টা’, ‘ভ্রষ্টা’ ইত্যাদি অপবাদে জর্জরিত হতে হয়েছে। কখনোবা দিতে হয়েছে অমূল্য প্রাণ। নয়তো মেনে নিতে হয়েছে সামাজিক দাসত্ব। বাস্তবে নারীর সাথে পুরুষের শারীরিক গঠন ছাড়া আর এমন কোন পার্থক্য নেই, যার কারণে নারীকে ‘দুর্বল’ হিসেবে দেখা যেতে পারে। তাও কিন্তু সামাজিকভাবে নারীকে বঞ্চিত করার পরিণাম এটি। একসময় ছিল যখন শিকারের জন্য পেশিশক্তির কারণে শক্তিশালীরা পূজিত হত কিন্তু এখন তো সারা পৃথিবী চলছে বুদ্ধি দ্বারা, মানসিক শক্তি দ্বারা। এখানে পেশিশক্তি কোনো বিবেচ্য বিষয়ই নয়। বরং, পুরুষতন্ত্রই অত্যাচারী- সেই তখন থেকে এখনো পর্যন্ত। তাহলে শুধু নারীর জন্যই এখনো এই ‘ডাইনী’ আখ্যা কেনো? এই ব্যথাময় অপবাদ শুধু নারীর কেনো?

লেখক: সিনিয়র সায়েন্টিফিক অফিসার,পরমাণু শক্তি কমিশন,চট্টগ্রাম

x