যেহেতু সে গণতান্ত্রিক

সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী

শুক্রবার , ২ নভেম্বর, ২০১৮ at ৯:৪৮ পূর্বাহ্ণ
22

এলিজাবেথের সময়ে নাটকের অত্যুৎকৃষ্ট বিকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নাট্যব্যক্তিত্বদের যে বিশেষ সম্মান ছিল তা কিন্তু নয়। রাষ্ট্র সে-সম্মান তাঁদের দেয় নি। যে জন্য দেখি শেক্‌সপীয়র অসামান্য সব নাটক লিখছেন বটে, তবু তার ইচ্ছেটা থাকছে ভদ্রলোক হওয়ার, যার তাড়নায় তিনি পর্যাপ্ত অর্থ সঞ্চয় করার পর লন্ডনের নাট্যজগৎ ছেড়ে দিয়ে নিজের ছোট শহরে ফিরে এলেন, এবং নতুন বাড়ি কিনে ‘ভদ্র’ জীবনযাপন শুরু করলেন। সেকালে নাটকে লোকদেরকে ভবঘুরে ও ভিক্ষুকের পর্যায়েই গণ্য করা হতো, সামাজিকভাবে। রাষ্ট্র এগিয়ে আসে নি তাদেরকে সাহায্য করতে।
উপন্যাস যদি হয় সমাজতান্ত্রিক, তবে নাটক অবশ্যই গণতান্ত্রিক। নাটক শ্রেণি দেখে না, মানুষ দেখে। না, শ্রেণিভেদ ভেঙে ফেলবে এ দায়িত্ব সে নেয় না, কিন্তু সব শ্রেণীর মানুষকে নিয়ে আসতে চায় সে নিজের কাছে। না-পারলে বড় ক্ষুণ্ন হয়, ভেতরে ভেতরে। মানুষ নাটকের মঞ্চে থাকে, থাকে তার সামনে, থাকে পেছনেও। সব মিলিয়ে গণতান্ত্রিক শিল্পকলা সে- স্বভাবে ও চরিত্রে। ভেতরে যেমন তেমনি বাইরেও।
ওদিকে রাষ্ট্র কখনোই গণতান্ত্রিক নয়, এমন কি তখনো নয় যখন সে দাবি করে গণতান্ত্রিক বলে। সে জন্য প্রকৃত সমাজতন্ত্রীরা রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করেন না, আশা করেন যে উবে যাবে, এক সময়ে। উবে না-গেলে বিপর্যয় ঘটে, যেমনটা ঘটেছে সোভিয়েত ইউনিয়নে। রাষ্ট্র থাকলে আমলাতান্ত্রিকতা থাকবেই, আর আমলাতন্ত্র সব সময়েই গণতন্ত্রের শত্রু। রাষ্ট্রে কোনো না কোনোভাবে থাকে শ্রেণি, রাষ্ট্র যাকে রক্ষা করতে চায়, অন্তর্গত আমলাতন্ত্রের বিশেষ অনুরোধে। আসলে রাষ্ট্রমাত্রেই শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধি বটে। রাষ্ট্রের সঙ্গে নাটকের বিরোধ তাই একেবারে মূলগত। তাছাড়া সত্য এটাও যে, রাষ্ট্র হচ্ছে কৃত্রিম, আর নাটককে যতই কৃত্রিম বলা হোক না কেন যদি একেবারে অতিনাটকীয় না হয়, হয় সুস্থ তা হলে অবশ্যই সে সমস্ত তার কৃত্রিমতার অভ্যন্তরে এবং চরিত্রগতভাবেই স্বাভাবিক। রাষ্ট্র বিশ্বাস করে নিয়ন্ত্রণে, নাটকের অভীপ্সা মুক্তি। রাষ্ট্রের অভীষ্ট শৃঙ্খলা, নাটকের অভীষ্ট অনুভূতি। এ দুয়ে মিলবে কেন?
তবু দু’পক্ষ মেলে তো। মিলেছে প্রাচীন গ্রীসে, যেখান থেকে আমরা পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ নাটকগুলোর কয়েকটি পেয়েছি; মিলেছে এলিজাবেথীয় ইংল্যান্ডে, যার নাট্য-সাহিত্য ভুবনজয়ী; মিলেছে বৈদিক ভারতবর্ষে, যেখান থেকে কালিদাসের মতো নাট্যকার বের হয়ে এসেছেন, তাঁর ‘শকুন্তলা’ নিয়ে।
মিলেছে বটে, কিন্তু প্রতিটি ক্ষেত্রেই দেখা গেছে যে, নাটকের সঙ্গে এক ধরনের বিরোধ বেধেছে রাষ্ট্রের। মিলন দিয়ে যা ঢাকা যায় নি।

গ্রীসের কথা দিয়েই শুরু করতে হয়। সেখানে এক প্রকারের গণতন্ত্র ছিল, যদিও তাতে নাগরিক অধিকার ছিল না দাস ও নারীর। ওই রাষ্ট্র নাটকের জন্য সুবিধা করে দিয়েছিল। গণতান্ত্রিকতায় বিশ্বাস করতো বলেই নাটক মঞ্চায়নের ব্যবস্থা করে দিত। নাটক দেখতে আসতো এথেন্সের নগরবাসীদের অধিকাংশই। সেকালের একটি নগরে ৩০-৩৫ হাজার দর্শক যদি এক সঙ্গে নাটক দেখে তাহলে তো বুঝতেই হবে যে, অধিবাসীদের মস্ত বড় অংশই উপস্থিত থাকতো নাট্যোৎসবে। উৎসবে এক সঙ্গে ট্র্যাজেডির মঞ্চায়ন হতো তিনটি, কমেডির একটি। নাটকের প্রতি রাষ্ট্রের পক্ষপাত ছিল বোঝা যায়, যার দরুন পৃথিবীর চারজন শ্রেষ্ঠ নাট্যকারের উল্লেখ করতে হলে তিনজনকেই খুঁজতে হয় এথেন্সে, অপরজন ইংল্যান্ডের রাণী এলিজাবেথের সময়কার।
নাটককে জনগণের কাছে নিয়ে যাওয়া হয় নি, জনগণকে নিয়ে আসা হয়েছে নাটকের কাছে। বহু মানুষের সেই উপস্থিতি নাট্যচর্চাকে করেছে গৌরবময়, নাটকের অভ্যন্তরে এনে দিয়েছে প্রাণবন্তুতা। এথেন্সের গণতন্ত্র ছিল ইহজাগতিক; নাটকও ছিল তাই। নাটকের আবরণটা সেখানে ধর্মীয়, দেবদেবীরা চতুষ্পার্শ্বেই রয়েছে, তারা নিয়ন্ত্রণ করছে মানুষের ভাগ্য কিন্তু মানুষ লড়ছে সেই ভাগ্যের বিরুদ্ধে- লড়াইটা মানবিক, তাই সম্পূর্ণ ইহজাগতিক। আর কমেডি তো মানুষকে নিয়ে হাস্যপরিহাস। ট্র্যাজেডির চেয়েও অধিক পরিমাণে ইহজাগতিক। কিন্তু তবুও ওই এথেন্সের দার্শনিক প্লেটোই তো আবার ভীষণ চটা ছিল নাট্যকারদের ওপর। কবিদেরকে তিনি নির্বাসনে পাঠাতে চেয়েছেন। বলেছেন, ওদেরকে বের করে দাও আমাদের রাষ্ট্র থেকে। তাঁর কল্পলোকে যে আদর্শ রাষ্ট্রের ছবি ছিল সেখানে কবির জন্য কোনো স্থান ছিল না। কবির বলতে সেকালে নাট্যকারও বোঝাতো। নাটক সেকালে কবিতাতে লেখা হতো; কালিদাসের কালেও, এমনকি শেক্‌সপীয়রের কালেও বটে।
কেন এই দণ্ড- নির্বাসনের? প্লেটোর নিজের কল্পনা ও ভাষা রীতিমত কাব্যিক; স্বভাবে কবি হয়েও তিনি কেন এতো চটলেন নাট্যকার তথা কবিদের ওপর? ব্যক্তিগত কোনো বিরোধ ছিল কি? মোটেই না, বিরোধটা ছিল দার্শনিক, আরো নির্দিষ্ট করে বলতে গেলে, রাজনৈতিক। প্লেটো গণতন্ত্রে বিশ্বাস করতেন না। মোটেই না। তার রাষ্ট্র ফ্যাসিবাদী। সেখানে মানুষরা সবাই শ্রেণিতে শ্রেণিতে বিভক্ত। দার্শনিকরা শাসন করে, সৈনিকরা করে যুদ্ধ এবং পায়ের কাছে থাকে যারা, সেই শ্রমজীবীরা করে উৎপাদন। এই ব্যবস্থাটা অক্ষুণ্ন রাখার স্বার্থেই নাট্যচর্চা নিষিদ্ধ করা দরকার হয়ে পড়েছিল। কেননা নাটক এই বিভাজনকে চ্যালেঞ্জ করে, ওদিকে নাটক বলে সব মানুষই মানুষ। নাটক মানুষের মনে ভাবাবেগ সৃষ্টি করে দেয়, ফলে হয়তো দেখা যাবে দার্শনিক হতে চাইছে সৈনিক, সৈনিক হতে চাইছে দার্শনিক, এবং শ্রমিক ভাবছে সেও তো মানুষ, সে কেন দার্শনিক বা শিল্পী হবে না। প্লেটোর রাষ্ট্র চায় মানুষকে আলাদা রাখতে, নাট্যকারদের সৃষ্টি মানুষকে ডাক দেয় এক হতে; এ দু’য়ে মৈত্রী হবে কি করে? রাষ্ট্রের হাতেই যেহেতু ক্ষমতা রয়েছে, রাষ্ট্র তাই হাঁকিয়ে দেবে নাট্যকারদেরকে, বের করে দেবে ঘাড় ধরে। এটাই তো স্বাভাবিক।
প্লেটো নৃত্য পছন্দ করতেন। ‘আইন’ নামের বইতে নৃত্যের পক্ষে বলেছেন তিনি। নৃত্যে যাঁর আপত্তি নেই, বরঞ্চ সম্মতি আছে, তিনি যদি নাটক নিষিদ্ধ করতে চান তাহলে ব্যাপারটাকে কি আমরা অস্বাভাবিক বলবো? মোটেই না। নৃত্য হচ্ছে শারীরিক, নাটক মনস্তাত্ত্বিক। মানুষ নৃত্য করুক রাষ্ট্র এতে আপত্তি করবে না, কিন্তু মানুষ নাটকের মাধ্যমে প্রচলিতকে চ্যালেঞ্জ করতে শিখুক রাষ্ট্র এটা চাইতে পারে না। আমাদের এই গরীব রাষ্ট্র ১০০ কোটি টাকা খরচ করেছে সাফ গেমসে, এর অর্ধেকও কি খরচ করবে নাটকের প্রয়োজনে? ভাবা যায়?
প্লেটোর ছাত্র এ্যারিস্টটলও মোটেই গণতান্ত্রিক ছিল না, তিনি জনগণের শাসন চান নি, শাসন চেয়েছেন কতিপয়ের। কিন্তু তিনি প্লেটোর তুলনায় কম আকাশচারী, এবং অধিক বাস্তববাদী। তিনি জানতেন নিষিদ্ধ করে দিলেও নাটক থাকবে, কেননা মানুষের প্রাথমিক প্রবৃত্তিগুলোর একটি হচ্ছে অনুকরণ, আর সেই অনুকরণের ভেতর থেকেই নাটকের অভ্যুদয়। তার চেয়ে ভালো নাটককে কাজে লাগানো। কাব্যতত্ত্বের বইতে তিনি এই কাজে লাগানোর তত্ত্বটিই প্রচার করেছেন। ট্র্যাজেডি নিয়েই তাঁর আলোচনা। ট্র্যাজেডি দেখে মানুষ সুস্থ হবে, তার ভেতরে যে করুণা ও ভীতি আছে তার বিমোচন ঘটবে, ঘটলে মানুষ তার মানসিক স্বাস্থ্যকে আরো সবল করতে পারবে। মনের স্বাস্থ্য নাগরিকদের জন্য খুবই জরুরি। ঝড়ের পরে আকাশের যে অবস্থা হয়, শান্ত ও নির্মল, ট্র্যাজেডির অভিনয় দেখার পর দর্শকের অবস্থাও হবে তেমন। রাষ্ট্রের স্বার্থে নাটককে ব্যবহার করবার এই ব্যবস্থাপত্র খুবই বাস্তববাদী, সন্দেহ কি। এ্যারিস্টটল তাঁর অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকেই রক্ষা করবেন গণতান্ত্রিক নাটক দিয়ে। কাঁটা দিয়েই তুলবেন কাঁটা। তিনি একজন কবি নন, যেমন প্লেটো ছিল; তিনি বৈজ্ঞানিক, বলা যায় চিকিৎসকই মূলত- রাষ্ট্রের।

প্রাচীন ভারতেও নাটক ছিল, কালিদাস যার শ্রেষ্ঠ রচয়িতা। কিন্তু সে-রাষ্ট্র গ্রীক রাষ্ট্র থেকে স্বতন্ত্র, তার নাটকও তাই সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের। রাষ্ট্রে গণতন্ত্র নেই, নাটকেও তার অভাব রয়েছে।
সংস্কৃত নাটকের আশেপাশে জনগণ ছিল না; এ নাটক সম্পূর্ণ অভিজাতদের জন্য রচিত। তাই এর ভাষা কৃত্রিম, কাহিনী বাস্তবতাবিমুখ। সংস্কৃত ভাষা কারো মুখের ভাষা ছিল না, ছিল রাজদরবারের ভাষা, গ্রীক থেকে যেখানে সে স্বতন্ত্র। নাটকের সংলাপ ছিল ওই কৃত্রিমতার মধ্যেও কৃত্রিম। ফলে সে নাটক কখনো প্রাণবন্ত হয় নি। জনগণের উপস্থিতি গ্রীক নাটকের উষ্ণ প্রাণস্পন্দন এনে দিয়েছে, সংস্কৃত নাটকে তেমন কিছু ঘটে নি। এথেন্সে জনগণের জন্য খোলা মঞ্চ ছিল, প্রাচীন ভারতে তেমন কিছু ছিল না, সেখানে নাটক হতো অভিজাতদের দরবারে। নাট্যকারকে স্তুতি গাইতে হতো পৃষ্ঠপোষকের, কালিদাসকে পর্যন্ত যা গাইতে হয়েছে; গ্রীক নাটকে এ ছিল অকল্পনীয়।
বড় কথা, সংস্কৃত নাটকে ট্র্যাজেডি নেই। ট্র্যাজেডি হচ্ছে মহত্তম নাটক, যে সাহিত্যে ট্র্যাজেডি নেই তাকে অবশ্যই দুর্বল বলতে হবে নাট্যবিচারে। নেই কেন? নেই রাজনৈতিক কারণে। রাষ্ট্রের যারা হর্তাকর্তা-বিধাতা, তারা কর্মে আগ্রহী ছিল না; আর নাটক হচ্ছে কর্মের ব্যাপার; শাসকরা বিশ্বাস করতেন ধর্ম, অর্থ ও কামে। এই তিন বিশ্বাসে বিশ্বাসী যারা তারা নাটকীয় দুর্ভোগ কেন দেখতে চাইবে? ধর্ম বলছে সৎ যে সে পুরস্কার পাবে, অসৎ পাবে শাস্তি, অথচ ট্র্যাজেডি দেখাচ্ছে সৎ মানুষের দুর্ভোগ। অর্থে যারা আস্থা রাখে তারা মুনাফা চায়। ট্র্যাজেডি মুনাফার কথা বলে না, বলে দুর্ভোগের কথা। আর যারা ভোগবাদী, উন্মুখ যারা কামচর্চায়, তারা তো করুণা ও ভীতির মঞ্চায়ন দেখতেই চাইবে না; তারা চাইবে কামানুপ্রেরণা। বিয়োগান্ত নাটকের পক্ষে তাই কোনো সুযোগই ছিল না বিকশিত হবার।
কৌতুকের ব্যাপার এটা যে, কৌতুকও সুযোগ পায় নি প্রাচীন ভারতে। আসলে দেখা যায় ট্র্যাজেডিকে যারা ভয় পায় না, তারাই কমেডি লিখতে পারে। দৃষ্টান্ত প্রাচীন এথেন্স, দৃষ্টান্ত এলিজাবেথীয় ইংল্যান্ড। এথেন্সে দেখি একদিকে যেমন আছে ট্র্যাজেডির কবি ইসকিলাস, সফোক্লিস ও ইউরিপিডি, অন্যদিকে তেমনি, পাশাপাশি রয়েছেন কমেডির রচয়িতা এ্যারিস্ট্রোফিনিস। জীবন একই, অখণ্ড, তার পূর্ণতাই দুদিক দিয়ে প্রকাশিত- একদিকে ট্র্যাজেডি, অন্যদিকে কমেডি। যারা ট্র্যাজেডিকেই ভয় পায় না, তারা কি ভয় পাবে কমেডিকে? প্রশ্নই ওঠে না। একই ঘটনা দেখি আমরা শেক্‌সপীয়রের ক্ষেত্রে, ট্র্যাজেডি লিখেছেন, কমেডিও লিখছেন, পাশাপাশি। দেখি তাঁর ইংল্যান্ডে, যেমন ট্র্যাজেডি পাওয়া যাচ্ছে, তেমনি পাওয়া যাচ্ছে কমেডি।
সংস্কৃত সাহিত্যে সেটা নেই। তারা ট্র্যাজেডিকে অপছন্দ করে, কৌতুককেও পছন্দ করে না। কৌতুক প্রাণের লক্ষণ, সংস্কৃত নাটকে সেই প্রাণটা নেই। ‘শকুন্তলা’র মতো নাটককেও বিয়োগান্ত করা যায় নি, যদিও তার ঘটনাপ্রবাহ বিয়োগান্তই। সেটা যেমন সংস্কৃত নাটকের দুর্বলতা, কৌতুকের অভাবও তেমনি আরেক দুর্বলতা।
বলা যায় বৈশিষ্ট্যও। আর এই বৈশিষ্ট্য এসেছে রাষ্ট্রের চরিত্র থেকে। রাষ্ট্র ছিল অগণতান্ত্রিক, অগণতান্ত্রিক রাষ্ট্র নাটককে সাহায্য করে নি। ঠিক কাজই করেছে, অন্য রকমের কাজ করলে সেটাই বরঞ্চ অস্বাভাবিক হতো। উৎকৃষ্ট সভ্যতা উৎকৃষ্ট নাট্যধারা সৃষ্টি করতে পারলো না, জনবিমুখতার কারণেই, প্রধানত।

তাহলে এলিজাবেথীয় যুগে নাটকের যে বিকাশ তার ব্যাখ্যা কি? রাষ্ট্র কি তখন গণতান্ত্রিক ছিল? না তা ছিল না। তবে কিভাবে সম্ভব হলো মার্লো-শেক্‌সপীয়র-বেন জনসন-ডেকার-ওয়েবস্টারের পক্ষে নাট্য রচনা?
হ্যাঁ, রাষ্ট্র গণতান্ত্রিক ছিল না ঠিকই, কিন্তু তবু একদিকে রেনেসাঁন্স অন্যদিকে জাগতিক সাফল্য, এই দুয়ের মিলিত ফলশ্রুতিতে রাষ্ট্রের এক ধরনের প্রাণবন্ততা এসেছিল যা নাটককে সাহায্য করলো। রেনেসাঁসের ফলে মানুষ হয়েছে ইহজাগতিক, মানুষের ভেতরে যে রয়েছে অপার রহস্য ও বিপুল সম্ভাবনা এই জ্ঞান লাভ হয়েছে তার, গ্রীক ও ল্যাটিন সাহিত্য তার করায়ত্ত, চোখে-মুখে নবপ্রভাতের দীপ্তি। ওদিকে আবার অপরাজেয় বলে কথিত স্পেনের নৌবহরকে দিয়েছে সে হারিয়ে, তার জলদস্যুরা ছড়িয়ে পড়েছে সর্বত্র, লুণ্ঠন করে আনছে ধনসম্পদ, উপনিবেশ স্থাপন করছে মানুষ আমেরিকায় গিয়ে। পুঁজির আদিম সঞ্চায়নের ব্যাপক তৎপরতা তখন সর্বত্র। এই যে জীবনের সমৃদ্ধি এটাই প্রকাশ পেলো নাটকে। ট্র্যাজেডিকে ভয় নেই, কমেডিকেও নয়। দ্বন্দ্ব অপছন্দের নয় লোকের। রাণী এলিজাবেথ চিরকুমারী; তাঁর রাজত্ব স্বর্ণযুগ ইংল্যান্ডের, নিজে তিনি নাটক দেখতে পছন্দ করেন। সবই নাট্যচর্চার অনুকূলে যায়।
সেকালে মধ্যবিত্ত ছিল না। নাটকের জন্য সেও এক বড় সুবিধা। ছিল অভিজাত ও সাধারণ মানুষ, তারা উভয়েই নাটক দেখতে পছন্দ করতো। শ্রেণিতে মধ্যবিত্ত না হয়েও অভীপ্সায় মধ্যবিত্ত শিরোমণি প্লেটো আদর্শ রাষ্ট্র নির্মাণের ব্যাপারে যে পরামর্শ দিয়েছিল সেটা মধ্যবিত্তের পক্ষেই দেওয়া সম্ভব, উদ্ভাবনায় এমন স্থির অভিনিবেশ অন্য শ্রেণির মানুষের পক্ষে লাভ করা কষ্টকর।
মধ্যবিত্তের প্রতিনিধি ক্রমওয়েল যখন রাষ্ট্র ক্ষমতায় এলেন তখন তিনি সেই কাজটিই করলেন যা প্লেটো করতে চেয়েছিল। নিষিদ্ধ করে দিলেন নাট্যচর্চা। প্লেটো ছিল দার্শনিক, ক্রমওয়েল সৈনিক, কিন্তু এক হয়ে গেলেন তাঁরা নাটকের প্রতি বিরূপতায়। বক্রাঘাত এখানেও যে, যে-ক্রমওয়েল ইংল্যান্ডে রাজতন্ত্রের উচ্ছেদ করে গণতান্ত্রিক বুর্জোয়া বিপ্লবের পথ পরিষ্কার করছিল তিনিই আবার গণতান্ত্রিক শিল্পচর্চা নাটককে নিষিদ্ধ করে দিলেন। প্রকৃত গণতন্ত্রী হওয়া সহজ নয়, আসলেই। স্মরণীয় এটাও যে ক্রমওয়েলের রাষ্ট্রে পুস্তক প্রকাশনার ওপরেও নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছিল। নাটক নিষিদ্ধকরণ ও পুস্তক প্রকাশের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা একই অগণতান্ত্রিকতার দ্বিবিধ প্রকাশ বটে।
এলিজাবেথের সময়ে নাটকের অত্যুৎকৃষ্ট বিকাশ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু নাট্যব্যক্তিত্বদের যে বিশেষ সম্মান ছিল তা কিন্তু নয়। রাষ্ট্র সে-সম্মান তাঁদের দেয় নি। যে জন্য দেখি শেক্‌সপীয়র অসামান্য সব নাটক লিখছেন বটে, তবু তার ইচ্ছেটা থাকছে ভদ্রলোক হওয়ার, যার তাড়নায় তিনি পর্যাপ্ত অর্থ সঞ্চয় করার পর লন্ডনের নাট্যজগৎ ছেড়ে দিয়ে নিজের ছোট শহরে ফিরে এলেন, এবং নতুন বাড়ি কিনে ‘ভদ্র’ জীবনযাপন শুরু করলেন। সেকালে নাটকে লোকদেরকে ভবঘুরে ও ভিক্ষুকের পর্যায়েই গণ্য করা হতো, সামাজিকভাবে। রাষ্ট্র এগিয়ে আসে নি তাদেরকে সাহায্য করতে।
তবে নাটকের যে কি প্রচণ্ড শক্তি রাষ্ট্রের চরিত্র উন্মোচনে শেক্‌সপীয়র তা দেখিয়েছেন তার নাটকে। ‘হ্যামলেট’-এর কথাই ধরা যাক না কেন; সে নাটক দেখিয়ে দিচ্ছে ডেনমার্কে রাষ্ট্রযন্ত্র কোন অধঃপতনের শেষ প্রান্তে গিয়ে পৌঁছেছে। সেখানে হ্যামলেটের মতো আদর্শবাদী, জনপ্রিয় ও বহুমুখী প্রবণতাসম্পন্ন একজন মানুষের জন্য অসহায়ভাবে ছোটাছুটি এবং শেষ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করা ছাড়া উপায় নেই। নিরীহ ওফেলিয়া সেখানে আত্মহত্যা করে। ভাই সেখানে ভাইকে খুন করে, সিংহাসনের লোভে; এবং বিবাহ করে ভ্রাতৃপত্নীকে সিংহাসনে আরোহণ করার সময়ে। বন্ধু বিশ্বাসঘাতকতা করে বন্ধুর সঙ্গে, রাষ্ট্রের প্ররোচনায়। পিতা বিশ্বাস করে না পুত্রকে, পুত্রের শ্রদ্ধা নেই মাতার প্রতি। মূল কারণ রাষ্ট্র। রাষ্ট্রের অমানবিক স্বভাবকে শেক্‌সপীয়র ধরিয়ে দিলেন এই নাটকে; অন্য নাটকেও। “কিং লীয়র”, “রিচার্ড দি সেকেন্ড”, “জুলিয়াস সিজার”, “ম্যাকবেথ”, “ওথেলো”, “করিওলেনাস”, “ট্রয়লাস অ্যান্ড ক্রেসিডা”, কোনটিকে বাদ দিয়ে কোনটির কথা বলবো এবং কোন নাটকে রাষ্ট্রকে পাবো না মনুষ্যত্ববিরোধী প্রতিষ্ঠান রূপে?
রাষ্ট্র যে নাটককে বিশ্বাস করবে সেটা কোন ভরসায়? ‘হ্যামলেট’ নাটকে কি ঘটলো শেষ পর্যন্ত? নাটকের ভেতরে যে-নাটকের মঞ্চায়ন করছিল যুবরাজ হ্যামলেট তাতে ভ্রাতৃঘাতক রাজা ক্লডিয়াস দেখতে পেলেন নিজের ছবি, এবং হ্যামলেটও জানলেন নিশ্চিতরূপে যে তিনি যা ইতিপূর্বেই জেনেছেন সেটা মিথ্যে নয়। রাজা খুনী বটে। এই যে ধরিয়ে দেওয়া, বলে দেওয়া সত্য কোনটি- এ কাজ নাটক করতে পারে। শাসকশ্রেণির জন্য নাটক তাই বিপজ্জনক বটে।
নাটক রাষ্ট্রকে চিহ্নিত করে দেয় ব্যক্তির শত্রু হিসেবে। ‘ম্যাকবেথ’ নাটকের কথা ধরা যাক বৃদ্ধ নৃপতি ডানকানকে হত্যা করে রাজা হয়েছেন ম্যাকবেথ। কেন হতে গেলেন? কারণ হচ্ছে উচ্চাশা। হাতের কাছে সিংহাসন। একে ছাড়া যায় কি ভাবে? রাষ্ট্র ডাকছে তাকে মালিক হতে। ম্যাকবেথ সাড়া দিয়েছেন। তারপর একটির পর একটি হত্যাকাণ্ড। পরিণামে নিজের মৃত্যু। রাষ্ট্র শত্রুতা করে মানুষের সঙ্গে, দেখি তা “জুলিয়াস সীজার”, “এ্যান্টনি অ্যান্ড ক্লিওপেট্রা”তে, দেখি “ট্রয়নাস অ্যান্ড ক্রেসিডা”তে।
কিং লীয়ারের যে ট্র্যাজেডি সে রাজার নয়, বৃদ্ধ পিতার। কিন্তু ওই ট্র্যাজেডির মূলে রয়েছে তাঁর রাজত্ব। রাজ্য ছাড়লেন, কিন্তু কর্তৃত্ব ছাড়তে চাইলেন না; ফলে অনিবার্য হলো দুর্ভোগ। কনিষ্ঠ কন্যা কর্ডেলিয়াকে এবং অনুগত কেন্টকে তিনি নির্বাসনে পাঠিয়েছিল, ক্রোধে এবং অন্ধত্বে। রাজারা ক্রুদ্ধ হয় যখন তখন অন্ধ থাকে প্রায়শ। ওথেলোও অন্ধ হয়েছিল ডেসডমোনার পাপের বিষয়ে রাষ্ট্রীয় লোকদের কারণে।
দ্বন্দ্ব ছাড়া নাটক নেই। আর দ্বন্দ্ব থাকলেই দু’পক্ষ থাকবে। এবং এটা মোটেই অস্বাভাবিক নয় যে, একভাবে না একভাবে রাষ্ট্র জড়িয়ে যাবে সেই দ্বন্দ্বে। যেমন ধরা যাক, ইবসেনের নাটক ‘পুতুলের ঘর’-এ। সেখানে দ্বন্দ্বটা ব্যক্তিগত, বড় জোর পারিবারিক। নোরা সামান্য গৃহবধূ মাত্র। কিন্তু নোরাও তো বিশেষ রাষ্ট্রব্যবস্থার মানুষ। যে-ব্যবস্থার বাইরে সে যেতে পারে না, যার ভেতর আটকা পড়েই তার জীবনকে চিনতে পারে খেলাধুলা হিসেবে। তার গৃহ যেন রাষ্ট্রের ছবি।
ওদিকে বার্নার্ড শ’র নাটকে সেন্ট জোনকে দেখি সারাক্ষণ রাষ্ট্রের হাতে বন্দী হিসেবে। ফরাসী রাজপুরুষেরা ইংরেজদের হাতে তুলে দেয় তাকে, কেননা দেশপ্রেমিক সেই কৃষক কন্যা দেশকে মুক্ত করেছে বটে, কিন্তু চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বসেছে রাজতন্ত্রকে। রাজতন্ত্র রক্ষার ক্ষেত্রে ফরাসী ও ইংরেজ যুদ্ধে লিপ্ত দুই প্রতিপক্ষ এক হয়েছে। একালে নাট্যকার ব্রেখট দেখাচ্ছেন নাগরিকদের জীবনে রাষ্ট্র কতো শক্তিশালী। বিজ্ঞানী গ্যালিলিওর যে অধঃপতন মর্ম-পীড়ার কারণ হয় দর্শকদের ও পাঠকের, তার কারণ রাষ্ট্রের চরিত্র ও শক্তি।
গণতান্ত্রিক গ্রীসে রাষ্ট্র কি করে জড়িত করতো ব্যক্তিকে তার ছবি দেখছি আমরা ইডিপাস, এ্যাগামেমন, এ্যান্টিগোনি, ইলেকট্রাদের নিয়ে লেখা নাটকে।

যে ইংরেজ সেই এলিজাবেথীয় যুগে নাটক উপভোগ করেছে তারাই দেখা গেল ঊনবিংশ শতাব্দীর বাংলায় ভিন্ন ব্যবহার করছে। পছন্দ করছে না বাঙালিরা নাটক করুক। তারা একটি অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আদেশ জারি করে দিয়েছে। যার মূল ব্যাপারটা হলো এই যে, অভিনয়ের আগে নাটকটিকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাস করিয়ে নিয়ে যেতে হবে। এর কারণ ইংরেজ এখানে রাষ্ট্রক্ষমতায় রয়েছে, ব্যক্তি ইংরেজ নাটক পছন্দ করে, নাটক দেখে, বাংলায় এসেও তারা যে নিজেদের ক্লাবে নাট্যাভিনয় করতো তার প্রমাণ রয়েছে; কিন্তু স্থানীয়রা নাটক করবে এতে তার উৎসাহ নেই, বরঞ্চ অবিশ্বাস রয়েছে। রাষ্ট্রের সেই পুরাতন অবিশ্বাস নাটকের প্রতি। যেটা খুবই স্বাভাবিক।
হাতেনাতে প্রমাণও ছিল। বাংলায় সাধারণ রঙ্গমঞ্চের প্রতিষ্ঠা ঘটে ১৮৭২ সালে; আর সেই রঙ্গমঞ্চে প্রথম যে নাটকটি অভিনীত হয় সেটি হলো দীনবন্ধু মিত্রের “নীলদর্পণ”, যে-নাটক স্পষ্টতঃই ইংরেজ-বিরোধী। দীনবন্ধু মিত্রের ওই নাটক পরে ইংরেজীতে অনূদিত হয়। অনুবাদ করেছিল মাইকেল মধুসূদন দত্ত, প্রকাশ করেছিল পাদ্রী লং সাহেব। অনুবাদক তখন হাইকোর্টে চাকরী করতেন, রাষ্ট্র তাঁর কাজটি পছন্দ করেনি, যে জন্য তাঁর অসুবিধা হয়েছিল চাকরিতে। পাদ্রী লং তো মামলাতেই জড়িয়ে পড়েন।
ইংরেজ চলে গেছে। কিন্তু ইংরেজ-প্রবর্তিত ওই অভিনয় নিয়ন্ত্রণ আইন রয়ে গেছে। এ প্রায় অবিশ্বাস্য ব্যাপার। কিন্তু আছে যে সেটা তো সত্য এবং আছে যেহেতু তার নিশ্চয়ই কারণও রয়েছে ভেতরে। সেটি এই যে, রাষ্ট্র বদলেছে ঠিকই, কিন্তু চার চরিত্র বদলায় নি।
আমাদের দেশে এরশাদের স্বৈরশাসন নাটককে ক্ষতিগ্রস্ত করে গেছে আরেকভাবে। তার শাসনের বিরোধিতা করতে গিয়ে নাটককে হতে হয়েছে উচ্চকণ্ঠ, যার ফলে নাটকের স্বাভাবিক ও শৈল্পিক কণ্ঠের ক্ষতি হয়েছে বৈকি। স্বৈরাচার যদি নাটক বিষয়ে উদাসীন থাকে তবে সে যে ক্ষতিকর হয়- সে সত্য এক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে বেশ কৌতুককর ভাবে। আর যদি উদাসীন না হয় তাহলে ব্যাপার ভয়ঙ্কর- নাটক যাবে নিষিদ্ধ হয়ে।

x