যুবনায়ক স্বামী বিবেকানন্দ স্মরণে

ড. উজ্জ্বল কুমার দেব

শনিবার , ১২ জানুয়ারি, ২০১৯ at ৪:৩৮ পূর্বাহ্ণ
68

নোবেল বিজয়ী ফরাসী উপন্যাসিক রোম্যাঁ রোলাঁ স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে মজা করে লিখেছিলেন, বিবেকানন্দ দারুণ ব্যাধিতে ভুগছিলেন- ঐ ব্যাধি ছিল শক্তির আধিক্য। তাঁর ভিতর দিবারাত্র দাউ দাউ করে জ্বলছিল দুনিয়াকে আমুল বদলে দেবার জ্বালাময়ী ঐশীশক্তি। আর তিনি ছিলেন আত্মশক্তিতে ভরপুর একজন যুবক। আজ ১২ জানুয়ারি, এ যুবনায়কের জন্মদিন। আজ হতে প্রায় ১৫৫ বছর আগে ১৮৬৩ সালের ১২ জানুয়ারি এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে বিবেকানন্দের জন্ম হয়। বিবেকানন্দের আসল নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। সন্ন্যাস গ্রহণ করার পরেই তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর কাছে বিবেকানন্দ নামে পরিচিত হন। ছোট বেলা থেকেই তিনি অত্যন্ত মেধাবী ছাত্র ছিলেন। প্রেসিডেন্সি কলেজে পড়াকালীন সময়ে সাহিত্য, দর্শন, ইতিহাস, সমাজ বিজ্ঞান, পাশ্চাত্য সাহিত্য,পাশ্চাত্য দর্শন এবং ইউরোপিয়ান ইতিহাস সহ প্রায় সব বিষয়েই তাঁর সমান আগ্রহ ছিল। পাশাপাশি হিন্দু ধর্ম তথা হিন্দু পুরাণ-বেদ, উপনিষদ, ভাগবত গীতা, রামায়ণ, মহাভারত ইত্যাদি ও তাঁর আকর্ষণের বিষয়বস্তু ছিল। তিনি শিক্ষা এবং আধ্যাত্মিকতা এই দুইয়ের মেলবন্ধনে বড় হয়ে উঠছিলেন। কিন্তু তার মনে এক সময় ঈশ্বরের স্বরূপ নিয়ে দ্বন্দ্ব শুরু হয় যখন তিনি কেশব চন্দ্র সেনের ব্রাহ্ম সমাজের সংস্পর্শে আসেন। পরবর্তীতে সবাইকে ক্রমাগত প্রায় একই প্রশ্ন করতেন- মশাই আপনি কি ঈশ্বরকে দেখেছেন? কিন্তু সেখানেও তিনি তার মনকে শান্ত করতে পারলেন না। কোন জায়গায় সদুত্তর না পেয়ে তিনি দক্ষিণেশ্বরে ঠাকুর রামকৃষ্ণের সংস্পর্শে আসেন এবং সরাসরি জিজ্ঞেস করেন যে তিনি ভগবানকে দেখেছেন কিনা। এই প্রশ্নের উত্তরে ঠাকুর রামকৃষ্ণ বলেন যেমন ভাবে তিনি তার সামনে বিবেকানন্দকে দেখছেন তেমন ভাবেই তিনি ভগবানকেও দেখেছেন। এই উত্তর পেয়ে তিনি শান্ত হন এবং রামকৃষ্ণ দেব -এর সান্নিধ্যে আসেন। এরপর থেকে আমরা এক অন্য বিবেকানন্দকে পাই কারণ রামকৃষ্ণ পরমহংসদেব বিবেকানন্দকে দীক্ষার সাথে সাথে মানবতার শিক্ষাও দিয়েছিলেন।১৮৮৬ সালে তিনি পায়ে হেঁটে সমগ্র দেশ ভ্রমণ শুরু করেন। উদ্দেশ্য মাতৃভূমি সম্পর্কে বিশদভাবে জানা। এই সময় স্বামীজি তৎকালীন সমগ্র ভারতবর্ষের সমাজ,ধর্ম, রীতিনীতির সংস্পর্শে আসেন। আমেরিকার শিকাগো ধর্মসভার কথা এই সময়েই তিনি জানতে পারেন। ১৮৯৩ সালে তিনি শিকাগো ধর্মসভায় যোগদান করার উদ্দেশ্য রওনা হন। হাজার বাধার সম্মুখীন হয়েও তিনি এই সভায় যোগদান করেন এবং ভারতবর্ষের সাহিত্য সংস্কৃতি এবং ধর্মকে পৃথিবীর সামনে তুলে ধরেন। আমেরিকার বিভিন্ন প্রান্তে তিনি সনাতন ধর্মের উদারতা, আধ্যাত্মিকতা, পরমত সহিষ্ণুতা প্রচার করে অনেক ফলোয়ার তৈরি করেন। পরবর্তীতে ১৮৯৪ সালে তিনি নিউইয়র্কে বেদান্ত সোসাইটি অফ নিউইয়র্ক প্রতিষ্ঠা করেন। এরপর তিনি দেশে ফিরে আসেন এবং ১৮৯৭ সালে রামকৃষ্ণ মিশন প্রতিষ্ঠা করেন। ১৯০২ সালের ৪ই জুলাই মাত্র ঊনচল্লিশ বছর বয়সে তিনি দেহত্যাগ করেন। বিবেকানন্দ সারা জীবন ধরে শুধু মানবধর্মের উন্নতি ও উত্তরণের জন্য কাজ করেছেন। মানুষের সেবা করা তাঁর মূল ধর্ম ছিল। তিনি বার বার বলেছেন “আমি সেই ভগবানের পূজা করি, যাকে তোমরা ভুল করে মানুষ বলে ডাকো”। তিনি আরও বলেছেন, যে ধর্ম বা যে ঈশ্বর বিধবার অশ্রুমোচন করিতে পারে না অথবা অনাথ শিশুর মুখে একমুঠো খাবার দিতে পারে না, আমি সে ধর্মে বা সে ঈশ্বরে বিশ্বাস করি না। যত উচ্চ মতবাদ হউক, যত সুবিন্যস্ত দার্শনিক তত্ত্বই উহাতে থাকুক, যতক্ষণ উহা মত বা পুস্তকেই আবদ্ধ, ততক্ষণ উহাকে আমি ধর্ম নাম দিই না। চক্ষু আমাদের পৃষ্ঠের দিকে নয়, সামনের দিকে-অতএব সম্মুখে অগ্রসর হও, আর যে ধর্মকে তোমরা নিজের ধর্ম বলিয়া গৌরব কর, তাহার উপদেশগুলো কার্যে পরিণত কর-ঈশ্বর তোমাদিগের সাহায্য করুন। তার জ্ঞানের কোনো সীমা ছিলো না। তিনি ধর্মের ভেদাভেদ মানতেন না। তিনি মুক্ত চিন্তাধারার মানুষ ছিলেন এবং জীব সেবার মধ্যে দিয়েই তিনি ঈশ্বরের সান্নিধ্য লাভের চেষ্টা করেছিলেন। তিনি বলতেন, জীব হচ্ছে স্বয়ং শিব। স্বামী বিবেকানন্দ রচিত ‘সখার প্রতি’ কবিতাটি ছিল একটি জীবন্ত বেদ। এ কবিতায় তিনি লিখেছেন- “ব্রহ্ম হ’তে কীট-পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়,/ মন প্রাণ শরীর অর্পণ কর সখে, এ সবার পায়। বহুরূপে সম্মুখে তোমার, ছাড়ি কোথা খুঁজিছ ঈশ্বর?/ জীবে প্রেম করে যেই জন, সেই জন সেবিছে ঈশ্বর।” স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর গুরু শ্রীরামকৃষ্ণ থেকে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা পেয়েছিলেন, তা হলো ‘যত মত তত পথ’। তিনি বলতেন কোন ধর্মের সহিত আমাদের বিবাদ নাই। আমাদের প্রত্যেকেরই ইষ্ট ভিন্ন। কিন্তু যখন দেখি-কেহ এসে বলে, ‘ইহাই একমাত্র পথ’ এবং জোর করে আমাদিগকে ঐ মতাবলম্বী করতে চায়, তখন আমরা তাদের কথা শুনে হেসে থাকি। যারা ঈশ্বরলাভের উদ্দেশ্যে ভিন্নপথাবলম্বী ভ্রাতাদের বিনাশ-সাধন করিতে ইচ্ছুক, তাহাদের মুখে প্রেমের কথা বড়ই অসঙ্গত ও অশোভন। তাদের প্রেমের বিশেষ কিছু মূল্য নাই। অপরে অন্য পথের অনুসরণ করিতেছে, ইহা যে সহ্য করিতে পারে না, সে আবার প্রেমের কথা বলে! ইহাই যদি প্রেম হয়, তবে দ্বেষ বলিব কাকে? খ্রিস্ট বুদ্ধ বা মুহাম্মদ জগতের যে-কোন অবতারেরই উপাসনা করুক না, কোন ধর্মাবলম্বীর সহিত আমাদের বিবাদ নাই। কোন্‌ খাদ্য আমার শরীরের জন্য উপযোগী, তা আমার নিজ অভিজ্ঞতা হতে আমিই বুঝতে পারি, কোটি কোটি ডাক্তার সে-সম্বন্ধে আমাকে কিছু শিক্ষা দিতে পারে না। এইরূপ কোন্‌ পথ আমার উপযোগী হবে, তা আমার অভিজ্ঞতা হতে আমিই ঠিক বুঝিতে পারি ইহাই ইষ্টনিষ্ঠা। এই কারণেই আমরা বলে থাকি যে, যদি কোন মন্দিরে গিয়ে অথবা কোন প্রতীক বা প্রতিমার সাহায্যে তুমি তোমার অন্তরে অবস্থিত ভগবানকে উপলব্ধি করিতে পার, তবে তাই কর; প্রয়োজন হয় দুই শত প্রতিমা গড় না কেন? যদি কোন বিশেষ অনুষ্ঠানের দ্বারা তোমার ঈশ্বর-উপলব্ধির সাহায্য হয়, তবে শীঘ্র ঐ সকল অনুষ্ঠান অবলম্বন কর। যে-কোন ক্রিয়া বা অনুষ্ঠান তোমাকে ভগবানের নিকট নিয়ে যায়, তাই অবলম্বন কর; যদি কোন মন্দিরে গেলে তোমার ঈশ্বরলাভের সহায়তা হয়, সেখানে গিয়েই উপাসনা কর। কিন্তু বিভিন্ন পথ নিয়ে বিবাদ করিও না। যে-মুহূর্তে তুমি বিবাদ করো, সেই মুহূর্তে তুমি ধর্ম পথ হইতে ভ্রষ্ট হয়েছো তুমি সম্মুখে অগ্রসর না হয়ে পিছু হটছো, ক্রমশ পশুস্তরে উপনীত হচ্ছো।” ১৮৯৩ এ শিকাগো ধর্ম মহাসম্মেলনে সর্বধর্মের প্রতিনিধিদের প্রতি তাঁর সাহসী উচ্চারণ ছিল- “বিবাদ নয়,সহায়তা; বিনাশ নয়,পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়,সমন্বয় ও শান্তি।”স্বামী বিবেকানন্দ ছিলেন আত্মবিশ্বাসে বলীয়ান, ঐশীশক্তিতে ভরপুর একজন বীর। যুবকদের আত্মবিশ্বাসী হওয়ার উপর তিনি যথেষ্ট জোর দিয়েছিলেন। তিনি বিশ্বাস করতেন যুবশক্তি চাইলে সবকিছু ভেঙে নতুন করে গড়তে পারে। তিনি যুবকদের উদ্দেশ্য বলেছেন, “কখনও ভাবিও না, আত্মার পক্ষে কিছু অসম্ভব। এরূপ বলা ভয়ানক নাস্তিকতা। যদি পাপ বলিয়া কিছু থাকে, তবে ‘আমি দুর্বল’ বা ‘ওরা দুর্বল’-এরূপ বলাই একমাত্র পাপ। তুমি যাহা চিন্তা করিবে, তাহাই হইয়া যাইবে। যদি তুমি নিজেকে দুর্বল ভাব, তবে দুর্বল হইবে। তেজস্বী চিন্তা করিলে তেজস্বী হইবে।” চিন্তার শক্তি হইতেই সর্বাপেক্ষা বেশী শক্তি পাওয়া যায়। চিন্তার নীরব শক্তি দূরের মানুষকেও প্রভাবিত করে। তিনি আত্মবিশ্বাসী একদল যুবকের প্রত্যাশা করতেন সর্বদাই। তাঁর ভাষায় “আমি চাই একদল বাঙালি যুবক; এরাই দেশের আশাভরসা-স্থল। চরিত্রবান, বুদ্ধিমান পরার্থে সর্বত্যাগী এবং আজ্ঞানুবর্তী যুবকগণের উপরই আমার ভবিষ্যৎ ভরসা-আমার ভাবগুলি যারা কাজে পরিণত করে নিজেদের ও দেশের কল্যাণ-সাধনে জীবনপাত করতে পারবে”। তিনি পৃথিবীর সকল মানুষের মুক্তির মধ্যে দিয়ে নিজের মুক্তির কথা ভাবতেন। যুবকদের প্রতি নিজে জেগে অপরকে জাগ্রত করার কথা বলতেন। অনেকেই আজকাল হিন্দুধর্ম সম্পর্কে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ জ্ঞান বিবেকানন্দের রচনা থেকেই আহরণ করেন। উনি ছিলেন পথ দ্রষ্টা, উনি আজ পুরো বিশ্বের কাছে পথ প্রদর্শক, উনি সকলের গুরু, সকলের প্রভু, ওনার ভাবাদর্শে চলতে শিখতে চায় যুবসমাজ। আজকের এই দিনে এ মহান যুবনায়কের প্রতি রইল শ্রদ্ধাঞ্জলি।
লেখক : অধ্যাপক, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়

x