যুদ্ধ দিনের ঈদ

আ.ফ.ম. মোদাচ্ছের আলী

বুধবার , ১৩ জুন, ২০১৮ at ৬:৪৯ পূর্বাহ্ণ
106

সারারাত ঘুম হয়নি মিতুর। কেমন কেমন জানি লাগছে। গত বছর এই রকম লাগেনি কেন? উত্তর ও মিতু মনে মনে বলে ফেলে। গত বছর তো যুদ্ধ ছিল না। ঈদের আগের রাতে বাবা মায়ের পাশে বসে ওদের শহরের টিনের চালের রান্নাঘরে রান্না দেখতে দেখতে গল্প করেছেন। মিতু বাবার কোলে বসে থেকেছে। বাবা তাঁর মাথার চুলগুলো নেড়েচেড়ে দিচ্ছিলেন। কিন্তু এক বছর যেতে না যেতেই পুরো ওলট পালট। ওরা গ্রামের বাড়িতে এসেছে তিন মাস হল। স্কুল খোলা । তবুও মা দাদার বাড়ি বরলিয়াতে চলে এসেছেন। বাবা এপ্রিল এর পর থেকে আর বাসায় আসেনা। মাকে জিজ্ঞেস করলে বলেন অফিসের কাজে বাইরে গেছেন। কিন্তু গ্রামে এসে মিতু বুঝতে পারে অনেক কিছু। বুঝতে পারে দেশে কিছু একটা হচ্ছে। সেটির নাম যুদ্ধ। ছয় বছর বয়স হলেও দাদাদাদির দীর্ঘশ্বাস ‘ছেলেটা একি করল?’ মনে মনে দাদা খুশি। মায়ের বিষণ্ন মুখ। তার বুকটা কেঁপে কেঁপে উঠে। বাবা কোথায়? রাতে চুপি চুপি হারিকেনের আলো কমিয়ে সবাই রেডিও শুনে। সেখানে যুদ্ধের খবর শোনা যায়। মিতু ‘যুদ্ধ’ ‘স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র’ শব্দগুলো শিখে গেছে। কাল ঈদ। সবাই ঘুমিয়ে। হঠাৎ দরজায় ধাক্কা। হুড়মুড় করে বাড়ির সবাই ঘুম থেকে উঠে পড়ে। কদিন আগে মামার বাড়ির পাশের গ্রামে মিলিটারি এসে অনেক মানুষ মেরে ফেলেছিল। দাদা খুব নিচু গলায় জিজ্ঞেস করে, কে? ফিস ফিস উত্তর আসে দরজার ওপাশ থেকে, বাবা আমি নেছার। পড়িমড়ি করে দরজার ছিটকিনি ও কাঠের পাল্লাটি মা খুলে দেয়। অবাক হয়ে সবাই দেখে মুখে খোঁচা খোঁচা দাড়ি। কারো পরনে প্যান্ট, কারো পরনে লুঙ্গি, হাতে অস্ত্র নিয়ে পাচঁজন মানুষ। সামনে বাবা। বাবা ঢুকেই দাদাদাদিকে সালাম করে মিতুকে কোলে নেয়। অন্যরাও দাদাদাদিকে সালাম করে। বাবা দাদিকে বললাম একটু ডাল ভাত হবে? দুদিন ধরে কেউ ভাত খায়নি। দাদি চোখ মোছে। মা ঘরের সাথে লাগোয়া রান্নাঘরের দিকে দৌড় দেয়। মাটির পাত্র থেকে ডিম বের করে নেয়। রাতের ভাত ছিল অনেক। কেউ আজকাল ঠিকঠাক ভাত খায়না। ঈদের দিন শুধু সেমাই রান্না করার কথা। মাদাদি মিলে কেউ যেন বুঝতে না পারে সেভাবে ঘরে কেরোসিনের চুলায় ভাত বসায়। ডিম ভাজা হয়। ডাল রান্না করতে দেরি হবে তাই রাতে রান্না করা মাছের ঝোলের সাথে পানি মিশিয়ে ডালের পরিবর্তে গরম করা হয়। রান্না শেষ হলে বাবা সহ পাঁচজন মিলে গোল হয়ে মাটিতে বসে ডিম আর পানি মেশানো ঝোল দিয়ে মাথা নিচু করে গোগ্রাসে ভাত খেতে থাকে। যেন কত কাল খায়নি। মা দূরে দাঁড়িয়ে আছে। দাদি ওদের পাতে ঝোল তুলে দিচ্ছে। মিতু বাবাকে এভাবে খেতে কোনদিন দেখেনি।

দাদা পাঞ্জাবির বুক পকেট থেকে ঘড়ি বের করে সময় দেখেন। বলেন, ‘রাত দুইটার উপর বাজে। তরা কি করবি’? বাবা খাওয়া শেষ করে মায়ের দেয়া গামছা দিয়ে হাত মুছে অন্যদের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলেন ‘এখনি চলে যাব। কাল ঈদ। এ ঈদ আমাদের জন্য নয়। মৌলভী হাটের পাকিস্তানি ক্যাম্পে রাজাকাররা পাকিস্তানি মিলিটারিদের সাথে ঈদ করবে। আমরা অপারেশন করবো। বাবা মিতুকে নিয়ে মায়ের ঘরে চলে গেলেন। প্যান্টের পকেট থেকে পঞ্চাশ পইসার চারটি কয়েন বের করে মিতুর হাতে দিয়ে মাকে বললেন, ‘এই টাকা দিয়ে তোমরা লাল সবুজ কাপড় কিনে সেলাই মেশিনে সেলাই করে পতাকা তৈরি করে রাখবে। যেদিন দেশ স্বাধীন হবে সেদিন এই পতাকা আমরা এসে উড়াবো। তোমাদের জন্য এটাই আমার ঈদ উপহার’। এরপর বাবা হনহন করে রুম থেকে বের হলেন। পাঁচজন সবাই এক লাইনে দাঁড়িয়ে রাইফেল কাঁধে নিয়ে বাবা মাকে স্যালুট করেন। মৃদু অথচ দৃপ্ত কণ্ঠে মিলিত স্বরে বলেন, ‘জয় বাংলা’। দাদাও বলেন ‘জয় বাংলা’।

ঘড়ির কাঁটায় এখন জার্মানিতে রাত দুইটা। মিতুর চোখে জল। ক্লান্ত শরীরে ঘুমিয়ে পড়েছিল, আর ফিরে গিয়েছিল সাতচল্লিশ বছর আগের ঈদের রাতে।এখন সে দূর প্রবাসে থাকে। বাবা মাকে নিয়ে থাকে বাংলাদেশে। দাদাদাদি পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন বেশ অনেক বছর। মিতু ও তার স্বামী বাবামাকে জার্মানিতে নিয়ে আসতে চাইলেও বাবা আসেননি। বাবা উল্টো বলেন, ‘এই কাদামাটির সবুজ দেশই আমার ভাল লাগে। জাতীয় পতাকা দিয়ে এখানেই তোরা আমাকে শেষ বিদায় দিবি। কিছুক্ষণ পর মিতু স্কাইপেতে বাবামাকে ঈদ মোবারক জানানোর জন্য ল্যাপটপ হাতে নেয়। একাত্তর সালের ওই ঈদের রাতের মতো অবচেতন মনে বলে ওঠে, ‘জয় বাংলা’।

x