যুদ্ধ, গণহত্যা এবং সিস্টেম অফ এ ডাউনের হেডব্যাঙ্গিং

হাসনাত শোয়েব

মঙ্গলবার , ২০ নভেম্বর, ২০১৮ at ১০:৫৬ পূর্বাহ্ণ
129

I don’t like people in general. I think they’re stupid (Malakian : SOAD)
সারি-সারি লাশ। নাহ, ঠিক লাশ না। হাড়ের স্তূপ। একটা জনপদের বিশ লাখ মানুষের মধ্যে পনের লাখকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়েছে। আধুনিক রাষ্ট্রসংঘকে টেবিলে বসে গণহত্যার সংজ্ঞা তৈরি করতে হলো। বিশ্বযুদ্ধ চলাকালীন সময়ে এনলাইটেন্ট সভ্যতার শৈল্পিক গণহত্যা বলে কথা। হিটলার পূর্ববর্তী সময়ে সবচেয়ে অমানবিক গণহত্যা। প্রতিটি লাশ উড়ে গিয়ে দেয়ালজুড়ে গ্রাফিতি হয়ে যাচ্ছে। পুরো আর্মেনিয়া নিজেই যেন তখন গ্রাফিতি। লাশ আর রক্তের গ্রাফিতি। অটোমান সাম্রাজ্য তথা তুরস্ক নিজেদের আধুনিক বানানোর লক্ষ্যে পনের লাখ জীবন্ত প্রাণকে জীবাশ্ম বানিয়ে দিয়েছিল। সেই রক্তের দাগ এখনো আর্মেনিয়ানদের শরীর থেকে মুছে যায়নি। আর সেই দাগ থেকে সৃষ্টি হলো একটা চিৎকার ‘সিস্টেম অফ এ ডাউন’। সংক্ষেপে গণহত্যার ক্ষত থেকে অল্টারনেটিভ মেটাল অথবা হার্ডরক আইডিয়া। যারা রকের ভাষায় গানের রাজনীতি করেছে। ডেভিলস হর্ন দিয়ে মিডল ফিঙ্গার দেখিয়েছে সভ্যতার নিষ্ঠুর ঘাতকদের।
আমি প্রথম ‘সিস্টেম অফ এ ডাউন’ শুনি ২০০৪ -৫ সালের দিকে। তখন রক মিউজিককে খানা-খাদ্য বানিয়ে নিয়েছি। রকে খাই রকে ঘুমাই এমন অবস্থা। ফ্যানবিহীন তীব্র গরমের একটা ঘরে চিৎকার করে ‘টক্সিসিটি’ কাভার করার বৃথা চেষ্টা। আমরা জানতাম রক করতে লাগে চিৎকার এবং গরম। দুটোই ছিলো। কেবল রকটাই আসলো না। তবুও ব্যান্ড মানে ‘সিস্টেম অফ এ ডাউন’। হাঁটতে হাঁটতে চিৎকার করে উঠা। যারা সিস্টেম এর ‘BOYB’ গানটা শুনেছেন তারা জানেন এটা কী। এভাবে আমাদের রকের হাতেখড়ি। সেই যে সিস্টেম অফ এ ডাউন বুকের ভিতরে গাঁইথা গেলো। যাদের গান, লিরিক (যদিও তখন তেমন বুঝতাম না), প্রেজেন্টেশন সবিমিলিয়ে চুম্বকের মতো টেনে ধরে রাখতো। যারা অন্যসব ব্যান্ড থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তাদের গায়কীও আলাদা। এরপর বহু পুরানা রুচি বদলাইলাম অথচ এখনো আমার সবচেয়ে আপনা ব্যান্ডগুলোর একটা ‘সিস্টেম অফ এ ডাউন’ এবং বেশ উপরের দিকে।
এরপর যমুনার জল কালো থেকে ঘোলা হলো। কত অজানারে জানিলাম। ঘাটতে ঘাটতে বের করলাম সিস্টেম অফ এ ডাউনের আদ্যোপান্ত। জানলাম, আমেরিকানদের ভাষায় গাওয়া হলেও তাদের বুকে পুষে রাখা আর্মেনিয়ান যুদ্ধের ক্ষত। সেই ক্ষত কেবল পুষে রেখে আমি, তুমি এবং ফুল-পাখির গান করেনি সোয়াড। গগনবিদারী সেই চিৎকারের মধ্য দিয়ে তারা জানাতে চেয়েছে নিজেদের ইতিহাসের কথা, লড়াইয়ের যন্ত্রণা, আশেপাশের দুনিয়া সম্পর্কে একেবারেই নিজেদের দৃষ্টিভঙ্গী। যা সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র। তারা বারবার বলার চেষ্টার করেছে তারা তারাই। বেশ কয়েকটা ইন্টারভিউতে একই কথা বলেছেন ব্যান্ডের সদস্যরা। যারা কাউকে অনুসরণ করে না। যারা রকের ভাষায় বরাবরইই নিজেদের ফিলোসফিকে রিপ্রেজেন্ট করতে চেয়েছে। যাদের গিটারিস্ট তাই একবাক্যে বলে দিতে পারে, ‘আমি সাধারণত লোকজন তেমন পছন্দ করি না। আমার মনে হয় তারা স্টুপিড।’ রক মিউজিক করতে এসে অডিয়েন্সকে উড়িয়ে দেওয়ার জন্য যথেষ্ঠ যোগ্যতা লাগে।
আমাদের তখনো মতান্তরে এখনো ‘স্টুপিড’ জেনারেল পিপল মনে করে হার্ডরক মিউজিক মানেই চিৎকার চেঁচামেচি তৈয়ার করা। যাদের গানের কোনো উদ্দেশ্য নেই। তারা বুঝতেই চায় না একটা আজম খান একটা বাংলাদেশ মুক্তিযুদ্ধ করে স্বাধীন না হলে তৈয়ার হয় না, যেমন তৈয়ার হয় না একটা সিস্টেম অফ এ ডাউনের মতো ব্যান্ডও। যুদ্ধের তীব্রতা ও ক্ষত একমাত্র চিৎকার এবং হেড ব্যাঙ্গিং দিয়েই প্রশমন সম্ভব। উপমহাদশের ভিতর বাংলাদেশ ছাড়া বাকিদের মধ্যে সেই চিৎকার অথবা আর্তনাদ তৈরি না হওয়ার পিছনে এই কারণটিকে বিবেচনায় নেয়া যেতে পারে। এটা একটা ঐতিহাসিক বাস্তবতা যে, প্রয়োজনই মূলত সৃষ্টিকে উস্কে দেয়। যাই হোক, তেমন পরিস্থিতিই সিস্টেম অফ এ ডাউনের সৃষ্টি হওয়া অনিবার্য করে তোলে। আর্মেনিয়ানদের জন্য এই চিৎকারের কোনো বিকল্প ছিল না। আর্মেনিয়ার জেনোসাইড নিয়ে তাদের অন্যতম দুটি গান হলো p l u c k এবং Holy Mountain’। দুটি গানেই গানেই উঠে এসেছে গণহত্যার ভয়াবহতা ও বেদনা। p l u c k এ বলা হচ্ছে Elimination Why,
Die Walk Down
A whole race Genocide,
Taken away all of our pride’
একটি গণহত্যা সমস্তকিছুকে কেড়ে নিয়ে যেতে পারে। কেবলমাত্র বিপ্লবই মানুষকে মুক্তি দিতে পারে। revolution, the only solution’ যেখানে পৃথিবীব্যাপী বিপ্লবের কাছ মুখ ফিরয়ে পুঁজির প্রতি দাসখত দেয়া হচ্ছে সেখানে তথাকথিত উচ্ছন্নে যাওয়াদের রক ব্যান্ড ‘SOAD’ এখনো বিপ্লবের প্রতি নিজেদের ঈমান রেখেছে।
তিনটি শব্দেই এই গানে সব দাবি জানিয়ে দেয়া হয়েছে ‘স্বীকৃতি, ক্ষতিপূরণ এবং সংশোধন’। কোনো গান হয়তো এরচেয়ে বেশি পলিটিক্যাল দায়িত্ব পালন করতে পারে না। রকের নিশ্চয় কোনো সীমানা নেই। এই গানের কোথাও আর্মেনিয়া শব্দটির উচ্চারণও নেই। পৃথিবীর যে-কোনো গণহত্যার বিরুদ্ধে এভাবেই এ-গানটি দাঁড়িয়ে যেতে পারে। এই গানটির মানবিক আবেদন এতটাই দুর্দান্ত, যেখানে বলা হচ্ছে, Took all the children and then we died’ প্রায় একই ধরনের গান Holy Mountain’ । এখানে কোরাসে বলা হচ্ছে ‘লায়ার, কিলার, ডেমন’। এটি নিশ্চিতভাবেই গণহত্যাকারীদের উদ্দেশ্য করেই বলা হয়েছে। যে গানে কামনা করা হয়েছে মুক্তি ও স্বাধীনতা।
এ তো গেলো ‘সিস্টেম অফ এ ডাউনের’ গণহত্যা বিষয়ক গানের কথা। তবে এর বাইরেও তাদের প্রায় প্রতিটি গানে নতুন দৃষ্টিভঙ্গি ও নতুন রাজনীতি নিয়ে হাজির হয়েছে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে এবং শান্তির পক্ষে লড়াইয়ে নেমেছে। যেখানে কন্টেম্পোরারি রাজনীতি, আমেরিকার ওয়ার অন ড্রাগস, সেক্সচুয়াল ইন্টাকোর্স নিয়ে কথাবার্তা বলা হয়েছে। এবং তা গতানুগতিক ধারা থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ‘SOAD’ এর অন্যতম বিখ্যাত ও জনপ্রিয় গান ‘BYOB’ ইরাক যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বানানো। এই গানটিতে বলা হয়েছে, কেনো যুদ্ধে প্রেসিডেন্ট নিজে লড়াই করেন না। কেন শুধুমাত্র গরীবদেরকেই কেন যুদ্ধের বলি বানানো হয়। ‘Hypnotize’ গানটাও যুদ্ধবিরোধী। রাষ্ট্র কীভাবে জনগণকে হিপনোটাইজ করে নিজের স্বার্থ হাসিল করে সেটাই এ গানে বলা হয়েছে। ‘cigaro’ গানটি বুরোক্রেসিকে আঘাত করে। তবে ‘SOAD’ এর সবচেয়ে সহজবোধ্য এবং তীক্ষ্ণ গান ‘BOOM’ এখানে গ্লোবালাইজেশন, বোমা এবং যুদ্ধোপকরণের পেছনে খরচের বিষয়টিকে আক্রমণ করা হয়েছে। সর্বোপরি আক্রমণ করা হয়েছে যুদ্ধকে এবং তার নিষ্ঠুরতাকে। আমেরিকার বিতর্কিত ‘ওয়ার অন ড্রাগ নীতিকে আক্রমণ করা হয়েছে ‘Prison Song’ গানটির মধ্যে দিয়ে। সিস্টেম অফ এ ডাউন মূলত যতটা না রক ব্যান্ড তার চেয়ে অধিক রক এক্টিভিস্ট। তাদের আরেক বিখ্যাত হিট নাম্বার হলো Chop Suey ৯/১১ এর ঠিক আগে আগে মুক্তি পাওয়া এই গানটির একটি লাইন নিয়ে সেসময় বেশ বিতর্ক তৈরি হয়। লাইনটি হলো, ‘ ও I don’t think you trust in my self-righteous suicide’.
এই গানটির ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে ‘SOAD’ মেম্বার মালাকিয়ান বলেন, ‘ The song is about how we are regarded differently depending on how we pass. Everyone deserves to die. Like, if I were now to die from drug abuse, they might say I deserved it because I Abused dangerous drugs…’
আমাদের এখানে স্টেরিওটাইপ ধারণা হচ্ছে রক মিউজিক মানে একদল বখাটে তরুণের চিৎকার-চেঁচামেচি এবং রক মিউজিকের কাজ সুশীল সমাজের অভ্যন্তরে ফিতনা তৈরি করা। তবে আসলেই রক মিউজিকের কাজ হলো ফিতনা তৈরি করা। সেটা হচ্ছে ফিতনার বিরুদ্ধে ফিতনা। নৈরাজ্যের বিরুদ্ধে নৈরাজ্য। এটাই মূলত রকের কাজ। এক্সিস্টিং সোসাইটির ভিতরে নিজেদের একটা স্পেস তারা বের করে নেওয়ার লড়াই সবসময় জারি রাখে। আর ক্লাসিক্যাল সমাজ তার মধ্যে কোন ডিসঅর্ডার সহ্য করতে পাওে না। যে-কারণে সিস্টেম অফ এ ডাওন কিংবা অন্য কোন রক ব্যান্ডকে বুঝার আগেই তারা খারিজ করে দিতে চেষ্টা করে। কিন্তু রকের কাজই যখন সংকটের ভিতর দিয়ে টিকে থাকা। সিস্টেম অফ এ ডাওনও তাই টিকে থাকে লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে। যুদ্ধের বিরুদ্ধে নিজেদের হার্ডরক যুদ্ধ দিয়ে।

x