যুদ্ধশিশু মনোয়ারা ও কোহিনুরেরা ভাল থাকুক

কাজী রুনু বিলকিস

শনিবার , ১৬ মার্চ, ২০১৯ at ১০:৪৫ পূর্বাহ্ণ
104

সুসান ব্রাউন মিলার তাঁর “Against our will Men, Women and Rape” গ্রন্থে একাত্তরে বাংলাদেশে পাকিস্তানিদের সংঘটিত যৌন নির্যাতনকে তুলনা করেছেন নানজিং-এ সংঘটিত গণধর্ষণ এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে রাশান নারীদের উপর নাৎসীদের ভয়ঙ্কর নির্যাতনের সাথে। কিন্তু আমাদের গবেষকদের গবেষণায় দেখা যায় নির্যাতনের ব্যাপকতা পৃথিবীতে সংঘটিত সকল নিষ্ঠুরতার শীর্ষে।
“পঁচিশ ও ছাব্বিশে মার্চের গণহত্যার পরপরই পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী বিভিন্ন শহর সামরিক গুরুত্বপূর্ণ স্থান, স্কুল কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়সহ, গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মী, তাদের সমর্থক বুদ্ধিজীবী ও বিশেষ করে হিন্দু সম্প্রদায়ের বাড়িগুলোতে হানা দেয়। এ পর্যায়ে তারা কাউকে হত্যা করে, অনেককে ধরে নিয়ে যায়। পুরুষদের নির্যাতনের পর কোন কোন স্থান থেকে মেয়েদেরকে উঠিয়ে নিয়ে যায়। এবং কোন কোন পরিবারে মা মেয়ে ও বাড়িতে অবস্থানরত মেয়েদেরকে তাদের বাড়িতেই নির্যাতন করে। এ সময় যৌন নির্যাতনের চেয়ে হত্যা করার প্রবণতা ছিল অনেক বেশী।” যুদ্ধ ও নারী ডা এম এ হাসান। যারা যুদ্ধে ভিটেমাটি ছেড়ে না পালিয়ে অনিচ্ছায় কিংবা চাপের মুখে পাক হানাদার ও তাদের দোসরদের রান্নাবান্নাসহ ও অন্যান্য কাজে সহায়তা দিতে বাধ্য হয়েছেন তাঁরা সপরিবারে ঘৃণিত ও লাঞ্ছিত হয়েছেন স্বাধীন দেশেও। যারা যৌন দাসী ও কমফোর্ট গলি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিলেন তাদের অধিকাংশই নিহত হন। যুদ্ধের শেষ পর্যায়ে তাদের হত্যা করা হয় খুব নিষ্ঠুরভাবে।
প্রায় প্রতি বৎসরই কেউ কেউ আসছে নাড়ির টানে তারা কেউ যুদ্ধ দেখেনি কিন্তু যুদ্ধের বিভীষিকায় তাদের জন্ম।
প্রায় ২৫ হাজার শিশু যাকে বলা হয় যুদ্ধ শিশুর জন্ম হয়েছিল। আরও অনেক শিশুর জন্ম রোধ করা হয়েছিল গর্ভপাত করে। কোহিনুর নামে একাত্তরের এক যুদ্ধ শিশু বারবার নরওয়ে থেকে বাংলাদেশে আসছেন তার মায়ের খোঁজে। তার শেকড়ের খোঁজে। কোহিনুরকে যখন বাংলাদেশ থেকে দত্তক হিসেবে এক দম্পতি নরওয়েতে নেন তখন সে তিন বছরের শিশু। একাত্তরের যুদ্ধশিশু হিসেবে জন্ম নেওয়ার পর সে ঢাকার মাদার তেরেসার চ্যারিটি হোমে ছিল। এখন কোহিনুর পরিণত নারী, তারও একটি চার বছরের মেয়ে আছে। কোহিনুর নরওয়েতে একজন সংগীত শিল্পীও। বারবার ছুটে আসেন তার জন্মদাত্রীর খোঁজে। সে জানায় নরওয়েতে একশর মত যুদ্ধ শিশু আছে। যারা এখন নিজ নিজ কর্মক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠিত। তিনি জানেন, মুক্তিযুদ্ধের পর পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে তার মত আরো অনেক শিশুকে দত্তক হিসেবে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যেতে হয়েছে। সেই সময়ে বাংলাদেশের নির্যাতিত নারীদের সহায়তার জন্য অনেক দেশ এগিয়ে এসেছিল বিশেষ করে কানাডা, নরওয়ে, ডেনমার্ক ও অস্ট্রেলিয়া।
মনোয়ারা ক্লার্ক একজন যুদ্ধশিশু। মায়ের গর্ভেই সে রক্তাক্ত হয়। আঘাতে আঘাতে তার নরম শরীর কেটে যায়।
সেই ক্ষত নিয়ে মৃত মায়ের গর্ভ থেকে তার জন্ম হয়। পাকিস্তানী হায়েনারা গণধর্ষণের পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে তার মাকে। খোঁচার দাগে মায়ের গর্ভের শিশুর দেহও কেটে যায়। মনোয়ারার বাহুতে, পিঠে, কাঁধে এখনও সেই দাগ বয়ে বেড়াচ্ছে তার জন্ম দাগ। তার মা মৃত পড়েছিল। অলোকিকভাবে শিশুটিকে বিশেষ ব্যবস্থায় পৃথিবীর আলোতে নিয়ে আসেন কানাডিয়ান চিকিৎসক হালকে ফেরী। তার স্থানও হয় ঢাকার মাদার তেরেসা হোমে। সেখানে এক কানাডিয়ান দম্পতি ৬ মাস বয়সে তাকে দত্তক সন্তান হিসেবে নিয়ে যান। নাম হয় তার মনোয়ারা ক্লার্ক। একেবারে বাংলা না জানা মনোয়ারা মুক্তিযুদ্ধের ৪৫ বৎসর পরে বাংলাদেশে এসেছে কেবলমাত্র তার জন্ম সনদ নিতে।
পারস্পরিক বোঝাপড়ার মাধ্যমে ফিনল্যান্ডের এক নাগরিকের সাথে তার বিয়ে হয়। বিয়ের পর তাদের একটি কন্যা সন্তান হয়। সেই শিশুটি অটিজম আক্রান্ত। তারপর থেকে তার স্বামী বলতে থাকে, অটিস্টিক বেবীর জন্য তুমিই দায়ী। কারণ আমার পরিবারের পরিচয় আছে, তোমার কোন পরিচয় নেই। তুমি একটা ওয়ার বেবী সেই কারণেই তোমার বেবী অটিস্টিক হয়েছে। তার বেঁচে থাকার কথাও ছিল না। সে জানে না তার মাকে বাবাকে।
এখন সে বাংলাদেশে ছুটে এসেছে তার জন্ম সনদের জন্য।
সে বলছে, “I am here for my identity, I am here for my family. My birth certificate make me more confident. ৪৭ বছর পরেও দুর্ভাগ্য তার পিছু ছাড়ছেনা।
আমাদের মুক্তিযুদ্ধের এই নিরপরাধ যুদ্ধশিশুগুলো যেখানেই থাক ভালো থাকুক। আত্মবিশ্বাসের সাথে থাকুক। ওরা এদেশের সন্তান। ওরা আমাদের সন্তান। কোন গ্লানি যেন ওদের স্পর্শ না করে। ভালো থাকুক কোহিনুর ক্লার্ক। ভালো থাকুক মনোয়ারা এবং অচেনা অজান সব যুদ্ধ শিশুরা।

x