যুদ্ধজয়

সুসেন কান্তি দাশ

বুধবার , ৩১ জানুয়ারি, ২০১৮ at ৪:৩৫ পূর্বাহ্ণ
75

বয়সে বৃদ্ধ নূপুর দাদু। কিন্তু মনের দিক থেকে একজন উদ্যমী, সাহসী মানুষ। সব সময় মুখে হাসিহাসি ভাব।

একদিন ভোরের বেলার কথা। উঠোনে মাদুর পেতে বসেন এক গামলা মুড়িবিস্কুট নিয়ে। মুড়িগুলো মুঠোয়মুঠোয় উঠোনে ছিটিয়ে দিতে থাকেন। আর আয়আয় বলে শূন্যে হাত তুলেন। অমনি আকাশ থেকে অগণিত পাখি উড়েউড়ে নেমে আসে উঠোনে। এরা খুঁটিয়েখুঁটিয়ে মুড়ির দানা খেতে থাকে। এ সময় ডাক দিয়ে নূপুর দাদু বলেন, “কইরে মা জোনাকী–? আমার বাঁশের বাঁশিটা এনে দেতো, একটু বাজাই…!” আনছি বাবা… ! ঘরের ভেতর থেকে একটি কিশোরী একটি সুন্দর নীলরঙা বাঁশি নিয়ে এলো। জানা গেছে, মেয়েটি দূরের গ্রাম থেকে আসা এক অনাথিনী। দুমুঠো খাবারের জন্য গাঁয়ের এদিকওদিক ঘুরতে থাকায় দাদু তাকে কন্যা জেনে ঘরে ঠাঁই দেন।

নূপুর দাদুর বাঁশির সুর পৌঁছে যায় বহুদূরে। অনেকে ঘুমভাঙা চোখে বেরিয়ে আসে উঠোনে। কেউবা কান পেতে ঘরের ভেতর থেকে শুনতে থাকে সুর। সুরের মায়াজালে সিক্ত হয়ে উঠে পাখিরাও। এরাও লাফিয়েলাফিয়ে দানা খুটিয়ে যাচ্ছে। এ সময় হঠাৎ দূর থেকে গুড়ণ্ডমগুড়ণ্ডম শব্দ ভেসে আসে। গাঁয়ের লোকেদের আর্তচিৎকার আর ছুটে যাওয়ার দৃশ্য খুব দূর থেকে কাছে এসে পৌঁছে। উঠোনের পাখিরাও উড়ে গেলো আকাশে। বৃদ্ধ দাদু ধীরে লাঠিতে ভর করে উঠে দাঁড়ান। সময়টা একাত্তরের শেষের দিকে। গাঁয়ের লোকেরা অনেকে দিশেহারা হয়ে গেলো। কেউকেউ তার কাছে বিপদের সমূহ আশংকা ব্যক্ত করে সমাধান চাইতে আসে। দাদু বুঝে উঠতে পারছেনা, কী করবে, কী বলবে। ডাক দিয়ে জোনাকীকে বলেনমাগো, ভয় পাস্‌নে, আমি আছি, আমাকে হাত ধরে নিয়ে চল্‌।

জোনাকী তার বৃদ্ধ বাবার হাত ধরে এগোতে থাকে। যেতেযেতে এসে থামলো বড় রাস্তার পাশে। এ সময় বৃদ্ধ একটু থামলো। দেখলো, বেশ কয়েকটি পাকিস্তানি পুলিশের গাড়ি। পুলিশগুলো গুলি উচিয়ে ফুটাতো থাকে। আর তাতেই বাঙালিরা এদিক ওদিক ছুটছে আর হাকডাক চিৎকার করে চলেছে। বাঁচাও! বাঁচাও! আবার মুক্তি পক্ষের কিছু বাঙালি ও গুলি নিয়ে ছুটছে সেদিকে।

গুলির ধোঁয়াতে চারিদিক কেমন ধোঁয়াটে হয়ে উঠেছে। সময়টা দুপুরের কাছাকাছি। সূর্যের আলোতে অমন কালো ধোঁয়া চোখে জ্বালা ধরিয়ে দেয়। ততক্ষণে থেমে যায় পাকিস্তানিদের আক্রমণ। জোনাকীর কাঁধে ভর করে বৃদ্ধ এগোতে থাকে। দেখে পথের পাশে রক্তমাখা শরীর নিয়ে পড়ে আছে অগণিত বাঙালি আর পাকিস্তানি। দূরে দাউ দাউ করে জ্বলছে ছনের ঘর, টিনের গোলা। জোনাকী ভয় পেয়ে কাঁদতে শুরু করে। বৃদ্ধ নূপুর বাবু মেয়েকে মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। বলে, মাগো, ভয় পাস্‌নে, ভয়ের কিছু নেই। আমাদের এই সমস্যা কাঁটিয়ে উঠতে হবে। চল্‌ ঘরে ফিরে যাই।

দুপুর গড়িয়ে গেলো। বিকাল বেলা হালকা কুয়াশায় ছেয়ে যেতে থাকে পরিবেশ। পাশের গ্রাম থেকে অগণিত লোক আসতে থাকে নূপুর দাদুর গ্রামে। অনেকে রক্তাক্ত, আহত। নূপুর বাবু এদের অনেককেই তার ঘরে জায়গা করে দেন। এ সময় চিকিৎসার জন্য কেউ ডাক্তারের কাছে যেতেও সাহস পাচ্ছে না। ইতোমধ্যে অনেককেই বড় রাস্তা থেকে পাকিস্তানি পুলিশ ধরে নিয়ে গেছে।

বৃদ্ধ নূপুর বাবুর কোমল প্রাণ। তিনি অসুস্থ অনাহারী অগণিত লোককে ঘরে আশ্রয় দিতে থাকেন। অনেক বড় বাড়ি তার। গোলায় প্রচুর ধানচাল। নিকট আত্মীয়রা কেউ নিকটে নেই। কেবল কিশোরী মেয়ে জোনাকীর মায়ামমতা ও স্নেহে আবদ্ধ হয়ে পড়েছেন। ঘরের একোণেওকোণে লোকেরা আশ্রয় খুঁজে পায়। নূপুর বাবুর ঠাকুর দাদা একজন নামকরা কবিরাজ ছিলেন। তার রেখে যাওয়া কবিরাজের পুঁথি অনেক যত্ন করে রাখেন।

আজ বহুদিন পর সেসব বই খুলে বুড়ো আহত লোকদের চিকিৎসা সেবা দিতে থাকে। অনেকেই ধীরেধীরে সুস্থ হয়ে উঠে। জোনাকী সারাদিন ধরে ওদের খাবারের ব্যবস্থা করতে থাকে। বুড়োর পাশাপাশি সেবা শুশ্রূষা করতে থাকে।

সারাক্ষণ অজানা আশংকা নূপুর বাবুর মনে বাসা বাঁধে। সময়েসময়ে রেডিওটা হাতে নিয়ে নানান খবরাখবর শুনে নেন। দেশজুড়ে বাঙালি মুক্তিবাহিনী সোচ্চার হয়ে উঠেছেন। অনেকের ঘটনাদুর্ঘটনার খবর আসে। মাঝেমাঝে আশেপাশ হতেও গুলির শব্দ ও তাজা খবর শোনা যায়।

এক বিকেল বেলা। নূপুর বাবু তার ঘরে আশ্রিত লোকদের সাথে স্বাধীনতার প্রয়োজনীয়তা প্রসঙ্গে আলাপ করতে থাকে। জোনাকী গাঁয়ের পাশে বয়ে যাওয়া নদীর ঘাটে জল আনতে চলে গেলো।

ঘরের আশ্রিত মানুষের খাবারের জল নেই; তাই জল সিদ্ধ করতে হবে।

একটু পরের কথা। দূর থেকে জোনাকীর আর্তচিৎকার শোনা যায়। কে কোথায় আছো (!) তোমরা ছুটে আসো। পাকসেনারা আসছে। সেই ডাক শুনতে পেয়ে নূপুর দাদু লাঠিতে ভর করে উঠে দাঁড়ায়।

দেখছে নদীর পাড় বেয়ে ছুটে আসছে পাকসেনারা। নূপুর বাবুর মনে জেগে ওঠে অনেক সাহস। তিনি হাতের লাঠি উঁচিয়ে ছুটে গেলেন। পাকসেনারা গুড়ণ্ডমগুড়ণ্ডম শব্দ তুলে গুলি ফোঁটাতে থাকে। গাঁয়ের অনেকেই নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেতে ছুটোছুটি করছে। অনেকে লাঠি, দা, খুন্তি নিয়ে যুদ্ধ শুরু করলো। নিকটে জোনাকীকে দেখা যায় না। কে কোনদিকে ছুটছে দেখা যায় না। নূপুর বাবু তার ঘরে আশ্রিত লোকদের বলছেতোমরা বুকে সাহস করে শত্রুর মোকাবেলা কর। আমাদের যুদ্ধ জয়ের পালা।

চারিদিকে গুলির আওয়াজ ও কালো ধোঁয়া। নূপুর বাবু তার হাতের লাঠি উঁচিয়ে পাক বাহিনীকে শায়েস্তা করার জন্য এগিয়ে গেলো। এ সময় দেখতে পেলেন অনতিদূরে গাড়ির সামনে দাড়িয়ে একজন পাকিস্তানি। তার নির্দেশে গুলি ছুঁড়ছে অন্য পাকসেনা। নূপুর বাবু সুকৌশলে তার নিকটে গিয়ে দাঁড়ালো। মুখোমুখি শুরু হলো যুদ্ধ। নূপুর বাবু তার শক্ত লাঠি দিয়ে আঘাত করলো সেই পাকসেনাকে। অমনি ধরাশায়ী হলো লোকটি। এ সময় অন্যদিক হতে একটা গুলি এসে পড়লো নূপুর বাবুর গায়ে। বিকট চিৎকার দিয়ে তিনি মাটিতে পড়ে গেলেন। এক সময় যুদ্ধে জয়ী হলো এলাকাবাসী। পাকসেনারা পিছু হটল, অনেকে মারা পড়লো।

অনেক ছুটে এলো নূপুর বাবুর কাছে। তিনি গুলিবিদ্ধ আহত। কোথা থেকে ছুটে এলো জোনাকী। বললোণ্ড বাবা আমরা জয়ী হলাম। কিন্তু। নূপুর বাবু বললেনমাগো আমাদের দেশের পতাকাটা একবার তুলে ধর। মেয়েটি ঘর থেকে নিয়ে এলো লাল সবুজ পতাকা।

x