যুগোপযোগী কৃষকবান্ধব খাদ্যশস্য সংগ্রহ নীতিমালা গ্রহণ করা জরুরি

রবিবার , ৬ অক্টোবর, ২০১৯ at ৭:৫৫ পূর্বাহ্ণ
31

বিশ্বের অনেক দেশে সার, বীজ, বিদ্যুৎসহ সবকিছুতে ভর্তুকি দেওয়া হয়। বাংলাদেশ মূলত সার ও সেচ পাম্পের বিদ্যুতে ভর্তুকি দেয়। ভারতের কৃষকরা বেশি ভর্তুকি পাওয়ায় তাদের উৎপাদন খরচ ও সংগ্রহ মূল্য আমাদের চেয়ে কম। তারপরও বাংলাদেশে গত ৩০ বছরে প্রকৃত হিসেবে চালের দাম অর্ধেকে নেমে এসেছে। প্রতি বছরের মূল্যস্ফীতি ধরলে চালের দাম ধারাবাহিকভাবে কমেছে। আর ধানের দাম কম হওয়ার কারণে কৃষকই বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এখানে ধান-চালের ক্ষেত্রে মধ্যস্বত্বভোগীকে যেরকম নেতিবাচকভাবে দেখা হয় তা ঠিক নয়। কৃষকের ধান চাল বিপণনে তাদেরও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা আছে। কারণ একযোগে ধান কাটা শুরু হওয়ার পর সরকার তো সব ধান কিনতে পারবে না। চালকল মালিকরাও অনেক সময় কিনতে চান না। এ সময় ফড়িয়ারা ওই ধান কিনে নেন। তারা ধান না কিনলে কৃষকের অবস্থা আরো খারাপ হতো। এখন বড় চালকল মালিকরাই বেশি মধ্যস্বত্বভোগীর ভূমিকা পালন করছেন তারা বাজার থেকে অনেক সস্তায় ধান কিনে তা বেশি দামে সরকারি গুদামে দিচ্ছেন এতে তারা বেশি মুনাফা পাচ্ছেন। সরকার বেশি ধান কিনলে চালকল মালিকদের মুনাফা কমবে এবং কৃষক লাভবান হবেন। তবে চালকল মালিকদের মধ্যেও পার্থক্য আছে। এক সময় আমাদের দেশে অনেক চাতাল ছিল। সেগুলো এখন বড় বড় মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারছে না। বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। চালের বাজার বড় মিল মালিকদের নিয়ন্ত্রণে চলে যাচ্ছে। এটা গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন, যা বিবেচনায় রেখে খাদ্য উৎপাদন ক্রয় বিপণন পরিকল্পনা সাজাতে হবে। প্রথমেই মৌসুমের শুরুতেই নিম্নতম ক্রয়মূল্য ঘোষণা করতে হবে। সরাসরি কৃষকের কাছ থেকে ধান কেনা নিশ্চিত করার সাথে সাথে মোট উৎপাদনের অন্তত এক-তৃতীয়াংশ সরকারকে কিনতে হবে। সরকারের মজুদ ব্যবস্থা উন্নয়নকল্পে অবিলম্বে নতুন অবকাঠামো নির্মাণ, স্বল্প মেয়াদে বেসরকারি বা ব্যক্তি পর্যায়ে গুদাম ভাড়া করা, নিয়মিত বাজারের সরবরাহ পরিস্থিতি তদারক এবং তার ভিত্তিতে আমদানির ওপর যথাযথ নিয়ন্ত্রন বজায় রাখতে হবে। ব্যবস্থাপনাগত ত্রুটির কারণেই ধান-চাল সংগ্রহ অভিযানের লক্ষ্য অর্জিত হয় না।
কৃষকের কাছ থেকে ধান ও গম সংগ্রহের ক্ষেত্রে একটি নীতিমালা দরকার। এক্ষেত্রে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর এবং খাদ্য বিভাগ মিলে একটি যুগোপযোগী কৃষক বান্ধব শস্য সংগ্রহ নীতিমালা প্রণয়ন ও কৃষি কার্ড প্রবর্তনের ব্যবস্থা করতে পারে। কোন কাজ সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে সম্পন্ন করতে সুনির্দিষ্ট ও সুপরিকল্পিত নীতিমালা থাকাটা জরুরি। সম্প্রতি দেশের কৃষির টেকসই উন্নয়নে জাতীয় কৃষিনীতি-২০১৮ প্রণয়ন করা হয়েছে। তবে তাতে কৃষকের কাছ থেকে সরাসরি শস্য ক্রয়ের সুনির্দিষ্ট কোন বিষয়ের উল্লেখ নেই।
সরকারের খাদ্যশস্য সংগ্রহের বিদ্যমান নীতিমালাও কৃষক স্বার্থ অনুকূলে নয়। ধান সংগ্রহকে কেন্দ্র করে উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে হুমকি ধমকি দেওয়ার খবরও কোন কোন সংবাদ মাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। কোন কোন পত্রিকায় সরকারি খাদ্য গুদামে ধান সংগ্রহের নামে স্লিপ বাণিজ্য চলছে মর্মে খবর বেরিয়েছে। এতে প্রকৃত কৃষক সরকার নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রি করতে পারছেন না। আর বিক্রি করতে পারলেও কোথাও কোথাও খাদ্যগুদামের কর্মকর্তা ও কর্মচারীকে ঘুষ দিতে হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে কৃষক এমন কি চাতাল মালিকরাও সরকারের কাছে ধান চাল বিক্রি করতে চান না। এছাড়া দাম নির্ধারণের কারণেও সংগ্রহ অভিযান সফল হয় না। ধান-চাল বিক্রির এসব অভিযোগ দুর্নীতি ও দলবাজি বন্ধ করতে হলে কৃষকের কাছ থেকে সরকারি গুদামে ধান সংগ্রহের বর্তমান নীতিমালার বদলে যুগোপযোগী কৃষক বান্ধব একটি নতুন নীতিমালা প্রণয়ন এবং তার যথাযথ বাস্তবায়ন অপরিহার্য।

x