যার হাত ধ’রে, ভিনসেন্ট

মঙ্গলবার , ১৬ এপ্রিল, ২০১৯ at ১০:৩৭ পূর্বাহ্ণ
70

মনোজগতে চলমান বিভ্রাট আর শারীরিক অসুস্থতা দিনকে দিন বেড়েই চলেছে তার। শিল্পী হিসেবে শৈল্পিক সাফল্যের জন্য তাঁর অন্তরও একদিকে যেমন ক্ষুধিত, তেমনই মগজ ক্রমশই ছেয়ে যাচ্ছে ভোঁতা অন্ধকারে, শহুরে জীবনের টানাপড়েন অযুত জটাজাল হয়ে বিষণ্নতার সঙ্গে মিশে আরও ফেনিল আরও তরঙ্গায়িত করে তুলছে তাকে। অথচ যশ-খ্যাতি-সাফল্য ইত্যাদি যখন তাঁর পদতলে, তখন ভিনসেন্ট মিথের ডামাডোলো ‘অত্যাচারিত প্রতিভা’ এবং ‘ভূখা শিল্পী’ হিসেবে পোস্টারবয় বনে গেছেন, আর সেইসব সর্বনামেরই চৌম্বকীয় আকর্ষণ তাকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দিয়েছে। নানা মাধ্যমে যেমন চলচ্চিত্র, বই, প্রদর্শনী, গবেষণা, বহুমাত্রিক উপস্থাপনা ইত্যাদিতে ভিনসেন্ট পরিবেশিত হচ্ছেন, পুনঃসৃজিত হচ্ছেন, যা এখনও চলমান, হয়তো এই প্রয়াস অনিঃশেষওবা!
কিন্তু ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ-এর এই যে কিংবদন্তিতুল্য সৃষ্টি আর তার জন্য আমরা যতখানি পাগলপারা, তারই ফাঁকতালে এমনকিছু কী আমাদের অগোচরে রয়ে যাচ্ছে বা আমরা ভুলে গেছি? ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম এবং শিল্পী হিসাবে তার গল্প, যা বেশিরভাগই তাঁর সহোদর থিও’র সঙ্গে অসংখ্য চিঠিপত্র আদান-প্রদানের হাত ধ’রে সঞ্জাত, ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ বেঁচে থাকতেই কী সেইসব গল্প তাদের কুঁড়ে কুঁড়ে খায়নি? শিল্পীর সৃষ্টির প্রতি এমন মাতোয়ারা ভাব কী আমাদেরকে অজানাভাবে তার গল্পের অন্য আরেক কুশীলবের কথা ভুলিয়ে দিচ্ছে, যার জন্য ভিনসেন্ট কেবলই ‘অত্যাচারিত প্রতিভা’ এবং ‘ভূখা শিল্পী’-র খ্যাতি আর গৌরবে পর্যবসিত হয়ে যাননি, সেই কুশীলব যিনি তাঁর জীবদ্দশায় ‘রেড ভিনিয়ার্ড’ কে হাতছাড়া করেননি।

ভিনসেন্টের সঙ্গে জোহান্না বংগারের খুব যে গাঁটছড়া কিছু ছিলো তেমন নয়, সম্পর্কে দেবর ছিলেন, এটুকুই। বস্তুত জোহান্না’র সঙ্গে ভিনসেন্টের জীবদ্দশায় হাতেগোনা দুয়েকবারই সাক্ষাৎ ঘটেছিলো। কিন্তু এই যোগাযোগটিই ভিনসেন্টকে বিশেষায়িত করে তোলে, কালে।
ভালবেসে সবাই তাকে ‘জো’ ডাকতো, জোহান্নার বেড়ে ওঠা এমন একটি পরিবারে যে পরিবারের সন্তানদের শিক্ষাদীক্ষা এবং শিল্প-শিল্পী বিষয়ে উৎসাহের কোনো কমতি ছিল না। এটি সেই সময়ের কথা, যখন বেশিরভাগ নারীরই লক্ষ্য ছিল ভাল স্ত্রী হওয়ার দৌড়ে এগিয়ে থাকা। অথচ এমন বাতাবরণেও তিনি ইংরেজি ভাষাতে ডিগ্রি অর্জন করে ফেলেছেন, ২২ বছর বয়সেই যোগ দিয়েছেন শিক্ষকতায়, লন্ডনের ব্রিটিশ যাদুঘরের গ্রন্থাগারিকের পদও অলঙ্কৃত করেছেন একসময়। পেশাজীবনের বাইরে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিপূন জীবনীকার এবং তার দিনলিপি যাকে বলে চোস্ত তরিকায় লিখে রাখতেন। অবশ্য বিয়ের পর কিছুদিনের জন্য এই অভ্যেস মূলতবী থাকলেও দুর্ভাগ্যজনকভাবে মাত্র আটাশ বছর বয়েসে বিধবা হয়ে পড়লে আবারও লেখালেখি শুরু করেন। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলেকে স্বাধীনভাবে বড় করে তোলার অভিপ্রায়ে, আমস্টারডামে তার পৈত্রিক বাড়িতে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্তের বিপরীতে দাঁড়িয়ে তিনি বুশাম নামের ছোট একটি গ্রামে থিতু হবেন বলে মনস্থির করেন। শোকে-কষ্টে তিনি মুহ্যমান ছিলেন ঠিকই কিন্তু ভেঙ্গে পড়েননি একটুও। ১৮৯১-র ১৫ নভেম্বর তিনি লিখেছেন:
‘আমি আমার শিশুটিকে নির্মল পরিবেশে বড় করে তুলতে চাই, ফলে আমাদের বুশামে থাকতে হবে। এখন আমার সাবধানী হতে হবে। আমার চিন্তা-চেতনায় এখন সংসার ঢুকে পড়বে, গেরস্থালির হাজারো সমস্যা আমাকে জেঁকে ধরবে, কিন্তু এতসবের মধ্যেও আমার আত্মাকে জীবিত রাখতে হবে। থিও (থিও ভ্যান গঘ) আমাকে শিল্প সম্পর্কে অনেক কিছু শিখিয়েছে, না, বরং বলা ভালো সে আমাকে জীবন সম্পর্কে গভীর ধারণা দিয়ে গেছে।’
থিওকে গভীরভাবে ভালবাসতেন এবং জানতেন যে থিও ভিনসেন্ট আর তার শিল্পের প্রতি কতটা যত্নশীল ছিলেন। ভিনসেন্ট যখন আর্লেস হাসপাতালে ছিলেন তখন থিও জো-কে লেখেন, ‘আমার প্রাণপ্রিয় ভাই ভিনসেন্টের সমস্ত স্মৃতি আমাদের ধরে রাখা উচিত।’ জোহান্না বংগার স্বামীর সেই স্বপ্নটিকে নিজের করে নিলেন, স্বপ্নকে সত্যি করে তুললেন। অন্যত্র তিনি লিখেছেন:
‘ছেলেকে লালন-পালন ছাড়াও আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ থিও আমার উপর দিয়ে গেছে। যতদূর পারা যায় ভিনসেন্টের শিল্পসৃষ্টিকে দিকে দিকে প্রদর্শনের ব্যবস্থা করে দেওয়া এবং এ-র যথোচিত সম্মান আদায় করা। থিও আর ভিনসেন্টের মধ্যকার সমস্ত ধন-রত্নগুলো (চিঠি) সামলিয়ে রাখাও আমার আরেকটি বড় দায়িত্ব ছিল। বৃহৎ এই জীবনে আমি নিজেকে স্রেফ বস্তুর অধীক কিছু মনে করি না। কিন্তু আমি নি:সঙ্গ এবং নির্জন বোধ করি কখনো কখনো। মুহুর্তের জন্য আমার মনে পড়ে সেই অনুধাবনের কথা, আমি যখন হল্যান্ডে ফিরে এলাম, আমি উপলব্ধি করতে পারলাম একজন নি:সঙ্গ শিল্পীর জীবনের মহিমা এবং বিশালতা। আর তখন ভিনসেন্টের সৃষ্টির প্রতি মানুষের উদাসীনতায়, কতোটা পীড়িত হয়েছি, কতোটা হতাশ হয়েছি তা বলে বোঝানো যাবেনা।’
নিজের বাড়িকে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের প্রদর্শনশালা’য় রূপ দেন তিনি, যা খুব দ্রুতই তরুণ শিল্পীদের পদচারণায় মুখর হয়ে ওঠে। প্যারিসে দুবছর কাটনোর সময় ভিনসেন্টের যে খ্যাতি গড়ে উঠতে শুরু করেছিলো তার পুনরুদ্ধারে নামেন জো। প্যারিসের ওই সময়টায় ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ-এর সঙ্গে তাঁর প্রজন্মের অনেক শিল্পীর সাথে যোগাযোগ তৈরি হতে থাকে, যেমন এমিলে বার্নার্ড, লুই আকুয়েতিন, এবং হেনরি দে তুলুস – যিনি প্যাস্টেলে গঘের একটি প্রতিকৃতিও আঁকেন। থিও ছিলেন শিল্প-সংগ্রাহক যিনি তাঁর প্রজন্মের আভাগার্দ শিল্পীদের সাথে ভিনসেন্টের পরিচয় ঘটিয়ে দিতে সাহায্য করেছিলেন, থিও ভাইয়ের কাজের প্রশংসায়ও ছিলেন পঞ্চমুখ। প্যারিসে থাকাকালে ভিনসেন্ট ইমপ্রেশনিস্ট-ধারা এবং জাপানি শিল্প দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হন। উল্লেখ্য ভিনসেন্টের সৃষ্টির উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনের শুরু এখান থেকেই। আর্লেসে থাকাকালে ভিনসেন্ট সাহচর্য পেয়েছিলেন পল গগুইন এবং এমিল বার্নার্ডের। গগুইনের কথা আমরা সবাই জানি, ভিনসেন্টের কর্ণহরণের সঙ্গে তার নামটি জুড়ে আছে।
ভিনসেন্টকে যারা ভালোবাসতেন তেমন অনেক শিল্পীর সাথে যোগাযোগ শুরু করলেন জোহানা এবং সহসাই সাড়া মিলতে লাগলো এমন কিছুর যার সন্ধানেই ছিলেন জো। বস্তুত, ক্লদ মনে, যার কাছ থেকে ভিনসেন্ট ব্যাপকভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন, তার কাজ দেখতে এলেন এবং যারপরনাই অবাক হলেন, যে মানুষ ফুল আর আলোকে এতো পছন্দ করতেন তিনি জীবনভর এতো অসুখী থাকলেন কী করে! ক্যামিলি পিসারো কল্পনাপ্রবণ হয়ে ঘোষণা করেছিলেন, ভিনসেন্টের ফুলগুলো আসলে মানুষের মতোই।
১৮৯২-এর ২৪ ফেব্রুয়ারি, ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের প্রথম প্রদর্শনী (আক্ষরিক অর্থে)-র প্রাক্কালে জোহান্না লিখেছিলেন: ‘‘আগামীকাল রাতে ‘আর্টি’-তে [দ্য আর্টিস্ট এসোসিয়েশন অব আমস্টারডামের নিজস্ব প্রদর্শনী কক্ষে] ভিনসেন্টের আঁকা ড্রয়িংয়ের প্রদর্শনী। বেশ আশা করে বসে আছি, এ এমন এক অনুভূতি যার একমাত্র ফসল দর্শকের কাছ থেকে মিলবে, আমার ভাবনা আর চেষ্টা আজ কূলের সন্নিকটে, ব্যাপরটা দারুণ। লোকজন কি বলছে, কী তাদের প্রতিক্রিয়া তা শুনতে কাল অবশ্যই সেখানে যেতে হবে। আমি পুনর্বার দেখতে চাই তাদের মনোভাব, তাদের অনুভব ধরতে চাই – একদিন যারা ভিনসেন্টের কাজ দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খেতেন, মজা করতেন।’’
জোহান্না তৎকালীন আর্ট ডিলারদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে শুরু করেন এবং নিজের বাড়িতেই ভিনসেন্টের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের পাশাপাশি, সংগ্রহশালা গড়ে তোলেন। এমনকি দুয়েকজনকে আর্থিক সাহায্য দিয়ে কাজে লাগান শিল্পসমঝদার ক্রেতা খুঁজে বার করার কাজে। বিভিন্ন ঐতিহাসিক সূত্রগুলো প্রমাণ করে যে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের সর্বপ্রথম ক্রেতা ফরাসি লেখক অক্তাভ মিরবিউ। অক্তাভ ৬০০ ফ্রাঙ্কের বদলে কিনে নেন ‘দ্য আইরিসেস’ এবং ‘দ্য থ্রি সানফ্লাওয়ার’। ‘সানফ্লাওয়ার’ সিরিজের কাজগুলোর চাহিদা তখন তুঙ্গে, ১৮৯৪ সালে এমিল শুফেনেকার এই সিরিজের টোকিও সংস্করণটি সংগ্রহ করেন।
১৯০১ সালে জোহান্না বিয়ে করেন চিত্রশিল্পী-লেখক কোহেন গশলাক কে। বিয়ের বছর দুয়েক পর ১৯০৩ সালে, জোহান্না ফের আমস্টারডামে ফিরে আসেন এবং এই নতুন আবাসও হয়ে ওঠে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের নতুন ঠিকানা। ১৯০৫-এর গ্রীষ্মে, তিনি আমস্টারডামের স্টেদেলিজ্‌ক যাদুঘরের প্রদর্শনশালাটি ভাড়া নিতে সক্ষম হন এবং ভিনসেন্টের কাজের একটি বড় আকারের প্রদর্শনীর আয়োজন করেন, যা দুই হাজারেরও অধীক দর্শক দেখতে এসেছিল। ঠিক কাছাকাছি সময়ে, আমস্টারডামের রিজ্‌ক্‌ মিউজিয়াম এক অদ্ভূত প্রস্তাব দেয় যে তারা ভিনসেন্টের ছবি প্রদর্শন করবে এক শর্তে। শর্তটি এই, যে ক’টি শিল্পকর্ম প্রদর্শিত হবে তার সমপরিমাণ শিল্পকর্ম যদি মিউজিয়ামকে উপহার হিসেবে দেওয়া হয় তবেই প্রদর্শনী সম্ভব! যাইহোক, নেদারল্যান্ডের বাইরে কিছু প্রদর্শনী সংগঠিত করতে সক্ষম হন তিনি এবং ওয়েস্টফেলিয়ার হ্যাগেনের ফোকওয়াং যাদুঘর ভিনসেন্টের প্রথম আন্তর্জাতিক সংগ্রহশালা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে। একই বছর, ১৯০৫ সালে, তিনি জার্মান শিল্প ইতিহাসবিদ এবং প্রখ্যাত কিউরেটর হুগো ভন শুদি’র কাছে ‘দ্য সানফ্লাওয়ার’-এর মিউনিখ সংস্করণটি বিক্রি করেন, যা ভিনসেন্টের শিল্পকর্মের উল্লেখযোগ্য সংগ্রহ হিসেবে সর্বজনবিদিত।

বছর কয়েক পর, আরেকজন নারী যিনি ভিনসেন্ট-অনুরাগী এবং উৎসাহী, জোহান্নার গল্পের অপরিহার্য অংশ হয়ে ওঠেন। ভিনসেন্টের প্রতিভাকে চিনতে পেরে ১৯০৮ সালে ‘দ্য এজ আব দ্য উড’ চিত্রটি সংগ্রহ করেন। এরপর একের পর এক ভ্যান গঘের ৯১টি পেইন্টিং এবং ১৮৫টি ড্রইং নিজের সংগ্রহে অন্তর্ভুক্ত করেন। তার এই সংগ্রহটিই ক্রলার-মুলার মিউজিয়ামের ভিত্তি হয়ে ওঠে যা বিশ্বে ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের দ্বিতীয় বৃহত্তম সংগ্রহ। ১৯১০ সালে লন্ডনে প্রথমবারের মতো পোস্ট-ইমপ্রেশনিস্ট প্রদর্শনীতে ভিনসেন্টের শিল্পকর্মগুলি প্রদর্শিত হয়। যদিও, তখনও ভিনসেন্টের সৃষ্টিগুলোকে ‘উদ্ভট’ এবং ‘মজা’র তকমায় ডাকা হচ্ছে!
ওই একই সময়ে, ভিনসেন্টের শিল্পকর্মকে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দিতে তৎপর থাকেন জোহান্না। পাশাপাশি ভিনসেন্ট ও থিও’র চিঠিগুলোর সম্পাদনা এবং অনুবাদে নিজেকে যুক্ত রাখেন, যা পরবর্তীতে ভিনসেন্টকে চেনা-জানার অন্যতম উৎস হয়ে ওঠে বিশ্বজুড়ে।
ভিনসেন্টের শিল্পকর্মগুলো ‘শিল্পকর্ম’ হিসেবে স্বীকৃতি না পাওয়া ইস্তক তিনি ওই চিঠিগুলো অপ্রকাশিত রাখার সিদ্ধান্ত নেন। বেশিদিন অপেক্ষা করতে হয়নি জোহান্নাকে। ডাচ সংস্করণে প্রথম খন্ডটি প্রকাশিত ১৯১৪-এর বসন্তে, ততদিনে প্রথম বিশ্বযুদ্দের দামামা বেজে উঠেছে। ১৯১৫ সালের শুরুর দিকে জো পালিয়ে আসেন নিউইয়র্কে, এসেই চিঠিগুলোর অনুবাদে লেগে পড়েন। সেসময়ে তিনি লিখছেন:
‘‘থিওর অসুস্থতার শুরুর দিকেই চিঠিগুলো আমার জীবনে একটি বড় জায়গা করে নেয়। আমি জানতাম এই চিঠিগুলোর ভেতরই আমি তাকে (থিও) আবার খুঁজে পাবো। আমি কেবল আমার হৃদয় দিয়েই চিঠিগুলো পাঠ করি না, আমার গোটা অন্তরাত্মাও এর সঙ্গে যুক্ত হয়। কাজেই ওগুলো আমার সবসময়ের সঙ্গী। আমি চিঠিগুলো বারবার পড়ি, পড়তেই থাকি যতক্ষণ না ভিনসেন্টের পূর্ণ অবয়বটি আমার সামনে হাজির হয়। কখনও কখনও এটি আমাকে খুব ব্যথিত করে তোলে। মনে আছে, গেলো বছর ভিনসেন্টের প্রয়াণ দিবসের সন্ধ্যায়, আমি একটু দেরি করে বাড়িতে ফিরলাম। বাইরে তিরতিরে হাওয়া, টিপটিপ বৃষ্টি পড়ছে, মিশকালো অন্ধকার। আমাদের বাড়িটা আলোয় উদ্ভাসিত, লোকজন টেবিলের চারপাশে জড়ো হয়ে আছে। একটা গর্ব বলা ভালো অহংকারের অনুভব টের পেলাম নিজের ভেতর। জীবনে এই প্রথম আমি বুঝতে পারলাম যে যখন ভিনসেন্টকে কেউ গোনায় ধরতো না, যখন সবাই মুখ ফিরিয়ে থাকতো আর তখন হয়তো মনে মনে সে ভাবতো ‘পৃথিবীতে যেন আমার কোনো স্থানই নেই…’, বুঝলাম সেই অনুভব কতোটা প্রাণঘাতী। আমি চাই লোকে জানুক ভিনসেন্টের প্রভাব আমার জীবনে কত ব্যাপক। ভিনসেন্ট আমাকে এমনভাবে জীবনযাপন করতে সাহায্য করেছে যে, এখন আমি আমার স্বয়মের কাছে শান্তিতে থাকতে পারি। প্রশান্তি – ঠিক এই শব্দটিই ওদের দুজনেরই প্রিয় ছিলো, যা উভয়েই মানব-মুক্তির সর্বোচ্চ পর্যায় বলে বিবেচনা করতো। সেই প্রশান্তি – আমিও পেয়েছি। সেই শীতকাল থেকে, যখনই একা থাকতাম, মন বিষাদে ছেয়ে যেতো, কিন্তু আমি অসুখী ছিলাম না। ভিনসেন্ট যেমন ভাবতো ‘হয়তো হৃদয় ব্যথিত কিন্তু তাতে আনন্দও সীমাহীন’ – এই অভিব্যক্তি এখন খুব বুঝতে পারি আমি।’’
২২ সেপ্টেম্বর ১৯২৫, জোহান্নার যেদিন দেহাবসান ঘটে, ছিলেন ৫২৬ নম্বর চিঠির অনুবাদে। এর একবছর আগে, গঘের ‘দ্য সান ফ্লাওয়ার’ সিরিজের একটি চিত্রকর্ম তার হাতছাড়া হয়, যেটির প্রতি তিনি অত্যন্ত অনুরাগী ছিলেন। বেশ কষ্ট পেয়েছিলেন। লন্ডনের ন্যাশনাল গালারি অব ব্রিটিশ আর্টের কিউরেটরদের অন্যতম জিম এডিকে এই পেইন্টিংটি বিক্রি করতে অনাস্থা জ্ঞাপন করে লিখেন,
‘‘আপনার আবেদনের প্রেক্ষিতে আমি আমার হৃদয়কে যথেষ্ট শক্ত করে বোঝাবার চেষ্টা করেছি। গত ত্রিশ বছরের প্রতিটি দিন আমি এই ছবিটির দিকে তাকিয়েছি বারবার। আমি নিজেকে এ-র কাছ থেকে আলাদা ভাবতে পারিনা। আমি বুঝতে পেরেছি ভিনসেন্টকে এই ছবির বাইরে আর কোনো ছবির মাধ্যমে যোগ্যভাবে উপস্থাপন করা সম্ভব নয়। সে নিজেও হয়েেতা চাইতো তার ছবি এমন কোনো গ্যালারিতেই প্রদর্শিত হোক। তাই তার গৌরবের জন্য অবশ্যই আমাকে এটি হাতছাড়া করতে হচ্ছে।’’
জোহান্না বংগার হয়তো শুরু থেকেই ব্যাকরণ মানা অর্থাৎ তথাকথিত শিল্পানুরাগী বা উৎসাহী ছিলেন না। কিন্তু একজন শিল্পীর সৃষ্টিকর্মের প্রেমে ও ভক্তিতে, তিনিই ভিনসেন্ট ভ্যান গঘের শিল্পকর্মের অন্যতম সেরা কিউরেটর, রক্ষক এবং প্রবর্তক হয়েছিলেন।

তথ্যসূত্র: ওয়েবজিন আর্টিস্টোরি-র মার্চ ২০১৮ সংখ্যায় প্রকাশিত The Woman Who Saved Vincent Van Gogh রচনার মাহমুদ আলম সৈকত কৃত অনুবাদ।

x