যানবাহন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের গলদ

সড়ক দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে বিশেষজ্ঞের অভিমত

মীর আসলাম

বৃহস্পতিবার , ২ আগস্ট, ২০১৮ at ৪:৪০ পূর্বাহ্ণ
50

কোনো ভাবে থামছে না সড়ক দুঘর্টনায় হতাহত মানুষের স্বজনদের কান্না। প্রতিদিনই কোনো কোনো এলাকায় দুঘর্টনায় পতিত হয়ে অথবা গাড়ী চাপায় মারা যাচ্ছে সাধারণ মানুষ। গুরুতর আহত অবস্থায় চিকিৎসার জন্য যেতে হচ্ছে বিভিন্ন হাসপাতালে। কেউ কেউ দীর্ঘ চিকিৎসার পর সারা জীবনের জন্য পঙ্গুত্ববরণ করে ফিরতে হচ্ছে বাড়িতে।

বিশেষজ্ঞদের অভিমত গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাটে খোঁড়াখুঁড়ির কারণে খানা খন্দকে ভরা অপ্রশস্ত সড়কে ওভারটেক করে চালকদের আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা, ফিটনেসবিহীন গাড়ি ও অপরিপক্ব চালকদের কারণে যানবাহন চলাচলকে ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। সাধারণ মানুষের অভিযোগঅদক্ষ যানবাহন চালকদের বেপরোয়া গাড়ি চালানো ও লক্কর মার্কা গাড়ি নিয়ে অন্যের গাড়ির আগে যাওয়ার কারণে বেশিরভাগ দুঘর্টনা ঘটছে। বিভিন্ন সড়ক পথে প্রতিদিনের চলাচলকারী যাত্রী সাধারণ ও সাধারণ মানুষের সাথে কথা বলে জানা যায়, প্রতিদিনের দুঘর্টনায় মানুষের প্রাণ গেলেও এই নিয়ে মামলা করার আগ্রহ থাকে না ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের। হতাহতের স্বজনরা অনেকেই মনে করেন মামলা করলে হয়রানি ও আর্থিক উভয় দিকে ক্ষতির শিকার হতে হবে। সচেতন মহলের মতে স্বজনহারা মানুষের এই ধারণায় ঘাতক চালকরা অধরা থেকে যায়।

বিভিন্নস্থানে সংগঠিত দুঘর্টনার প্রত্যক্ষদর্শীরা বলেছেনকোনো কোনো ঘটনায় ঘাতকরা ঘটনাস্থলে প্রতিবাদি মানুষের কবলে পড়লেও তাৎক্ষণিক যানবাহন শ্রমিক সংগঠনের নেতৃবৃন্দ ও তাদের নেপথ্যে থাকা শক্তির মদদে ঘাতকরা নিরাপদ অবস্থানে চলে যেতে সক্ষম হয়। অবশ্য এসব ঘটনায় কিছু ব্যতিক্রমী প্রতিবাদী কর্মসূচিও দেখা যায় বিভিন্ন সময়। এ ধরণের কর্মসূচি সাধারণত দেখা যায়দেশের স্বনামধন্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, অথবা আলোচিত, খ্যাতিমান কোনো ব্যক্তি সড়ক দুঘর্টনায় পতিত হওয়ার ঘটনায়।

গত শনিবার রাজধানীর কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালের সামনে শহীদ রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী বাস চাপায় মারা যায়। ঘটনা শুনে রাজধানী জুড়ে ক্ষোভে ফেটে পড়ে বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। বিক্ষুব্ধ শিক্ষার্থীদের সাথে এই ঘটনায় প্রতিবাদী হয়ে উঠে সাধারণ মানুষও। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের পরিবর্তে বেফাঁস মন্তব্য করে বেকায়দায় পড়েন নৌমন্ত্রী শাহজাহান খান। সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে তাঁকে উক্ত মন্তব্যের জন্য শাসানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকেও দুর্ঘটনা রোধ ও ঘটনা তদন্তে কিছু উদ্যোগ নেয়ার কথা জানানো হয়। গঠন করা হয়েছে দুই শিক্ষার্থীর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি। এদিকে এ ঘটনাটি সামনে এনে সড়ক দুর্ঘটনা রোধে আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)। এর আগে চট্টগ্রামের পায়েল নামের এক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীকে চাপা দেয় একটি গাড়ি। আহতাবস্থায় তাকে হাসপাতালে না পাঠিয়ে পানিতে ফেলে হত্যার অভিযোগ উঠে ঘাতকদের বিরুদ্ধে। এ ঘটনা নিয়েও চলছে সচেতন মহল ও শিক্ষার্থীদের প্রতিবাদ আন্দোলন। সচেতন মহলের মতেঅতীতের এ ধরণের ঘটনা প্রবাহ পর্যালোচনায় দেখা যায়এ ক্ষেত্রে প্রতিবাদী মানুষের মাঝে উত্তেজনা থাকে সাময়িক। যদিও বিচ্ছিন্ন এসব প্রতিবাদ আন্দোলন থেকে তেমন সুফল আসে না। আন্দোলন প্রতিবাদ ধামাপড়ে যায় অদৃশ্য শক্তির ইশারায়। উল্লেখ্য, চলচ্চিত্রকার তারেক মাসুদ ও চলচ্চিত্রগ্রাহক ও সাংবাদিক মিশুক মুনীর ২০১১ সালের ১৩ আগস্ট মানিকগঞ্জের জোঁকা এলাকায় সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হন। ২০১৪ সালের ২৯ নভেম্বর বাসসের সাবেক প্রধান সম্পাদক ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক, আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক জগলুল আহমেদ চৌধুরী কারওয়ানবাজার এলাকায় বাস থেকে নামতে গিয়ে পেছনের চাকায় পিষ্ট হয়ে নিহত হন। এ নিয়ে বেশ কিছুদিন সচেতন মহল প্রতিবাদি ছিলেন। পরে অবশ্য ধামাচাপা পড়ে যায়।

এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম ছিল গত ১৯৮৯ সালের একটি সড়ক দুর্ঘটনা। ওই ঘটনাটি ছিল দৈনিক সংবাদের বার্তা সম্পাদক মোজাম্মেল হোসেন মন্টু মতিঝিল এলাকায় একটি বেপরোয়া গাড়ির ধাক্কায় নিহত হওয়ার ঘটনা। তাকে চাপা দেয়া গাড়িটি ছিল বাংলাদেশ বেভারেজ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের মালিকানাধীন। ১৯৯১ সালে এই ঘটনায় নিহত ব্যক্তির স্ত্রী রওশন আরা ক্ষতিপূরণ চেয়ে গাড়ির মালিকের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেন। ২৫ বছর পর ২০১৪ সালের ২০ জুলাই সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মন্টুর পরিবারকে ৩ কোটি ৫২ লাখ টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদেশ প্রদান করেন নিম্ন আদালত। যেই রায় পরবর্তীতে বহাল রাখেন আপিল বিভাগ। আইনবিদদের মতেসড়ক দুর্ঘটনায় নিহত কাউকে এই বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ দেয়ার আদালতের এই রায় দেশের মধ্যে একটি দৃষ্টান্ত।

তবে নিরাপদ সড়ক প্রতিষ্ঠার দাবিতে সোচ্ছার একটি সংগঠন এখনো মানুষকে আশান্বিত করছে বলে মন্তব্য করেছেন সচেতন মহল। সড়ক দুঘর্টনায় নিজের প্রিয়তমা স্ত্রীকে হারিয়ে বেশ কয়েক বছর ধরে নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা) শিরোনামে আন্দোলন করে আসছেন এই সংগঠনটি নিয়ে চিত্র নায়ক ইলিয়াস কাঞ্চন।

তিনি সড়ক দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানমূলক গবেষণা করে দায়ী করেছেন অশিক্ষিত চালক, ত্রুটিপূর্ণ যানবাহন, দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা, জনগণের অসচেতনতা, অনিয়ন্ত্রিত গতি, আইনের যথাযথ প্রয়োগের অভাবকে। দুঘর্টনারোধে তিনি অভিমত দিয়েছেন সড়ক দুর্ঘটনা রোধ করতে হলে হতাহতদের জন্য ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করতে হবে। তবে ক্ষতিপূরণ আদায় করতে হবে দায়ি চালক ও গাড়ির মালিকের কাছ থেকে। এসব ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হলে দুঘর্টনা অনেকাংশে কমে আসবে বলে তিনি অভিমত ব্যক্ত করেন।

জানা যায়, ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে সড়ক দুর্ঘটনা অর্ধেকে নামিয়ে আনার সংকল্প করেছিল বাংলাদেশ । এ নিয়ে জাতিসংঘের সাথে অঙ্গীকারপত্রে সইও করে বাংলাদেশ। এক পরিসংখ্যনে জানা যায়২০১৪ সালে সড়ক দুর্ঘটনা ঘটেছিল ৫ হাজার ৯২৮টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের সংখ্যা ৮ হাজার ৫৮৯ জন। আর আহত হয়েছিলেন ১৭ হাজার ৫২৪ জন। বাংলাদেশ যাত্রী কল্যাণ সমিতির ‘বাংলাদেশের সড়ক দুর্ঘটনা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদন ২০১৫’অনুযায়ী২০১৫ সালে বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আট হাজার ৬৪২ জন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন ২১ হাজার ৮৫৫ জন। মোট দুর্ঘটনা হয়েছে ছয় হাজার ৫৮১ টি। এসব দুর্ঘটনায় নিহতের মধ্যে রয়েছেন প্রায় ৫২ ভাগই পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তি। সংশ্লিষ্ট সূত্র মতেএই জরিপের পরবর্তী সময়ের দুঘর্টনার ভয়াবহতা আরো বেশি। এসময় দুঘর্টনা বেড়ে যাওয়ার কারণ জানতে চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের প্রফেসর ড, মুহাম্মদ ওমর ইমাম আজাদীকে বলেনযানবাহন ব্যবস্থাপনায় বড় ধরণের গলদ রয়েছে। এ সেক্টরের সাথে সংশ্লিষ্ট সকল বিভাগ চলছে মনগড়া নিয়মে। তিনি দুঘর্টনার জন্য সড়ক ব্যবস্থাপনায় থাকা সব কর্তৃপক্ষ, অপরিপক্ক চালক, চালকদের আগে যাওয়ার প্রতিযোগিতা ও ফিটনেস বিহীন গাড়ি, বিআরটিএ’র সুষ্ঠু নীতিমালার অভাবকে দায়ি করেছেন।

যোগাযোগ ব্যবস্থা নিয়ে কাজ করা এই বিশেষজ্ঞের মতেসড়ক ব্যবস্থাপনায় থাকা যেসব কর্তৃপক্ষ রয়েছে তাদের মধ্যে কারো সাথে কারো সমন্বয় নেই। সমন্বয়হীনতার কারণে আজ সব গুরুত্বপূর্ণ রাস্তাঘাট খোঁড়াখুঁড়ির কারণে খানা খন্দকে ভরে গেছে। যানবাহন চলাচল ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেনবিআরটিএ চলছে মনগড়া নিয়মে, তাদের হাতে সুষ্ঠু কোনো পরিকল্পনা নেই। রাস্তায় চলাচল করছে ফিটনেসবিহীন গাড়ি। সুযোগ পাচ্ছে লাইসেন্সবিহীন অপরিপক্ক চালক। এঅবস্থায় দুর্ঘটনা বাড়ছে উদ্বেগজনক হারে। তিনি মনে করেনএ পরিস্থিতি উত্তরণে সড়ক ব্যবস্থাপনায় সুষ্ঠু ও বাস্তবমুখী সমন্বিত পরিকল্পনা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি।

x