যানবাহনে সিএনজি কনভার্সন ব্যবসায় মন্দা

চট্টগ্রামসহ সারা দেশে ৮০ ভাগ কারখানা বন্ধ ।। তিন হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে ভাটা

সোহেল মারমা

শনিবার , ২১ জুলাই, ২০১৮ at ৪:৪৪ পূর্বাহ্ণ
181

পরিবেশবান্ধব জ্বালানি হিসেবে যানবাহনে সিএনজি (সংকুচিত প্রাকৃতিক গ্যাস)’র ব্যবহারে আগ্রহ কমছে। এতে যানবাহনগুলোতে জ্বালানি তেল থেকে সিএনজি কনভার্সন বা রূপান্তর ব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিচ্ছে। ইতিমধ্যে চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ৮০ ভাগ কারখানা বন্ধ হয়েছে। এখাতে ব্যবসায়ীদের অন্তত ৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগে ভাটা পড়ছে। মূলত সিএনজি’র দাম বৃদ্ধি ও কৌশলগত কারণেই এব্যবসায় মন্দাভাব দেখা দিয়েছে বলে গতকাল আজাদীকে জানিয়েছেন সিএনজি স্টেশন মালিকদের সংগঠন ‘বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন’র সাধারণ সম্পাদক ফারহান নূর। বর্তমানে দামের দিক দিয়ে তেলের সাথে গ্যাসের খুব একটা পার্থক্য না থাকায় মালিকরা নতুন করে গাড়ি কনভার্সন করছে না বলে জানান ফারহান নূর।

এছাড়া যানবাহনে জ্বালানি হিসেবে সিএনজির বদলে এলপিজি নিয়ে সরকার যে কৌশল নির্ধারণ করেছে এর সাথে দ্বিমত পোষণ করেন সিএনজি ব্যবসায়ীদের এ নেতা। ফারহান নূর বলেন, যানবাহনে পরিবেশ বান্ধব জ্বালানি হিসেবে সিএনজির ব্যবহার ভালোভাবেই চলে আসছিল। কিন্তু সরকারের পলিসি হঠাৎ এ খাতে সমস্যা সৃষ্টি করছে। ব্যবসায়ীরা সিএনজিতে থাকতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। তিনি বলেন, সরকারের নানামুখী পদক্ষেপের কারণে বর্তমানে যানবাহন রূপান্তরের পরিমাণ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইতিমধ্যে ৮০ ভাগ সিএনজি কনভার্সন কারখানা বন্ধ হয়ে গেছে। সিএনজি খাতে ব্যবসায়ীদের ৩ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ রয়েছে বলে জানিয়েছেন ফারহান।

সারাদেশে মাত্র ৪ দশমিক ৭৬ শতাংশ গ্যাস সিএনজিতে ব্যবহার হয়। আবার এ সামান্য পরিমাণের গ্যাস থেকে সরকারের মোট রাজস্বের ২২ দশমিক ৮ শতাংশ সিএনজি খাত থেকে আসছে। দেশের অর্থনীতিতে এত বড় অবদানের পরও সরকার কেন এ খাতকে নিরুৎসাহিত করছে তা বোধগম্য নয় বলে জানিয়েছেন “বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশস”র সাধারণ সম্পাদক। এ ব্যবসাটি যখন শুরু হয় তখন সরকারি এক প্রজ্ঞাপনে বলা ছিল, দামের দিক দিয়ে অকটেনের তুলনায় সিএনজি’র পার্থক্য চারভাগের এক ভাগ হবে। অর্থাৎ বর্তমানে অকটেন ৮৯ টাকা হলে সিএনজি’র দাম ২২ টাকা হওয়ার কথা। কিন্তু সেভাবে না গিয়ে সিএনজির দাম বাড়ানো হয়েছে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাংলাদেশের বায়ু দুষণের মাত্রা ভয়াবহ পর্যায়ে উপনীত হওয়ার প্রেক্ষিতে সরকারি সিদ্ধান্তে ১৯৯৯২০০০ সাল থেকে বাংলাদেশে বিশেষ করে হালকা গাড়িতে অকটেন ও পেট্রোলের পাশাপাশি বিকল্প জ্বালানী হিসেবে সিএনজি ব্যবহারের সূচনা ঘটে। সিএনজি জ্বালানী নির্ভর পরিবহন অবকাঠমো নির্মাণ, তদারকি এবং বাণিজ্যিকভাবে পরিচালন ও সম্প্রসারণের দায়িত্ব বর্তায় আরপিজিসিএল (রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানী )’র উপর।

বেসরকারিভাবে সিএনজি ফিলিং স্টেশন ও কনভারসন ওয়ার্কসপ স্থাপনের অনুমোদন, মনিটরিং এবং মোবাইল কোর্টও পরিচালনার করে সংস্থাটি।

সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে বর্তমানে প্রায় আড়াই লাখ গাড়িতে সিএনজি কনভার্সন হয়েছে। এসব কনভার্টেড গাড়ির মধ্যে হালকা গাড়ির যেমন প্রাইভেট কার, মাইক্রোবাস, জীপ’র সংখ্যা বেশি।

চট্টগ্রামে আরপিজিএল’র অনুমোদনকৃত ৬০ টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং ২১ টি কনভার্সন ওয়ার্কসপ আছে।

বাংলাদেশ সিএনজি ফিলিং স্টেশন অ্যান্ড কনভার্সন ওয়ার্কশপ ওনার্স অ্যাসোসিয়েশসনের হিসাব বলছে, চট্টগ্রামসহ সারাদেশে ৫৮৫টি সিএনজি স্টেশন, ১৭০টি কনভার্সন ওয়ার্কশপ এবং প্রায় ১০ লাখ সিএনজি চালিত গাড়ি রয়েছে। সারাদেশে মোট যানবাহনের ৪০ শতাংশ সিএনজিতে চলছে।

নগরীর কনভার্সন কারখানাগুলোর কয়েকটিতে ঘুরে দেখা গেছে, বড়বড় নামীধামী কোম্পানীগুলোর কনভারশন কারখানার ব্যবসায়ও মন্দাভাব দেখা দিয়েছে।

আগ্রাবাদ এঙেস রোডে ৭ থেকে ৮টির মতো কনভারশন কারখানা আরপিজিসিএল’র তালিকায় আছে। কিন্তু সরেজমিন দুয়েকটি ছাড়া বাকীগুলোর কোন অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। এরমধ্যে ইন্ট্রাকো সিএনজি কনভার্সন, মাওলানা ফিলিং স্টেশনের অস্তিত্ব পাওয়া যায়।চট্টগ্রামে সবচেয়ে বড় কনভার্সনের কাজ হয়ে থাকে নাভানা সিএনজিতে।

প্রতিষ্ঠানটির চট্টগ্রামের ব্যবস্থাপক মুজিবুল হক গতকাল আজাদীকে বলেন, এক থেকে দেড় বছর আগে প্রতিষ্ঠানটিতে প্রতি মাসেই পেট্রোল ও অকটেন চালিত ৩০০/৪০০ গাড়ি সিএনজিতে কনভার্সন করা হত। বর্তমানে তা অনেকে কমে এসেছে। এখন কোন কোন মাসে ৭/৮ টি কনভারশনের জন্য পাওয়া যায়।

কিছু লোকালভাবেও সিএনজি কনভার্সনের কাজ অনেকেই করছে। তবে এগুলো অনুমোদনহীন। এছাড়া আনাচে কানাচে অবৈধভাবে সিলিন্ডার টেস্টের দোকান গড়ে উঠছে। তাদের কোন লাইসেন্স নাই। মানহীন কাজের কারণে তাতে বিভিন্ন সময় সিলিন্ডারে দুর্ঘটনা ঘটছে।

আরপিজিসিএল কর্তৃপক্ষও তাদের বিরুদ্ধে কোন তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করতে দেখা যায়নি। এতে করে সামগ্রিক দিক দিয়ে বেশ কয়েক মাস ধরেই এ ব্যবসাটিতে মন্দাভাব দেখা দিয়েছে বলে জানান মুজিবুল হক। ইন্ট্রাকো সিএনজি কনভার্সনের ব্যবস্থাপক খায়রুল বাশার গতকাল আজাদীকে বলেন, এক সময় ব্যবসাটি ভালোই ছিল। প্রতি মাসেই ১৫ থেকে ১৬ টি করে কনভারশন করা হত। কিন্তু এখন গাড়ী পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। গত মাসে কোম্পানীটি মাত্র ৪টি গাড়ী সিএনজিতে কনভারশন করেছে।

গত ৭/৮ মাস ধরে এ ব্যবসায় মন্দা বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন তিনি। এছাড়া এলপিজি বা অটোগ্যাস নিয়ে সবার মাঝে একটি দ্বিধাদ্বন্ধ বিরাজ করছে বলে জানিয়েছেন খায়রুল বাশার।

এর পাশাপাশি হাইব্রিড গাড়ি আমদানি বেড়ে যাওয়ায় এ ব্যবসায় মন্দা বিরাজ করছে। সাধারণ হাইব্রিড গাড়িগুলোতে সিএনজি কনভারশন করা থাকে।

চট্টগ্রামে সাউদার্নসহ অন্যান্য বড় বড় কোম্পানীগুলোরও একই অবস্থা বলে জানিয়েছেন ইন্ট্রাকো’র এ কর্মকর্তা।

আরপিজিসিএল সূত্রে জানা গেছে, গত ২০১৬১৭ অর্থবছরে মাত্র ১০ হাজার ৯১৬টি যানবাহন সিএনজিতে কনভারশন করা হয়েছে। এরমধ্যে আরপিজিসিএল করেছে মাত্র ৭৮টি যানবাহন। এর আগের অর্থবছরে ছিল ৩২ হাজার ২৮৯টি।

গত অর্থবছরে (২০১৭১৮) আরপিজিএল নিজস্ব কারখানায় ৩০টি যানবাহন রূপান্তরিত করেছে।

চট্টগ্রামসহ সারাদেশে আরপিজিসিএল’র ১টিসহ মোট ৫৫০টি সিএনজি ফিলিং স্টেশন এবং ৩৪টি যানবাহন রূপান্তর কারখানা চালু আছে। এ সকল সিএনজি ফিলিং স্টেশন থেকে দৈনিক ৫ লাখ যানবাহনে সিএনজি সরবরাহ করা হয়ে থাকে। তাতে প্রতিদিন প্রায় ১২৪ মিলিয়ন ঘনফুট প্রাকৃতিক গ্যাস ব্যবহার হচ্ছে। যা দেশের মোট গ্যাস ব্যবহারের প্রায় ৫ শতাংশ।

দেশে বর্তমানে রূপান্তরিত যানবাহনের সংখ্যা হচ্ছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ২৫টি (২০১৬১৭ অর্থবছরের বার্ষিক প্রতিবেদন)

এদিকে সরকার সিএনজি’র ব্যবহার কমিয়ে যানবাহনে এলপিজি বা অটোগ্যাসের ব্যবহার করার লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু অটোগ্যাসের দাম নির্ধারণ বা ফিলিং স্টেশন না থাকাসহ অন্যান্য দিকগুলো এখনো অপ্রস্তুত। আরপিজিসিএল সূত্র বলছে, গাড়িতে জ্বালানি হিসেবে ব্যবহৃত সিএনজি’র ব্যবহার কমিয়ে এলপিজি ভিত্তিক অটো গ্যাসচালিত গাড়ির ব্যবহার বাড়াতে অটোগ্যাসে রূপান্তর প্রক্রিয়া সহজ করতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সরকারের পরিকল্পনায় চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায় অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন স্থাপন ও কনভারসন কারখানা তৈরির প্রক্রিয়া চলছে।

জ্বালানি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, সারা দেশে ৫০০ অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন এবং ২৫টি অটোগ্যাস ওয়ার্কশপ স্থাপন করার পরিকল্পনা রয়েছে। এ খাতে ব্যবসা করতে আগ্রহীদের অটোগ্যাস ফিলিং স্টেশন স্থাপনে ডিলারশিপ অনুমোদন প্রক্রিয়া চলছে। এছাড়া সিএনজি স্টেশন মালিকদের নিজেদের স্টেশনকে অটোগ্যাস স্টেশনে রূপান্তর করার সুযোগ দেয়া হচ্ছে।

এদিকে আমদানি নির্ভর হওয়ায় এলপিজিভিত্তিক অটোগ্যাসের দাম নিশ্চিতভাবে সিএনজি থেকে বেশি পড়বে বলে জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা। এছাড়া প্রতিবেশী কোনো দেশে অটোগ্যাস জনপ্রিয় হয়নি। আর সিএনজির তুলনায় অটোগ্যাস পরিবেশবান্ধবও নয়। এ ছাড়া অটোগ্যাসে গাড়ি রূপান্তরেও অনেক বেশি খরচ পড়বে।

এজন্য যতদিন গ্যাসের সরবরাহ আছে ততদিন অন্তত সিএনজি পদ্ধতি চালু রাখাই পরিবেশবান্ধব কাজ হবে বলে মনে করছেন ব্যবসায়ীরা।

x