যানবাহনে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহার রোধে আইনি বাধ্যতা ও সম্মিলিত প্রচেষ্টা চাই

বৃহস্পতিবার , ১৪ মার্চ, ২০১৯ at ৬:৪৩ পূর্বাহ্ণ
34

বাসে চড়ে চলাচল করে ঢাকার ৬৫ শতাংশেরও বেশি মানুষ। কমবেশি একই চিত্র দেশের সবখানেই। যাতায়াতের প্রধানতম এ বাহনই দিন দিন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠছে। বিশেষ করে সিএনজি (কমপ্রেস্‌ড ন্যাচারাল গ্যাস) ফুয়েল সিস্টেমে চলা বাসগুলো দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর জরিপ বলছে, সিএনজিতে চলা ৪৪ শতাংশ বাসের গ্যাস সিলিন্ডারের মেয়াদ ঠিক নেই। সিএনজি চালিত অন্যান্য যানবাহনেরও বড় অংশ চলছে মেয়াদহীন গ্যাস সিলিন্ডারে। রূপান্তরিত প্রাকৃতিক গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড (আর পি ডি সিএল) এর তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে সিএনজি চালিত যানবাহনের সিলিন্ডারের অর্ধেকই রয়েছে মেয়াদহীন অবস্থায়। সম্প্রতি পত্রিকান্তরে এ খবর প্রকাশিত হয়। উপরোক্ত খবর থেকে প্রতীয়মান হয়, দেশের দেড় লাখ গাড়িতে মেয়াদোত্তীর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার রয়েছে। যদি তা হয়, তাহলে বলতে হয়,- এসব যানবাহন চলাচল করছে বিস্ফোরণমুখ বোমা নিয়ে। তাই মাঝে মধ্যে বিস্ফোরণও ঘটছে। ঘটছে প্রাণহানির ঘটনাও এসব দুর্ঘটনায়। একটি গ্যাস সিলিন্ডারের মেয়াদ থাকে পাঁচ বছর। এরপর নিরাপত্তার জন্যই মেয়াদোত্তীর্ণ রিটেস্টিং করার নিয়ম রয়েছে। প্রয়োজন হলে সিলিন্ডার বদলে ফেলতে হয়। গাড়িতে স্থাপন করা গ্যাসের সিলিন্ডার পরীক্ষা করে বিস্ফোরক অধিদপ্তরে রিপোর্ট জমা দেওয়ার নিয়মও আছে। কিন্তু তা মানা হচ্ছে না। সচেতনতার অভাবে গাড়িচালক ও ব্যবহারকারী নিজেই জানেন না যে তার গাড়িটি বিপজ্জনক বোমা হয়ে উঠেছে। গাড়িতে সিলিন্ডার নিয়ে এই যে হেলাফেলা চলছে তা সত্যিই দুর্ভাগ্যজনক। এ অবস্থায় পুলিশ ও বিআরটিএসহ দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলোর উচিত গাড়ির রুট পারমিট ও ফিটনেস সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে গ্যাস সিলিন্ডারের মেয়াদ দেখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা, দুর্ঘটনার বিপদ প্রতিরোধের স্বার্থেই এটা করা দরকার। তা না হলে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ত্রুটিপূর্ণ সিলিন্ডারের কারণে যে কোন সময় ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনা ঘটার ঘটনা রোধ করা যাবে না। এটা যে পুলিশ ও দায়িত্বশীল প্রতিষ্ঠানগুলো জানে না বা বুঝে না, তা নয়। তারপরও কেন এমন অসচেতনতা ও উদাসীনতা নিয়ে বসে রয়েছে তা আমাদের বোধগম্য নয়। দায়িত্বশীলদের এই অসচেতনতা ও উদাসীনতা শুধু নয়, এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের খামখেয়ালি মনোভাব। অবাক হওয়ার মতো বিষয় যে, সিএনজি চালিত গাড়ির ফিটনেস নেওয়ার সময় গ্যাস সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার বাধ্যতামূলক কোনো আইন নেই। সিলিন্ডার পরীক্ষার কেন্দ্রও রয়েছে হাতে গোনা কয়েকটি মাত্র। এমন অবস্থায় সিলিন্ডার পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে যেমন বাধ্য করা যাচ্ছে না, তেমনি এ বিষয়ে কোন তাগিদও অনুভব করছেন না গাড়ির মালিকেরা। আমরা জানি না এমন নিয়ম-শৃঙ্খলাহীন কোন খাত এভাবে চলে কিনা? এ ক্ষেত্রে আর পিডিসি এল তিন দফা সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে আছে, ফিটনেস দেয়ার আগে বিআরটিএর গাড়ির সিলিন্ডার ও সিএনজি কনভার্সনের সনদ দেখার বিষয়টি বাধ্যতামূলক করা। বিআরটিএর আইনে সিলিন্ডার রিটেস্টের বিষয়টি বাধ্যতামূলক। এটি যদি কেউ না মানে তা হলে শাস্তির ব্যবস্থা রাখা। পুলিশ রাস্তায় গাড়ির সিলিন্ডার রিটেস্টের সনদ, সিএনজি কনভার্সনের সনদ ও বিআরটিএর ফিটনেস সনদ পরীক্ষার ক্ষমতা পাবে। কিন্তু দুঃখজনক হলো, এর কোনটিই মানা হচ্ছে না।
রাজধানী ঢাকায় ও বন্দর নগরী চট্টগ্রামে চলাচলকারী বেশির ভাগ প্রাইভেট কার এখন সিএনজিতে চলে। কেবল প্রাইভেট কার নয়; বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পিকআপ ভ্যান, জিপ, মাইক্রোবাস, যাত্রীবাহী ‘লেগুনা’সহ অনেক বাস-মিনিবাসও চলে সিএনজিতে। কিন্তু সব গাড়ির সিলিন্ডার মানসম্মত কিনা বা নিয়মিত পরীক্ষা করা হয় কিনা, তা তদারকির কোন ব্যবস্থা নেই। তাই আমাদের জিজ্ঞাসা-এসব গণপরিবহনের যাত্রীদের জীবন বিপন্ন হলে তার দায় কে নেবে? যাত্রীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিআরটিএ, ট্রাফিক পুলিশ, সড়ক পরিবহন ও সেতু মন্ত্রণালয়কে এদিকে দৃষ্টি দিতে হবে। অন্যদিকে প্রাইভেট কারের মালিকদের নিজেদের স্বার্থেই গ্যাস সিলিন্ডার ও অন্য সরঞ্জামের মান রক্ষা করা উচিত। এ ছাড়া ফিলিং স্টেশনে গাড়িতে গ্যাস নেওয়ার সময় প্রত্যেকেরই যানবাহন থেকে নেমে নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়ানো দরকার। গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহারে সংশ্লিষ্ট সকলকে দায়িত্বশীলতার প্রমাণ দেওয়া জরুরি। সিলিন্ডারের আদর্শ মান ও নিরাপদে যাতায়াত নিশ্চিতকরণে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আরও বেশি দায়িত্বশীল হওয়া দরকার। বিশেষ করে ফিটনেস সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বিআরটিএ’র কঠোর নজরদারি সিলিন্ডারের মান নিয়ন্ত্রণে যথেষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে। উপরন্তু সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ রাস্তায় গাড়ির কাগজপত্র যাচাই করার সময় সিলিন্ডারের মেয়াদও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখতে পারে। আমাদের বিশ্বাস, এতে মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার ব্যবহারে গাড়ির মালিকের সচেতনতা বেড়ে যাবে। মোট কথা, সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের সম্মিলিত প্রচেষ্টা অব্যাহত থাকলে মেয়াদোত্তীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ গ্যাস সিলিন্ডার ব্যবহার রোধ করা আদৌ কঠিন হবে না।

x