যাত্রীবান্ধব নয়, সিএনজি অটোরিক্সা ছিনতাইবান্ধব

জামিনে ফিরে পুরনো পেশায়

ঋত্বিক নয়ন

বুধবার , ৭ মার্চ, ২০১৮ at ৪:১১ পূর্বাহ্ণ
105

যাত্রীবান্ধব হতে না পারলেও সিএনজি অটোরিক্সা ইতোমধ্যেই ছিনতাইবান্ধব হিসেবে নাম কুড়িয়েছে। নগরজুড়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ছিনতাইকারীরা সিএনজি অটোরিক্সাযোগে। নামে সিএনজি অটোরিক্সা হলেও জ্বালানি হিসেবে ছিনতাইকারীরা ব্যবহার করছে অকটেন। তারা এতটাই সুচতুর যে রেকি করা থেকে ছিনতাই করে পালিয়ে যাওয়া পর্যন্ত নির্দিষ্ট ছক মেনে চলে তারা। শুধু তাই নয়, ছিনতাইকাজে ব্যবহৃত সিএনজি অটোরিক্সাগুলো নির্দিষ্ট থাকে। একই ভাবে সিএনজি অটোরিক্সা মেরামতের জন্য গ্যারেজও নির্দিষ্ট থাকে। ইতোপূর্বে পুলিশের কাছে তথ্য ছিল ভোর ও সন্ধ্যা ছিনতাইয়ের উপযুক্ত সময়। তবে সিএমপির ঊর্দ্ধতন কর্মকর্তাগণ জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময়ে ধরা পড়া ছিনতাইকারীরা দু’টো তথ্য দিয়েছে। ১) কাজের নির্দিষ্ট সময় সবসময় মানা হয় না। ২) তারা কাজের স্পট নির্দিষ্ট করার আগে পালানোর পথটা নির্দিষ্ট করে। নগর জুড়ে বেপরোয়া ছিনতাইকারীদের দৌরাত্ম্য প্রতিরোধে কাজ করা সিএমপির অতিরিক্ত উপ পুলিশ কমিশনার (দক্ষিণ) শাহ মো: আবদুর রউফ আজাদীকে বলেন, সিএনজি অটোরিক্সাই এখন ছিনতাইকারীদের প্রধান বাহন। ইতোমধ্যে ছিনতাই কাজে ব্যবহার করা ৮/১০ টি সিএনজি অটোরিক্সা আটক করেছে পুলিশ। গত সোমবার সদরঘাট থানায় আটক হয়েছে তিনটি সিএনজি অটোরিক্সা। এছাড়া ধরাও পড়েছে বেশ কয়েকজন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী। তাদের কৌশল সম্পর্কেও আমরা বেশ কিছু তথ্য পেয়েছি। প্রায় প্রত্যেকেই দেখা যাচ্ছে এক বা একাধিকবার ইতোপূর্বে ধরা পড়েছিল। জেল থেকে ছাড়া পেয়ে আবারো জড়িয়ে পড়েছে ছিনতাই কাজে।

নগরজুড়ে চলছে সিএনজি অটোরিক্সাযোগে ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া তান্ডব। অথচ সিএনজি অটোরিক্সা চালু হওয়ার পর থেকে সাধারণ মানুষ ভেবেছিল পরিবেশ বান্ধব এ পরিবহনটি যাত্রীবান্ধব হয়ে উঠবে। কিন্তু নানা অজুহাতে নিয়মের বেড়াজাল ছিঁড়ে চলছে অটৈারিক্সা মর্জিমাফিক। যাত্রীবান্ধব না হলেও এখন ছিনতাই বান্ধব হিসেবে লোকে অভিহিত করছে সিএনজি অটোরিক্সাকে। রাতেদিনে সমানে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। পথচারী, রিকশা আরোহী থেকে শুরু করে অটোরিকশার যাত্রীরাও ছিনতাইকারীদের কবলে পড়ছে। কারো মোবাইল ফোনসেট, কারো হ্যান্ডব্যাগ টেনে নিচ্ছে টানা পার্টি। বড় ছিনতাইয়ের ঘটনায় থানায় মামলা হলেও বেশির ভাগ ঘটনায় ভুক্তভোগীরা থানা পুলিশের কাছে যায় না। ফলে অনেক ছিনতাইয়ের ঘটনার কোন রের্কডও থাকছে না। গোয়েন্দা পুলিশের একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা বলেন, মহানগরে প্রতিদিন গড়ে ১৫টি করে ছিনতাই হচ্ছে। এসব ঘটনায় বেশির ভাগ ভুক্তভোগীই থানায় অভিযোগ করতে যায় না। আর গেলেও পুলিশ মামলা নিতে গড়িমসি করে। মামলা রেকর্ড করলে তদন্ত করতে হবে, এতে পুলিশের পরিশ্রম বাড়বে। আর মাস শেষে সেরা থানার সেরা অফিসার পুরস্কার নেওয়া যাবে না। এমন মানসিকতা থানা পুলিশের সদস্যরা পোষণ করেন। এ কারণে ছিনতাইকারীরা এখন বেপরোয়া হয়ে গেছে। সরাসরি মামলা দায়ের করার আইনি বাধ্যবাধকতা থাকলেও পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভালো দেখাতেই মূলত ছিনতাইডাকাতির ঘটনায় মামলা রেকর্ড করছে না বলে নিশ্চিত করেছেন নগর পুলিশের দায়িত্বশীল একাধিক কর্মকর্তা।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, আগে অস্ত্র নিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটলেও এখন অটোরিকশা নিয়ে নগরীতে হচ্ছে ছিনতাই। নগরীতে অস্ত্র দেখিয়ে ছিনতাইয়ের ঘটনা কমলেও বেড়ে গেছে এমন ‘টানা পার্টির’ দৌরাত্ম্য। ছিনতাই প্রতিরোধে কাজ করছে এমন একাধিক কর্মকর্তা ছিনতাইকারীদের কৌশল প্রসঙ্গে ধারণা দেন আজাদীকে। তারা বলেন, সিএনজি অটোরিক্সাযোগে ভোর সাড়ে পাঁচটার দিকে বের হন তিনজন। একজন চালকের দায়িত্ব পালন করেন। একজনের দায়িত্ব থাকে ব্যাগ টান দেওয়ার। আর তৃতীয় জন থাকে ব্যাকআপ হিসেবে। চালক ব্যতীত দুই জন যাত্রী বেশে থাকে। বিভিন্ন এলাকায় ঘুরে দেখে কোন সড়কে পুলিশের তৎপরতা আছে, ঐ সড়কে পালানোর সহজ পথটা কতোটা নিরাপদ। এসময় কোন টার্গেটের দেখা পেলে তারা কিছু দূর এগিয়ে গিয়ে পুনরায় ঘুরে আসে এবং চলন্ত অবস্থায় ছোঁ দিয়ে নিয়ে নেয় মোবাইল ফোন, ভ্যানিটি ব্যাগ কিংবা ল্যাপটপ ব্যাগ। ভোর বেলায় রেল, বাস স্টেশনে যাওয়া আসা যাত্রী ও অফিসগামীদের টার্গেট করে ছিনতাইয়ের কাজ করে থাকে।

সন্ধ্যায় ছিনতাইকারীরা সবসময় ফাঁকা রাস্তাকেই বেছে নেয়। যেসব রাস্তায় যানজট হয় সেগুলো তারা এড়িয়ে চলে। কখনো একটি সিএনজি টেক্সি অটোরিক্সা নিয়ে বের হয়, কখনো আবার সামনে পেছনে ব্যাকআপ সিএনজি অটোরিক্সা থাকে। মাঝের সিএনজি অটোরিক্সা যদি ধরা পড়ে যায়, তবে সামনে ও পেছনের সিএনজি অটোরিক্সা থেকে দ্রশুত তাদের সহযোগীরা নেমে জনতার বেশে ধরা পড়া তিন জনকে পালানোর সুযোগ করে দেয়। চালকের উপর সফলতা অনেকাংশে নির্ভর করে বলে ছিনতাইয়ে ব্যবহৃত সিএনজি অটোরিক্সার চালককে হতে হয় দারুণ দক্ষ । এমনিতেই দ্রুত বেগে ছুটতে সিএনজির পরিবর্তে জ্বালানি হিসেবে অকটেন ব্যবহৃত হয়। তার উপর চালক এতটাই বেপরোয়া হয় যে সামনে কোন বাধা বিপত্তিই তারা মানতে চায় না। তাদের একটাই চিন্তা থাকে, কী করে পালাবে। নগরীর জাকির হোসেন রোড, রেয়াজউদ্দিন বাজার তিন পোলের মাথা, সিআরবি, নিমতলা বিশ্বরোড থেকে বারিক বিল্ডিং, ওয়াসা থেকে আলমাস মোড়, সার্সন রোড, চেরাগী পাহাড় মোড় থেকে জামালখান হয়ে গণি বেকারী, চট্টগ্রাম কলেজ এলাকাটি বেশি ছিনতাই প্রবণ এলাকা বলে জানিয়েছেন পুলিশ কর্মকর্তাগন।

পুলিশ কর্মকর্তারা জানান, ছিনতাই করতে গিয়ে যারা ধরা পড়ে, তাদেরকেই তালিকাতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। বিভিন্ন সময়ে তারা কারাগার থেকে ছাড়া পেয়ে পুনরায় এ পেশায় জড়িয়ে পড়ে। ধরা পড়া ছিনতাইকারীদের নিয়ে পুলিশ নগরীতে অটোরিকশা নিয়ে ছিনতাই করা চক্রের ৩০ জনের মতো সদস্যকে চিহ্নিত করেছে, যাদের মধ্যে নয়জন অটোরিকশা চালক। গোয়েন্দা পুলিশের এক কর্মকর্তা বলেন, অটোরিকশা নিয়ে ছিনতাইকারীদের প্রধান অটোচালকরা। তাদের ওপরই মূলত ছিনতাইয়ের কাজটি নির্ভর করে। ইমন, ইউনুস, ফরিদ, শাহজাহান, মোস্তফা ওরফে আকাশ, জাফর, নজরুল, আলতাফ ও ইউসুফ নামে নয়জন চালক মূলত এ ছিনতাইকারীদের মধ্যে অন্যতম। তাদের সঙ্গে আছেন অন্তত আরও ২০ জন। এ ২০ জনের মধ্যে ফরিদ, ভূট্টো, ফিরোজ, জাফর, ইসমাইল, সেলিম অন্যতম বলে জানা যায়। বিভিন্ন সময়ে হাতেনাতে অভিযান করে যাদের ধরা হয়, দেখা যায় তারা অনেকেই আগে গ্রেপ্তার হয়েছিল। জামিনে এসেই তারা আবার ছিনতাইয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে বলে জানান তিনি।

x