যাচ্ছি কোথা!

মোস্তফা কামাল পাশা

মঙ্গলবার , ২৫ জুন, ২০১৯ at ১০:৫৮ পূর্বাহ্ণ
23

খেয়ালের বশেই দৌঁড় আমার। জীবনটাতো খেয়ালের খেলনা! উপরওয়ালা নিজ খেয়ালে মানুষ নামের পুতুল বানিয়েছেন। প্রতি মাইক্রো সেকেন্ডে রক্তমাংসের হাজার পুতুল গড়ছেন। আবার তুলেও নিচ্ছেন প্রকৃতির ভারসাম্য বজায় রাখতে। তিনি পুতুলগুলোর কান্ড দেখছেন! কতো বাহারি কান্ড! কতো কসরত-দড়াবাজি? নিজকে জাহির করা, উপরে তোলার কতো খেলা পুতুলের! এতো আরেক ইতিহাস। হবে কোন একদিন, আজ না। ট্রাজেডি হচ্ছে পুতুলের দড়াবাজি চলতে চলতেই তিনি হঠাৎ টুপ করে তুলে নেন। পুতুলতো সবচে’ রঙিন ও মোটাতাজা হয়ে রঙের পৃথিবীর সবকিছু দখলে নিয়ে থেকে যেতেই চায়। তার আকাঙ্খা, লিপ্সা, লোভ, ভোগের দৌঁড় অবিরাম। কিন্তু কোন ফাঁকে যে উপরঅলা টুপ করে তুলে নেন, ঠিক ঠাহরও হয়না! থেমে যায় দৌঁড়! পড়ে থাকে ভোগ্য-ভোজ্য সবকিছু। কোন নয়া পুতুল এগুলো লুটেপুটে খায়, তার জানা হয়না কখনো! জীবন নামের পুতুল খেলাটা জম্পেস উপভোগ করতে বড্ডো মজা পাই। দৌঁড়টা সনাতন ঘরানার না। দড়ি ছেড়া দামড়া টাইপের। যখন যা ভাল্লাগে তাই করি। বিচক্ষণ বিষয়ীরা হা হা করে উঠেন, “এই করছোটা কী! সাড়ে সব্বোনাশ হয়ে যাবেতো! এভাবে না, এমনভাবে না, ওভাবে করো! দারুণ হবে”! দুচ্ছাই, কেতা পুড়ি! আমি আমার তালে! বিষয়ীদের উপদেশ, পদাঙ্ক ধরে কে চলে? নিজের পথ নিজে বানাই। মাঝপথে আটকাই। একটু থামি, বাঁক বদলাই, আবার নয়া পথ। এভাবে পুতুল জীবনটাতে নানা ছন্দের তার বাঁধি, বাজাই, ছিঁড়ি। দারুণ এঙাইটিং গেম! লাভক্ষতির হিসাব কষে ছোট জীবনটা নষ্ট করার মতো গাধা আমি না। খেয়ালে পাওয়া ফ্রি জীবন খেয়ালেই সিগারেটের ধোঁয়ার মত উড়িয়ে দেব! বেশতো চলছে-তো কী বা কতো হারিয়েছি, আফসোস কীসের? আস্ত একখান পৃথিবী, চোখে মায়া বুলানো প্রকৃতির অপরূপ শোভা, মুক্ত আকাশের বিশাল ছাদ, কারো একার না। সবার, এসব নিয়ে ছোট্ট জীবন পাড়ি দিতে দোষ কী? তো খাস কথায় আসি! গ্রামে একটা ডুপ্লেঙ বাড়ি করতে গিয়ে কাঠামো, ছাদ, সিড়ি সব শেষ করে ফেলে রেখেছি। প্লাষ্টার, ফিনিশিংএর কাজ অসমাপ্ত! কিছু ঘটনায় শেষ করার মনোযোগ ছিঁড়ে গেছে। প্রচুর টাকা ঢেলেছি! অঙ্কটা থাকনা। ইচ্ছে ছিল শেষ সময়টা গ্রামে কাটাবো। তো শেষেরতো কোন ঠিকানা নাই! এখন-তখন যে কোন সময়ে শেষ অঙিজেন নেয়ার কাজ চুকে যেতে পারে। কিন্তু আমার জীবন দর্শনতো সবার না। গ্রামের পড়শীরা পাঁচ বছর ফেলে রাখা বাড়ির কাঠামো দেখে থমকায়, কেউবা আরামে চুক চুক করে! মনে মনে বলে, এই ব্যাটার এতো টাকা মাটিতেই খাবে! তো, খাকনা। মাটিতো কাঁচ, হিরে, প্লাস্টিক ছাড়া সর্বভুক, সবকিছু খায়, মানুষও তার প্রিয় খাবার! একটা অসমাপ্ত বাড়ি খেলে দোষ কী? টাকা আমার, আফসোস ভাই-ব্রাদারের! আজব দুনিয়া! পরিবারের সদস্য সংখ্যা মোটামুটি। মানে ভারী! নয়া নাতিও এসেছে। প্রতিটা ঈদ গ্রামে করা হয়। ভোর মানে সকালে যাওয়া-রাতে ফেরা। দিনভর হৈ- হুল্লোড়! এবার দু’বৌমার কোলে দু’ নাতি পৌনে ছ’মাস ও পৌনে তিনমাসের তুলতুলে পুতুল। তাই এ’বছরে ঝক্কিটা বাড়তি। নাতিরা দারুণ আয়েসপ্রিয়। খাদেম চাই ২৪ ঘন্টা! ওরা কীভাবে আকাশ ছাদের নিচে থাকবে? তাই সপরিবারে যাত্রা বাতিল। আকাশ ছাদের অংশিদার আমি বাড়ি যাই ঈদ জামাতের পর। বড় ছেলে গাড়ি বের করার আগ্রহ দেখালেও না করে দেই। বাড়িতে কিছু মানুষের কাছে প্রচুর গোপন দায়। ওরা অধীর অপেক্ষায়। আবার মেয়েও বাড়তি বোঝা চাপিয়েছে। সব খালাস করে আসতে হবে চুপচাপ। সিএনজিতে বাড়ি পৌঁছাই বারটা নাগাদ। পুরানো বাড়ি জমজমাট। ভাবী অবসরপ্রাপ্ত ব্যাঙ্ক কর্মকর্তা। রমজান মাস বাড়িতেই কাটিয়েছেন। তিন ভাইপো, সবাই প্রতিষ্ঠিত। বৌমা ও তিনজোড়া নাত নাতনি মিলে দারুণ হৈ চৈ। পড়শি ও মেহমানেরও ভিড়। নগরীর মাত্র ৩০ কিলো দূরে হাটহাজারিতেই আমাদের বাড়ি। পাতলা ট্রাফিকে গাড়িতে ৩৫/৪০ মিনিটের দূরত্ব। পরিবেশ নগর থেকেও বাজে। দ্বেষ, হিংসা, লোভ, ঘোলা রাজনীতির দুষণ গুরুতর! আমাদের একটা হাজার একরের ওয়াকফ এষ্টেট আছে। রমজান আলী চৌধুরী ওয়াকফ এষ্টেট। প্রচুর শরিক, বিভেদ ২৪ ঘন্টা। কিছু শরিকের অণু শরিকের ক’জন অধুনালুপ্ত ডেসটিনির সাথে গোপনে গাছ লাগানোর লিজ চুক্তি করে মোটা টাকা হাতায়। সে থেকে বিরোধের শুরু। ডেসটিনি নানা লোভনীয় প্যাকেজে অগ্রিম গাছ বিক্রি করে লাখ লাখ মানুষের পকেট কাটে। সমর্থন দেয় ওই অণুগ্রুপের পকেট সমবায়, শেয়ার ও কমিশনভোগী চিহ্নিত ক’জন। অনেক কষ্ট ও কৌশলে রফিকুল আমিনের ডেসটিনির কব্জামুক্ত করার পর রক্তের আত্মীয়রা আমাকে বিয়োগ করে যে যার মত দখল নিয়েছে এষ্টেট! রাজনীতির তাপ্পিদেয়া ছাতাও নাকি আছে! চুপচাপ আছি, পারিবারিক সম্পত্তিই লুটের মাল, তো ওয়াকফ এষ্টেট! যাকগে, যাদের দায় মিটাতে বাড়িতে আসা, তাদের ঘরে ঘরে হাজিরা দিয়ে ভারমুক্ত হয়ে ঘন্টা তিন পর ফিরে আসি। খারাপ লাগে, নতুন কিছু ভদ্র পরিবার দুস্থ তালিকায় যোগ হওয়ায়। ভাইপো, বৌমা, নাত নাতিরা ভক্ত আমার। ওরা একদিন আগে এসেছে। আসর জমিয়েছে দারুণ। সাড়ে তিন পৌণে চার নাগাদ মেহমান আপ্যায়নে ক্লান্ত বৌমাদের সাথে খাওয়া দাওয়া সারি। এই ফাঁকে ভয়ঙ্কর একটা খবর কানে ঝাপ্টা খায়। রমজান আলী চৌধুরী বাড়িতে নাকি ঈদ জামাতের পর পর তুমুল মারামারি হয়েছে। কারণটা একদম ঠুনকো। মসজিদের ইমাম সাহেব মুনাজাতের সময় মরহুম কোন এক চৌধুরীর নাম ধরে দোয়া করেননি। এনিয়ে ওই চৌধুরীর ওয়ারিশানরা খেপে যায়। এরপর মসজিদে বাড়াবাড়ির বিপজ্জনক ট্রেন চালক ছাড়াই ছুটতে থাকে। থামে মরহুম দিদারুল আলম চৌধুরীর বাড়িতে। উনিও সম্পর্কে আমার মামা। ওনার ছেলেদের তৈরি নতুন বাড়ির জানালার থাই ফিটিংস ও দামি গ্লাস হয়ে যায় বিরোধের টার্গেট। এক পক্ষ ইট পাথর ছুঁড়ে ভাঙতে থাকে গ্লাস, ফিটিংস। বাধা দিতে গিয়ে আহতের ঘটনাও! পরে থানা পুলিশ। আটক হয় কয়েকজন হামলাকারী। এরা নাকি ‘চিহ্নিত’ ছাত্রলীগার! এটা মায়ের নানাবাড়ি। আওয়ামী লীগ বিরোধী পুরানো ঘাটি। একমাত্র মরহুম খায়রুজ্জমান চৌধুরীর পরিবার বাদ দিয়ে। এ’নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ থেকে অনেক ‘কাহানি’! এখন বাদ। হায়রে ছাত্রলীগ-আওয়ামী লীগ! প্রচুর রক্তভেজা পিছলা পথ মাড়িয়ে, বহু বিনিদ্র রজনী পাড়ি দিয়ে, জীবনকে হাতের মুঠোয় নিয়ে ‘৭৫ এর পর জানবাজ কিছু নেতাকর্মীকে সাথে নিয়ে ধলই তথা পুরো হাটহাজারিতে সংগঠনগুলোর ভিত্তি মজবুত করেছি। আজ সেখানে ছাত্রলীগ আওয়ামী লীগের নামে এত অপকর্ম কীভাবে হয়? এমনকি বেদখল হয়, আমার পৈত্রিক ও ওয়াকফ সম্পত্তি! আসলে এরা কারা, মদদদাতাই কে? দ্রুত পরগাছা নির্মূল করা না গেলে বঙ্গবন্ধু ও প্রাণপ্রিয় সংগঠনের উপর সব দায় চাপবে। মসজিদের ইমাম মুনাজাতে কার বাপের নাম না নেয়ায় যদি কোন ভদ্রলোকের বাড়িতে হামলা হয়, এটা বিশ্বাস করা কী সম্ভব ! আসলে আমরা যাচ্ছি কোথা- চালকইবা কে।

x